itihaschorchay-upadan-hisabe-bongodorshoner-gurutwo
প্রশ্ন-উত্তর

ইতিহাসচর্চায় উপাদান হিসাবে বঙ্গদর্শনের গুরুত্ব



এই লেখাটি ইতিহাসের ধারণা অধ্যায়ের অন্তর্গত। মূল আলোচনা এই লিঙ্ক থেকে পড়ুন ইতিহাসচর্চায় সংবাদপত্র সাময়িকপত্রের গুরুত্ব

তোমরা ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসটি পড়েছ? কিংবা ‘কপালকুণ্ডলা’? পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ, উপন্যাসগুলির ভাষা ঠিক আমাদের কথ্য বাংলার মত নয়?
বঙ্কিমচন্দ্রের এই উপন্যাসগুলির যে ভাষা তাকে বলে সাধু গদ্য।
এতে সংস্কৃত তৎসম ও তদ্ভব শব্দের ব্যবহার বেশি। এই সাধু গদ্যের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের প্রথম পরিচয় হয় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে।

১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে ‘বঙ্গদর্শন’।

‘বঙ্গদর্শন’ বাংলা পত্রপত্রিকার ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণকে সূচিত করে। ‘বঙ্গদর্শনে’র পূর্বে প্রকাশিত সাময়িকপত্রগুলির মধ্যে বেশিরভাগই খুব বেশিদিন চলেনি। এমনকি ‘বঙ্গদর্শনে’র সমসাময়িক আর দুটিমাত্র পত্রিকা বিংশ শতক পর্যন্ত টিকেছিল – ‘তত্ত্ববোধিনী’ ও ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকা। এগুলি ছিল নীরস শিক্ষামূলক পত্রিকা।

সেসময় বাংলায় আনন্দপাঠের উপযুক্ত লেখার মধ্যে একদিকে ছিল রামায়ণ-মহাভারত, বাংলা আরব্য রজনী, বেতাল পঞ্চবিংশতি আর অন্যদিকে ছিল পত্রপত্রিকার ভারী ভারী প্রবন্ধ।

কিশোর মনের চাহিদা নিবৃত্তি ঘটাতে পারে এমন লেখা ছিল বিরল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নবীনচন্দ্র সেনের মত সে যুগের প্রথিতযশা বাঙালির আত্মজীবনীতে এই নিয়ে খেদ ঝরে পড়েছে। এই শূন্যতা ভরাট করতে বিভিন্ন রুচির পাঠযোগ্য রচনার ডালি সাজিয়ে হঠাৎ হাজির হল ‘বঙ্গদর্শন’।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

কবিতা, নাটক-নভেল, প্রবন্ধ, সমালোচনামূলক রচনা কি নেই তাতে! বাংলা প্রকাশনার জগতেও ‘বঙ্গদর্শন’ জোয়ার আনে। এখানে প্রকাশিত হবার পর অনেক উপন্যাসই বই হয়ে বেরিয়েছে।

বঙ্কিমের বেশিরভাগ কিংবদন্তী সৃষ্টি যেমন ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘রজনী’, ‘আনন্দমঠ’, ‘রাধারানী’, ‘ইন্দিরা’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রথম বঙ্গদর্শনেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

রম্যরচনা ছাড়াও এখানে সমসাময়িক দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্যবিষয়ক লেখা থাকত।
পাশ্চাত্য ইতিহাস ও সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে বাঙালি মানসে ইউরোপীয় ধাঁচের জাতীয়তাবোধ জাগরিত হয়। ‘আনন্দমঠে’র বন্দেমাতরম সঙ্গীত অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছে।

বঙ্কিম খুব সচেতনভাবেই এক দেশজ বাংলা গদ্যরীতি তৈরী করতে চেয়েছিলেন। তাই সংস্কৃত ও আরবি-ফারসি সাহিত্য থেকে ধার করার পাশাপাশি যেখানেই সম্ভব হয়েছে সেখানেই তিনি ওইসব শব্দের বঙ্গজ প্রতিশব্দ আমদানি করেছেন। এইভাবে বিশুদ্ধ বাংলা গদ্যের যে ধাঁচাটি বঙ্কিম তৈরী করে দেন বিংশ শতাব্দীর লেখকেরাও মূলতঃ সেটিকেই অনুসরণ করেছেন।

গদ্যরীতির পাশাপাশি পত্রিকার বিন্যাসের ক্ষেত্রেও পরবর্তীকালের ‘ভারতী’, ‘নব্যভারত’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলি ‘বঙ্গদর্শন’কে মডেল ঠাউরেছিল।

প্রথম কয়েকটি খন্ডের পর ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদনার দায়িত্ব বর্তায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভ্রাতা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাঁধে।

‘বঙ্গদর্শনে’র লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, লালবিহারী দে, রামগতি ন্যায়রত্ন, দীনবন্ধু মিত্রের মত নামজাদা ব্যক্তিত্ব।

আরও কিছু দিক থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পথপ্রদর্শক। ‘বঙ্গদর্শন’ পূর্ববর্তী যুগের বাজারী সাহিত্য বিক্রি হত ফুটপাথে। ওইসব বইয়ের কাগজের মানও খুব একটা ভালো ছিল না। ‘বঙ্গদর্শনে’র কাটতির সুবাদে লাইব্রেরীকে কেন্দ্র করে এক নতুন পাঠ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। পত্রিকার প্রচ্ছদ, কাগজ ও বাঁধাই ছিল রুচিশীল ভদ্রলোক পাঠকের মনমত।

আগেকার দিনে একজন বই বা সংবাদপত্র কিনলে দশ জন নিরক্ষর লোককে ডেকে পড়ে শোনানোর একটা চল ছিল। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সদস্যদের বাড়ি বাড়ি কপি পৌঁছে দেবার রীতি চালু করলে ধীরে ধীরে ভদ্রলোক বাঙালি নিভৃতপাঠে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

আশা করি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছ, কেন খেলাধুলা, খাওয়া দাওয়া, শিল্পচর্চার মত বই পড়াও সংস্কৃতিরই অঙ্গ! এই সংস্কৃতির গাঠনিক পর্বের সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বুঝতে হলে অনেক সময়েই ঐতিহাসিকদের ‘বঙ্গদর্শনে’র মত সাময়িক পত্রের আশ্রয় নিতে হয়।

বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রকাশের পিছনে বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমকালীন শিক্ষিত মননের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় ঘটানো।

সমসাময়িক পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার বিষয়গুলি এই পত্রিকায় উঠে আসত। দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন রচনা এখানে প্রকাশিত হত। এই প্রসঙ্গে তাঁর ‘বিজ্ঞানরহস্য’ সিরিজ এবং ‘কৃষ্ণচরিতে’র কথা উল্লেখ করা যায়।

রাজনৈতিক বিষয়ে ইউরোপে প্রচলিত তত্ত্বগুলোর সঙ্গে বাঙালির পরিচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বঙ্গদর্শন। ভারতের আর্থ-সামাজিক বিষয়ে বঙ্কিমের চিন্তাভাবনাও প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গদর্শনের পাতায়।

‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক ভূমি-রাজস্ব নীতির দরুণ বাঙালি কৃষকের সঙ্গীন অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই পত্রিকাতেই বঙ্কিমচন্দ্র ব্যক্তিগত নিবন্ধ রচনার সূচনা করেছিলেন।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।