paragar-duipohor-valobasi
WB-Class-8

পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি – জীবনানন্দ দাশ

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বাংলা। পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি (কবিতা)


কবি পরিচিতি

বাংলা কবিতার ধারায় রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম মহৎ কবি জীবনানন্দ দাশ। ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে (অধুনা বাংলাদেশে) জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ।

১৯১৭ সালে শ্রী জীবনানন্দ ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন এবং ১৯১৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ পাশ করেন। তাঁর কর্মজীবন খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। প্রথমে ১৯২২ সালে সিটি কলেজের চাকরি, তারপর সেখান থেকে বরখাস্ত হয়ে দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপনার কাজ পান। সেই চাকরিও থাকেনি বেশিদিন।

গৃহশিক্ষকতা আর চরম অনটনে কেটেছে তাঁর জীবন। ১৯৫২ সালে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক পুরস্কৃত হন তিনি। যদিও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছিল ‘ঝরা পালক’ (১৯২৭)। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬), ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪), ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮), ‘রূপসী বাংলা’ (১৯৫৭), ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ (১৯৬১) ইত্যাদি। জীবৎকালে তাঁর খুব কম কবিতাই প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর বহু কবিতা এখনও অনাবিষ্কৃত। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ২২ অক্টোবর সেখানেই মারা যান তিনি।

পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি কবিতার উৎস

এই কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

কবিতার সরলার্থ

পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি, কবিতাটির আলোচনা শুরু করার আগে আমাদের দুটি শব্দের সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন।

পাড়াগাঁ – আমরা জানি ছোট জনপদকে গ্রাম বলা হয়। আর অপেক্ষাকৃত ছোট এবং অনুন্নত জনপদকে পাড়াগাঁ বলা হয়।

প্রহর – এখন আমরা যেরকম মিনিট, ঘণ্টা এবং বেলার হিসাবে দিন বা রাতের হিসাব করি। তেমন আগে প্রহর বা পহর দিয়ে এই হিসাব করা হত। একপ্রহর হল তিন ঘণ্টা। সকাল ছটা থেকে এই প্রহর শুরু হত, অর্থাৎ প্রথম প্রহর হল সকাল ছটা থেকে সকাল নটা। এর পরবর্তী প্রহর ছিল নটা থেকে দুপুর বারোটা। এই সময়কেই দ্বিপ্রহর বলা হত।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক।

পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি — রৌদ্র যেন গন্ধ লেগে আছে

কবি বলেছেন যে তিনি পাড়াগাঁর দু’পহর বা দ্বিপ্রহর ভালোবাসেন।

সূর্য যখন মধ্যগগনে থাকে। দিনের সবচেয়ে উষ্ণতম সময়কাল কবির প্রিয়। এই সময় সচারচর কেউ থাকে না। ধরিত্রীর সব অংশ ভেসে যায় সূর্যের তীব্র আলোর স্রোতে। গন্ধ যেমন গায়ের সাথে লেগে থাকে, তেমনি কবির মনে যেন রৌদ্র যেন গন্ধের মত লেগে আছে ধরিত্রীর সাথে।

স্বপনের — কোন গল্প, কি কাহিনী, কি স্বপ্ন যে বাঁধিয়াছে ঘর
আমার হৃদয়ে, আহা, কেউ তাহা জানেনাকো — কেবল প্রান্তর
জানে তাহা, আর ওই প্রান্তরের শঙ্খচিল; তাহাদের কাছে
যেন এ-জনমে নয় — যেন ঢের যুগ ধরে কথা শিখিয়াছে

কবি স্বপ্ন দেখেন। তিনি বুঝতে পারেন না যে এটা গল্প নাকি কোন কাহিনি। সে স্বপ্ন কবির হৃদয়ের গভীরে ঘর বাঁধে। এই স্বপ্ন আর কেউ বুঝতে পারেনা। বোঝে কেবল প্রান্তর (বিশাল বড় মাঠ) আর প্রান্তরে থাকা শঙ্খচিল (সাদা রঙের চিল)। তারা যেন শুধু এই জন্মের নয়। অনেক কাল ধরে তারা তাদের কাহিনি জমিয়ে রেখেছে।

এ  হৃদয় — স্বপ্নে যে বেদনা আছে : শুষ্ক পাতা — শালিখের স্বর,
ভাঙা মঠ — নক্‌শাপেড়ে শাড়িখানা মেযেটির রৌদ্রের ভিতর
হলুদ পাতার মতো সরে যায়, জলসিড়িটির পাশে ঘাসে

কবির হৃদয়ে – স্বপ্নে যে বেদনা ধরা দিয়েছে তাই যেন প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। শুষ্ক পাতা, শালিকের স্বর, ভাঙা মঠ; তুচ্ছ ঘটনাগুলি কবি মনে ধরা দিচ্ছে প্রকৃতির অব্যক্ত কাহিনির চিহ্নরূপে।

কোন এক মেয়ের নক্‌শাপেড়ে শাড়ি, যা হয়তো আগে ব্যবহৃত হত; তা যেন আজ রিক্ত হলুদ পাতার মত হাওয়ায় সরে যায়। এসে পড়ে জলসিঁড়ির (পুকুরঘাটে নামার সিঁড়ি) পাশের ঘাসে।

শাখাগুলো নুয়ে আছে বহু দিন ছন্দহীন বুনো চালতার:
জলে তার মুখখানা দেখা যায় — ডিঙিও ভাসিছে কার জলে,
মালিক কোথাও নাই, কোনোদিন এই দিকে আসিবেনা আর,
ঝাঁঝরা -ফোঁপরা, আহা ডিঙিটিরে বেঁধে রেখে গিয়েছে হিজলে;

অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো চালতার শাখাগুলি জলের কাছে নুয়ে আছে। তারা বুনো, অযত্নে বেড়ে ওঠে তাই তাদের বেড়ে ওঠা ছন্দহীন। জলে চালতার ছবি প্রতিফলন হয়, কবির মনে হয় যেন ‘মুখখানা দেখা যায়’। জলে একটি ডিঙি (ছোট নৌকা) ভাসছে। ডিঙিটি পরিতক্ত, তার কোন মালিক নেই। অতি ব্যবহারে, সময়ের সাথে সে ‘ঝাঁজরা’ হয়ে গেছে। ডিঙিটি বাঁধা আছে হিজল গাছের সাথে। কবির মায়া হয়। তাঁর মনে হয়ে অবিভাবকহীন ডিঙিটি যেন হিজলের অবিভাবকত্বে রয়েছে।

পাড়াগাঁর দু — পহর ভালোবাসি — রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার
গন্ধ লেগে আছে, আহা, কেঁদে – কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে।

প্রকৃতির অবক্ত্য কাহিনি প্রকাশ পায় পাড়াগাঁর দুপহরে। কবির মনে হয়, মধ্যগগনের আঁচে তপ্ত, বেদনাতুর ধরিত্রী যেন কেঁদে ভাসায় আকাশের নিচে।

subscribe-jump-magazine-india

পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি কবিতার সারাংশ

বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলাকে ভালোবাসেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসেন।

তিনি স্বপ্নাতুর চোখে তাঁর ভালোবাসার প্রকৃতিকে উপলব্ধির চেষ্টা করেন। দুপুর বেলায়, যখন মধ্যগগনে থাকে সূর্য। রোদে ভেসে যায় প্রকৃতি। পাড়াগাঁয়ের রাস্তায়, মাঠে কোন মানুষ থাকে না। প্রকৃতির অনেক কথা বলার থাকে, কিন্তু শোনার কেউ থাকে না। একাকি কবি সেসময় বেদনাতুর প্রকৃতির ক্রন্দন শুনতে পান। প্রকৃতি মানুষের ভাষায় কথা বলে না। কিন্তু সে তার অব্যক্ত কাহিনি প্রকাশ করে নানান ক্ষুদ্র – তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে দিয়ে। পাতা ঝড়ে পড়ে, শালিকের ডাক শোনা যায়, ভাঙা মঠ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে… প্রকৃতি এই ভাবে তার বেদনা ব্যাক্ত করে।

কিন্তু প্রকৃতি ব্যাথিত কেন?

সময়ের কলে বাঁধা পড়ে ঘটনা, কাহিনি গল্প, সাক্ষী থাকে প্রকৃতি। প্রকৃতি তা বলতে চায়। ব্যাক্ত করতে চায় সেই নক্‌শাপেড়ে শাড়িটার কথা, যা একসময় কোন এক রমণীর আভূষণ ছিল। কিন্তু আজ তা হলুদ – বিবর্ণ পাতার মত রিক্ত, তার স্থান আজ জলসিরিটির পাশের ঘাসে। প্রকৃতি ব্যাক্ত করতে চায় সেই ডিঙির কথা, যা একসময় কারুর মালিকানায় ছিল, কিন্তু আজ তা পরিতক্ত। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সে আজ বৃদ্ধ, ঝাঁজরা – ফোঁপরা।

কবির মায়া হয়, কবিও প্রকৃতির এই দুঃখের শরীক হন।

সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।