WB-Class-8

শারীরবৃত্তীয় কাজে ধাতব ও অধাতব মৌলের ভূমিকা

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বিজ্ঞান । অধ্যায় – পদার্থের প্রকৃতি (তৃতীয় পর্ব)


আগের পর্বে আমরা মানব জীবনে ধাতব ও অধাতব মৌলগুলির ভূমিকা সম্পর্কে জেনেছি। এই পর্বে আমরা শারীরবৃত্তীয় কাজে ধাতব ও অধাতব মৌলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

আমাদের শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন মৌল নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

দেহের সঠিক শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার জন্য এই মৌলগুলির উপস্থিতি বিশেষ প্রয়োজন। আমরা একে একে এগুলি সম্পর্কে ধারণা লাভ করবো।

দেহে জলের ভারসাম্য রক্ষা

জীবদেহে জলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহের 60% থেকে 70% হল জল। শরীরের বিভিন্ন কোষের ক্রিয়াকলাপ এবং বিভিন্ন অঙ্গগুলির সমন্বয়সাধন ও কার্যকারিতার জন্য জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরের বিভিন্ন আন্তঃকোষীয় ও বহিঃকোষীয় কার্যসম্পাদনের মাধ্যম হল জল। কোষীয় তরলে উপস্থিত Na+ ও K+ ক্যাটায়ন এইক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃকোষীয় ও বহিঃকোষীয় প্রকোষ্ঠে জলের বন্টন হয় অভিস্রাবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই কাজে Na+ অর্থাৎ সোডিয়াম আয়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

Na+ ও K+ শরীরে রক্তের আয়তন এবং তরল রাখতে সাহায্য করে।

তবে শরীরে সোডিয়াম বেড়ে গেলে বা পটাশিয়াম খুব কমে গেলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। আমরা জানি খাদ্য লবণ অর্থাৎ সোডিয়াম ক্লোরাইড (Nacl) এ সোডিয়াম বর্তমান। এই কারণে কাঁচা নুন বেশী খেলে Na+ এর প্রভাবে রক্তে জলের পরিমাণ বেড়ে যায়, ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, যা হৃৎপিণ্ড ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে ডায়েরিয়া হলে বা কোন কারণে অত্যাধিক ঘাম হতে থাকলে শরীর থেকে Na+ বেড়িয়ে যায়। সোডিয়ামের পরিমাণ নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে কম হয়ে গেলে রক্তচাপ হ্রাস পায় ও এর প্রভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হবারও সম্ভবনা থাকে।

subscribe-jump-magazine-india

হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা

হৃৎপিণ্ড হল এমন একটি পাম্প যা সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে। হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ফলে এই রক্ত সঞ্চালন ঘটে।

হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণকার্যে ক্যালসিয়াম (Ca) ও পটাশিয়াম (K) আয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ক্যালসিয়াম হৃদযন্ত্রের পেশীকোষে প্রবেশ করে বৈদ্যুতিক সঙ্কেত সৃষ্টি করে যা হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা সমন্বয় করে। শরীরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে হৃৎপিণ্ডের সংকোচনের হার কমে যায়, আবার ক্যালসিয়ামের গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি হলে হৃৎপিণ্ডের সংকোচন বৃদ্ধি পায়।

pumping-of-heart

রক্ত তঞ্চন

আমরা জানি যে শরীরের কোন অংশে কেটে গিয়ে রক্তপাত ঘটতে থাকলে, পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্ষতস্থানের রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনাকে রক্ত তঞ্চন বলা হয়। ক্যালসিয়াম আয়ন রক্তে বর্তমান রক্ত তঞ্চনে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলিকে সক্রিয় করে তোলে।

হাড় ও দাঁতের গঠন

দাঁত ও হাড়ের গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ও ফসফরাস (P) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাড় ও দাঁতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ক্যালসিয়াম। ক্যলাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড়ের ঘনত্ব রক্ষা করে। এছাড়া আমাদের দাঁতের এনামেল তৈরি হয় ক্যলাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা।

অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা

আমাদের শরীরে অ্যাসিড বা অম্ল এবং ক্ষারের ভারসাম্য বজায় থাকা খুব প্রয়োজন। এই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পটাশিয়াম (K) এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। শরীরে যদি K+ অর্থাৎ পটাশিয়াম আয়নের পরিমাণ কমে যায় তাহলে কোষের ভিতর অ্যাসিড বা অম্লত্ব বৃদ্ধি পায়। আর সেই সাথে কোষের বাইরে থাকা তরলের ক্ষারত্ব বৃদ্ধি পায়। অম্ল–ক্ষারের এই ভারসাম্যহীনতার ফলে নানারকম অস্থিঘটিত রোগ দেখা যায়। এই ভারসাম্য না থাকার কারণে শরীরের বিভিন্ন হাড়ের সংযোগস্থল অর্থাৎ অস্থিসন্ধির ক্ষয় হতে শুরু করে যা আর্থ্রাইটিস নামে পরিচিত। এছাড়া অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পাওয়ার মতন রোগ দেখা দিতে পারে।

পেশী সংকোচন ও স্নায়ুস্পন্দন পরিবহণ

মানব শরীরে প্রায় 600 পেশী বর্তমান। আমাদের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঞ্চালনের পিছনে পেশীগুলির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। পেশীর সংকোচন–প্রসারণের কারণে এই সঞ্চালন ঘটে। এই ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম আয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও পেশীর বিভিন্ন ক্রিয়ার উপর ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম আয়নের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

শরীরে অক্সিজেন পরিবহণ

মানবদেহে অক্সিজেন পরিবহণ ঘটে হিমোগ্লোবিন ও মায়োগ্লোবিনের মাধ্যমে। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকায় বর্তমান থাকে হিমোগ্লোবিন, আর পেশীতন্তুতে থাকে মায়োগ্লোবিন। আয়রন বা লোহা হল রক্তের অন্যতম উপাদান। মানব দেহের 70% আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিনের মধ্যে বর্তমান থাকে।

এছাড়াও জিঙ্ক (Zn), কপার (Cu), ম্যাঙ্গানিজ (Mn) ও আরও বিভিন্ন মৌল আমাদের শরীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

মানবদেহে ধাতু অধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিজনিত সমস্যা

মানব শরীরে গঠন ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যের জন্য বিভিন্ন ধাতু ও অধাতুগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু অন্যদিকে কিছু কিছু ধাতু ও অধাতু যদি মানবদেহে নির্দিষ্ট মাত্রার বেশী উপস্থিত থাকে তাহলে তা দেহে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

আর্সেনিক (As), ফ্লুওরিন (F), মার্কারি বা পারদ (Hg), লেড (Pb), নিকেল (Ni) প্রভৃতি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশী মানব শরীরে থাকলে তা শরীরে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। এরফলে মস্তিস্ক, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, যকৃত, ত্বক প্রভৃতি বিভিন্ন অঙ্গ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় বা বিনষ্ট হয়।

এই মৌলগুলি দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রবেশ করলে এবং অত্যধিক মাত্রায় শরীরে সঞ্চিত হলে তা এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

মানবদেহে আর্সেনিকের প্রভাব

আর্সেনিক একটি ধাতু যা খাদ্য, পানীয় জল, কীটনাশক বা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই এর থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সাধারণত গভীর নলকূপের জল এবং খাদ্যের মাধ্যমে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে। এর প্রভাবে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। ত্বকে আর্সেনিকের প্রভাবে বিভিন্ন ক্ষত সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে সহনসীমার বেশি পরিমাণ আর্সেনিক মানবদেহে প্রবেশ করলে তা ক্যন্সার এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সাধারণত আর্সেনেট ও আর্সেনাইট যৌগ রূপে এটি পানীয় জল ও খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগবাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

মানবদেহে ফ্লুওরিনের প্রভাব

আর্সেনিকের মত ফ্লুওরিন ও একটি মানবদেহের ক্ষতিসাধক পদার্থ, যা ফ্লুওরাইড যৌগ রূপে শরীরে প্রবেশ করে। আর্সেনিকের মত ফ্লুরিনও গভীর নলকূপের জলের মাধ্যমে বা খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অত্যধিক মাত্রায় ফ্লুওরিন শরীরে প্রবেশ করতে থাকলে তা হাড়ের ক্ষতি করে এবং ক্যান্সারের সম্ভবনা বৃদ্ধি করে।

মানবদেহে লেডের প্রভাব

এটি একটি ধাতব খনিজ পদার্থ যা রং, কীটনাশক, সীসাযুক্ত ব্যাটারি, খেলনা, পানীয় জল প্রভৃতির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শরীরের সহনসীমার বেশি মাত্রায় লেড যদি প্রবেশ করে তাহলে অ্যানিমিয়া, কিডনি ও মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করে। অত্যধিক লেড শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। এমনকি শরীরে সিসার পরিমাণ সহনসীমার অনেক বেশী হয়ে গেলে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

মানবদেহে পারদের প্রভাব

লেড ও আর্সেনিকের মত পারদও একটি ভারী ধাতু (Heavy metal)। ডিজেল, জেট ফুয়েল প্রভৃতির দহনের ফলে পারদ বাতাসে মিশে যায়। এটি পরে জল বা মাটিতে মিশে যায় এবং খাদ্যের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই, থার্মোমিটার, তৈল শোধনাগার, প্লাস্টিক প্রভৃতি থেকেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শরীরে অতিরিক্ত পারদের নানা ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়। শরীরে অতিরিক্ত পারদের উপস্থিতির প্রভাবে স্নায়ুতন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষতি হতে পারে।

এছাড়াও শরীরে ক্যাডমিয়াম (Cd), ক্রোমিয়াম (Cr), অ্যালুমিনিয়াম (Al), নিকেল (Ni) প্রভৃতি মৌল নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশী থাকলে তা শরীরে নানা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

অধ্যায় সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব →অণু ও পরমাণুর ধারণা

এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতিঃ

বিজ্ঞান স্নাতক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষিতা নন্দিতা বসুর পেশা শিক্ষকতা।তিনি বই পড়তে বড় ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, অবসরে, বাসে ট্রামে তো বটেই, শোনা যায় তিনি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বই পড়তে পারেন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।