pat-sonchalon-totter-byakha
Class-11

পাত সঞ্চালন তত্ত্বের ব্যাখা

ভূগোল একাদশ শ্রেনি – প্রাকৃতিক ভূগোলের নীতিসমূহ


দৈনন্দিন জীবনে একটু লক্ষ্য করলে দেখবে যে ছাদ যেমন পিলারের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে তেমনই পৃথিবীর বাইরের আবরণ বা ভূত্বকটি পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা অর্ধতরল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের উপর কতকগুলি ভাসমান কঠিন খণ্ডের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই কঠিন খণ্ডগুলি হল এক একটি পাত।

পাত ও পাতসংস্থান শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন কানাডার অধ্যাপক জে. টি. উইলসন ১৯৬৫ সালে।

পাত সংস্থান কোনো একক ধারণা নয়, এটি সম্মিলিত ধারণা। এই ধারনার আগে ওয়েগনারের মহাদেশ সঞ্চরণ মতবাদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

পাত সংস্থান তত্ত্বের জনক হলেন এক্স.লি.পিঁচো। তিনি ১৯৭৩ সালে “প্লেট টেকটোনিক” গ্রন্থে পাতসংস্থান ত্বত্তের ব্যাখা করেন।

পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা পাতগুলির মধ্যে রয়েছে ৭টি বড়ো পাত,৮টি মাঝারি ও ২০টি ছোট পাত। এই পাতগুলির কোনটি ভারী আবার কোনটি হাল্কা। এই পাতগুলির কোনটিই স্থির নেই,সবই সচল অবস্থায় রয়েছে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার এর উপর।
পৃথিবীর বৃহত্তম পাত হল প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত।

পৃথিবীর সাতটি বড়ো পাত

1. প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত,
2. ইউরেশিয় পাত,
3. উত্তর আমেরিকা পাত
4. দক্ষিণ আমেরিকা পাত
5. আফ্রিকা পাত,
6. ইন্দো-অস্ট্রেলিয়া পাত
7. অ্যান্টার্কটিকা পাত।

পৃথিবীর আটটি মাঝারি পাত

1. চীন পাত,
2. ফিলিপাইন পাত,
3. আরবীয় পাত,
4. ইরান পাত,
5. নাজকা পাত,
6. কোকোস পাত,
7. ক্যারিবিয়ান পাত,
8. স্কোশিয়া পাত।

চলন অনুসারে পাতের প্রকারভেদ

1. অপসারী বা প্রতিসারী চলন

এক্ষেত্রে পাতগুলি পরস্পরের থেকে বিপরীত দিকে ক্রমশ দূরে সরে যায় এবং পাতদুটির মাঝে নতুন ভূত্বকের সৃষ্টি হয়।

2. অভিসারী পাত চলন

এক্ষেত্রে পাতগুলি পরস্পরের দিকে এগিয়ে যায় এবং এই ধরনের চলনের ফলে তিনটি অবস্থার সৃষ্টি হয়।

a. অভিসারী নিমজ্জনঃ- ভারী মহাসাগরীয় পাতটি হাল্কা মহাদেশীয় পাতের নীচে নিমজ্জিত হয় ফলে সামু্দ্রিক খাতের সৃষ্টি হয়।

b. অভিসারী সংঘর্ষঃ- এক্ষেত্রে দুটি মহাসাগরীয় বা দুটি মহাদেশীয় পাত মুখোমুখি চালিত হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং পাত সীমানায় পলি সঞ্চয় ঘটে ও পর্বত সৃষ্টি হয়।

c. নিরপেক্ষ পাত চলনঃ- এই পাতসীমানায় দুটি পাত পরস্পরের থেকে আড়াআড়ি ভাবে দূরে সরে যায়।

পাত সঞ্চালনের কারণ

পাতগুলির সঞ্চারণের প্রধান চারটি কারণ হল –

1. ম্যাগমা উত্থান -অপসারী পাত সীমানায় ম্যাগমা উত্থিত হয় ফলে পাত দুটি পরস্পরের থেকে দূরে সরে যায় ।

ম্যাগমা উত্থান

2. অভিকর্ষ টান – অপসারী পাত সীমানায় তৈরি হওয়া শৈলশিরা উঁচু এবং অভিসারী পাত সীমানায় তৈরি হওয়া খাতটি নিচু হওয়ায় ভূমিরুপের ঢালের পার্থক্যের জন্য ঢাল বরাবর অভিকর্ষজ বল কাজ করে যার ফলে পাতের সঞ্চালন ঘটে।

অভিকর্ষ টান

3. পাতের নিমজ্জন জনিত টান – অভিসারী পাত সীমানা বরাবর একটি পাত নীচের দিকে নেমে গেলে অন্য পাতটির উপর টানের সৃষ্টি হয় এবং পাতের সঞ্চালন হয়।

পাতের নিমজ্জন জনিত টান

4. পরিচলন স্রোত – পরিচলন স্রোতের ফলে ভূ-অভ্যন্তরে ভাসমান খণ্ডগুলি একে অপরের থেকে দূরে সরে যায় বা কখনো পরস্পরের কাছে সরে আসে এইভাবেও পাতের সঞ্চালন ঘটে।

পাত সীমানার প্রকারভেদ

প্রতিসারী বা গঠনাত্মক পাত সীমানা

যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের থকে দূরে সরে যায়, সেই সীমানাকে প্রতিসারী পাতসীমানা বলে। পাতগুলি পরস্পরের থেকে দূরে সরে গিয়ে ভূ-অভ্যন্তরের ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন ভূমিরূপ গঠন করে বলে এই পাত সীমানাকে গঠনাত্মক পাত সীমানা বলে।

উদাহরণ – মধ্যসামুদ্রিক শৈলশিরা এই পাতসীমানা বরাবর সৃষ্টি হয়েছে।


একাদশ শ্রেণি থেকে → Physics | Chemistry | Biology | Computer

অভিসারী বা ধংসাত্মক পাত সীমানা

যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে, সেই সীমানাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। এখানে একটি পাত আর একটি পাতের ভিতরে ঢুকে গিয়ে গলে পাত ধংস হয়। তাই এই পাত সীমানাকে ধংসাত্মক পাত সীমানা বলে।

উদাহরণ রকি – আন্দিজ পর্বত অভিসারী পাত সীমানা বরাবর সৃষ্টি হয়েছে।

সংঘর্ষের ধরন অনুযায়ী এই অভিসারী পাতসীমানাকে তিনভাগে ভাগ করা যায়।

1. মহাদেশীয়- মহাদেশীয় পাত সীমানা

যখন দুটি মহাদেশীয় পাত পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন ভারী পাতটি হাল্কা পাতের নিচে চলে যায় এবং মহিখাতে জমে থাকা পলি ভাঁজ হয়ে উপরে উঠে পর্বত গঠন করে। যেমন- ভারত উপদ্বীপীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষে টেথিস সাগরের পলি ভাঁজ হয়ে হিমালয় পর্বত তৈরি হয়েছে। এই একইভাবে আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া পাতের সংঘর্ষে তৈরি হয়েছে আল্পস পর্বত।

2. মহাসাগরীয়- মহাসাগরীয় পাত সীমানা

দুটি মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষ হলে অগ্ন্যুদগম ও ভূমিকম্প হয়। দুটি মহাসাগরীয় পাতের ধাক্কা লেগে সেখানে যেকোনো একটি পাত ঢুকে গিয়ে গলে ম্যাগমারূপে বেরিয়ে এসে আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে। এই কারণে জাপান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে অসংখ্য আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়েছে।

3. মহাদেশীয়-মহাসাগরীয় পাতসীমানা

এই পাত সীমানায় দুটি পাতের সংঘর্ষে ভারী মহাসাগরীয় পাতটি হাল্কা মহাদেশীয় পাতের ভিতরে ঢুকতে থাকে।দুটি পাতের চাপে পাতের মিলনস্থলের পলি ও পাললিক শিলা ভাঁজ হয়ে ভঙ্গিল পর্বতের উৎপত্তি হয়। এইভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও উত্তর আমেরিকা পাতের চাপে রকি পর্বত গঠন হয়েছে এবং নাজকা ও দক্ষিণ আমেরিকা পাতের চাপে আন্দিজ পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। এই সীমানায় ভারী মহাসাগরীয় পাত তিতরে ঢুকে গলে গিয়ে অগ্ন্যুদগম ঘটে। এই কারণে রকি ও আন্দিজ পর্বত বরাবর রয়েছে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

4. নিরপেক্ষ পাত সীমানা

যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের বিপরীতে আড়াআড়ি ভাবে সরে যায়, সেই সীমানাকে নিরপেক্ষ পাত সীমানা বলে। এই সীমানায় সাধারণত চ্যুতিরেখা সৃষ্টি হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিমে সান আন্দ্রিয়াস চ্যুতি এরূপ পাতসীমানার উদাহরণ।

ভূ-গাঠনিক ও মহীসঞ্চরণের পার্থক্য

ভূ-গাঠনিক ও মহীসঞ্চরণের পার্থক্য

পর্ব সমাপ্ত!


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী মোনালিসা মাইতি। পড়াশোনার পাশাপাশি বই পড়তে এবং গান গাইতে ভালোবাসেন মোনালিসা ।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।