vumikompo
Class-11

ভূমিকম্প

ভূমিকম্প কাকে বলে?

সহজ ভাষায় ভূত্বকে হঠাৎ কম্পন হওয়াকে বলা হয় ভূমিকম্প বা ভূকম্প।
অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে ভূ অভ্যন্তরে শিলায় ফাটল সৃষ্টি হওয়ার দরুণ শক্তি মুক্তি ঘটে এবং শক্তি তরঙ্গের আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ও ভূত্বকের বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে কেঁপে ওঠে।ভূ ত্বকের এই আকস্মিক বা কেঁপে ওঠাকেই ভূকম্প বা ভূমিকম্প বলা হয়।

ভূমিকম্প সাধারণত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক এই দুই কারণেই ঘটে থাকে।

ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়।এবং কখনো ভূমিকম্পের তীব্রতা এত কম থাকে যে তা অনুভূত হয় না। আবার কখনো ভূমিকম্পের তীব্রতা বেশী হওয়ায় তা বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে।

এই ভূমিকম্পের বা ভূকম্প তরঙ্গের সৃষ্টি হয় ভূত্বকের গভীরে, যাকে কেন্দ্র বলা হয় এবংভূকম্প তরঙ্গ ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য

চিত্রে ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রের পার্থক্য

ভূমিকম্পের কারণ

ভূমিকম্প প্রধান দুটি কারণে সংঘটিত হয়- (ক) প্রাকৃতিক কারণ ও (খ) কৃত্রিম কারণ।

ক) প্রাকৃতিক কারণ

প্রাকৃতিক শক্তির কারণে এই ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই কারণ গুলি নিম্মলিখিত-

1) পাতের চলন

হালকা ও ভারী পাতের চলনের ফলে বা একটি পাতের সাথে অন্য পাতের সংঘর্ষের ফলে পাতের সীমানা বরাবর অঞ্চল জুড়ে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।


একাদশ শ্রেণি থেকে → Physics | Chemistry | Biology | Computer

(a) প্রতিসারী সীমানা বরাবর ভূমিকম্পের কারণ

দুটি পাত যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায় তখন ম্যাগমা পাতের মাঝখান দিয়ে উপরে উঠে আসে এবং শিলায় চাপ পড়ে ফাটল সৃষ্টি হয়।যার ফলে চ্যুতি হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। এই ধরনের ভূমিকম্প লক্ষ্য করা যায় মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা বরাবর।

(b) অভিসারী সীমানা বরাবর ভূমিকম্পের কারন

দুটি পাত যখন পরস্পরের সম্মুখে এগিয়ে আসে তখন তারা মুখোমুখী সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং হালকা পাতটির নীচে ভারী পাতটি প্রবেশ করে যার ফলে প্রবেশিত পাতটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, এজন্য ভূমিকম্প অনুভূত হয়।হালকা বার্মা পাতের নীচে ভারী ভারতীয় পাত প্রবেশ করায় তীব্র ভূমিকম্প হয়েছিল।

(c) নিরপেক্ষ সীমানা বরাবর ভূমিকম্পের কারণ

নিরপেক্ষ পাত সীমানায় দুটি পাত পরস্পরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় পাতগুলির কিনারায় চ্যুতি ও ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।এ ধরনের ভূমিকম্প দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে।

2) তাপ বিকিরণ

আদিকাল থেকেই পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে শীতল ও সংকুচিত হয়ে চলেছে। ভূ অভ্যন্তরে এখন ও তাপ বিকিরণ প্রক্রিয়া চলছে যার ফলে ভূগর্ভের শিলাস্তরের আয়তনে অসমতা লক্ষ্য করা যায় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

3) ধস ও হিমানী সম্প্রপাত

অধিক বৃষ্টি পাতের ফলে বিশাল আকারের ভূমিধস ঘটলে, এবং পার্বত্য এলাকায় প্রায়ই বড়ো বড়ো শিলার পতন ঘটলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে থাকে।

4) উল্কাপাত

বড়ো আকারের উল্কাপাত ভূপৃষ্টে হঠাৎ আছড়ে পড়লে ভূকম্প অনুভূত হয়।

5) নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলের উত্থান

নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে ভাঁজ গঠনের সময় ভূমিকম্পে সৃষ্টি হয়ে থাকে।

6)লাভা নিষ্ক্রমণ

আগ্নেয়গিরির ছিদ্রপথ দিয়ে লাভা নিষ্ক্রমণের সময় ভূত্বকে চাপ পড়ে এবং ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

খ)কৃত্রিম কারণ

প্রাকৃতিক কারণ ছাড়া মানুষের কার্যাবলীর জন্যও ভূমিকম্প ঘটে থাকে, তা কৃত্রিম কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়:-

1) ডিনামাইট বিস্ফোরণ

পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট তৈরি করার জন্য বা খনিজ দ্রব্য উত্তোলন করার জন্য ডিনামাইট ফাটানো হয়ে থাকে যার ফলে সেই অঞ্চল বরাবর ভূমিকম্প ঘটে থাকে।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

2) জলাধার নির্মান

নদী বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মানের সময় জমা জল রাশির প্রবল চাপে শিলাস্তরের ভারসাম্য নষ্ট হয় যার ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ- মহারাষ্ট্রের কয়না বাধেঁ জমা জলরাশির জন্য চাপে ভৃমিকম্প ঘটেছিল।

3)পারমাণবিক বিস্ফোরণ

পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ভূগর্ভে বোমা ফাটানো হয়ে থাকে যার ফলে ঐ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল তখন কেঁপে ওঠে এবং ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। উদাহরণ 1999 সালে রাজস্থানের পোখরানে পরমাণু বিস্ফোরণের ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছিল।

ভূকম্পীয় তরঙ্গকে দু ভাগে ভাগ করা যায়।

১) দেহ তরঙ্গ

ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে যেসব তরঙ্গ চারিদিকে ছড়িয়ে পরে সেইসব তরঙ্গকে দেহ তরঙ্গ বলে। এই তরঙ্গকে আবার দুভাগে ভাগ করা যায়। ক) প্রাথমিক তরঙ্গ বা P -তরঙ্গ খ) মাধ্যমিক তরঙ্গ বা S- তরঙ্গ।

২)পৃষ্ঠ তরঙ্গ

যেসব তরঙ্গ ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে অগ্রসর হয়, সেইসব তরঙ্গকে পৃষ্ঠ তরঙ্গ বা l-তরঙ্গ বলে। এই তরঙ্গের ধংসাত্মক ক্ষমতা খুব বেশী।

P ও S তরঙ্গের পার্থক্য


চিত্রে P ও S তরঙ্গের পার্থক্য

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ হওয়ার কারণ

ভারতের পশ্চিমে কাশ্মীরের নাঙ্গা পর্বত থেকে শুরু করে পূর্বে অরুণাচল প্রদেশের নামচাবারওয়া শৃঙ্গ পর্যন্ত এই ২৫০০ কিমি দীর্ঘ হিমালয় অঞ্চলে প্রায়শই ভূমিকম্প হয়ে থাকে। উত্তর ভারতের কাশ্মীর, উত্তরাখন্ড,হিমাচল প্রদেশ, আসাম,অরুনাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা সহ সমগ্র উত্তর- পূর্ব ভারত তথা হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এই সমস্ত অঞ্চলই অত্যধিক ভূমিকম্প প্রবণ।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

এই সমগ্র অঞ্চলটি ভূমিকম্প প্রবণ হওয়ার কারণগুলি হল

১) বর্তমান সময় পর্যন্ত গঠন কাজ চালু থাকায় দুটি মহাদেশীয় পাতের ধাক্কা লেগে ভূমিকম্প হয়।
২) ভারতীয় পাত তিব্বতীয় পাতের নীচে প্রবেশ করায় শিলায় পীড়ন জমতে থাকে, এই পীড়ন সহ্যসীমা অতিক্রম করলে শিলায় ফাটল ধরে এবং এই অংশে চ্যুতির সৃষ্টি হয় ও ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
৩) সমস্থিতিক ভারসাম্য অবস্থায় আসার জন্য ও হিমানী সম্প্রপাতের জন্য হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী মোনালিসা মাইতি। পড়াশোনার পাশাপাশি বই পড়তে এবং গান গাইতে ভালোবাসেন মোনালিসা ।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

XI_geo_6a