gayan-chokkhu
Madhyamik

জ্ঞানচক্ষু

বাংলা দশম শ্রেনি – জ্ঞানচক্ষু (গদ্য) |


লেখিকা পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহিলা সাহিত্যিক হলেন আশাপূর্ণা দেবী। ভাবতে অবাক লাগবে যে এই জনপ্রিয় সাহিত্যিক তথাকথিত ভাবে বিদ্যালয় ও কলেজে পড়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু প্রায় সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন অসংখ্য মণি-মুক্ত।

তার সাহিত্য কাজের মধ্যে বারবার উঠে এসেছে ছোটদের কথা, মেয়েদের কথা, মায়েদের কথা। কঠিন কথা অত্যন্ত সহজ ভাবে লেখায় তার খ্যাতি ছিল অতুলনীয়। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’, ‘বকুলকথা’ ইত্যাদি। তাঁর প্রাপ্ত অসংখ্য পুরস্কারের মধ্যে ‘জ্ঞানপীঠ’, পদ্মশ্রী, সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য।

উৎস

বর্তমান আলোচ্য ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি ‘কুমকুম গল্পসংকলন’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

বিষয় সংক্ষেপ

গল্পের শুরুতেই আমরা দুটি চরিত্রের সাথে পরিচিত হই। প্রথমজন ‘তপন’, এই গল্পের প্রধান চরিত্র এবং দ্বিতীয়জন তপনের ‘ছোটমেসো’।

এরপর গল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা জানতে পারি যে তপন তার ছোট মাসির বিবাহ উপলক্ষে তার মামারবাড়ি ছুটি কাটাতে এসেছে। এখানে এসে তপন জানতে পারে তার ‘নতুন’ ছোটমেসো একজন নামি লেখক। স্কুল পড়ুয়া ছোট্ট তপনের কাছে লেখক মানেই একজন অন্যরকম মানুষ।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান |

কিন্তু তপন যখন ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে যে তার ছোটমেসমশাই তার বাবা, মামা বা কাকুর মতন একজন ‘নিছক’ সাধারণ মানুষ এবং একজন জলজ্যান্ত’ লেখক হয়েও দাড়ি কামানো, সিগারেট খাওয়া, ‘ঘুমানোর সময় ঘুম’ বা ‘চানের সময়  চানের’  মতন স্বাভাবিক কাজ করেন, তখন সে যারপরনাই আশ্চর্য  হয়।





মাসির বিয়ে হয়ে যাবার পরেও গরমের ছুটির কারণে তপন তার মামারবাড়িতে আরো কিছুদিন থাকার সুযোগ পায়, এদিকে তার প্রফেসর – লেখক ছোটমেসোও তার কলেজ বন্ধ থাকার কারণে আরো কিছুদিন মামারবাড়ি থেকে যান। এর ফাঁকে, একদিন দুপুরবেলা উৎসাহী তপন একটা গল্প লিখে ফেলে এবং তা ছোটমাসির হাত ঘুরে তপনের লেখক ছোটমেসোর কাছে পৌঁছে যায়।

যেকোন মাপের লেখকের কাছেই তার নাম ছাপার অক্ষরে দেখা একটি গর্বের বিষয়, তপনও এর ব্যাতিক্রম ছিলনা। লেখার গুনমান তেমন ভালো না হলেও এবং অন্য সবাই তপনের গল্প শুনে হাসাহাসি করলেও, তপনের মেসোমশাই সেই লেখার প্রশংসা করেন এবং ‘সন্ধ্যাতারা’ নামক নামি পত্রিকার সম্পাদকের সাহায্যে ছাপিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেন।

এরপর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়। তপন বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু ছোট্ট তপনের লেখক হবার বাসনা বাড়তে থাকে এবং সে আরো কিছু গল্পও রচনা করে ফেলে। ইতিমধ্যে একদিন তপনের ছোটমেসো এবং মাসি তাদের বাড়ি আসেন এবং তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে তপনের বহুকাঙ্খিত ‘সন্ধ্যাতারা পত্রিকা’। বাড়ির সবাই জানতে পারেন যে তপনের লেখা সত্যিই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।

পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে ‘প্রথম দিন’ (গল্প) শ্রী তপন কুমার রায় দেখে সবাই আনন্দিত হয়। ছোটমেসো অবশ্য স্বীকার করে নেন যে তপনের গল্পটা একটু কাঁচা বলে সেটা একটু ‘কারেকশন’ করে নিতে হয়েছে।

এবার তপন বুঝতে পারে যে তপনের গল্প ছাপা হলেও আসল কৃতিত্ব হল তার ছোটমেসোর কারণ ছোটমেসো “নিজে না গিয়ে দিলে কি আর ‘সন্ধ্যাতারার’ সম্পাদক তপনের গল্প কড়ে আঙ্গুল দিয়ে ছুতো?”

ধীরে ধীরে তপনের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়, কারণ সে বুঝতে পারে গল্প তার একার কৃতিত্বে ছাপা হয় নি। এরপর তার মায়ের অনুরোধে গল্পটি পড়া শুরু করলে তপন আসল ধাক্কাটা খায়। সে বুঝতে পারে, “মেসো তার গল্পটিকে আগাগোড়াই কারেকশন করেছেন।

“অর্থাৎ নতুন করে লিখেছেন, নিজের পাকা হাতের কলমে!”

এরপর দুঃখিত তপন সংকল্প করে যে ‘সে যদি কখনো আর লেখা ছাপতে দেয় তো, নিজে গিয়ে দেবে। নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক’। এই ভাবে তপনের জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন বা বোধোদয় হয়।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিবাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

মূল বক্তব্য

জ্ঞানচক্ষু কথার অর্থ বোধোধয় বা অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন। কোন বিশেষ কারণে কোন বিশেষ কিছু শিক্ষালাভ করলে আমরা এই বিশেষ শব্দটি ব্যবহার করি।

একজন লেখক বা স্রষ্টার কাছে তার সৃষ্টি সত্ত্বা অন্যতম অহংকার। সৃষ্টির গুনমান যে রকমই হোক না কেন, তার রদবদল যেকোন সৃষ্টিকর্তার কাছেই অত্যন্ত অপমানজনক। স্রষ্টা তার সৃষ্টি সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আনন্দিত হন ঠিকই কিন্তু তা অন্যের হাত – যশের কারণে সমাদৃত হলে স্রস্টাকে নিজের কাছে ছোট হতে হয়। কারণ কোন স্রষ্টাই তার শুধুমাত্র খ্যাতিলাভের আশায় সৃষ্টি করে না।


[আরো পড়ুন – Fable কবিতার আলোচনা]

এই গল্পে আমরা দেখি তপন তার নিজের ভাষায় একটি গল্পের সৃষ্টি করেছিল। যা তার লেখক ছোটমেসোর নিজের কৃতিত্বে সম্পূর্ণ রদবদল হয়ে, ছোটমেসোর বদান্যতায় একটি নামি পত্রিকায় তপনের নামে ছাপা হয়। এর ফলে সুনাম তপনের হলেও তা ছিল আসলে ছোট মেসোর। লেখাটি ছাপা না হলে হয়তো তপন দুঃখ পেত কিন্তু ‘নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়ার’ অপমান তাকে সহ্য করতে হতো না। তাকে শুনতেও হতো না ‘অমুক, তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে’। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তপনের ‘সৃষ্টি’ এবং ‘স্রষ্টা’ সম্পর্কে জ্ঞানচক্ষুর উন্মেচন ঘটে।

এই লেখাটির পাঠ শুনে নিন। 👇

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –