amra-kobitar-byakha
WB-Class-9

আমরা কবিতার ব্যাখ্যা

বাংলানবম শ্রেনি – আমরা (পদ্য) – দ্বিতীয় পর্ব


এই লেখার প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে ‘আমরা’ কবিতার উৎস এবং মূল বক্তব্য নিয়ে। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো কবিতার ব্যাখ্যা নিয়ে। যদি এই লেখার প্রথম পর্ব আগে না পড়া হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে এই লিঙ্ক থেকে পড়ে নেবার আবেদন রইল।

আমরা কবিতার ব্যাখ্যা

রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা ছন্দের অভিনব প্রয়োগে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ছন্দের জাদুকর বলা হয় তাকে। একইসঙ্গে সদস্যের প্রতি তীব্র অনুরাগ, মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ পেয়েছে এই ‘আমরা’ কবিতায়। তাঁর ‘কুহু ও কেকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বন্দরে’, ‘ছেলের দল’, ‘ঝোড়ো হওয়া’ ইত্যাদি কবিতাগুলোতে জাতীয় উদ্যম ও উৎসাহের আয়োজন দেখা যায়। দেশকে তিনি গভীরভাবে ভালোবেসেছেন, ভালোবেসেছেন দেশের ঐতিহ্যময় ইতিহাসকে এবং গৌরবময় মনীষাকে। বঙ্গদেশ তাঁর মাতৃভূমি –  তাই বাংলার মহীয়সী রূপ, বাংলার অতীত-ঐতিহ্য গৌরবকথা প্রচার করেছেন কবি এই কবিতায়। অতুলপ্রসাদ সেন যেমন একদা লিখেছিলেন –

ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’

তেমনি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাবনা যেন জগৎসভায় বাঙালি পুনরায় তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে। সমস্ত কবিতাটিতে আটটি স্তবক জুড়ে বাংলা ও বাঙালির ভৌগোলিক অবস্থান ইতিহাস-ঐতিহ্য শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্ম-বিজ্ঞানের গৌরবগাথা তুলে ধরেছেন কবি। কবিতাটিতে এত এত অনুষঙ্গ এসেছে যার ব্যাখ্যা টিকা কণ্টকিত হয়ে উঠবে এমনই আশা করা যায়। কিন্তু এই লেখায় যথাসম্ভব প্রাঞ্জল গদ্যে অনুষঙ্গগুলির ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

একেবারে প্রথম স্তবকে কবি এই ভঙ্গ বঙ্গদেশের ভৌগোলিক বর্ণনা দিয়েছেন।

হুগলি জেলায় গঙ্গার দ্বিতীয় ত্রিবেণী অবস্থিত যেখানে গঙ্গার মূলস্রোত থেকে পৃথক হয়েছে যমুনা ও সরস্বতী নদী। তিনটি নদীর সঙ্গমস্থল তো বলা হয় ত্রিবেণী। এই ত্রিবেণী কে কবি মুক্তবেণী বলেছেন। অন্যদিকে এর একটি পৌরাণিক অনুষঙ্গ রয়েছে। শিবের জটা অর্থাৎ বেণী থেকে গঙ্গার নিষ্ক্রমণের অনুষঙ্গে ‘মুক্তবেণীর গঙ্গা’ বলা হতে পারে। কবি তাই লিখেছেন –

মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে

গঙ্গা পুরাণের একমাত্র বিষ্ণুর শ্রী শিবের জটা তার অধিষ্ঠান। হিন্দু সংস্কার মতে, গঙ্গা হল পাপহারক – মুক্তিদায়িনী। তাই পুরাণের ‘গঙ্গাস্তোত্রম্‌’-এ বলা হয়েছে –

পতিতোদ্ধারিণী জাহ্নবী গঙ্গে খণ্ডিত গিরিবরমণ্ডিত ভঙ্গে।

ভীষ্মজননি হে মুনিবরকন্যে পতিতনিবারিণি ত্রিভুবন ধন্যে।।…

রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতি কুমতিকলাপম্‌।…

অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে বহু প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু মানুষের কাছে গঙ্গা রোগ-শোক নিরাময়কারীরূপে স্থান পেয়ে এসেছে। এই কবিতায় কবির কল্পনাতেও এরই ছায়া আমরা দেখতে পেলাম। এরপর কবি লিখছেন, যার বাম হাতে ‘কমলার ফুল’, ডান হাতে ‘মধুকমালা’ অর্থাৎ বাঁদিকে রয়েছে পদ্ম বাংলাদেশের জাতীয় ফুল আর ডানদিকে রয়েছে মহুয়া ফুলের বিহার, উত্তরে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বত আর পাদদেশে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই তো বাংলার ভৌগোলিক সীমানা। কবি লিখছেন –

ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ মুকুট কিরণে ভুবন আলা

ভালে অর্থাৎ কপালে কাঞ্চন শৃঙ্গ অবস্থিত একথা দ্ব্যর্থবোধক। এক অর্থে বোঝায় কাঞ্চন অর্থাৎ সোনার শৃঙ্গের মুকুট রয়েছে। আসলে কবি বোঝাতে চেয়েছেন সূর্যোদয়ের সময় সূর্যালোক কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরকে সোনার মত আভায় ভরিয়ে তোলে, তা সোনার মুকুটের মতোই সুদৃশ্য। আবার বঙ্গমাতৃকার অপার সৌন্দর্যময় শ্যামলিমার কথা বলতে গিয়ে কবি লিখছেন –

কোল-ভরা যার কনক-ধান্য, বুক-ভরা যার স্নেহ

কবি এই শস্যশালিনী স্নেহময়ী মায়ের সন্তান – শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ, সুজলা-সুফলা সোনার ধানে তার বুক উজ্জ্বল হয়ে আছে। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বন্দেমাতরম্‌’ স্তোত্রে যেমন বর্ণনা করেছিলেন –

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং শস্যশ্যামলাং মাতরম্‌

কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় যখন লেখেন –

কোন দেশেতে তরুলতা

সকল দেশের চাইতে শ্যামল

কোন দেশেতে চলতে গেলেই

দলতে হয় রে দূর্বা কোমল?

কোথায় ফলে সোনার ফসল

সোনার কমল ফোটে রে?

সে আমাদের বাংলাদেশ

আমাদেরই বাংলা রে।

তখন বাংলার নদী-মাঠ-ক্ষেত ভালোবেসে আবার জন্ম নেওয়ার সাধ হয় কবির। এ বাংলা সত্যেন্দ্রনাথের গরবিনী বাংলা, এ বাংলা জীবনানন্দের রূপসী বাংলা। এই স্তবকে বাংলার চিরন্তন রূপ বর্ণনায় মত্ত কবি।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

দ্বিতীয় স্তবকে কবি বাংলার অতীত ইতিহাসে পাড়ি দিয়েছেন।

এই কবিতাটি যেন কবির স্বাজাত্যবোধের প্রকাশক। কবির ইতিহাস বর্ণনা যেন বীরগাথার প্রকাশক। বাঘ সাপের মতো হিংস্র জন্তুসংকুল আদিম পরিবেশেও বাঙালির অস্তিত্ব ছিল। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করেছে সে। বাঙালি জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে টিকে থেকেছে আর বাঙালির এই অকুতোভয় চরিত্রই ফুটে উঠেছে এখানে। কবি লিখছেন –

আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে

দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে

 এখানেই একটি পৌরাণিক আখ্যান বলতে হয়।

বাল্মীকি রামায়ণে দশানন, রামচন্দ্রের চরিত্রগুলি আমরা পাই। বিশ্বশ্রবা মুনি ও নিকষা রাক্ষসীর জ্যেষ্ঠপুত্র রাবণ এবং সূর্যবংশীয় রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠপুত্র হলেন রামচন্দ্র। রামচন্দ্রের প্রপিতামহ রঘু। সূর্যবংশীয় রাজা দিলীপের পুত্র হলেন রঘু। তার পুত্র অজ এবং  অজের পুত্র দশরথ। রঘু ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। তার নামেই বংশের নাম রঘুবংশ-  রামকে তাই অনেকে রঘুপতি, রাঘব ইত্যাদি নামে ডেকে থাকেন। বীর বাঙালি চতুরঙ্গ সৈন্য নিয়ে এইরকম লড়াই করেছিল। বাঙালি বিজয় সিংহও ছিলেন একজন বীর, তিনি জয় করেছিলেন লঙ্কা দেশ। বিজয় সিংহের লড়াইয়ের ইতিহাসও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই অবসরে তোমাদের সঙ্গে কাহিনিটি ভাগ করে নিই। বিজয় সিংহ রাঢ় দেশের রাজপুত্র ছিলেন। তার পিতা রাজা সিংহবাহু তাঁকে নির্বাসন দেন এবং ৭০০ অনুচর নিয়ে নির্বাসিত বিজয় সিংহ লঙ্কার দিকে সমুদ্রপথে গিয়ে উপস্থিত হন। লঙ্কা দ্বীপের আদি অধিবাসীদের পরাস্ত করে সিংহল জয় করে বিজয় সিংহ সেখানকার রাজকুমারীকে বিবাহ করেন এবং  রাজরাস্ট্র নামে রাজধানী স্থাপন করেন। তার নাম অনুযায়ী লঙ্কা প্রদেশের নতুন নাম হয় সিংহল।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘আমরা’ কবিতায় বাঙালির গৌরব স্মরণ করতে গিয়ে বিজয় সিংহের এই শৌর্যের পরিচয় দিয়েছেন। বাঙালি কখনোই দুর্বল চিত্ত ছিল না। সে যেমন যুদ্ধ করে রামচন্দ্রের প্রপিতামহ থেকে মোঘল বাদশা সকলকে প্রতিরোধ করতে পারে, তেমনি বিজয় সিংহের এই কীর্তিও বাঙালির ইতিহাসের স্মারক। এরপর দ্বিতীয় স্তবকের একেবারে শেষে কবি লিখছেন –

চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লিনাথে

চাঁদ বলতে আসলে বিখ্যাত বারো ভূঁইয়া চাঁদ রায়ের কথা বলা হয়েছে যিনি আকবরের অধীনতা স্বীকার না করেই আমৃত্যু যুদ্ধ করেছিলেন। একইসঙ্গে প্রতাপ হলেন অপর এক ভূঁইয়া প্রতাপ সিংহ যিনি মোগলদের যুদ্ধে পরাস্ত করেন। দিল্লিনাথ বলতে দিল্লির মোগল নবাব-বাদশাহদের কথাই বলা হয়েছে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

 তৃতীয় স্তবকের শুরুতেই কবি পুনরায় আরেক বাঙালি বিস্মৃতপ্রায় কপিলমুনির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।

কপিল জ্ঞানের নিধান বা আধার, আদি বিদ্বান এবং সাংখ্যদর্শনের রচয়িতা। কপিল তাঁর এই সাংখ্যদর্শনে মূলত নিরীশ্বরবাদের কথা বলেন। তাঁর মতে জগৎ জড়প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত। সাংখ্যদর্শন রচয়িতা এই কপিল তাঁর অমূল্য দর্শনের যে সূত্র সেই সমস্ত এই বাংলার মাটিতে বসেই রচনা করেছিলেন।

তারপর কবি চলে যাচ্ছেন অতীশ দীপঙ্করের এক ঐতিহাসিক কাহিনিতে। বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষু অতীশ দীপঙ্কর পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর তিব্বতে এবং সেখান থেকেই সমগ্র বিশ্বে বৌদ্ধধর্মকে প্রচার করার কাজে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হিমালয়ের তুষারমন্ডিত পথে দুর্গম দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে শীতে-ঝড়ে সবকিছুকে উপেক্ষা করে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে গিয়েছিলেন। বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ্যক্ষ এবং মহাস্থবির অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের এই তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কাহিনি কবি তাঁর কবিতায় এই স্তবকে উল্লেখ করেছেন –

বাঙালি অতীশ  লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর

ঠিক এর পরের পংক্তিতেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উল্লেখ করেছেন একটি শব্দবন্ধ ‘পক্ষধরের পক্ষশাতন’। এর কাহিনিটি ঈষৎ দীর্ঘ। নব্যন্যায়ের প্রবর্তক গঙ্গেশ উপাধ্যায়ের শিষ্য ছিলেন জয়দেব মিশ্র। তিনি একপক্ষের পাঠ একদিনে আয়ত্ত করতেন এবং তর্কযুদ্ধে দূর্বল পক্ষ অবলম্বন করেও জয়ী হতে পারতেন। তাই তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন পক্ষধর মিশ্র নামে। ফলে পক্ষধর মিশ্র পরবর্তীকালে মিথিলার রাজা ভৈরব সিংহের সভাসদ হন এবং ‘প্রসন্ন রাঘব’ নামক একটি নাটক রচনা করে প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হন। কিশোর রঘুনাথ শিরোমণি যিনি নবদ্বীপে থাকতেন আর এক বাঙালি, তিনি ছিলেন পক্ষধর মিশ্রের একজন ছাত্র। গুরু পক্ষধর তাঁর ছাত্রের পাণ্ডিত্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ছাত্রকে তর্কযুদ্ধে নামতে বাধ্য করেন এবং রঘুনাথ গুরুকে ন্যায়-তর্কে হারিয়ে দেন। পক্ষধর অর্থাৎ পাখাধারণকারী যিনি আর পক্ষশাতন অর্থাৎ পাখা ছেদন। এখানে কবির কল্পনায় কিশোর রঘুনাথ কর্তৃক পক্ষধরের জ্ঞান-অহংকার চূর্ণ করাকেই পক্ষশাতন বা ডানা কেটে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তৃতীয় স্তবকের শেষে কবি লিখছেন –

বাংলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে

স্পষ্টত বোঝাই যায়, লক্ষণ সেনের রাজসভার পঞ্চরত্ন-এর অন্যতম কবি জয়দেবের কথাই এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে। তাঁর ‘গীতগোবিন্দম্’ কাব্য বাংলায় লেখা না হলেও তিনি একান্ত রূপেই বাঙালি কবি। তাঁর কাব্য ‘গীতগোবিন্দম্’কে জয়দেব নিজেই বলেছিলেন ‘মধুর কোমলকান্ত পদাবলি’। তাই তার অনুষঙ্গে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এখানে ‘কান্ত কোমল পদ’ কথাটি উল্লেখ করেছেন। রবি অর্থাৎ সূর্য যেমন বিশ্বজগতে শাশ্বত ঠিক তেমনি বাঙালির কাব্যধারায় জয়দেব একইভাবে শাশ্বত স্থান অধিকার করে আছেন এমনই কবি সত্যেন্দ্রনাথের কল্পনা।

চতুর্থ স্তবকের প্রায় সমগ্রটি জুড়ে রয়েছে বাঙালির স্থাপত্যকীর্তি নিদর্শনের চিত্র।

বাঙালির প্রশস্তি করতে গিয়ে বাঙালির অতীত-ঐতিহ্যের যে প্রাচীন স্থাপত্য শিল্প তার উল্লেখ করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ এই কবিতায়। স্থাপত্যের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন যবদ্বীপে বরবুদুরের কথা, যাকে কবি নিজের ভাষায় লিখছেন বরভূধর। বরবুদুর বা বরভূধর হলো একটি বৌদ্ধ বিহার যা হিন্দুরা তৈরি করেছিলেন ৭৭৮ থেকে ৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। সেখানে একসঙ্গে বহু হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ছিল এবং ছিল চণ্ডীমণ্ডপ। এরপরে কবি বলেছেন কম্বোজ দেশের আঙ্কোরভাট মন্দিরের কথা, এই মন্দিরকেও হিন্দু বাঙালি স্থাপত্য বলে চিহ্নিত করা যায়। স্থপতি ধীমান ও তার পুত্র বিটপাল গৌড়ীয় শিল্পটিকে জগতে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন এবং সেই সূত্রেই বাঙালির উৎকর্ষ শীর্ষে উঠেছিল। বাঙালি রাজপুত্র বিজয় সিংহের বীরত্বগাথা অজন্তার গুহাচিত্রে খোদিত হয়ে আছে।

মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি

বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশিসে অমৃতের টিকা পরি

পঞ্চম স্তবকের একেবারে শুরুর দুটি পংক্তিতে সত্যেন্দ্রনাথ বাঙালির সংগ্রামমুখর জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কিংবা পরবর্তীতে পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরেও বাঙালির অস্তিত্ব ম্লান হয়নি। বাঙালি আবার নতুন জীবন তরঙ্গে ভেসে গিয়েছে। দুর্ভিক্ষ বা মড়ক তখন প্রাচীন বাংলার নিত্যসঙ্গী ছিল। বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতিতে বাঙালি কিন্তু মহামারীর প্রকোপ জয় করেও সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছিল। শ্রীচৈতন্য কিংবা বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ প্রত্যেকেরই কর্ম জীবনের মূলমন্ত্র ছিল ‘ব্যাঘ্রে-বৃষভে সমন্বয়’ অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে কবি বলতে চাইলেন বাঘ এবং এবং ষাঁড় যেমন দুটি ভিন্ন জাতীয় প্রাণী ঠিক সেই রকমই বাঙালি সমাজের ব্রাহ্মণ শূদ্র চন্ডাল মন্ত্রী কায়স্থ প্রত্যেকের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে একটি সার্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই ছিল নিমাই এবং বিবেকানন্দের কর্মযোগ। তাঁরা উভয়েই চেয়েছিলেন ধর্মের ভেদাভেদ দূর হোক, কর্মের ভেদাভেদ দূর হোক।

ষষ্ঠ স্তবকে কবি আসলে বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু এবং অপর খ্যাতনামা রসায়নবিদ্‌ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুষঙ্গ এনেছেন।

তপের প্রভাবে অর্থাৎ তপস্যার বলে বাঙালি সাধক জগদীশচন্দ্র আবিষ্কার করেছিলেন গাছেরও প্রাণ আছে। জড় উপাদানের মধ্যে এই যে প্রাণের উপস্থিতি প্রথম খুঁজে পান একজন বাঙালিই। প্রাচীন মধ্যযুগীয় তান্ত্রিকদের শবসাধনার মাধ্যমে মৃতদেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠার থেকেও আশ্চর্যকর এই ‘নবীন সাধনা’। আবার কবি লিখছেন যে-

বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া

দুটি বিজাতীয় ধাতুর মিলনে এমন এক নতুন যৌগ আবিষ্কার করেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যার নাম মারকিউরাস নাইট্রাইট। কবি কল্পনায় এই রাসায়নিক সম্পৃক্তি যেন উভয়ের মধ্যে বিবাহ। এত ঐতিহ্য, এত ঐশ্চর্যময় ইতিহাস বাঙালির তাই বাঙালি হিসেবে জন্ম কবির বৃথা হয়নি বলেই আবেগবিহ্বল কণ্ঠে তিনি বলেন –

বিফল নহে এ বাঙালি জনম বিফল নহে এ প্রাণ

শেষ দুই স্তবকে কবির নিজের বয়ান আমরা দেখি।

বাঙালি জাতির, বাঙালি সংস্কৃতির প্রশস্তি করতে গিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। বেতালের কাহিনিতে বেতাল যে প্রশ্নগুলি করতো রাজা বিক্রমাদিত্যকে তাতে থাকতো উভয়সংকট, ঠিক তেমনি উভয়সঙ্কট নেমে এসেছিল বাঙালির জীবনে – স্বাধীনতা নাকি পরাধীনতা এই প্রশ্নে দীর্ণ বাঙালি আত্মত্যাগের মন্ত্রে সত্যাগ্রহী হয়, সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে অহিংসার বাণী প্রচার করে। মানবতার এই নতুন মন্ত্রে বাঙালি তার অতীত গৌরব পুনরায় ফিরে পাবে এমন আশাবাদ ধ্বনিত হয়েছে কবির কণ্ঠে। সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত হবে বাঙালির মহামিলনমন্ত্র। মানবধর্মের এই বাণী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এমনটাই কবি কল্পনা করেন আর তাই কবিতার শেষে তিনি ঘোষণা করেন –

মিলনের মহামন্ত্রে মানবে দীক্ষিত ক’রি ধীরে –

মুক্ত হইব দেব-ঋণে মোরা মুক্তবেণীর তীরে।

সমাপ্ত!


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –