My-journey-sourdip-nath-jump-magazine
Article (প্রবন্ধ)

আমার যাত্রাপথ

একটি নদী যখন সমুদ্রে এসে মেশে তখন নিজের অস্তিত্বকে হঠাৎই হারিয়ে ফেলে, মাধ্যমিকের ছোট্ট ঘেরাটোপকে অতিক্রম করে উচ্চ-মাধ্যমিকের বৃহত্তর জগতের সামনে উন্মুক্ত হয়ে আমিও কিছুটা ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। শুরু থেকেই ইতিহাস-ভূগোলে তেমন interest না থাকা এবং ‘Software Engineer’ হওয়ার ইচ্ছা থেকেই উচ্চ-মাধ্যমিকে Science নেওয়া। একে তো হঠাৎ করে নব্বই পাতার পাঠ্যবই থেকে নশো পাতার up-gradation, তার উপর আশেপাশের থেকে ভেসে আসা – ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে আকাশ আর পাতাল তফাৎ’, ‘এই দুই বছর জীবনের সবথেকে কঠিন সময়’ এই জাতীয় কথাবার্তা। স্বভাবতই ষোলো বছরের আমার মনেও কিছুটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তবু নতুন উদ্যমের সঙ্গেই শুরু হয় উচ্চ-মাধ্যমিকের উদ্দেশ্যে পথ চলা।

Physics-এর derivation থেকে শুরু করে Chemistry-এর equation আর Maths-এর technique।  এই সব কিছুর মাঝে অপেক্ষাকৃত সহজ Computer Science-এর প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে আর ভবিষ্যতে ‘Computer Science Engineering’ পড়ার ইচ্ছাটাও আরো প্রবল হতে থাকে। নতুন পড়াশোনার সাথে কিছুটা অভ্যস্ত হতে না হতেই সামনে আসে মাধ্যমিকের রেজাল্ট। চোখের সামনে অনেকের ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলোকে ঝরে পড়তে, আবার অনেকের মনে নতুন স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলতে দেখি। আর আমি? আমার তো unexpectedly 7th হওয়াটা আরো কিছু বাড়তি চাপ বয়ে এনে দেয়।

sourdip-model-school-jump-magazine
উত্তরপাড়া মডেল হাই স্কুলের ‘দিদিভাইয়ের’ সাথে

একেই Science এর মাত্রাতিরিক্ত চাপ, তার উপর যদি আবার লোকজনের প্রত্যাশার চাপ ঘাড়ে এসে পড়ে তবে একটা ষোলো-সাতেরো বছরের ছেলে কিভাবে সামলাবে, তা জানা ছিল না। সামলাতে যে আমাকে নিজেকেই হবে – এই ভেবে পারিপার্শ্বিক চাপগুলোকে কিছুটা উপেক্ষা করেই আবার জোর কদমে শুরু হয় পড়াশোনা। স্কুলে ভর্তি, নতুন uniform, নতুন বন্ধু – এই সবকিছুকে বুঝে উঠতে উঠতে কেটে যায় প্রায় ছটা মাস – এসে পড়ে Half yearly Exam, result –ও বেশ পদস্থ হয়, অবে আসল ধাক্কাটা আসে তখন, যখন ঠিক তিন মাস পরেই এই বিশাল বিশাল syllabus গুলোর পুরোটা নিয়ে annual examination এ বসতে হয়। ভয়, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা এই সব কিছু নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। এক এক সময়ে মনে হতে থাকে Science কি আদৌ আমার জন্য? এরই মধ্যে পরীক্ষার ঘণ্টা বাজে, পরীক্ষা শেষও হয়ে যায়। বিগত বছরের পরিশ্রম আর ফাঁকি সবকিছুরই মূল্যায়ন হাতে এসে পড়ে। ক্লাস Eleven-এর annual পরীক্ষার রেজাল্টে নিজের ভুলত্রুটি, কিছু বিশেষ চ্যাপ্টারের প্রতি অনীহার ফল হাতেনাতে পেয়ে যাই। তবে এর সাথেই পাই আরো একটা সুযোগ, নিজেকে better করার।

drama-souradip-jump-magazine
নাটকের মঞ্চে

Twelve-এ উঠে পড়াশোনা শুরু হবার সাথে সাথেই বোঝা যায় ভয়টা অনেকটা কেটে গেছে, নব্বই এর বদলে নশো যেন শুধুই একটা সংখ্যা। Physics-এর চরম interesting Current Electricity, Optics, Modern Physics কিংবা Maths-এর Calculus পড়াশোনাটার প্রতি একটা ভালোবাসা সৃষ্টি করে। চাপটা কমেছে মনে হওয়া শুরু হয় যখন, ঠিক তখনই মনে পড়ে WBJEE বা JEE Main-এর জন্য তো আবার পড়তে হবে! তবে Boards-এর জন্য ভালোবাসাটা already জন্মে যাওয়ায় elevenটাকে আর ঘুরে দেখা হয়ে ওঠে না। বেশ দ্রুত গতিতেই পড়া চলতে থাকে ঠিকই, তবে Test পরীক্ষাটা যেন বড্ড তাড়াতাড়ি এসে কড়া নাড়তে থাকে। একদিকে তো সব syllabusই শেষ হয়নি আর অন্যদিকে Test এর ভয়াবহ routine – বেশ চাপে ফেলে দেয় আমাকে। স্কুল জীবনের সমাপ্তি, বন্ধুদের সাথে বিচ্ছেদ, মন ভারাক্রান্ত এই সবকিছুর মধ্যেই Test–এর result মনে করিয়ে দেয় – আর মাত্র তিনমাস।

souradip-model-school-jump-magazine
স্কুলের বন্ধুদের ও শিক্ষকের সাথে

Test পরীক্ষায় পাওয়া 94% নম্বরকেই ধরে রাখার উদ্দেশ্যে শেষ ও চরম প্রস্তুতি শুরু হয়। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, পড়ার সময়টা বাড়ে ঠিকই, তবে syllabus যে তখনও শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন বাড়িতে থেকে একঘেয়েমি জীবনের প্রতি বিরক্তি আর প্রচণ্ড ভয়ের সাথে সাথেই চলতে থাকে নিয়মিত test paper practice। এরই ফাঁকে হয়ে যায় WBJEE আর JEE Mains-এর form fill up, নাহ এইবার eleven টাকে উল্টে পাল্টে দেখতেই হচ্ছে, এই ভেবে আবার eleven-এর বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার গুলোকে ঝালিয়ে নেওয়া শুরু হয়। দেখতে দেখতে কেটে যায় মাসগুলো। February কাটিয়ে March আসতেই tuition যাওয়াটাও বন্ধ হয়ে যায়, হাতে গোনা আর কয়েকটা দিন। উত্তেজনাটা আরো বেড়ে যায় Entrance পরীক্ষার Admit card হাতে পেয়ে। Routine তৈরি করেই ফেললাম। পড়াশোনা বন্ধ করে এবার শুধুই বাড়িতে বসে পরীক্ষা – self evaluation।

HS শুরু হয় 27th March, বাংলার MCQতে ধ্রুপদী সঙ্গীত, English এত সহজ! বাহ!!! Maths টাও বেশ ভালোই হল। তিনটে পরীক্ষা দিয়ে Physcis পরীক্ষার প্রশ্ন সহজ হবে এই ভেবে চিন্তামুক্ত (আরো একটা কারণ ছিল যে 2017 পরীক্ষায় Physics বেশ শক্ত এসেছিল), তখনই অসম্ভব অন্যরকম level এর Physics প্রশ্ন আমার আত্মবিশ্বাসটাকে সযত্নে ভেঙ্গে দিল। বাকি তখনও Chemistry, যা মোটের উপর ভালই গেল। Wait! Wait! Wait! পরশু তো JEE Mains!!! পরীক্ষার আগের রাতে সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত থেকে শুধুই Previous Years দেখে পরীক্ষা দিয়ে এলাম। পরীক্ষা তখনও বাকি, তবু unofficial solution key দেখে marks calculation এর লোভ সামলাতে পারলাম না। নাহ, নম্বর খুব একটা খারাপ আসেনি! কিন্তু Computer পরীক্ষাটা মনের মতো হল না। দশদিন বাদে অসুস্থ শরীরে WBJEE দিতে বসলাম। ব্যাস এইবার ছুটি, দুই বছরের পরিশ্রমের শেষ।

কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন। H.S. পরীক্ষার রেজাল্ট 8th June বেরোবে ঘোষণা করা হল, ইতিমধ্যে entrance গুলোর ফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় H.S. পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য tension তেমন অনুভব করছিলাম না। তবে 7th June রাতে যেন প্রচণ্ড ভয়-উত্তেজনা-চিন্তায় দমটা যেন বন্ধ হয়ে এলো! 8th June সকাল দশটা প্রেস কনফারেন্সে চতুর্থ স্থানে নিজের নামটা শুনে দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল – এই কান্না শুধু আনন্দের নয় – বহু ভেঙ্গে পড়া, বহু উঠে দাঁড়ানো, বহু ত্যাগ আর বহু রুদ্ধশ্বাস করা tension-এর প্রকাশ এই কান্না। যার সাক্ষী আমার জীবনের শুধুই এই দুটো বছর।

cheif-minister-FELICITATION-souradip
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সৌরদীপ

লেখক পরিচিতিঃ

২০১৬ মাধ্যমিকে সপ্তম স্থানাধিকারী এবং ২০১৮ উচ্চ মাধ্যমিকে চতুর্থ স্থানাধিকারী সৌরদীপ নাথ। শুধু একটি লাইন সৌরদীপের পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। বালি, হাওড়ার সাধারণ ঘরের, মিশুকে ও অত্যন্ত মেধাবী ছেলে সৌরদীপ বর্তমানে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (Indian Institute of Engineering Science and Technology, Shibpur) কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনাকে সাথে রেখে সমান তালে নাটক, আবৃত্তি, আড্ডা (ফিজিক্যাল ও ডিজিটাল) তথা ‘ল্যাদ’ খাওয়া ইত্যাদি কিভাবে একসাথে অসাধারণ ভাবে ম্যানেজ করা যায় তার জলন্ত উদাহরণ সৌরদীপ।

2 Replies to “আমার যাত্রাপথ

Leave a Reply