শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, পরোপকারী, গদ্যকার …
সাগর বা সমুদ্রের গহ্বর যেমন অতল, তেমনি এই মানুষটির পাণ্ডিত্য। তাই তাঁর নাম বিদ্যাসাগর।
সমগ্র বাঙালি জাতি যে সকল মনিষীদের নিয়ে গর্ব অনুভব করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। আজ তাঁর জন্মের ২০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।
২০০ বছর অনেক সময়, এই অনেকটা সময় পরেও বাঙালির ভাষায় – মনে – প্রাণে বিদ্যাসাগর নামটি সমান ভাবে উজ্জ্বল।
বিদ্যাসাগর মহাশয় সম্পর্কে কিছু লেখা খুব কঠিন কাজ, তিনি তাঁর অসাধারণ জীবনকাল নানা ধরণের কাজে পরিপূর্ণ। তার বিপুল কাজের মধ্যে দুটি দিক বাঙালি সমাজকে নবজাগরণের পথে এগিয়ে দিয়েছিল; শিক্ষা সংস্কার এবং সমাজ সংস্কার। আমরা তাঁর এই দুটি কাজের দিক সম্পর্কে সামান্য স্মৃতিচারণ করবো।
শিক্ষা সংস্কার
বিদ্যাসাগর মহাশয় আজীবন কাল শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। একদিকে তিনি যেমন অসংখ্য বিদ্যালয় – কলেজ সংস্কার এবং স্থাপন করেছেন, ঠিক তেমনই বই – প্রবন্ধ রচনা এবং পত্রিকা পরিচালনার মাধ্যমে বাঙালি সমাজকে ক্রমাগত শিক্ষিত করে গেছেন।

বর্ণপরিচয়
বড় গাছ। ভাল জল। লাল ফুল। ছোট পাতা।
উপরের শব্দগুলি চিনতে পারছেন?
নিশ্চয়ই পারছেন। এগুলি বর্ণপরিচয়-এর প্রথম পাঠ থেকে নেওয়া হয়েছে।
আপনার – আমার মতো যেকোন বাঙালির মাতৃভাষা পাঠের প্রথম আত্মীয়ের নাম বর্ণপরিচয়।
সেই যে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর মহাশয় বাংলা বাংলাবর্ণমালার সংস্কার ঘটিয়ে ‘বর্ণপরিচয়’ পুস্তকের রচনা করেছিলেন; তার চলন আজও অমলিন। বর্ণপরিচয় সৃষ্টির আগে বাংলা বর্ণমালার উপরে সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষার অযৌক্তিক ব্যবহার পরিলক্ষিত হত; বিদ্যাসাগর মহাশয় এই আশোধিত বর্ণমালাকে সংস্কার করেন এবং সহজবোদ্ধ ও যুক্তিভিত্তিক বর্ণমালার প্রচলন করেন।
বাংলা ভাষার ইতিহাসে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
প্রথমত সেই সময়ে পাঠ্য পুস্তক ছিল দুর্লভ এবং দ্বিতীয়ত শিশুর পাঠ্য বই ছিল একটি কল্পনা। সেই সময়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের লিখিত পুস্তক বাংলা ভাষা শিক্ষায় এক অমোঘ ভূমিকা পালন করে।
আজ প্রায় ১৭০ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও এই পুস্তকের গুরুত্ব একটুও কমেনি। ধর্মীয় গ্রন্থ বা মহাকাব্য ভিন্ন এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী প্রাসঙ্গিক থাকার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
আধুনিক শিক্ষার বিস্তার
এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে আজ থেকে ১৭০ বছর আগের শিক্ষার অবস্থা অনুমান করা খুবই কঠিন একটি কাজ। আজকের সময়ে প্রতিটি ব্লকে অসংখ্য সরকারি বিদ্যালয় আছে।বিদ্যালয়ের অভাবে শিক্ষালাভে বঞ্চিত হচ্ছে এই ঘটনা আজ বিরল। কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সময়ে এই ঘটনা ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। শুধু তাই নয়, সমস্যা ছিল আরো…
প্রথমত, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি অনুসারে পঠন – পাঠন হতো না।
দ্বিতীয়ত, পাঠশালা বা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল একেবারে হাতে গোনা।
তৃতীয়ত, অধিকাংশ শিক্ষকরা ছিলেন প্রাচীন পন্থী। আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে অধিকাংশ ব্যাপারেই তাদের কোন ধারণা ছিল না।
ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে শিক্ষার সনদ আইন প্রণয়ন হলে; আধুনিক শিক্ষা বিস্তারলাভ করার সম্ভবনা তৈরি হয়। সেই সময় বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, সরকার থেকে তাকে অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সময়ে তিনি নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দুবছরের মধ্যে তিনি কুড়িটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
শুধু তাই নয়, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উপযোগী করে তোলার জন্য তিনি শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শুরু করেছিলেন।
শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা নয়, উচ্চ শিক্ষাকে মধ্যবিত্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর মহাশয় ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন স্থাপন করেন, বর্তমানে এই কলেজের নাম বিদ্যাসাগর কলেজ। অতি অল্প সময়ে এই কলেজটি খ্যাতি অর্জন করে।
সমাজসংস্কার
বিদ্যাসাগর মহাশয় হিন্দু শাস্ত্রের একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত।
কিন্তু তার মধ্যে কোন রূপ বিকৃত সংস্কার বা ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না। তিনি উদার মনে পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সমাজের বিপক্ষে গিয়ে নারীমুক্তির জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
[আরো পড়ুন – JUMP ম্যাগাজিনের প্রবন্ধ বিভাগ।]
বিধবা বিবাহ আইন
তৎকালীন ভারতীয় সমাজে বিধবাদের সামাজিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। স্বামী মারা যাবার পরে বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ ও যন্ত্রণা ভোগ করতে হত। বিদ্যাসাগর মহাশয় আজীবনকাল এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেগেছেন।
তিনি হিন্দু শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন; তিনি নানা উপায়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে এই বিধবাদের উপরে প্রচলিত অত্যাচার কোন ধর্মীয় আচার নয় বরং এটি একটি ধর্মবহির্ভূত বিকৃত আচার মাত্র।
তার সফল আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালে সরকার ‘বিধবা বিবাহ আইন’ সিদ্ধ ঘোষণা করেন।
কিন্তু আইন হলেই তো সমাজ তাকে মেনে নেবে না।
তাই বিধবা বিবাহ আইনকে সচল করার উদ্দেশ্যে তিনি অনেকগুলি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর পুত্রের( নারায়ণচন্দ্র) সাথে এক ভাগ্যহীনা বিধবার বিবাহদান।
বিধবা বিবাহ তৎকালীন সমাজে বিদ্যাসাগরের সম্মান খর্ব করলেও ইতিহাস তার এই আন্দোলন কোনদিন ভুলবে না।
নারীশিক্ষা
তৎকালীন সমাজে নারীশিক্ষার প্রচলন ছিল না।
বরং নারীদের অত্যন্ত কম বয়সে বিবাহের প্রচলন ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে নারীজাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা।
গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের পড়াশোনার স্বার্থে তিনি ব্যাক্তিগত উদ্যোগে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩০০ ছাত্রী এই স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করত। প্রাথমিকভাবে বিদ্যাসাগর মহাশয় এই বিদ্যালয়গুলি ব্যাক্তিগত উদ্যোগে শুরু করলেও পরবর্তী কালে সরকার এই বিদ্যালয়গুলির আংশিক দায়ভার গ্রহণে সম্মত হয়। মাত্র দশ বছরের চেষ্টায় মোট বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা হয় ২৮৮টি।
কলিকাতা শহরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ড্রিংক ওয়াটার বিটন উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যসাগসর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত।

শেষ কথা
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চরিত্রের অন্যতম একটি দিক হল অনমনীয় মানসিকতা এবং কঠিন মূল্যবোধ। বাঙালি সমাজের অধিকাংশ মানুষ যখন ব্রিটিশদের চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকতেন; সেই সময় দাঁড়িয়ে তিনি আলাদা করে ব্রিটিশদের কোন গুরুত্ব দিতেন না। কর্মক্ষেত্রে তিনি বহুবার বিরোধের সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি অটল থেকেছেন। পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিন্তু কোনদিন আপসের রাস্তায় হাঁটেননি।
আর একটি কথা না বললেই নয়, তা হল তাঁর পরোপকারী মানসিকতা। মনিষীরা সম্ভবত এরকমই হন, তাঁরা তাঁদের পরের সমস্যাকে নিজের সমস্যার ঊর্দ্ধে দেখেন। তাই তো বহুবার নিজের বিপদ অগ্রাহ্য করে পরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। দেশের আপামর দরিদ্রসাধারণ সংস্কৃত শাস্ত্রবিশারদ বিদ্যাসাগরকে জানত দয়ার সাগর নামে।
এই প্রখর মেধাবী, অপরিগ্রাহী, খর্বকায় মানুষটি এককথায় একটি স্তম্ভ। তাঁর সম্পর্কে যতই আলোচনা করা হয়, ততই কম বলে মনে হয়। সমাজ যখন অমানিশায় ডুবে যায়, তখন আমাদের বিদ্যার সাগরে অবগাহন করতে হয়।
কারণ, শিক্ষা আনে জ্ঞান আর জ্ঞান সৃষ্টি করে আলো আর আলো আমাদের মনের অন্ধকার দূর করে আমাদের পুনর্জন্ম দেয়। সৃষ্টি হয় নবজাগরণের।
এ
এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্যভাবে কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাওয়ার জন্য –
- ফলো করো – WhatsApp চ্যানেল
- সাবস্ক্রাইব করো – YouTube চ্যানেল
- লাইক করো – facebook পেজ
- সাবস্ক্রাইব করো – টেলিগ্রাম চ্যানেল
- Facebook Group – লেখা – পড়া – শোনা