জীবের জনন
Madhyamik

জনন | জীবনের প্রবহমানতা

জীবনবিজ্ঞানদশম শ্রেণি – জনন [Jonon]

কোশ বিভাজনের পর এবার আমরা পড়বো জীবের আর এক অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য জনন সম্বন্ধে।

জননের সংজ্ঞা

যে জৈবিক পদ্ধতিতে কোনো জীব তার নিজস্ব সত্ত্বা বজায় রেখে সম আকৃতিবিশিষ্ট অপত্য জীব সৃষ্টি করে এবং বংশবৃদ্ধিকরে, তাকে জনন (Reproduction) বলে।


jump magazine smart note book


জননের প্রয়োজনীয়তা (Importance of Reproduction)

জীবের অস্তিত্ব বজায়: জনন পদ্ধতির দ্বারা জীব তার বংশধর সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বকে বজায় রাখে, যা তাদের অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে।

নিজস্ব প্রজাতির জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি: জননের মাধ্যমে জীব তার নিজের প্রজাতির জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, এর ফলে পরোক্ষভাবে পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হবার আশঙ্কা কমে যায়।

জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষা: মৃত্যুর ফলে জীবের সংখ্যা কমে যাওয়া সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সেই মৃত্যু জনিত সংখ্যা পূরণ করতে সাহায্য করে জনন। এর ফলে পৃথিবীতে জীবজগতের ভারসাম্য বজায় থাকে।

ধারাবাহিকতা বজায় রাখা: জননের ফলে জীবের বংশানুক্রমিক ধারা বজায় থাকে।

সংকর জীব সৃষ্টি: আন্তঃপ্রজাতিক যৌন জননের ফলে সংকর জীব উৎপন্ন হয়, যা পরিবর্তিত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

প্রকরণ: এর ফলে জীবের মধ্যে ভেদ বা প্রকরণ (Variation) এর সূচনা হয়, প্রয়োজনীয় প্রকরণ জীবের অভিযোজন-অভিব্যক্তিতে সাহায্য করে।

জনন পদ্ধতি (Mode of Reproduction)

জনন প্রধানত দুই প্রকার। যথা –

a) অযৌন জনন (Asexual Reproduction)

b) যৌন জনন (Sexual Reproduction)

এছাড়া বিশেষত উদ্ভিদের ক্ষেত্রে অঙ্গজ জনন দেখা যায়। আমরা এবারে এই দুই প্রকার জনন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।


দশম শ্রেণির অন্যান্য বিভাগগুলি পড়ুন –ভৌতবিজ্ঞান | গণিত | জীবনবিজ্ঞান

অযৌন জনন কাকে বলে?

অযৌন জনন বলতে বোঝায় যে জনন প্রক্রিয়ায় গ্যামেট উৎপাদন হয় না। কিন্তু জনিতৃ জীবের দেহ কোশ বিভাজিত হয়ে অথবা রেণু তৈরি হয়ে জনিতৃ জীবের সত্ত্বা এবং আকৃতি বিশিষ্ট অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়।

অপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে অযৌন জননের একক হল হ্যাপ্লয়েড (n) রেণু। এরা রেণু সৃষ্টির মাধ্যমে জনিতৃ উদ্ভিদ থেকে অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি করে।

অযৌন জননের বৈশিষ্ট্য

  • একটি মাত্র জনিতৃ জীবই অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে। এই অযৌন জনন পদ্ধতিতে জনিতৃ জীবের কোনো দেহাংশ বিভাজিত হয়ে অথবা রেণু উৎপাদনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
  • তোমরা এর আগে মাইটোসিস এবং মিয়োসিস কোশ বিভাজন সম্পর্কে পড়েছ। অযৌন জনন প্রক্রিয়া মাইটোসিস কোশ বিভাজনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে মিয়োসিসের প্রয়োজন হয় না।
  • মাইটোসিস কোশ বিভাজন হয় বলে অযৌন জনন পদ্ধতিতে জনিতৃ জীবের সব রকম বৈশিষ্ট্য অপত্য জীবে সঞ্চারিত হয়।
  • মিয়োসিস কোশ বিভাজন না হওয়ায় এই জনন প্রক্রিয়ায় কোনো রকম ক্রসিং ওভার ঘটে না। এর ফলে অপত্য জীবের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয় না অর্থাৎ অভিব্যক্তিতে অযৌন জননের কোনো ভূমিকা নেই।
  • অনুকূল পরিবেশে অযৌন জনন সম্পন্ন হয়।
  • অযৌন জনন পদ্ধতিতে খুব কম সময়ে দ্রুত হারে বংশ বৃদ্ধি ঘটে।
  • অযৌন জনন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অপত্য জীব জিনগতভাবে জনিতৃ জীবের সম প্রকৃতির হয়।

উদাহরণ: অযৌন জনন প্রধানত উদ্ভিদ এবং কিছু নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীদের দেহে দেখা যায়।

অযৌন জননের বিভিন্ন পদ্ধতি

অযৌন জনন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। যেমন- i) বিভাজন ( Fission), ii) খন্ডীভবন (Fragmentation) iii) কোরকোদগম( Budding), iv) পুনরুৎপাদন(Regeneration), v) রেণু উৎপাদন (Spore Formation) ইত্যাদি।


UPDATE:মাধ্যমিক পরীক্ষার ভীতি কাটাবার সেরা উপায়↓

madhymik-mock-test

যৌন জনন কাকে বলে?

যে জনন প্রক্রিয়ায় দুটি অসম প্রকৃতির ভিন্নধর্মী জননকোশ অর্থাৎ পুং গ্যামেট এবং স্ত্রী গ্যামেটের মিলন ঘটার ফলে অপত্য জীব সৃষ্টি হয়, তাকে যৌন জনন বলে।

যৌন জননের একক হল জননকোশ বা গ্যামেট (Gamete)। পুংদেহে উৎপন্ন গ্যামেটকে পুং গ্যামেট (male gamete) বা শুক্রাণু (sperm) বলে এবং স্ত্রীদেহে উৎপন্ন গ্যামেটকে স্ত্রী গ্যামেট (female gamete) বা ডিম্বাণু (egg) বলে।

প্রতিটি গ্যামেটে হ্যাপ্লয়েড (n) সংখ্যক ক্রোমোজোম থাকে। একটি পুং গ্যামেট (n) এবং একটি স্ত্রী গ্যামেট (n) মিলনের ফলে ডিপ্লয়েড (2n) কোশ গঠিত হয়।

যৌন জননের বৈশিষ্ট্য

  • যৌন জননে একই প্রজাতির দুটি পৃথক জনন কোশের প্রয়োজন হয়।
  • যৌন জননে পুং এবং স্ত্রী গ্যামেটের মিলনের ফলে যে অপত্য জীব উৎপন্ন হয়, তাকে জাইগোট বলে।
  • উন্নত জীবে মিয়োসিস কোশ বিভাজনের মাধ্যমে হ্যাপ্লয়েড গ্যামেট উৎপন্ন হয়। কিন্তু কিছু নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদে যেমন ক্ল্যামাইডোমোনাসে মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় গ্যামেট উৎপন্ন হয়।
  • দুটি পৃথক গ্যামেটের মিলন এবং মিয়োসিস কোশ বিভাজনে ক্রসিং ওভার ঘটায়, যৌন জননে সৃষ্ট অপত্য জীবের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত হয়। যৌন জনন জীব বিবর্তনের বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
  • যৌন জনন তুলনামূলক জটিল প্রক্রিয়া।
  • নিম্নশ্রেণির জীবে প্রতিকূল পরিবেশে যৌন জনন ঘটে।
  • যৌন জনন পদ্ধতিতে অপত্য সৃষ্টি হওয়া সময়সাপেক্ষ।

উদাহরণ: মানুষসহ সকল মেরুদন্ডী প্রাণী যৌন জনন পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করে। তাছাড়া কিছু নিম্ন শ্রেণীর উদ্ভিদ যেমন ক্ল্যামাইডোমোনাস, শৈবাল এবং কিছু সপুষ্পক উদ্ভিদ যৌন জনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

যৌন জননের পদ্ধতি

যৌন জনন চারটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। যথা-

I) গ্যামেট উৎপাদন বা গ্যামেটোজেনেসিস (Gametogenesis): যে পদ্ধতিতে জনন মাতৃকোশ মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে গ্যামেট সৃষ্টি করে, তাকে গ্যামেটোজেনেসিস বলে। এর ফলে পুরুষদেহে শুক্রাণু এবং স্ত্রী দেহে ডিম্বাণু গঠিত হয়।

II) নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন (Fertilization): যে পদ্ধতিতে পুং এবং স্ত্রী গ্যামেটের মিলন হয়, তাকে নিষেক বলে। নিষেকের ফলে ডিপ্লয়েড (2n) জাইগোট তৈরি হয়।

III) ভ্রূণ গঠন বা এমব্রায়োজেনেসিস (Embryogenesis): জাইগোট মাইটোসিস প্রক্রিয়া বারবার বিভাজিত হয়ে মরুলা, ব্লাস্টুলা এবং গ্যাস্ট্রুলা দশার মাধ্যমে ভ্রূণে পরিণত হয়।

IV) ভ্রূণের বৃদ্ধি (Development of embryo): পরিণত ভ্রূণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে অপত্য সৃষ্টি করে।


jump magazine smart note book


অঙ্গজ জনন

অঙ্গজ জনন হলো উদ্ভিদের এক বিশেষ প্রকার অযৌন জনন পদ্ধতি। উদ্ভিদের অঙ্গজ একক (Vegetative unit) থেকে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি হওয়া হল অঙ্গজ জনন। উদ্ভিদের অঙ্গজ একক বলতে বোঝায় স্ফীত কন্দ (Tuber), গুড়িকন্দ (corm), কোরক (Bud) ইত্যাদি। অঙ্গজ জননের একক হল প্রোপাগিউল (Propagules)।

কাকে বলে অঙ্গজ জনন?

যে অযৌন জনন পদ্ধতিতে উদ্ভিদ দেহের কোন অঙ্গ বা অংশ জনিতৃ উদ্ভিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুনরায় অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি করে, তাকে অঙ্গজ জনন বলে।

অঙ্গজ জননের বৈশিষ্ট্য

  • অঙ্গজ জনন তুলনামূলকভাবে সরল এবং এক বিশেষ প্রকার অযৌন জনন প্রক্রিয়া।
  • জনিতৃ উদ্ভিদের দেহাংশ আলাদা হয়ে গিয়ে নতুন অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে, যেমন – আখ, জবা ইত্যাদি।
  • অঙ্গজ জননের ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদের গুণগতমান অপরিবর্তিত থাকে অর্থাৎ কোনো রকম প্রকরণ ঘটে না।
  • অঙ্গজ জননের ক্ষেত্রে মাইটোসিস কোশ বিভাজন পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়। এই মাইটোসিস কোশ বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের দেহের যে কোনো অংশ বৃদ্ধি পেয়ে অঙ্গজ জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে।
  • অঙ্গজ জননের মাধ্যমে উদ্ভিদের সংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

উদ্ভিদের অঙ্গজ জননের প্রকারভেদ

উদ্ভিদের অঙ্গজ জনন সাধারণত দুই প্রকার যেমন – a) প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অঙ্গজ জনন (Natural vegetative propagation) এবং b) কৃত্রিম অঙ্গজ জনন (Artificial vegetative propagation)।

পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → সপুষ্পক উদ্ভিদের যৌন জনন


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্যভাবে কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



Join JUMP Magazine Telegram


JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাওয়ার জন্য –

X-Lsc-2c