history-of-zero
Histroy of Science (বিজ্ঞানের ইতিহাস)

শূন্য এবং তার ইতিহাস



‘শূন্য’ অর্থাৎ ফাঁকা বা কিছুনা।

গনিতে যেমন 8 – 8 = 0 পাই আবার তেমনি কোনো অংকের পেছনে শূন্য যুক্ত হলে অঙ্কটির মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।

গণিতের একটি প্রয়োজনীয় সংখ্যাই হল শূন্য। শূন্য যেকোনো সংখ্যার সাথে গুণ করলেই সংখ্যাটির অস্তিত্ব থাকে না আবার কোনো সংখ্যাকে শূন্য দ্বারা ভাগ করলে অসীম হয়। যদিও এই শূন্যের আবিষ্কার নতুন বলে মনে হলেও এই ধারণা পুরোপুরি পরিণতি পায় ভারতবর্ষে 500 A.Dতে (আনুমানিক)। আজ সেই ‘শূন্য’-ই নানা রকম সরল (যেমন আমাদের দৈনিক টাকা-পয়সার হিসাব কষা) ও জটিল গণনা (যেমন ক্যালকুলাস) থেকে শুরু করে Computer-এর আবিষ্কারে সাহায্য করেছে।

গণিতের ভিত্তি অর্থাৎ সংখ্যামালা নিয়ে প্রায় সব সভ্যতাই মাথা ঘামাতে শুরু করে।

কিন্তু কিভাবে ‘কিছু নয়, কিন্তু কিছু একটা’’ সংখ্যা সংখ্যামালার অন্তর্গত হতে পারে তা নিয়ে সবাইকে হাবু-ডুবু খেতে হয়েছিল। প্রাচীন গ্রীক-রোমান এবং চৈনিকরা ‘শূন্যের’ অস্তিত নিয়ে সন্দিহান ছিলেন না, তবে এই ধারণাকে কিভাবে সংখ্যামালার মধ্যে নিয়ে আসবেন তা বুঝতে পারছিলেননা।

ancient-times-numericals
প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ব্যবহৃত সংখ্যামালা [সৌজন্যে Wikipedia]

ভারতঃ ‘শূন্য’ যেখানে ‘0’ হয়

এবার একটু বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক। প্রখ্যাত গণিতবিদ এবং দার্শনিক বারস্ট্রান্ড রাসেল একবার মজা করে বলেছিলেন যে, “মানব সভ্যতায় প্রাচীন ভারতের অবদান একেবারে শূন্য”

কথাটা শুনতে মজার মনে হলেও; ভারতের ভুমিকা সত্যিই আক্ষরিক ভাবেই শূন্য। কারণ আমাদের আধুনিক দশমিক পদ্ধতিতে সংখ্যা লেখার পেছনে যে সংখ্যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই শূন্য কিন্তু ভারতেই আবিষ্কার হয়েছিল।

JUMP whats-app subscrition

আনুমানিক দ্বিতীয় বা তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে গণিতবিদ পিঙ্গল (Pingala) শূন্যের কথা তার বইয়ে উল্লেখ করেন।

শূন্যের ধারণা তো পাওয়া গেল, কিন্তু তাকে সংখ্যায় ধরা হবে কিভাবে?

শূন্যের প্রথম চিহ্নের উল্লেখ পাওয়া যায় বাকশালি পাণ্ডুলিপিতে (Bakhshali Manuscript), এই পাণ্ডুলিপিগুলি বিভিন্ন সময়ে (খ্রিস্টপূর্বাব্দ 200 থেকে 990) লেখা হয়েছিল।

Bakhshali_numerals
বাকশালি পাণ্ডুলিপি [সৌজন্যে – newscientist.com]
আধুনিক রেডিওকার্বন ডেটিং (radiocarbon dating) পদ্ধতিতে দেখা গেছে এটাই পৃথিবীর প্রাচীনতম নথী যাতে ‘শূন্য’কে চিহ্নিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই সময়ে শূন্য-কে একটা বিন্দুর চিহ্নে চিহ্নিত করা হত।

Bakhshali_numerals_2
বাকশালি পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহৃত সংখ্যামালা

এখনও কিন্তু মানব সভ্যতার কাছে শূন্যের ব্যবহার অজানা ছিল!

৫০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের আর্যভট্ট সংখ্যা গণনার একটি নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি বিশাল সংখ্যাকে কীভাবে সংক্ষেপে লেখা যেতে পারে তার জন্য তিনি একটি ‘কোড’ বানিয়েছিলেন। এতে দশক, শতক ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন অক্ষর নির্দিষ্ট করা ছিল। সেখানে শূন্যের জন্য তিনি ‘খ’ অক্ষরটি ব্যবহার করেন। হয়তো তাঁর মাথায় শূন্যের সঙ্গে মহাকাশ বা ‘খগোল’ এর কোনো সম্পর্কের কথা মনে হয়েছিল।


[আরো পড়ুন – পাই-এর ইতিহাস]

শূন্যকে তো খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু অন্যান্য সংখ্যার মতো যেহেতু শূন্যতাকে আলাদাভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই শূণ্যকে সাধারণ সংখ্যা হিসাবে ভাবতে আমাদের সময় লেগেছিল। 629 খ্রীঃ ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর লেখা ‘ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত’–তে প্রথম শূন্যকে সংখ্যার মর্যাদা দিয়েছিলেন।

এটাকেই প্রকৃত অর্থে ‘শূন্যের আবিষ্কার’ বলা যেতে পারে।

অনেকে বলেন গুপ্তযুগে বৌদ্ধ দর্শনে একসময় ‘শূন্যতা’ নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়, হয়তো তার সঙ্গে শূন্য আবিষ্কারের একটা যোগাযোগ আছে। তবে আর্যভট্ট বা ব্রহ্মগুপ্ত, এঁদের সঙ্গে যেকোনো বৌদ্ধ বিহার বা শিক্ষাকেন্দ্রের যোগাযোগ ছিল, তার কোনো প্রমাণ নেই।

সংখ্যা হিসাবে শূন্যের সংজ্ঞা দেওয়া যে কত কঠিন ছিল তা ব্রহ্মগুপ্তের লেখা পড়লেই বোঝা যায়।

  • প্রথমে তিনি বলেন কোনো ধণাত্মক বা ঋণাত্মক সংখ্যার সঙ্গে ‘শূন্য’ যোগ করে দিলে সেই সংখ্যা বদলায় না। শূন্যের সঙ্গে ‘শূন্য’ যোগ করলেও তার যোগফল ‘শূন্য হয়।
  • বিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বললেন ‘শূন্য’ থেকে কোনো ঋণাত্মক সংখ্যা বাদ দিলে ধনাত্মক সংখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো সংখ্যা থেকে ‘শূন্য’ বাদ দিলে সেই সংখ্যা একই থাকে।
  • আবার শূণ্যের সঙ্গে কোনো সংখ্যা গুণ করলে ‘শূন্য’ হয়।

এইরূপ একের পর এক শূন্যের বৈশিষ্ট্যগুলি লিপিবদ্ধ করণ প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু শূন্য দিয়ে ভাগ করা নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়েছিলেন।

তিনি বললেন কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে একটি ভগ্নাংশ পাওয়া যায় যার হর হল শূন্য।

ব্রহ্মগুপ্তের প্রায় ২৫ বছর পর আরেকজন গণিতবিদ ‘ভাস্করাচার্য’ শূন্য দিয়ে ভাগ করা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

ভাস্করাচার্য বলেন, শূন্য দিয়ে কোনো সংখ্যাকে ভাগ করা হলে তার ফল হয় অসংখ্যা। তাই প্রকৃত পক্ষে গণিতের ভাষায় শূন্য দিয়ে ভাগ কারাটা নিরর্থক।

তবে ব্রহ্মগুপ্তের শূণ্য সম্পর্কিত গবেষণা যে মানব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা!

এই লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Aditi Sarkar
রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের ফলিত গণিতের (MSc in Applied Mathematics) প্রাক্তন ছাত্রী অদিতি সরকারের গণিতের সাথে সম্পর্ক চিরকালীন। পড়াশোনার পাশাপাশি গান শুনতে ও ছবি আঁকতে ভালোবাসেন অদিতি।

Leave a Reply