poschimbonger-obosthan-proshasonik-bivag
WB-Class-9

পশ্চিমবঙ্গের গঠন,অবস্থান ও প্রশাসনিক বিভাগ

ভূগোলনবম শ্রেণি – পশ্চিমবঙ্গ (প্রথম পর্ব)।


গঙ্গা নদীর নিম্ন সমভূমি অঞ্চলকেই প্রাচীনকালে বঙ্গ নামে অভিহিত করা হত। প্রাচীনকাল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত গঙ্গার এই নিম্নভূমি অঞ্চল বঙ্গদেশ নামে পরিচিত ছিল।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বঙ্গদেশ ভাগ হয়। পূর্ব ভাগের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান যা বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র নামে পরিচিত এবং পশ্চিমভাগের নাম হয় পশ্চিমবঙ্গ।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ২৩টি জেলায় বিভক্ত।

পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান

পূর্ব ভারতের একটি অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ রাজ্য হল পশ্চিমবঙ্গ।দক্ষিণে 21ডিগ্রী 38 মিনিট উওর অক্ষাংশ থেকে উওরে 27 ডিগ্রী 10 মিনিট উওর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পশ্চিমে 85 ডিগ্রী 50 মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে পূর্বদিকে 89 ডিগ্রী 50 মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

পশ্চিমবঙ্গে কর্কটক্রান্তি রেখার বিস্তার

কর্কটক্রান্তি রেখা (সাড়ে ২৩ ডিগ্রী) উত্তর অক্ষাংশ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী, গুসকরা,আউসগ্রাম, রাজবাঁধ, দূর্গাপুর, বাকুঁড়া জেলার দুর্লভপুর নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর, ধুবুলিয়া এবং পুরুলিয়া জেলার আদ্রা শহরের উপর দিয়ে পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের সীমানা

ভারতের এই রাজ্যটি তিনটি আন্তর্জাতিক সীমানা ও পাঁচটি আভ্যন্তরীণ সীমানায় আবদ্ধ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সীমানার দৈর্ঘ্যের বিচারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ভারতে দ্বিতীয়।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর

পূর্বাংশে রয়েছে ভারতের অসম রাজ্য ও পূর্বদিকে রয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, পশ্চিমে রয়েছে ঝাড়খন্ড, বিহার ও ওড়িশা রাজ্য। উওর সীমায় রয়েছে হিমালয় পর্বতমালার অংশ বিশেষ ভারতের সিকিম রাজ্য এবং নেপাল ও ভুটান রাষ্ট্র এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ।

পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে বাংলাদেশের সাথে এবং আভ্যন্তরীণ রাজ্য সীমানা রয়েছে ঝাড়খণ্ডের সাথে।

অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, পশ্চিমবঙ্গই ভারতের এমন এক রাজ্য যা আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত রয়েছে। এই রাজ্যের উত্তরে রয়েছে পর্বতমালা এবং দক্ষিণে রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র উপকূলীয় সমভূমি এবং পশ্চিমে মালভূমি অংশ এই অংশগুলি বাদে প্রায় সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে রয়েছে গাঙ্গেয় -ব-দ্বীপ সমভূমি।

প্রাকৃতিক দিক থেকে এত পরিপূর্ণ হওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গকে বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজ্য হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের অবস্থানের গুরুত্ব

উত্তর- পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমেই পরিবহন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত হয়েছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড তথা নেপাল ও ভুটান প্রভৃতি রাষ্ট্রকেও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের সাথেও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য এই রাজ্যের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের এই অভূতপূর্ব অবস্থানের কারণে এটি দেশের একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গরাজ্য।

পশ্চিমবঙ্গের আয়তন

পশ্চিমবঙ্গের মোট আয়তন 88,752 বর্গকিমি। ভারতের মোট আয়তনের বিচারে পশ্চিমবঙ্গ মাত্র 2 শতাংশ স্থান দখল করে আছে।ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে আয়তনে ত্রয়োদশতম।

পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব

2011সালের আদমশুমারি অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যা 91347736জন। জনসংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে চতুর্থতম রাজ্য।

ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫৫ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে বাস করে। আবার জনঘনত্বের বিচারে পশ্চিমবঙ্গই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। প্রতি বর্গকিমিতে 1029জন করে বসবাস করে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা হুগলী নদীর বাম তীরে অবস্থিত।

ব্রিটিশ আমলে তথা ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ভারতের রাজধানীও ছিল।

এটি ছিল ব্রিটিশদের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র। অতীত তথা বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা হল পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার। কলকাতাকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীও বলা হয়।এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর।

পশ্চিমবঙ্গের বিস্তার

এই রাজ্য উত্তর- দক্ষিণে ( দার্জিলিং-এর সিংগালিলা শৈলশিরা থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত) বিস্তৃত প্রায় ৬২৩ কিমি এবং পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত প্রায় ৩২০ কিমি।

উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া এই রাজ্যের সংকীর্ণতম অঞ্চল (আকৃতিগত কারণে এই অঞ্চল Chicken’s neck নামেও খ্যাত)। প্রস্থে ৯ কিমি। এটি মহানন্দা করিডর নামেও পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গের জেলাসমূহ

পশ্চিমবঙ্গের পুনর্গঠন

দেশভাগের সময় ১৪ টি জেলা নিয়ে গড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গ বারংবার রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বর্তমানে ২৩ টি জেলা সমন্বিত।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পর্যায়

 

ক) ১৯৪৮ সালে বিহারের ইসলামপুর পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত হয়।

খ) ১৯৫০ সালে ফরাসী অধিকৃত চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত হয়।

গ) ১৯৫১ সালে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত হয়।

ঘ) ১৯৫৬ সালে বিহারের মানভূম জেলার পুরুলিয়া এবং পূর্ণিয়া পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়।

ঙ) ১৯৮৬ সালে ১লা মার্চ ২৪ পরগণা জেলাকে ভেঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা নামক দুটি জেলায় ভাগ করা হয়।

চ) ১৯৮৮ সালে দার্জিলিং জেলার দার্জিলিং,কালিম্পং ও কার্শিয়াং মহকুমার ১৩ টি মৌজা নিয়ে দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ গঠিত হয়।

subscribe-jump-magazine-india

ছ) ১৯৯২ সালে পশ্চিম দিনাজপুর জেলাকে ভেঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এই দুই জেলায় ভাগ করা হয়।

জ) ১৯৯২ সালেই কোচবিহার জেলার সীমান্তে অবস্থিত মেখলিগঞ্জ এলাকার তিনবিঘা করিডরকে ৯৯৯ বছরের জন্য বাংলাদেশকে লীজ দেওয়া হয়।

ঝ) ২০১৪ সালের ২৫শে জুন জলপাইগুড়ি জেলাকে ভেঙ্গে আলিপুরদুয়ার গঠিত হয়।

ঞ) ২০১৭ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী দার্জিলিং জেলা ভেঙ্গে ২১তম জেলা হিসাবে কালিম্পং জেলার সৃষ্টি হয়।

ট)২০১৭ সালের ৪ঠা এপ্রিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ভেঙ্গে ঝাড়গ্রাম জেলা ২২তম জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

ঠ)২০১৭ সালের ৭ই এপ্রিল বর্ধমান জেলা ভেঙ্গে ২৩তম জেলা হিসাবে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান জেলা সৃষ্টি হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক বিভাগ

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক বিভাগ

আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ২৩টি জেলা সমন্বিত এবং এই ২৩টি জেলাকে শাসন ব্যবস্থার সুবিধার্থে ৫টি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।

এক-একটি প্রশাসনিক বিভাগ ৪টি বা ৫টি জেলা নিয়ে গঠিত ও প্রতিটি জেলার একটি করে সদর শহর রয়েছে এবং প্রত্যেকটি প্রশাসনিক বিভাগের একটি করে সদর দপ্তর রয়েছে।

প্রশাসনিক বিভাগগুলি নিম্নরূপ

1. প্রেসিডেন্সি বিভাগ

কলকাতা (কলকাতা), উত্তর ২৪ পরগণা (বারাসাত), দক্ষিণ ২৪ পরগণা(আলিপুর), হাওড়া(হাওড়া), নদীয়া( কৃষ্ণনগর) এই পাঁচটি জেলা ও তাদের সদর শহর নিয়ে এই বিভাগ গঠিত।

এই বিভাগের সদর দপ্তর হল কলকাতা।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

2. বর্ধমান বিভাগ

এই বিভাগের সদর দপ্তর হল চুঁচুড়া।
পূর্ব বর্ধমান (বর্ধমান),পশ্চিম বর্ধমান (আসানসোল), হুগলী (চুঁচুড়া), বীরভূম (সিউড়ী) এই চারটি জেলা নিয়ে গঠিত বর্ধমান বিভাগ।

3. মেদিনীপুর বিভাগ

এই বিভাগ ৫টি জেলা নিয়ে গঠিত। পুরুলিয়া( পুরুলিয়া), বাঁকুড়া ( বাঁকুড়া), পূর্ব মেদিনীপুর (তমলুক), পশ্চিম মেদিনীপুর (মেদিনীপুর) ঝাড়গ্রাম( ঝাড়গ্রাম)।
এই বিভাগের সদর দপ্তর হল মেদিনীপুর।

4. জলপাইগুড়ি বিভাগ

জলপাইগুড়ি (জলপাইগুড়ি), আলিপুরদুয়ার( আলিপুরদুয়ার), দার্জিলিং (দার্জিলিং), কালিম্পং(কালিম্পং), কোচবিহার (কোচবিহার) এই পাঁচটি জেলা নিয়ে এই বিভাগ গঠিত।
৫টি জেলা সমন্বিত এই বিভাগের সদর দপ্তর জলপাইগুড়ি।

5. মালদা বিভাগ

উত্তর দিনাজপুর( রায়গঞ্জ), দক্ষিণ দিনাজপুর(বালুরঘাট), মালদা(ইংলিশ বাজার), মুর্শিদাবাদ( বহরমপুর) এই চারটি জেলা নিয়ে মালদা বিভাগ গঠিত। এই বিভাগের সদর দপ্তর হল মালদা শহর।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তনী শ্রেয়সী বিশ্বাস। পড়াশোনা এবং লেখালিখির পাশাপাশি, ছবি আঁকা এবং বাগান পরিচর্যাতেও শ্রেয়সী সমান উৎসাহী।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।