gomon-class-10
Madhyamik

প্রাণীর গমন

জীবন বিজ্ঞানদশম শ্রেণি – প্রাণীদের সাড়াপ্রদানের একটি প্রকার হিসেবে গমন


গমনের সংজ্ঞা (Locomotion)

যে প্রক্রিয়ায় জীবেরা বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে বা অন্য কোনো কারণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করে, তাকে গমন বলে। যেমন- অ্যামিবার গমন, মানুষের দ্বিপদ গমন, প্যারামেসিয়ামের গমন ইত্যাদি।

গমনের চালিকাশক্তি

খাদ্যের প্রয়োজনে

উদ্ভিদরা নিজেদের খাদ্য নিজেরা প্রস্তুত করতে সক্ষম হলেও, প্রাণীরা পরভোজী হওয়ায় খাদ্যের জন্য তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই খাদ্যের সন্ধানে প্রাণীদের (শাকাশী বা মাংসাশী) একস্থান থেকে অন্যস্থানে গমন করতে হয়। তাই খাদ্য গমনের চালিকাশক্তি।

বাসস্থান

প্রাণীরা তাদের জীবন ধারণের সুবিধার জন্য উপযুক্ত পরিবেশে নিজেদের বাসস্থান গড়ে তুলতে চায়। তাই বাসস্থান খোঁজা এবং নির্মাণের জন্য তাদের গমনের প্রয়োজন হয়। তাই বাসস্থান গমনের চালিকাশক্তি।

অনুকূল পরিবেশের সন্ধান

সমস্ত প্রাণীরা বসবাসের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে থাকে। তাই পরিবেশের প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং অনুকূল পরিবেশের সন্ধানে জীবকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করতে হয়। তাই অনুকূল পরিবেশও গমনের চালিকাশক্তি।

আত্মরক্ষা

শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে প্রাণীদের একস্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হয়। তাই আত্মরক্ষা হল গমনের চালিকাশক্তি।

প্রজনন ও বংশবিস্তার‌

প্রজননের প্রয়োজনে সমস্ত প্রাণীরা একস্থান থেকে অন্যস্থানে গমন করে উপযুক্ত প্রজনন স্থান এবং সঙ্গী নির্বাচন করে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

বিভিন্ন প্রাণীর গমন পদ্ধতি

গমনের সময় প্রত্যেকটি প্রাণীই নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ ব্যবহার করে। এই সমস্ত অঙ্গগুলি গমনে সাহায্য করে বলে তাদের গমনাঙ্গ বলে। যেমন- মানুষের ক্ষেত্রে হাত ও পা, তিমির প্যাডেল, হাঁসের লিপ্তপদ, মাছের পাখনা, শামুকের মাংসল পদ, অ্যামিবার সিউডোপদ, ইউগ্লিনার ফ্ল্যাজেলাম ইত্যাদি।

এবার আমরা একে একে কয়েকটি প্রাণীর গমন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো।

অ্যামিবার গমন পদ্ধতি

অ্যামিবা একটি এককোশী প্রাণী যার গমন অঙ্গ হল ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়া। অ্যামিবা ক্ষণপদের সাহায্যে ধীরগতিতে স্থান পরিবর্তন করে। ক্ষণপদ দ্বারা অ্যামিবা গমন করতে পারে।

প্রথমে তারা ক্ষণপদটিকে সামনের দিকে বিস্তৃত করে কোনো কঠিন বস্তুকে আঁকড়ে ধরে। তারপরে তাদের দেহমধ্যস্থ সাইটোপ্লাজমকে ধীরে ধীরে ক্ষণপদের মধ্যে প্রবাহিত করে, এর ফলে অ্যামিবার দেহের পশ্চাৎ অংশ আস্তে আস্তে গুটিয়ে আসে এবং তারা সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে যায়। অ্যামিবার এই গমন পদ্ধতি অ্যামিবয়েড গমন নামে পরিচিত।

প্যারামেসিয়ামের গমন পদ্ধতি

প্যারামেসিয়াম একটি এককোশী প্রাণী, যার গমন অঙ্গ হল সিলিয়া। প্যারামেসিয়ামের দেহের বাইরের দিক সরু চুলের মত গঠন দ্বারা আবৃত থাকে, একে সিলিয়া বলে। প্যারামেসিয়াম এইভাবে সিলিয়াগুলিকে ব্যবহার করে সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে চলাচল করতে পারে। সিলিয়া সঞ্চালনের মাধ্যমে গমনের এই প্রক্রিয়াকে সিলিয়ারি গমন বা গতি বলে।

মাছের গমন

মাছ একটি মেরুদন্ডী প্রাণী এবং এরা জলে বসবাস করায় সন্তরণ পদ্ধতির সাহায্যে গমন করে। মাছের প্রধান গমন অঙ্গ হল পাখনা। এছাড়া মায়োটোম পেশিও মাছের গমনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

মাছের গমনে পাখনার ভূমিকা

মাছের দেহে সাতটি পাখনা দেখা যায়, বক্ষ পাখনা, শ্রোণি পাখনা, পৃষ্ঠ পাখনা, পায়ু পাখনা এবং পুচ্ছ পাখনা। পাখনাগুলি রশ্মি বিশিষ্ট হয় তার ফলে জলের চাপে এগুলো কখনোই ছিঁড়ে যায় না এবং প্রত্যেকটি পাখনার গোড়ায় মজবুত পেশির অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। পাখনা সংলগ্ন পেশীর সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে মাছ জলে সাঁতার কাটতে পারে।

মাছের পাখনা

মাছের গমনে মায়োটোম পেশির ভূমিকা

মাছের মেরুদণ্ডটি নমনীয় হয়। এই মেরুদন্ডের দুই পাশে লেজের একদম শেষ প্রান্ত অবধি অসংখ্য ‘V’ আকৃতির পেশির অবস্থান লক্ষ্য করা যায়, একে মায়োটোম পেশি বলে। এই পেশিগুলির সংকোচনের ফলে একপ্রকার তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, যা মাছের দেহের সামনের দিক থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত প্রবাহিত হয়।

পাখির গমন

পাখি একটি মেরুদন্ডী প্রাণী এবং বেশির ভাগ পাখিই উড়তে সক্ষম। কিন্তু কিছু কিছু বড় আকারের পাখি আছে যারা উড়তে পারে না, কেবলমাত্র হেঁটে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমন করে। পাখিদের উড্ডয়নকে প্রকৃত উড্ডয়ন বা True flight বলে এবং পাখিদের মুখ্য খেচর প্রাণী বলা হয়। পাখিদের গমনে ডানা, পালক এবং উড্ডয়ন পেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পাখির গমন পদ্ধতি

ডানা (Wing)

পাখিদের ডানা দুটি হল তাদের অগ্রপদ অর্থাৎ সামনের পা। ওড়ার সুবিধের জন্যই সেটি ডানায় রূপান্তরিত হয়েছে। পাখিদের ডানার উপরের অংশটি উত্তল এবং নীচের অংশটি সমতল হয়। ডানার সামনের অংশ চওড়া এবং পেছনের অংশটা ক্রমশ সরু হওয়ায় পাখিরা ওড়ার সময় ডানার সাহায্যে বাতাসের উপর চাপ প্রয়োগ করে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। পাখিরা ডানা দুটিকে পর্যায়ক্রমে ওঠানামার মাধ্যমে উড়তে সক্ষম হয়।

পালক (Feather)

পাখির সারাদেহ পালক দিয়ে ঢাকা থাকে। পালক দু’ধরনের হতে পারে, রেমিজেস ও রেকট্রিসেস।

উড্ডয়ন পেশি (Flight muscle)

পাখিদের বক্ষে উপস্থিত স্টারনাম সংলগ্ন অঞ্চলে এক ধরনের পেশি লক্ষ্য করা যায়, যেগুলি পাখিদের উড়তে সাহায্য করে এই পেশিগুলিকে উড্ডয়ন পেশি বলে। পেশিগুলি হল পেক্টোরালিস মেজর, পেক্টোরালিস মাইনর এবং কোরাকো ব্রাকিয়ালিস।


দশম শ্রেণির অন্যান্য বিভাগগুলি পড়ুন –ভৌতবিজ্ঞান | গণিত | জীবনবিজ্ঞান

মানুষের গমন

মানুষ দু পায়ের উপর ভর করে গমন অর্থাৎ হাঁটাচলা করে, তাদের এই গমন পদ্ধতিকে দ্বিপদ গমন বলে। মানুষের প্রধান গমন অঙ্গ হল হাত এবং পা। হাত এবং পায়ের সাহায্যে মানুষ হাঁটাচলা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা, গাছে চড়া ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের কাজ করতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে হাত এবং পা দুটি মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও অস্থি ও অস্থি সংলগ্ন পেশিও গমনে সাহায্য করে।

গমনের সময় দেহের ভারসাম্য রক্ষা

মানুষের দ্বিপদ গমনের সময় হাত দুটিও পর্যায়ক্রমে সামনে ও পিছনের দিকে সঞ্চালিত হতে থাকে। সাধারণভাবে বাঁ পা অগ্রসর হলে ডান হাত এবং ডান পা অগ্রসর হলে বাঁ হাত সামনের দিকে এগিয়ে আসে। এরফলে দেহের ভারসাম্য বজায় থাকে। এছাড়াও মানুষের দ্বিপদ গমনের সময় লঘুমস্তিষ্ক এবং অন্তঃকর্ণের অর্ধচন্দ্রাকার নালীও দেহের ভারসাম্য বজায় রাখে।

মানুষের দ্বিপদ গমনের সময় পা দুটি সঞ্চালনের জন্য কয়েকটি কঙ্কাল পেশি (Skeletal muscle), অস্থি (Bones) এবং অস্থিসন্ধি (Joints) সাহায্য করে।

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

X-Lsc-1e