niruddesh
WB-Class-9

নিরুদ্দেশ

বাংলানবম শ্রেণি – নিরুদ্দেশ


নিরুদ্দেশ গল্পের লেখক পরিচিতি

রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের সাহিত্যে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ৭ সেপ্টেম্বর কাশীতে তাঁর জন্ম হয়। যদিও তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল হুগলির কোন্নগরে। তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র, মাতা সুহাসিনী দেবী। অত্যন্ত অভিজাত পরিবারের সন্তান প্রেমেন্দ্র মিত্রের পিতামহ শ্রীনাথ মিত্র ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রীর বন্ধু।

অল্প বয়সে মাতৃবিয়োগ হলে দাদামশাই রাধারমণ ঘোষের তত্ত্বাবধানে তিনি বড়ো হয়ে ওঠেন। রাধারমণ ঘোষ মারা গেলে নলহাটিতে এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে তিনি বড়ো হয়ে ওঠেন। মেধাবী ছাত্র প্রেমেন্দ্র মিত্র নলহাটির মাইনর স্কুলে পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতার সাউথ সুবারবন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে সেই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তাঁর উচ্চশিক্ষা শুরু হয়, কিন্তু মাঝপথেই তাতে ছেদ ঘটে। শ্রীনিকেতনে কৃষিবিদ্যা পড়তে চলে যান প্রেমেন্দ্র মিত্র। এরপর কলকাতায় জীবিকা অন্বেষণের সময়ে প্রবাসী পত্রিকায় তাঁর দুটি গদ্য প্রকাশ পেলে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছেড়ে তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দাকাহিনি, গান, চিত্রনাট্য সমস্ত ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত রঙমশাল, কালিকলম, নবশক্তি, পক্ষীরাজ পত্রিকা। বাংলা সাহিত্যে ঘনাদা, পরাশর বর্মা আর ভূতশিকারি মেজোকর্তার মতো অনবদ্য তিনটি চরিত্র সৃষ্টি করে প্রেমেন্দ্র মিত্র স্মরণীয় হয়ে আছেন।

তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল – পাঁক, মিছিল, কুয়াশা, আগামীকাল, প্রতিধ্বনি ফেরে, ওরা থাকে ওধারে, অমলতাস ইত্যাদি। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – প্রথমা, ফেরারী ফৌজ, সাগর থেকে ফেরা, হরিণ চিতা চিল ইত্যাদি। সংসার সীমান্তে, বেনামী বন্দর, মহানগর এগুলি তাঁর অন্যতম গল্পগ্রন্থ।

১৯৫৭ সালে তিনি আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন আর ঠিক তার পরের বছরই ১৯৫৮ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারত সরকারের পদ্মশ্রী এবং বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম উপাধিতে ভূষিত প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯৮৮ সালের ৩ মে মারা যান।

নিরুদ্দেশ গল্পের উৎস

প্রেমেন্দ্র মিত্রের আলোচ্য ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটি প্রথম প্রকাশ পায় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে ‘সামনে চড়াই’ নামে তাঁর গল্পগ্রন্থে এটি সংকলিত হয়। আলোচ্য পাঠ্যাংশটি সেই গল্পগ্রন্থ থেকেই নেওয়া হয়েছে।

নিরুদ্দেশ গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

পুরো গল্প পড়লে দেখা যাবে এখানে মূলত লেখক এবং তাঁর বন্ধু সোমেশ দুজনে মিলে দুটি ভিন্ন মাত্রার নিরুদ্দেশের গল্প বলে। লেখকের গল্পটি খানিক সাদামাটা জীবনের প্রতিচ্ছবি, জটিলতাহীন পারিবারিক মান-অভিমানের আবর্তে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সোমেশ যে গল্প শোনায় তা ‘সত্যকার ট্রাজেডি’। মূলত লেখক আর সোমেশ এই দুটি চরিত্র নিয়েই গল্পটি এগিয়েছে। দুজনের বলা গল্পে যদিও অনেকগুলি কাল্পনিক চরিত্র আছে।

শীতের কোনো একদিন বৃষ্টি হয়েছে, আর সেদিনই লেখকের ঘরে আসে তাঁর বন্ধুপ্রতিম সোমেশ। লেখক তাঁকে জানায় সংবাদপত্রে একসঙ্গে সাতজন ব্যক্তির নিরুদ্দেশের খবর ছাপা হয়েছে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সোমেশের মন ভারাক্রান্ত, ফলে এই আশ্চর্য খবরে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয়না। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা জড়ো হয়ে যাচ্ছে। তারপরেই লেখক নিজেই নিস্তব্ধতা কাটিয়ে সোমেশকে বলেন যে এই নিরুদ্দেশের খবর দেখলে তাঁর হাসি পায় কারণ অনেকক্ষেত্রেই ব্যাপারটা একইরকম কারণে ঘটে।

এবারে লেখক একটি কাল্পনিক ঘটনার বর্ণনা শুরু করেন।

পড়াশোনায় চূড়ান্ত অমনোযোগী ছেলে রাত করে থিয়েটার দেখে বাড়ি ফিরছে দেখে তার বাবা ক্রোধান্বিত হয়ে শাপ-শাপান্ত করতে থাকেন এবং ছেলে ঘরে ঢোকা মাত্রই যখন তাঁকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন, তখন সেই ছেলে লেখকের কথায় ‘নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে’।

এ খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু ঘটনা আর সাধারণ থাকে না যখন পরেরদিনও ছেলে বাড়ি ফেরে না। ছেলের খোঁজে বাবা বাধ্য হয়ে যান খবরের কাগজের অফিসে। সেখানে নানা ঝক্কি পেরিয়ে বিজ্ঞাপনে ছেলেকে ফিরে আসার অনুরোধের কপি লিখে দেবার অনুরোধ করে আসেন। তারপরই বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হবার আগেই দেখা যায় ছেলে বাড়ি ফিরে এসেছে। ছেলেকে দেখে এবারে বাবার বদলে তার মা ধমক দিয়ে তাকে ঘরে থিতু করেন। লেখকের কথায় বেশিরভাগ নিরুদ্দেশের ঘটনাই এইরকম।

এরপরে শুরু হয় পরের গল্প।

তবে এর কথক লেখক নয়, সোমেশ। নিরুদ্দেশের ঘটনা শুনে সে বলে, ‘এই বিজ্ঞাপনের পিছনে অনেক সত্যকার ট্র্যাজেডি থাকে।’ সোমেশ কেন এই ট্র্যাজেডির কথা বললো, সে কীভাবেই তা এই অভিজ্ঞতায় উপনীত হল এই প্রসঙ্গ ধরেই এক রহস্যের আবর্তে কাহিনি এগোয়। সোমেশের বলা গল্পটি এরকম – বহুদিন আগে প্রধান সংবাদপত্রে দীর্ঘদিন যাবৎ একটি বিজ্ঞাপনে নিরুদ্দিষ্ট ছেলের প্রতি মায়ের করুণ আর্তি দেখা যেত।


নবম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

ধীরে ধীরে সেই বিজ্ঞাপনে মায়ের আর কোনো কথা ছিল না। নিরুদ্দিষ্ট ছেলের বাবা একদিন বিজ্ঞাপনে তাঁর ছেলেকে সত্ত্বর ফিরে আসতে জানায় কারণ তার মা শয্যাগত। মায়ের প্রতি কর্তব্যবোধের তাড়নাতেও ছেলে যেন ফিরে আসে এমনটাই তার বাবার কামনা। বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় সেই নিরুদ্দিষ্ট ছেলের নাম শোভন। কিছুদিন ধরে বিজ্ঞাপনে সেই বাবার আর্তি শোনা যেতে লাগলো। একসময় তাও বন্ধ হয়ে গেল।
বিজ্ঞাপনের ভাষাও বদলে গেল।
শোভনের চেহারার বর্ণনা দিয়ে পুরস্কার ঘোষণা করা হল। চেহারার বিশেষত্ব বলতে ডান কানের নীচে একটি জরুলের উল্লেখ করা ছিল। জীবিত না মৃত শুধু সেই সংবাদ জানার আগ্রহে শোভনের বাবা বিজ্ঞাপন দিতেন। ক্রমে পুরস্কারের অঙ্কও বাড়তে লাগলো। কিন্তু ছেলে ফিরলো না। সোমেশ এরপর জানায় শোভনকে সে চিনতো।

সোমেশ বলে যে একপ্রকার নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত মন নিয়ে জন্মেছিল শোভন। বাড়ি ছাড়বার পরে বিজ্ঞাপন সে দেখেছে ঠিকই কিন্তু আবার ভুলে গেছে। তবে বিজ্ঞাপন বন্ধ হওয়ার দু বছর পরে সে যখন উদাসীন চিত্তে একদিন বাড়ি সত্যই ফিরলো, তখন তার আশ্চর্য করুণ এক অভিজ্ঞতা হল।

জমিদারবাড়ির উত্তরাধিকারী শোভনকে নায়েবমশাই, খাজাঞ্চিবাবু কেউই চিনতে পারছেন না।

তারা জানায় এর আগে তারই মতো আরো দুজন এসেছিল, একইরকম দেখতে এমনকি ঘাড়ের জরুল পর্যন্ত এক। আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় শোভনের মৃত্যুসংবাদ তারা পেয়েছেন সাতদিন আগে। ডাক্তারের বর্ণনার সঙ্গে নাকি হুবহু মিল ছিল শোভনের। এমন ঘটনায় হতভম্ব শোভন কি করবে বুঝে পায় না। হঠাৎ বাবাকে বেরোতে দেখে ছুটে গেলেও তার বাবাও তাকে চিনতে অস্বীকার করে এড়িয়ে যায়।

ঠিক এইভাবে সোমেশের গল্প শেষ হলে লেখক লক্ষ করেন সোমেশের ঘাড়ের কাছেও জরুল আছে।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সোমেশ রহস্য করে বলে যে সেই কারণেই এই গল্পটা বানানো তার পক্ষে সহজ হয়েছে। কিন্তু গল্পের সমাপ্তি ঘটে লেখকের দ্বন্দ্বমথিত বর্ণনায় –
‘শীতের বাদলের এই শীতল প্রায়ান্ধকার অস্বাভাবিক অপরাহ্ণে তার হাসিটাই বিশ্বাস করিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না।’

নিরুদ্দেশ শোভনই কী তাহলে সোমেশ এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আমাদের মনকে গ্রাস করে। সার্থক ছোটগল্পের মতো প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ও ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’।

নিরুদ্দেশ গল্পের সারসংক্ষেপ

এই গল্পটিতে লক্ষণীয় বিষয় তিনটি –
ক) লেখকের কথনভঙ্গির কবিত্ব,
খ) গল্পের প্লটের দ্বিবিধ চরিত্র এবং
গ) দ্বিধা-দ্বন্দ্বময় সমাপ্তি

পুরো গল্পটিতে দুটি নিরুদ্দেশের কাহিনি আছে।
প্রথমটির কথক লেখক নিজে আর দ্বিতীয়টির কথক সোমেশ। প্রথম গল্পটিতে কিছুটা গাঢ় রসের পারিবারিক মান-অভিমানের ছাপ আছে। তবে তাতে হাসির যোগান নেই একেবারেই। অনেকে এই কাহিনির মধ্যে কমেডি আর ট্র্যাজেডি এই দুই ভাগ আছে বলে মনে করেন কিন্তু তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কমেডি এই গল্পের কোথাও নেই।

প্রথম গল্পের মধ্যে যে সাধারণ সাদামাটা ছবি আছে তা থেকে ব্যতিক্রম হয়ে উঠছে পরের গল্পটি। নিরুদ্দেশের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। যে শোভন একদিন একটি পরিবারে ছিল, তার নিজের পরিবার ছিল সেটা, সেই শোভন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর পরিবারের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। কিন্তু সাধারণ গল্পের থেকে এটা এখানেই আলাদা হয়ে যায় সে সেই ছিন্ন সম্পর্ক আর কোনোদিন জোড়া লাগে না।


নবম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

তার পরিবারের স্মৃতি থেকে সত্যই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় শোভন। অথচ সে নিজ অস্তিত্ব নিয়ে বিদ্যমান। পরিবারের কাছে কিছু বাস্তব ঘটনায় বলা ভালো তার মৃত্যুর ঘটনায় মানসিকভাবে তার বাবাও পর্যন্ত বিশ্বাস করেছে যে সে মৃত।

অথচ সত্যই শোভন মারা যায়নি।

এই পরিস্থিতিতে শোভনের ব্যক্তিগত পরিচয় হিসেবে কী রইল? তার মৃত্যুর খবর প্রচারিত। তার পরিবারে সে অস্বীকৃত। অথচ জীবন নিয়ে প্রাণ নিয়ে তার শরীরটা বেঁচে আছে। কিন্তু তার এই অস্তিত্বের কী অর্থ রইল? এই চরম করুণ সংকটে নিয়ে ফেলেন লেখক আমাদের। বিখ্যাত সাহিত্যিক আলব্যেয়ার কাম্যু যে অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশ্বযুদ্ধের বীভৎসার পরে সেই সংকট এই গল্পে শোভনকেও গ্রাস করেছে।

একটা নেই-সর্বস্ব জীবনের দিকে পরিণতি ঘটেছে তার।

এই দুটি গল্প একে অপরের পরিপূরক এবং বিপ্রতীপ। তবে গল্পের শেষে সোমেশই যে শোভন হতে পারে এমন সম্ভাবনার রেশ লেখক পাঠক মনে ছড়িয়ে দেন। হতে পারে সোমেশ তার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই শোভনের চরিত্রে আরোপ করেছে। আর সর্বোপরি প্রেমেন্দ্র মিত্রের অন্যান্য গল্পের কথনভঙ্গির মতো এখানেও কবিত্বপূর্ণ পটভূমি রচনা হয়েছে। তাঁর শব্দচয়ন, পরিবেশ রচনার কৌশল গদ্যের মধ্যেও কবিতার স্বাদ এনে দেয়।

‘নিরুদ্দেশ’ গল্পটি আমাদের এক কঠোর বাস্তবের সামনে এনে দাঁড় করায় যেখানে সামান্য তুচ্ছ কিছু fact বা ঘটনার কাছে সম্পর্ক মিথ্যে হয়ে যায়, পারিবারিক পরিচয় মিথ্যে হয়ে যায়।

[তবে লেখকের মুন্সিয়ানায় দুটি গল্পই কাল্পনিকতার মোড়কে মোড়া যার সব চরিত্র সম্ভবত কাল্পনিক।]

সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

IX_Beng_Niruddesh