barir-kache-arshi-nogor
Class-11

বাড়ির কাছে আরশি নগর – সরলার্থ

বাংলাএকাদশ শ্রেনি – বাড়ির কাছে আরশিনগর (দ্বিতীয় পর্ব)


আগের পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম লালন ফকির এবং বাড়ির কাছে আরশিনগর কবিতার মূলবক্তব্য নিয়ে। এই পর্বে আমরা সরলার্থ নিয়ে আলোচনা করবো।

বাড়ির কাছে আরশিনগর-সারসংক্ষেপ

লালনের প্রায় সকল গানেই তিনি নিজেকে সংযুক্ত করেন, নিজের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি, নিজের সাধনার দর্শনের বর্ণনার মধ্য দিয়ে তিনি আবিষ্কার করতে চান মানবজীবন ও অখণ্ড বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে। এ যেন অনেকটা বৈষ্ণব পদাবলির পদকর্তাদের ভণিতার মতো। পদের মধ্যে বা গানের মধ্যে পদকর্তার নিজের পরিচয় কৌশলে বলে দেওয়াই হল ভণিতা। লালনের সব গানেই তা লক্ষ করা যায়। লালন আলোচ্য গানে বলছেন, তাঁর বাড়ির কাছে রয়েছে আরশিনগর।

‘আরশি’ কথার অর্থ হল আয়না। আসলে এ হল মানব মন যেখানে বস্তুজগতের সব দৃশ্য, সব অনুভূতি, সব ঘটনা চিত্রপটের মতো প্রতিফলিত হয়। সেই আরশিনগরে এক ‘পড়শি’ বাস করে। এই পড়শির হাত-পা-মাথা-কাঁধ কিছুই নেই; এমনকি পড়শির চারদিকে অগাধ সমুদ্রের বাধা। ফলে সহজে তার কাছে পৌঁছানো যাবে না। এমনকি সেই সমুদ্রে কোনো নৌকা বা তরণীও নেই যা লালনকে ঐ পারে নিয়ে যেতে পারে। এই পড়শিকে না পাবার বেদনা লালনের কাছে ‘যম-যাতনা’ মনে হয়। পড়শি যদি একবার লালনকে স্পর্শ করেন, তবেই সেই যম-যাতনা দূর হতে পারে। কিন্তু তা হয় না কখনোই। লালন আর সেই পড়শি একস্থানে থাকলেও তাদের মধ্যে থাকে ‘লক্ষ যোজন ফাঁক’। এই ব্যবধান ঘোচার নয়।


একাদশ শ্রেণি থেকে→ Physics | Chemistry Biology | Computer

বাউল সাধনার প্রেক্ষিতে বাড়ির কাছে আরশিনগরের আলোচনা

এ তো গেল আক্ষরিক অর্থ, কিন্তু এর গভীরে যাওয়া দরকার। আসলে লালনের সব গানেই দুই রকম অর্থ প্রতীয়মান হয় – বাহ্য অর্থ (বাচ্যার্থ) আর গূঢ় অর্থ (ব্যঞ্জনার্থ)। প্রতিটি গানেই বাহ্যত কিছু অসংলগ্ন ঘটনা বা কথার আড়ালে লালন বাউল সাধনার গভীর গোপন তত্ত্ব উন্মোচন করেন। রূপকের আশ্রয়ে খুব সহজ ভাষায় গভীর জীবনবোধের প্রকাশ হয় এই গানে। লালন নিজে ছিলেন বাউল সাধক – মুখে মুখে তার আখড়ায় তিনি যে গানগুলি রচনা করতেন সেগুলি তাঁর শিষ্যরা লিখে রাখতেন।

‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে প্রথম বাঙালি পাঠকের সঙ্গে লালনের গানের পরিচয় ঘটান। পরে রবীন্দ্রনাথও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের গান প্রকাশ করেছিলেন। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত সম্পদ এই লালনের গান। মধ্যযুগের বাংলায় ধর্মীয় সাধনার ক্ষেত্রে লোকায়ত ধর্ম হিসেবে ‘বাউল’ সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। সংস্কৃত ‘বাতুল’ কিংবা হিন্দির ‘বাউরা’ থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি।

মনে করা হয় বৈষ্ণব সহজিয়া এবং সুফি সাধকদের সমন্বয়ের ফলেই বাউলদের উৎপত্তি। সহজিয়া দেহতত্ত্বে বিশ্বাসী যে মানুষ সহজ-সাধনার মধ্য দিয়ে মানুষরূপী ঈশ্বরকে অন্তরে অনুভব করার জন্য ব্যাকুল, তিনিই প্রকৃত বাউল।

বাউলদের সাধনার লক্ষ্য হল মনের মানুষের সন্ধান। এই ‘মনের মানুষ’ অনন্ত পরম আবার একইসঙ্গে প্রেমের আধার। বাউলদের ঈশ্বর এই ‘মনের মানুষ’ যিনি আছেন দেহসীমার মধ্যেই। ফলে বাউলদের সাধনা সীমার মধ্যেই অসীমের সন্ধান। প্রেম ব্যাকুলতায় বাউলেরা উন্মত্ত। এই মনের মানুষের সন্ধানই বাউলদের সাধনার লক্ষ হওয়ায় তাদের কাছে মনের ভিতরেই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান – নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে চান তারা। কিন্তু এই আত্মতত্ত্বের নাগাল পাওয়া বড় দুষ্কর। লালন তাঁর গানে লেখেন –

‘এই মানুষের আছে রে মন
যারে বলে মানব রতন।’

এই মানবরতন, মনের মানুষ কিংবা অলখ সাঁই সবই নিরাকার পরমের কথা বলে। প্রত্যেক মানুষের শুদ্ধ মনের মধ্যেই এই নিরাকার পরম বাস করেন যাকে বহু সন্ধানেও পাওয়া যায় না। বাউলদেওর যে ধর্মসাধনা তা একেবারে দেহকেন্দ্রিক। বাউলেরা বলেন, ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাই আছে দেহভাণ্ডে’। দেহের – এই নশ্বর দেহের মধ্যেই বাউল সাধকেরা ‘সহজ মানুষ’-এর অস্তিত্বকে অনুভব করতে চান। লালনের গানে এই মানবদেহই কখনো হয়েছে ‘ঘর’, কখনো বা ‘খাঁচা’।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

বলা যায় লালনদের বিশ্বাস বা ধারণা আসলে ‘পিণ্ড-ব্রহ্মাণ্ড তত্ত্ব’ বা micro-cosm theory-র উপর অধিষ্ঠিত। সহজিয়াপন্থী বাউলদের মতে দেহমন্দিরেই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান। অর্থাৎ জীবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার অবস্থান এমন কল্পনায় জীবাত্মা আর পরমাত্মার যে অদ্বৈত সম্পর্ক স্থাপিত হয় তাতেই বাউল সাধনার সিদ্ধিলাভ ঘটে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ‘জীবনদেবতা’ – বাউলগানে ‘মনের মানুষ’ আর সুফি সাধনার ‘আশিক-মাশুকা’ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’

ফলে আরাধ্য ঈশ্বর কখনো পূজিত হন দৈবীভাবে, কখনো প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রেয়সীরূপের আধারে কখনো বা বাৎসল্যের মোড়কে। সব পথেই তাঁকে পাওয়া যায়। তবে বাউল সাধকরা জীবাত্মাকে ‘পুরুষ’ আর পরমাত্মাকে ‘প্রকৃতি’ বা নারীরূপে কল্পনা করে পুরুষ-প্রকৃতির মিলনের মধ্য দিয়েই মনের মানুষকে খুঁজে পান। কবীরের দোঁহায় পাই –

‘তন্ত্ না জানু মন্ত্ না জানু, জানু সুন্দর কায়া’

অর্থাৎ আমি তন্ত্র-মন্ত্র কিছুই জানি না, শুধু জানি এই সুন্দর দেহকে। এই দেহই মন্দির, এই দেহই মসজিদ – এই কায়াসাধনাই বাউলদের ধর্ম। মনের মানুষকে বাইরে খুঁজলে পাওয়া যাবে না, দেহের মধ্যেই তাঁর অবস্থান। দেহকে আশ্রয় করে বাউলদের এই দেহাতীতের সাধনাকে বলা হয় ‘উজান বাওয়া’। অনেক সমালোচক-গবেষক একে ‘উল্টা সাধনা’ বলেছেন। এই সাধনা সম্ভব কেবলমাত্র সাধকের আত্মতত্ত্ব জ্ঞান হলে। নিজেকে জানার জ্ঞানই হল আত্মতত্ত্ব। আত্মতত্ত্ব জানলে পরমতত্ত্বের সঙ্গে কোনো ভেদ থাকে না।


একাদশ শ্রেণি থেকে → ভুগোল | অর্থনীতি

তবে অন্যান্য ধর্মসাধনায় যেমন মানবদেহের সহজ বৃত্তিগুলি রোধ করে পরমের জ্ঞানলাভের কথা আছে, বাউলরা সেই বৃত্তি নিরোধের কথা বলেন না। কায়াসাধনার পথে জাগতিক কামনা-বাসনা, ইন্দ্রিয়াসক্তিকে দূরে রেখেই বাউলরা মনের মানুষের সন্ধান করেন। ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ গানে লালন বলছেন –

‘গ্রাম বেড়িয়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা, নাই তরণী পারে –
আমি বাঞ্ছা করি দেখব তারি
কেমনে সে গাঁয়ে যাই রে – ’

এই ‘অগাধ পানি’ আসলে ষড়রিপুর জাগতিক বেষ্টনী – ইন্দ্রিয়াসক্তি, কামনা-বাসনার নাগপাশ যা আমাদের জীবনকে বেঁধে রাখে। সাধনার মধ্য দিয়ে এই অগাধ সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছতে হবে ওপারে। সেই গাঁয়ের নামই আরশিনগর – আরশিনগরে পড়শি স্বয়ং নিরাকার আরাধ্য ঈশ্বর, বাউলের ‘মনের মানুষ’। বাড়ির পাশেই অবস্থান হলেও সেই আরশিনগরে পৌঁছনো সহজ হয় না। ইন্দ্রিয়াসক্তিরূপ সমুদ্রের পরিখায় সেই গ্রাম সুরক্ষিত-দূর্গম। সমুদ্রে কোনো নৌকাও নেই অর্থাৎ কোনো সহজ পথ বা উপায় নেই পারে যাওয়ার জন্য। সাধনার পথ অতি দুঃসাধ্য। ‘আরশি’ কথার অর্থ আয়না। আয়নায় নিজের মুখই প্রতিবিম্বিত হয়।

এই ‘আরশিনগর’ তাই রূপকের আড়ালে আত্মতত্ত্বের কথাই বলে। বাউল সাধকেরা কখনোই পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী নন। তাই ব্রাহ্মদের মতো তাঁদেরও ঈশ্বর নিরাকার ব্রহ্মসমান। বাউলরা মন্দির-মসজিদে যায় না, বর্ণবৈষম্য, জাতিভেদ প্রথায় তাঁদের বিশ্বাস নেই। আবার জন্মগতভাবে কেউ বাউল হয় না, গুরুর নিকট দীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। লালনের গানে সেই নিরাকার ঈশ্বর কখনো ‘পড়শি’, কখনো ‘মনের মানুষ’, আবার কখনো বা ‘মানুষ রতন’। ‘পড়শি’-র হাত-পা-মাথা-কাঁধ কিছুই নেই, সে অদৃশ্য। অথচ সেই পড়শি এত কাছে থেকেও বহু যোজন দূরে। লালন গানে লিখছেন –

‘সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।’

জীবাত্মা আর পরমাত্মার মিলন তখনই সম্ভব হবে যখন সাধকের মোহমুক্তি ঘটবে। ‘লক্ষ যোজন ফাঁক’ আসলে সাধারণ ভোগী মানুষের বিষয়বাসনার কারণে সৃষ্ট। জীবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার অবস্থান আর আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমেই পরমাত্মাকে পাওয়া যায়। ‘অচিন পাখি’, ‘অলখ সাঁই’কে জানতে হলে আত্মার সন্ধান চাই আর আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনো সম্ভব। কিন্তু লালন বলছেন –

‘পড়শি যদি আমার ছুঁত
আমার যম-যাতনা যেত দূরে।’

ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পেলে, চর্যাপদের সেই সাধকদের মতো সহজপদ্মে মহাসুখ লাভ করলে জীবনের, বলা ভালো, বস্তুজগতের সর্বপ্রকার পার্থিব দুঃখ-শোক-বিরহ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেন লালন। বুদ্ধ যে চারটি আর্যসত্যের কথা বলেছিলেন সেখানে দুঃখ-শোক যে থাকবে এবং তার যে নিবৃত্তি সম্ভব তা বলা ছিল।



কিন্তু কোন পথে সেই দুঃখ-শোক থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?

সেই পথই বাউলদের কাছে আত্মানুসন্ধান, মহাযানী বৌদ্ধদের কাছে ‘সহজ-সাধনা’ কিংবা সুফি সাধকদের কাছে প্রেমতত্ত্বের মাধ্যমে চিত্তশুদ্ধি। লালনের গানে ‘যম-যাতনা’ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। নিরন্তর সাধনায় মগ্ন থাকতে হয় আর এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই আসলে বাউলদের ঈশ্বর-সাধনায় চালিত করে। ফলে বাড়ির পাশে আরশিনগরে ‘পড়শি’র খোঁজ চলতে থাকে নিরন্তর। লালনের অন্য গানে রয়েছে –

‘কেবল মনে নিষ্ঠা হলে মিলবে তারি ঠিকানা’

নিষ্ঠা থাকলে মানুষের পক্ষে পরমাত্মা দর্শন সম্ভব। বাউলদের সাধনায় এই আত্মতত্ত্বের সন্ধান গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ভাবধারার সঙ্গে মিলে যায়। প্লেটো বলেছিলেন, ‘Know thyself’, আবার ভারতীয় উপনিষদে আছে, ‘আত্মানং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো। এভাবেই আত্ম-অনুসন্ধানের পথে পরমাত্মার হদিশ মিলবে আর সাধারণ ভোগী মানুষ সমস্ত বিষয়বাসনা-ইন্দ্রিয়াসক্তি ত্যাগ করতে পারলে জানতে পারবে পরমকে আপন দেহের আধারে। লালনের ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ গানটি এভাবেই বাউলসাধনার এক গূহ্যতত্ত্বের প্রকাশ ঘটায়।

সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।