পদার্থবিদ্যা – একাদশ শ্রেণি – মহাকর্ষ (Gravitation)
অভিকর্ষজ ত্বরণের সাথে মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের সম্পর্ক
ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অবস্থিত কোনো বস্তুকে পৃথিবী যে বল দ্বারা আকর্ষণ করে তাকে অভিকর্ষ বল বলা হয়ে থাকে। এই অভিকর্ষ বলের কারণেই কোনো অবাধে পতনশীল বস্তুতে যে ত্বরণের সৃষ্টি হয় সেটাই আসলে অভিকর্ষজ ত্বরণ।
m ভরের কোনো বস্তুর উপর অভিকর্ষ বল
—(1) [নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসারে]
হল অভিকর্ষজ ত্বরণে মান
আবার মহাকর্ষ সূত্রানুযায়ী বস্তুটির উপর পৃথিবীর উপর আকর্ষণ বল বা অভিকর্ষ বলের পরিমাপ হল,
—(2)
যেখানে M হল পৃথিবীর ভর, R হল পৃথিবীর ব্যাসার্ধ। পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু হল ‘O’। এই পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে r দূরত্বে m ভরের বস্তুটি আছে বলে ধরে নেওয়া হল।
প্রসঙ্গত বলা ভালো যে, এক্ষেত্রে পৃথিবীকে একটি R ব্যাসার্ধের সমসত্ত্ব গোলক হিসাবে ধরে নেওয়া হল। তাই পৃথিবীর সমস্ত ভর M তার কেন্দ্রেই কেন্দ্রীভূত আছে বলে মেনে নেওয়া যেতে পারে। অভিকর্ষ বল সর্বদা ভূ কেন্দ্রের দিকে একটি ত্বরণের সৃষ্টি করে।
(1) এবং (2) নং সমীকরণের তুলনা করে পাই
∴ —(3)
উপরের সমীকরণটি থেকে বোঝা যায়, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান বস্তুটির ভর (m এর) উপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ কোনো স্থান নির্দিষ্ট থাকলে সেখানে ভারী বা হালকা যে কোনো ভরের বস্তুর অভিকর্ষজ ত্বরণের মান সমান।
ভূপৃষ্ঠের উপরের যে কোনো বিন্দুতে r = R (পৃথিবীর ব্যাসার্ধ)
(3) নং সমীকরণে r = R বসিয়ে পাই,
—(4)
(4) নং সমীকরণটিই হল অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) এর সাথে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (G) এর সম্পর্ক।
আগেই বলেছি এইক্ষেত্রে আমরা পৃথিবীকে একটি সমসত্ত্ব গোলক হিসাবে ধরে নিয়েছি, সেই হিসাবে আমরা পৃথিবীর গড় ঘনত্ব P এর কথা চিন্তা করতে পারি।
পৃথিবীর ভর (M) = পৃথিবীর আয়তন × পৃথিবীর গড় ঘনত্ব
=
M এর রাশিমালাটি (4) নং সমীকরণে বসালে পাই–
বা, —(5)
(5) নং সমীকরণটি হল মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (G) এবং পৃথিবীর গড় ঘনত্ব (P ) এর মধ্যে সম্পর্ক।
মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের ধারণা:
বিশ্বের যে কোনো দুটি বস্তুকণা পরস্পরকে মহাকর্ষ বল দ্বারা আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বল পরিমাপের নিয়ম সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র বা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র নামে পরিচিত।
মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, যে কোন দুটি বস্তুকণার মধ্যে আকর্ষণ বল/ মহাকর্ষ বল তাদের সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে এবং এই বলের মান বস্তুকণা দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
ধরলাম, ও ভরের দুটি বস্তুকণার মধ্যবর্তী দূরত্ব r, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে, এই আকর্ষণ বলের (F) রাশিমালাটি গাণিতিক ভাষায় প্রকাশ করলে পাই,
—(6)
G হল সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বা সংক্ষেপে বলা যায়, মহাকর্ষীয় বা মহাকর্ষ ধ্রুবক (6) নং সমীকরণ দিয়ে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
একাদশ শ্রেনি থেকে → বাংলা | ইংরাজি
উল্লেখ্য: নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রে বস্তুর ভর আসলে inertial mass বা জড়ত্বীয় ভর। আবার নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে, বস্তুকণার ভরকে মহাকর্ষীয় ভর (gravitational mass) বলা হয়, তবে এটা দেখানো যায় যে, জড়ত্বীয় ভর = মহাকর্ষীয় ভর।
এ নিয়ে বিশদ এখানে আলোচনা করা হয়নি। (6) নং সমীকরণে হলে F = G
মহাকর্ষ ধ্রুবক
দুটি একক ভরের বস্তুকণা একক দূরত্বের ব্যবধানে থাকলে পরস্পরকে যে বল দ্বারা
আকর্ষণ করে, সেটাই আসলে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক।
মহাকর্ষ ধ্রুবকের মাত্রা
∴
G এর একক
CGS পধতিতে
বা
SI পধতিতে
বা
FPS পধতিতে
বা
মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মান
একাদশ শ্রেনি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল
যদি 1 kg ভরের দুটি বস্তু 1 m দূরত্বের ব্যবধানে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে আকর্ষণ বল
এটি খুব অল্প মানের বল। আমাদের প্রাত্যহিক আধানে মহাকর্ষ বলের প্রভাব খুবই কম।
তাই আমরা প্রাত্যহিক জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল ব্যবহার করি না। কিন্তু পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে এই বল কার্যকর কারণ পৃথিবী ও চাঁদের ভর ও দূরত্ব অনেক বেশি। তাই মহাকাশের গ্রহণথাত্রের ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল প্রযোজ্য।
অভিকর্ষজ ত্বরণের ধারণা
অভিকর্ষজ ত্বরণের কথা আগেই বলেছি। এর মান হল:
CGS পধতিতে 980.6
FPS পধতিতে 32.2
SI পধতিতে 9.806
1 নং চিত্রে M ভরের পৃথিবী F বলের সাহায্যে m ভরের বস্তুকে আকর্ষণ করছে, বস্তুটিও পৃথিবীকে একই বলের সাহায্যে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে কারণ নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রানুযায়ী ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান এবং বিপরীত।
নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রানুযায়ী, বস্তুর ত্বরণ =
পৃথিবীর ত্বরণ =
M >> m
(বস্তুর ত্বরণ )/(পৃথিবীর ত্বরণ) = >> 1
∴ বস্তুর ত্বরণ >> পৃথিবীর ত্বরণ
বস্তুর ত্বরণে পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি তাই বস্তুটি পৃথিবীর দিকে গতিশীল হয়, পৃথিবীর গতি সেই তুলনায় নগণ্য হয়।
তবে অভিকর্ষজ ত্বরণ এর মান ধ্রুবক রাশি নয়। ভূপৃষ্ঠের ভিন্ন স্থানে এর মান ভিন্ন হয়, আমরা এর মান নির্ণয়ের সময় পৃথিবীকে সমসত্ত্ব গোলক হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম যা আসলে ঠিক নয়। তাই এর মান ধ্রুবক হয় না, বিভিন্ন হয়।
এর কারণ নিম্নরূপ-
→ ভূপৃষ্ঠে উপগোলাকার হয় বলে এর মান ভিন্ন হয়।
→ ভূপৃষ্ঠে থেকে ভিন্ন উচ্চতায় g এর মান ভিন্ন h উচ্চতায় অভিকর্ষজ ত্বরণ
→ ভূপৃষ্ঠে থেকে ভিন্ন গভীরতায় g এর মান ভিন্ন h গভীরতায় অভিকর্ষজ ত্বরণ
একাদশ শ্রেণি থেকে → Physics | Chemistry | Biology | Computer
→ পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য ভিন্ন স্থানে g এর মান ভিন্ন হয়।
একটি কৃত্রিম উপগ্রহে নভশ্চরের ওজন শূন্য বোধ হওয়ার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
কক্ষপথে স্থাপিত হওয়ার আগে নভশ্চরের ওজনের অনুভূতি যখন রকেটের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠে থেকে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়, তখন মহাকাশযানের গতিবেগ খুব দ্রুতহারে বৃদ্ধি করা হয়। এই ঊর্ধ্বমুখী ত্বরণের মান পৃথিবীর অভিকর্ষ ত্বরনের মানের অনেকগুণ বেশি হয়। ধরলাম এই ত্বরণের মান (f) = 15 g অভিকর্ষ ত্বরণের 15 গুণ। নভশ্চরের ভর যদি m হয়, নভশ্চরের উপর মহাকাশযানের ঊর্ধ্বমুখী প্রতিক্রিয়া বল R, মহাকাশযানটির ত্বরণ (f) = 15 g.
∴ R – mg = mf
∴ R = m (g + f)
= m (g + 15 g) = 16 mg
অর্থাৎ এক্ষেত্রে মহাকাশচারি নিজেকে তার আসল ওজনের 16 গুণ ভারী বলে মনে করে।
কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার সময় মহাকাশযানে মহাকাশচারীয় ওজনের অনুভূতি
ধরি, মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কেন্দ্রের সাপেক্ষে r ব্যাসার্ধের বৃত্তাকার কক্ষপথে স্থাপিত করা হয়েছে। m ভরের নভশ্চরের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল ও ঊর্ধ্বমুখী প্রতিক্রিয়া বলের (R) লব্ধ বল মহাকাশযানটিকে কক্ষপথে ঘোরানোর জন্য প্রয়োজনীয় অভিকেন্দ্র বল সরবরাহ করে।
—(A)
g : নভশ্চরের অবস্থানে অভিকর্ষ ত্বরণের মান
v : নভশ্চরের গতিবেগ/উপগ্রহের গতিবেগ
ভরের উপগ্রহের গতি বিবেচনা করলে, উপগ্রহের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বলই উপগ্রহটিকে ঘোরানোর জন্য প্রয়োজনীয় অভিকেন্দ্র বল সরবরাহ করে।
∴
∴ —(B)
(B) নং সমীকরণ (A) তে বসিয়ে পাই
∴ R = 0
নভশ্চরের উপর প্রতিক্রিয়া বল শূন্য হওয়ার জন্য নভশ্চর নিজের ওজন অনুভব করতে পারে না। ফলে নভশ্চর নিজেকে ভাসমান বলে মনে করেন। তাই কৃত্রিম উপগ্রহে মানুষ বা যে কোনো বস্তুর ভারহীনতা বলা হয়।
দ্রষ্টব্য: কোনো বস্তু ভারহীন হওয়ার অর্থ সেটির উপর ক্রিয়াশীল প্রতিক্রিয়া বল শূন্য হয় কিন্তু বস্তুটির উপর অভিকর্ষীয় বল শূন্য হয় না।
সমাপ্ত।
এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লেখিকা পরিচিতি
প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয় এবং IIT খড়গপুরের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তনী স্বধীতি মাঝি। পদার্থবিদ্যা চর্চার পাশাপাশি ছবি আঁকা, গান গাওয়া এবং বই পড়ায় সমান উৎসাহী স্বধীতি।
এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।
JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –
- সাবস্ক্রাইব করো – YouTube চ্যানেল
- লাইক করো – facebook পেজ
- সাবস্ক্রাইব করো – টেলিগ্রাম চ্যানেল
- Facebook Group – লেখা – পড়া – শোনা