himobaher-dharna
Madhyamik

হিমবাহের ধারণা, প্রকারভেদ ও কাজ

দশম শ্রেণি | বিষয়: ভূগোল । অধ্যায়:বহির্জাত প্রক্রিয়া ও সৃষ্ট ভূমিরূপ (পর্ব -4)


মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পুরু বরফের স্তর ভূমির ঢাল বরাবর নিচে নেমে এলে তাকে হিমবাহ বলা হয়। হিমবাহকে বরফের নদী ও বলা হয়।

পৃথিবীর বৃহত্তম সুপেয় জলের ভাণ্ডার হলো এই হিমবাহ। পৃথিবীর মোট সুপেয় জলের 0.3%শতাংশের ভাণ্ডার ভূপৃষ্ঠ থেকে পাওয়া যায়। পৃথিবীর সুপেয় জলের ভান্ডারের 70 শতাংশ হিমবাহের মধ্যে সঞ্চিত ও বাকী ৩০ শতাংশ হলো ভৌমজল। সুতরাং সুপেয় জলের ভাণ্ডার হিসেবে ভৌমজল এর গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়া পৃথিবীর অধিকাংশ নদী হিমবাহ দ্বারা পুষ্ট হয়ে থাকে।

পৃথিবীর মোট স্থলভাগের 10 শতাংশ বরফে আবৃত। এর মধ্যে 97 শতাংশ কুমেরু মহাদেশ ও গ্রীনল্যান্ড এ সঞ্চিত আছে। বাকি 3 শতাংশ পর্বত ও তার পাদদেশে সঞ্চিত আছে। এই 3 শতাংশ পৃথিবীর নদীর জল এবং বারি মন্ডল এর স্বাদু জল এর উৎস। 70 শতাংশ সুপেয় জলের উৎস কুমেরু মহাদেশের বরফের স্তরে সঞ্চিত। এই বরফ গলে গেলে সারা পৃথিবীর সমুদ্র তলের উচ্চতা প্রায় ৫৯ মিটার বেড়ে যাবে। গ্রীনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকায় সঞ্চিত বরফ প্রায় 3.35 কোটি ঘন কিমি জল এর সমান। ভবিষ্যতে এই বরফ গলানো গেলে সুপেয় জলের পরিমাণ বহুগুণে বাড়ানো যাবে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – গণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

হিমবাহের প্রকারভেদ

প্রখ্যাত হিমবাহ বিশারদ বিজ্ঞানী অ্যালমান-এর মতানুযায়ী হিমবাহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

মহাদেশীয় হিমবাহ

কোনো মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে হিমবাহ অবস্থান করলে তাকে মহাদেশীয় হিমবাহ বলা হয়। কুমেরু মহাদেশের ল্যাম্বার্ট হিমবাহ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশীয় হিমবাহের উদাহরণ।

সিয়াচেন হিমবাহ

পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ

পার্বত্য অঞ্চলে পর্বতের চূড়া অংশে জমাটবাঁধা তুষার যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে নিচের দিকে ভূমির ঢাল বরাবর নিচে নেমে আসে তাকেই পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ বলা হয়। ভারতের দীর্ঘতম পার্বত্য হিমবাহ হল কারাকোরাম পর্বতের সিয়াচেন হিমবাহ। পৃথিবীর বৃহত্তম পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহটি হলো আলাস্কার হাবার্ড হিমবাহ যা 2 কিমি চওড়া ও 100 মিটার পুরু।

আলাস্কার হবার্ড হিমবাহ

পাদদেশীয় হিমবাহ

উপত্যকা বা পার্বত্য হিমবাহ যখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পর্বতের পাদদেশে অবস্থান করে তখন তাকে পাদদেশীয় হিমবাহ বলা হয়। পাদদেশীয় হিমবাহের নিচের অংশটি আকারে অনেক চওড়া ও বিস্তৃত হয়। এই অংশকে লোব বলা হয়। আলাস্কায় অবস্থিত ম্যালাস্পিনা (65 কিমি চওড়া ও 45 কিমি লম্বা) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম পাদদেশীয় হিমবাহ। পৃথিবীর দ্রুততম হিমবাহ হল জ্যাকোবসাভো ইসব্রে যা প্রতিদিন প্রায় 40 মিটার পথ অতিক্রম করে।

subscribe-jump-magazine-india

হিমবাহের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিচে আলোচনা করা হলো।

হিমশৈল (Iceberg)

মহাদেশীয় হিমবাহ ভূমির ঢাল বরাবর এগিয়ে যেতে যেতে সমুদ্রের নিকট চলে এসে সমুদ্র তরঙ্গ দ্বারা হিমবাহের প্রান্ত ভাগ ভেঙে যায় ও সমুদ্রের জলে ভাসতে থাকে। ভাসমান এই বরফের বিশালাকার টুকরোকেই হিমশৈল বলা হয়। হিমশৈলের 1/9 অংশ জলের উপরে আর বাকি 8/9 অংশ জলের নিচে নিমজ্জিত থাকে যা জাহাজের চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। প্রসঙ্গত, 1912 সালে টাইটানিক জাহাজের ডুবে যাওয়ার পিছনে একটি হিমশৈল দায়ী ছিল।

শিল্পীর কল্পনায় হিমশৈলের ছবি।

ক্রেভাস (Crevasse)

হিমবাহ পর্বতের উত্তল ঢাল বরাবর প্রবাহিত হওয়ার সময় বরফ এর স্তরে চিড় ধরে অসংখ্য আড়াআড়ি এবং সমান্তরাল ফাটল তৈরি করে একেই ক্রেভাস বলা হয়। সাধারণ অসম ঢাল এর উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এই ক্রেভাস গুলো তৈরি হয়।

এগুলো কয়েক মিটার থেকে কয়েক হাজার কিমি অব্দি গভীর ও কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েকশো কিমি চওড়া হয়ে থাকে। 

ক্রেভাস পেরোচ্ছেন অভিযাত্রীদল

বার্গস্রুন্ড (Bergschrund)

হঠাৎ ঢালের পরিবর্তন অর্থাৎ উচুঁ পর্বত থেকে যখন হিমবাহ উপত্যকায় প্রবেশ করে তখন পর্বত গাত্র ও হিমবাহের মধ্যে যে সংকীর্ণ ফাঁক দেখা যায় যা হিমবাহের পৃষ্ঠদেশ থেকে তলদেশ অব্দি বিস্তৃত হয় তাকে বার্গস্রুন্ড বলা হয়। হিমালয় পর্বতে জেমু ও গঙ্গোত্রী হিমবাহে এরকম অনেক ক্রেভাস ও বার্গস্রুন্ড দেখা যায়। পাতলা তুষারের চাদর দিয়ে ঢাকা থাকার দরুন এই গুলো পর্বতারোহীদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। প্রতি বছরই ক্রেভাস ও বার্গস্রুন্ড এর মধ্যে পড়ে গিয়ে অনেক পর্বতারোহীর মৃত্যু ঘটে।

বার্গস্রুন্ড [সৌজন্যে – Wikipedia]

হিমানী সম্প্রপাত (Avalanche)

পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে বরফের বিশালাকৃতির চাঁই ভেঙে তীব্র গতি ও শব্দের সাথে নিচে নেমে আসে। একেই হিমানী সম্প্রপাত বলা হয়। হিমানী সম্প্রপাত এর সময় প্রবল ভূকম্পন অনুভূত হয় এবং  ঘর বাড়ি গাছপালা বরফের স্তুপে চাপা পড়ে যায়। এই ঘটনা অত্যন্ত বিপজ্জনক অনেক প্রাণসংশয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তোমরা হিমানী সম্প্রপাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে আরো ভালো জানার জন্য নীচের ভিডিওটি দেখে নিতে পারো।

হিমরেখা (Snowline)

পার্বত্য অঞ্চলে যে অঞ্চল বা রেখার উপর সারাবছর তুষার আবৃত করে রাখে এবং যে রেখার নিচে বরফ জলে পরিণত হয় তাকে হিম রেখা বা snowline বলা হয়। হিমরেখা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে স্থান পরিবর্তন করতে থাকে। যে উপাদান গুলি এই স্থান পরিবর্তনের জন্য দায়ী সেগুলো হলো উষ্ণতা, উচ্চতা, অক্ষাংশ, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, বায়ু প্রবাহ ইত্যাদি। হিমালয় এর দক্ষিণ অংশে এই হিমরেখা অনেক উপরে অবস্থান করে আবার হিমালয় এর উত্তরাংশে হিমরেখা অনেক নিচে অবস্থান করে। মেরু অঞ্চলে হিমরেখা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় অবস্থান করে।

হিমরেখা
হিমরেখা

হিমবাহের কাজ

নদীর মতোই হিমবাহেরও নিজস্ব কাজ বর্তমান। হিমবাহের কাজ কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

সেগুলি হলো ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপন বা সঞ্চয়। 

ক্ষয় কাজ:

হিমবাহের দ্বারা ক্ষয় কাজকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো উৎপাটন অপরটি অবঘর্ষ।

উৎপাটন প্রক্রিয়ায় হিমবাহের চাপের ফলে পর্বতের গা থেকে পাথর খুলে বেরিয়ে আসে। একে প্লাকিং ও বলা হয়। 

অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় উৎপাটন প্রক্রিয়ার ফলে হিমবাহতে যেসব পাথরের টুকরো সঞ্চিত হয়ে থাকে, এগুলো দ্বারা পাহাড়ের গায়ে বা হিমবাহ উপত্যকার তলদেশ ক্রমাগত ঘর্ষণের ফলে ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে যেতে মসৃণ হয়ে ওঠে।

বহন কাজ:

উৎপাটন ও অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ক্ষয় প্রাপ্ত পর্বত গাত্র থেকে সংগৃহীত পাথর চূর্ণ গুলি হিমবাহ দ্বারা পরিবাহিত হয় এবং ভূমির ঢাল বরাবর নিচের দিকে নামতে থাকে। একেই হিমবাহের বহন কার্য বলা হয়।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

অবক্ষেপণ:

ক্ষয় ও বহন কার্যের ফলে বাহিত পদার্থ যেমন চূর্ণ বিচূর্ণ পাথর ভূমির ঢাল অনুসারে হিমবাহের সাথে নিচের দিকে নেমে আসে। কিন্তু হিমবাহ যখন হিমরেখার নিচে নেমে যায় তখন হিমবাহের সাথে বাহিত পদার্থ গুলি সেই স্থানে সঞ্চিত হয়ে যায়। অনেক সময় হিমবাহের বিশালাকার বরফের স্তূপের অতিরিক্ত চাপের ফলে হিমবাহের তলদেশ এর বরফ গলে যায়। ফলে সেই অংশে বাহিত পাথর চূর্ণ ও অন্যান্য পদার্থের সঞ্চয় হয়। একেই অবক্ষেপন বলা হয়। 

হিমবাহের এই কাজের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় ।

পঞ্চম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্বে আমরা হিমবাহের কাজের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ নিয়ে আলোচনা করবো।

লেখিকা পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তনী শ্রেয়সী বিশ্বাস। পড়াশোনা এবং লেখালিখির পাশাপাশি, ছবি আঁকা এবং বাগান পরিচর্যাতেও শ্রেয়সী সমান উৎসাহী।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

Leave a Reply