forasi-biplob-4
WB-Class-9

ফরাসী বিপ্লব – চতুর্থ পর্ব

ইতিহাসনবম শ্রেণি – ফরাসী বিপ্লব (চতুর্থ পর্ব)


আগের তিনটি পর্বে আমরা ফরাসী বিপ্লবের প্রারম্ভিক পর্ব (প্রথম পর্ব) , আর্থিক সংস্কার ও বাস্তিল দুর্গের পতন (দ্বিতীয় পর্ব) এবং মানুষ ও নাগরিকের অধিকারপত্র, রাজার মৃত্যুদণ্ড (তৃতীয় পর্ব) নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা বিপ্লব ও অভ্যন্তরীণ সংকট, জ্যাকোবিন শাসন ও বিপ্লবের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো।

time-table

বিপ্লব ও আভ্যন্তরীণ সংকট

১৭৯৩ সালে রাজা ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুর পরে, ইউরোপ জুড়ে সমস্ত স্বৈরাচারী রাজাদের মধ্যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের ভীতি জন্ম নেয়। ১৯৯২ সালে রাজা ষোড়শ লুই গ্রেফতারের পরে অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার সাথে যে যুদ্ধ শুরু হয় তা ১৯৯৩ সালে ব্যাপক আকার ধারণ করে।

Bataille_Jemmapes
ফ্রান্সের বিপ্লবী বাহিনীর একটি যুদ্ধ।

এই সময়ে  ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, স্পেন, পোর্তুগাল, সার্ডিনিয়া ও নেপলস্‌ জোট বেঁধে ফ্রান্সকে আক্রমণ করে। শক্তিশালী এই জোটের কাছে পরাজিত হয়ে ফ্রান্সের বাহিনী পিছু হটতে শুরু করলেএবং নব্যগঠিত প্রজাতন্ত্র এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়।

ফ্রান্সে খাদ্যের যে সমস্যা ছিল তা এই সময় ব্যাপকতা লাভ করে।

খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য সবাই রাজধানী প্যারিসে জমায়েত হতে থাকে। এই সময়ে রাজনৈতিক অরাজকতা দেখা দেয়, বহু মানুষ প্রকাশ্যে নতুন সরকারের  সমালোচনা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করতে থাকে ও রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবী শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের অভ্যন্তরে বিপ্লব শুরু হয়ে যায়।

The_elimination_of_Girondins
আভ্যন্তরীণ আন্দোলন।

দেশের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের নেতৃত্ববৃন্দ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বিশেষ জরুরী আইন প্রণয়ন করেন। তাদের যুক্তি ছিল একমাত্র ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসের মাধ্যমেই দেশে আইন – শৃঙ্খলা ফিরিয়ে, প্রজাতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব। এই বিশেষ শাসন ব্যবস্থা ‘সন্ত্রাসের শাসন’ নামে পরিচিত। এই বিশেষ শাসন ব্যবস্থা ২রা জুন ১৭৯৩ থেকে ২৭জুলাই ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ অবধি কার্যকর ছিল।

জ্যকোবিন শাসন

Robespierre

সন্ত্রাসের শাসন শুরুর সময় আইন সভায় মূলত দুটি দলের প্রাধান্য ছিল  – জিরনডিস্ট (Girondins) এবং জ্যাকোবিন (Jacobin)। কিন্তু ফ্রান্সের আভ্যন্তরীণ সংকট এবং অর্থনৈতিক দৈন্যদশার ফলে সংখ্যাগরিষ্ট দল জিরনডিস্ট-দের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। এই সময়ে জ্যাকোবিনরা মূলত ‘সাঁকুলাৎ’ (sans-culotte)-দের (নিম্নআয়ের শ্রমিক, দিনমজুর, দোকানদার, গৃহভৃত্য সম্প্রদায়) সমর্থনে ফ্রান্সের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

Sans-culotte
একজন সাধারণ মানুষের ছবি (সাঁকুলাৎ) [চিত্র সৌজন্য – Wikipedia]
জ্যকোবিন দলের নেতা রোবস্‌পিয়ারের (অন্যান্য নেতারা ছিলেন দাঁতে, ডুপর্ট, হিবার্ট প্রমুখ) নেতৃত্বে সারা ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক গ্রেপ্তার (বিনাবিচারে) ও নির্বিচারে হত্যা শুরু হয়। এই সময়ে শুধুমাত্র সন্দেহের উপর ভিত্তি করে যেকোন মানুষকে গ্রেপ্তার করা যেত, বহু মানুষ এই সময়ে নিখোঁজ হয়ে যান। গনহারে প্রায় ৫০,০০০ জন মানুষকে গিলেটিনের সাহায্যে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে রানি মারি আঁতোয়ানেত, বিজ্ঞানী বেইলি, জিরডিস্ট দলের নেতৃত্ববর্গ ছিলেন অন্যতম।

La_fournée_des_Girondins_10-11-1793
গিলেটিনে গণহত্যা।

শুধুমাত্র যে দেশের আইন – শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যই রোবস্‌পিয়ার নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন তা নয়, অন্যান্য  নেতৃত্ববর্গকে হত্যা করে দেশের একছত্র নায়ক হবার পথ সুগম তিনি সুগম করেছিলেন। এমনকি তাঁর নিজের দলের নেতারাও রোবস্‌পিয়ারের সন্দেহের তালিকা মুক্ত ছিল না। বহু জ্যকোবিন নেতা-কর্মীদের তিনি হত্যা ও বন্দী করেছিলেন।

কিন্তু সব অপরাধের একটি শেষ থাকে, রোবস্‌পিয়ারের শাসনে আতঙ্কিত হয়ে বিরোধীরা তাকে গিলেটিনে হত্যা করলে ‘সন্ত্রাসের শাসনের’ অবসান ঘটে। জ্যকোবিনরা ক্ষমতাচ্যুত হলে বুর্জোয়ারা আবার প্রাধান্য লাভ করে।

Execution_robespierre,_saint_just...
রোবস্‌পিয়ারকে গিলেটিনে হত্যা করা হচ্ছে।

সন্ত্রাসের শাসনের ইতিবাচক দিক

এই অন্ধকার সময়েও জ্যকোবিনরা কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রকে ভবিষ্যতে মজবুত করে। জ্যকোবিনরা একটি সুস্পষ্ট আইনবিধি প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন, যা সেই সময় বাস্তবায়িত না হলেও এর সুত্র ধরেই নেপলিয়ান তাঁর বিখ্যাত ‘কোড নেপোলিয়ান’ প্রণয়ন করেছিলেন।

JUMP whats-app subscrition

ফরাসী বিপ্লবের প্রভাব

বিপ্লব কথার অর্থ পরিবর্তন। ফরাসী বিপ্লব মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে এক বিশেষ ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সূচনা ঘটে। ইউরোপের সামন্ততন্ত্রের পতনও শুরু হয় এই বিপ্লবের হাত ধরেই।

বিশ্বের মানুষ ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে ‘সংবিধানের’ গুরুত্ব বুঝতে শেখে।

স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর যে আদর্শ নিয়ে ফরাসী বিপ্লবের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা মহীরুহে পরিণত হতে বহু সময় নেয়। কিন্তু আজও যদি ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন গনতান্ত্রিক দেশের সংবিধান দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে ১৭৯১ সালে রচিত সংবিধানের মূল ভিত্তিগুলোর সঙ্গে আজকের সময়ের সংবিধানের কি আশ্চর্য মিল।

forashi-biplob


নবম শ্রেণির অন্যান্য বিভাগগুলি পড়ুন


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

2 Replies to “ফরাসী বিপ্লব – চতুর্থ পর্ব

Leave a Reply