computer-er-srenibivag
Class-11

কম্পিউটারের শ্রেণিবিভাগ

কম্পিউটারএকাদশ শ্রেনি – কম্পিউটার সিস্টেম (দ্বিতীয় পর্ব)


প্রথম কম্পিউটার আবিষ্কার থেকে শুরু করে নানা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কম্পিউটার আজকের অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। সূচনা থেকে আজকের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রকম কম্পিউটার। আগের পর্বে আমরা বিভিন্ন প্রজন্মের কম্পিউটার নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা কম্পিউটারের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করবো।

ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং কার্যনীতির উপর নির্ভর করে কম্পিউটারের শ্রেণিবিভাগ

কার্যনীতির উপর ভিত্তি করে কম্পিউটারকে ডিজিটাল, অ্যানালগ ও হাইব্রিড এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

অ্যানালগ কম্পিউটার (Analog Computer)

ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ডেটা পরিমাপ করার জন্য যে ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করা হয় তাকে অ্যানালগ কম্পিউটার বলা হয়।

এই ধরনের কম্পিউটার দিয়ে তথ্যের সঠিক বা সূক্ষ্ম ফলাফল পাওয়া যায় না।

অ্যানালগ কম্পিউটারের ব্যবহার

1. এই কম্পিউটার দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিমাপের কাজ ভালোভাবে করা যায়।
2. তাপমাত্রা, চাপ, ভোল্টেজ প্রভৃতি পরিমাপের কাজে এই কম্পিউটার ব্যবহার হয়।

অ্যানালগ কম্পিউটারের উদাহরণ

স্লাইড রুল, স্টেপড্‌ রেকনার প্রভৃতি।

আজকের বাস্তব জীবনে ব্যবহৃত অ্যানালগ কম্পিউটারের উদাহরণ হল- থার্মোমিটার, স্পীডোমিটার, সিসমোমিটার, ভোল্টমিটার প্রভৃতি।

অ্যানালগ কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) কোন পরিবর্তনশীল পদার্থের পরিমাপ করতে এই কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।
b) এই কম্পিউটার জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।
c) এই কম্পিউটার দিয়ে বিভিন্ন প্রকার পরিমাপের কাজ করা সম্ভব।
d) আউটপুট কোন গ্রাফ বা ভোল্টেজ সিগনালের মাধ্যমে প্রকাশ হয়।

ডিজিটাল কম্পিউটার (Digital Computer)

ডিজিটাল সিগনাল অর্থাৎ নির্দেশ দ্বারা পরিচালিত হয় এখন কম্পিউটারকে ডিজিটাল কম্পিউটার বলে।

ডিজিটাল কম্পিউটার শুধুমাত্র দুটি সংখ্যা বুঝতে পারে।সংখ্যা দুটি হল 1 অর্থাৎ ON এবং 0 অর্থাৎ OFF। এই কম্পিউটার ব্যবহার করে সূক্ষ্ম এবং সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

ডেস্কটপ, ল্যাপটপ প্রভৃতি বর্তমান যুগে ব্যবহৃত সকল কম্পিউটারই ডিজিটাল কম্পিউটার।

ডিজিটাল কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) এই কম্পিউটার শুধুমাত্র 0 এবং 1 এই দুটি বাইনারী সংখ্যা বুঝতে পারে।
b) এই কম্পিউটার ব্যবহার করে সঠিক এবং সূক্ষ্ম ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
c) এই কম্পিউটার মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে সক্ষম।
d) ধারাবাহিক নয় এমন তথ্যের উপর এই কম্পিউটার কাজ করে।
e) এই কম্পিউটারের ডেটা প্রসেসিং এর গতি অ্যানালগ অপেক্ষা বেশী হয়।

হাইব্রিড কম্পিউটার

হাইব্রিড কম্পিউটার (Hybrid Computer)

যে কম্পিউটারে অ্যানালগ ও ডিজিটাল উভয় কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে তাকে হাইব্রিড কম্পিউটার বলা হয়।

হাইব্রিড কম্পিউটারের ব্যবহার

a) আবহাওয়ার পূর্বাভাস
b) হাসপাতালে রোগীর রক্তচাপ
c) হৃদস্পন্দন মাপার যন্ত্র প্রভৃতিতে হাইব্রিড কম্পিউটার ব্যবহার হয়।
রোবট একটি হাইব্রিড কম্পিউটার।

হাইব্রিড কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) এই কম্পিউটারে ডিজিটাল এবং অ্যানালগ উভয় কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই।
b) এই কম্পিউটারে অ্যানালগ পদ্ধতিতে ইনপুট হয়, আর আউটপুট হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ সংখ্যার মাধ্যমে।
c) দ্রুত সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয়।

ডিজিটাল কম্পিউটারের শ্রেণিবিভাগ

আকারের উপর নির্ভর করে ডিজিটাল কম্পিউটার চার ভাগে ভাগ করা যায়।

মাইক্রো কম্পিউটার (Micro Computer)

এই ধরনের কম্পিউটার আকার তুলনামূলক ভাবে ছোট হয় এবং অন্যান্য কম্পিউটারের চেয়ে দাম কম হয়। এই কম্পিউটারগুলিতে সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (CPU) হিসাবে মাইক্রোপ্রসেসর ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এই কম্পিউটারে ইনপুট ও আউটপুট ডিভাইস ব্যবহার করা হয় যা একটি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (PCB) এর সাথে যুক্ত থাকে।
আমাদের নানা দৈনন্দিন কাজে বাড়ি, অফিস, স্কুলে এই কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।

মাইক্রো কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) এই কম্পিউটারগুলি আকার অন্য কম্পিউটার অপেক্ষা ছোট।
b) এই কম্পিউটার গুলির দাম তুলনামূলক কম।
c) এগুলি single user কম্পিউটার অর্থাৎ একজন ব্যবহারকারী একে ব্যবহার করতে পারে।
d) অন্যান্য কম্পিউটার গুলির তুলনায় এর মেমোরি অনেক কম হয়।
e) বিদ্যুতের খরচ তুলনামূলক ভাবে অন্য কম্পিউটারের থেকে কম।

মিনি কম্পিউটার (Mini Computer)

মেনফ্রেমের থেকে ছোট কিন্তু মাইক্রো কম্পিউটারের চেয়ে বড়, এরকম কম্পিউটারগুলি মিনি কম্পিউটার হিসাবে পরিচিত।

এগুলি মাল্টি–ইউজার কম্পিউটার এবং এরা মাল্টিপ্রসেসিং পদ্ধতি মেনে চলে। মাল্টিপ্রসেসিং হবার ফলে একই সময়ে একাধিক ব্যক্তি এই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে, আর মাল্টিপ্রসেসিং হবার ফলে এই কম্পিউটার একই সময়ে একাধিক কাজ করতে সক্ষম হয়।

মিনি কম্পিউটারের ব্যবহার

সাধারণত অ্যাকাউন্টিং, বিভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, Computer Aided Design (CAD) প্রভৃতিতে এই কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।

মিনি কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) এই কম্পিউটারগুলি মাল্টিইউজার ও মাল্টিটাস্কিং পদ্ধতিতে কাজ করে।
b) এই কম্পিউটারগুলির প্রসেসিং এর গতি মাইক্রো কম্পিউটারের চেয়ে বেশী হয়।
c) এটির আকার এবং দাম মেনফ্রেম কম্পিউটারের তুলনায় কম।

মেনফ্রেম কম্পিউটার

মেনফ্রেম কম্পিউটার (Mainframe Computer)

মেনফ্রেম কম্পিউটার হল বিপুল পরিমাণ তথ্য ধারণে সক্ষম এবং বিশেষ ধরনের কম্পিউটার যাতে একাধিক প্রসেসর আছে এবং যা মাল্টিইউজার ব্যবস্থা মেনে কাজ করে। এই ধরনের কম্পিউটার টাইম শেয়ারিং পদ্ধতি অনুসরণ করে।

মেনফ্রেম কম্পিউটারের ব্যবহার

বিপুল পরিমাণ তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয় এমন ক্ষেত্রে, যেমন- প্লেন ও ট্রেনের টিকিট বুকিং সিস্টেম, প্রতিরক্ষা, জনগণনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।


একাদশ শ্রেণি থেকে → Physics | Chemistry | Biology | Computer

মেনফ্রেম কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) এই কম্পিউটার গুলি টাইম শেয়ারিং পদ্ধতিতে কাজ করে।
b) এই কম্পিউটার গুলি বিপুল পরিমাণ তথ্য নিয়ে কাজ করতে সক্ষম।
c) এই কম্পিউটারে একাধিক প্রসেসর থাকে।
d) একাধিক অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করে।
e) এগুলি আকারে বিরাট বড় এবং অত্যন্ত দ্রুতগতি সম্পন্ন।

IBM দ্বারা প্রস্তুত সুপার কম্পিউটার Summit [Image by Carlos Jones/ORNL,Source, CC BY 2.0 ]

সুপার কম্পিউটার (Super Computer)

সুপার কম্পিউটার হল পৃথিবীতে আবিষ্কৃত কম্পিউটারগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়, শক্তিশালী এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন কম্পিউটার।

সুপার কম্পিউটারের ব্যবহার

এই কম্পিউটার কোন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হয় না।
a) আবহাওয়ার পূর্বাভাস,
b) খনিজ তেল এবং গ্যাসের অনুসন্ধান,
c) প্রতিরক্ষা,
d) পরমাণু চুল্লি, মহাকাশ গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।

সুপার কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কাজ করতে পারে।
b) এই কম্পিউটারে একাধিক প্রসেসর ব্যবহৃত হয়।
c) এটি মাল্টিইউজার ও মাল্টিটাস্কিং কাজ করতে পারে।
d) তথ্য সংরক্ষণ ক্ষমতা খুব বেশী।
e) এই কম্পিউটারের দাম সবচেয়ে বেশী হয়।

মাইক্রো কম্পিউটারের শ্রেণিবিভাগ

এছাড়া মাইক্রো কম্পিউটারকে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রধান ভাগগুলি হল

পার্সোনাল কম্পিউটারের বিবর্তন [Credit Tim Colegrove, CC BY-SA 4.0]

পার্সোনাল কম্পিউটার (Personal Computer)

বর্তমানে ব্যবহৃত কম্পিউটার গুলির মধ্যে পার্সোনাল কম্পিউটার বা PC ব্যক্তিগত কাজে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয়। এই কম্পিউটারের সাহায্যে বিভিন্ন অফিসের কাজ, ইন্টারনেট ব্যবহার, জ্ঞান শোনা বা সিনেমা দেখা, বিভিন্ন গেম খেলা প্রভৃতি সবই করা যায়।

মাইক্রো কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য

a) সাধারণত ডেস্ক বা টেবিলে রেখে কাজ করা হয়।
b) CRT, LCD অথবা LED মনিটর ব্যবহৃত হয়।
c) এই কম্পিউটারে সাধারণত keyboard, mouse প্রভৃতির মাধ্যমে input দেওয়া হয় এবং তথ্য সংরক্ষণ করতে Hard disk, CD, DVD, Pen drive প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

ওয়ার্কস্টেশন (Workstation)

এগুলি সাধারণ ভাবে পার্সোনাল কম্পিউটারের মতন, তবে তুলনামূলক অধিক শক্তিশালী হয়। এদের কার্যক্ষমতা, গ্রাফিক্স, মাল্টিটাস্কিং এর ক্ষমতা প্রভৃতি পার্সোনাল কম্পিউটারের চেয়ে বেশী হয়।

ওয়ার্কস্টেশনের ব্যবহার

গ্রাফিক্সের বা অ্যানিমেশনের কাজে, ক্লায়েন্ট–সার্ভার, মডেলের সার্ভার হিসাবে এই কম্পিউটার ব্যবহার হয়।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

ওয়ার্কস্টেশনের বৈশিষ্ট্য

a) অধিক শক্তিশালী প্রসেসর ও গ্রাফিক্স ব্যবহার হয়।
b) এটির সাথে একাধিক টার্মিনাল যুক্ত থাকতে পারে।
c) পার্সোনাল কম্পিউটারের তুলনায় দ্রুত ডেটা প্রসেসিং করতে পারে।

ল্যাপটপ (Laptop)

পোর্টেবল কম্পিউটারগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ল্যাপটপ। এটি ব্যাটারিচালিত হওয়ার কারণে সহজেই অন্যত্র নিয়ে যাওয়া যায়। আকারে ছোট হওয়ায় গাড়িতে বা যেকোন স্থানে বসে কাজ করা সম্ভব হয়।

ল্যাপটপের বৈশিষ্ট্য

a) এটি ব্যাটারিচালিত কম্পিউটার।
b) আকারে ছোট ও হালকা বলে বাড়ির বাইরেও এটিকে ব্যবহার করা যায়।
c) keyboard, mouse, monitor, speaker প্রভৃতি একত্রে যুক্ত থাকে।

নোটবুক (Notebook)

এটি ল্যাপটপের থেকেও আকারে ছোট এবং কম ওজনের হয়। একে ট্যাবলেট–PC ও বলা হয়ে থাকে। উন্নতমানের গ্রাফিক্স ও প্রসেসর থাকায় এগুলিকেও ল্যাপটপের মত যেকোন স্থানে ব্যবহার করা যায়।

পামটপ কম্পিউটার [Credit – Felix Winkelnkemper, CC BY-SA 4.0]

পামটপ কম্পিউটার (Palmtop Computer)

এটি হল অত্যন্ত ছোট আকারের কম্পিউটার যা হাতের তালুর উপর রেখে কাজ করা সম্ভব। এটি আকারে এতই ছোট যে এগুলি সহজেই পকেটে ভরে নিয়ে যাওয়া যায়। এতে একটি ছোট LCD screen এবং একটি Compressed Keyboard থাকে।

পর্ব সমাপ্ত


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

বিজ্ঞান স্নাতক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষিতা নন্দিতা বসুর পেশা শিক্ষকতা। তিনি বই পড়তে বড় ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, অবসরে, বাসে ট্রামে তো বটেই, শোনা যায় তিনি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বই পড়তে পারেন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।