bharatborsho-sarsongkkhep
Class-12

ভারতবর্ষ | বিষয়সংক্ষেপ

বাংলাদ্বাদশ শ্রেণি – ভারতবর্ষ (বিষয়সংক্ষেপ)


ভারতবর্ষ গল্পের লেখক পরিচিতি

১৯৩০ সালের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদের খোশবাদপুর গ্রামে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের জন্ম হয়। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার এক সুন্দর পরিমণ্ডল ছিল তাঁর বাড়িতে। এমনকি তাঁর পরিবারে আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত ভাষারও চর্চা ছিল। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন একজন খ্যাতনামা কবি। ফলে ছোটবেলা থেকেই সিরাজ সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে শুরু করেছিলেন। যৌবনের শুরুতে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ যুক্ত হয়ে পড়েন বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে।

সেই সূত্রেই তিনি লোকনাট্যদল ‘আলকাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সময়টা তখন ১৯৫০ সাল। সেই দলে তিনি বাঁশি বাজাতেন এবং লোকনাট্য ও লোকনৃত্যের প্রশিক্ষণ দিতেন। দলের কাজের সূত্রেই গ্রামবাংলার বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। ফলে গ্রামবাংলার নানা অঞ্চলের সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ ধারণা জন্মায় তাঁর। মুর্শিদাবাদ, মালদা, বর্ধমান, বীরভূম এমনকি কলকাতাতেও তিনি কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়াতেন। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সৈয়স মুস্তাফা সিরাজ আলকাপ দলের হয়ে সারারাত-ব্যাপী অনুষ্ঠানে সামিল হতেন।

পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যজীবনে এই সময়কার নানাবিধ অভিজ্ঞতা খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। লোকনাট্যাভিনয় থেকে ধীরে ধীরে তিনি কবিতা ও ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই ছোটোগল্পকার হিসেবে তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকার দপ্তরে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়।

১৯৬৬ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নীল ঘরের নাতি’ প্রকাশিত হলে রিনি ক্রমে ক্রমে ঔপন্যাসিক হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

সারা জীবন ধরে তিনি ১৫০টিরও বেশি উপন্যাস এবং ৩০০টিরও বেশি ছোটোগল্প লিখেছেন। ‘ইন্তিপিসি ও ঘাটবাবু’, ‘ভালোবাসা ও ডাউন ট্রেন’, ‘হিজল বিলের রাখালেরা’, ‘তরঙ্গিনীর চোখ’, ‘মানুষের জন্ম’, ‘রণভূমি’, ‘রক্তের প্রত্যাশা’, ‘মাটি’ ইত্যাদি ছোটগল্প এবং ‘অলীক মানুষ’, ‘অমর্ত্য প্রেমকথা’, ‘নিশিমৃগয়া’, ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি’, ‘তৃণভূমি’, ‘কিংবদন্তির নায়ক’, ‘উত্তর জাহ্নবী’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব উপন্যাস লিখেছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ।

তাঁর বেশ কিছু উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তাঁর বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র কর্নেল-এর স্রষ্টা। এই চরিত্রটি নিয়ে তিনি শিশু-কিশোরদের উপযোগী অনেক গোয়েন্দা ও রোমাঞ্চকর কাহিনি লিখেছেন। সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় উপন্যাস ‘অলীক মানুষ’-এর জন্য তিনি বঙ্কিম পুরস্কার এবং সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর ‘অমর্ত্য প্রেমকথা’ উপন্যাসের জন্য তিনি নরসিংহ দাস স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে ৮২ বছর বয়সে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মৃত্যু হয়।

ভারতবর্ষ গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

‘ভারতবর্ষ’ গল্পের পটভূমি রচিত হয়েছে একটি ছোটো মফস্বল জনপদকে ঘিরে। শীতকাল। কৃষিকাজ নির্ভর মানুষদের জীবনে তখন নিস্তরঙ্গ অবসর, তাই চা-দোকানে ভিড় জমায় তাঁরা। আর সেইসঙ্গে আড্ডা-গল্প চলতে থাকে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। বড় রাস্তা যেদিকে বাঁক নিয়েছে, সেই মোড়েই একটি ছোট্ট চা দোকানের আড্ডা-জমায়েতের বর্ণনা পাওয়া যায় গল্পের শুরুতেই।

সেই শীতের দিনেই চরম বর্ষণ শুরু হল হঠাৎ করেই।

চা দোকানের ভিড় ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। পৌষ মাসের অসময়ের বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার পরিবেশকে গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘ফাঁপি’। সেই প্রবল বর্ষণের মধ্যেই চা-দোকানে বসে থাকা লোকেরা দেখতে পায় এক জীর্ণ শীর্ণ চেহারার বুড়ি সামনে আসে। কুঁজো হয়ে যাওয়া সেই বুড়ি চা দোকানে চা খায়, পয়সা মেটায় আর ফাঁপি শুরু হওয়ার আশঙ্কায় সকলেই সেই বুড়ির বোধ-বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং ভাবতে থাকে আজ নির্ঘাত বেঘোরে মারা পড়বেন তিনি।

চরম বর্ষণ শুরু হয়।

চা-দোকান ফাঁকা হয়ে যায়, বর্ষণের জোর এতটাই বেশি ছিল যে দূরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, সবই ঝাপসা। এই প্রসঙ্গে লেখক ঐ অঞ্চলে প্রচলিত কিছু প্রবাদ, ডাকের বচন, খনার বচন ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন যা থেকে অনুমান করা যায় যে সেই বর্ষণ তিন দিনের আগে থামবে না। পাঁচ দিন পরে যখন সত্য সত্যই বৃষ্টি-ঝড় ইত্যাদি থেমে গেল, তখন বুড়ির অবস্থা জানার জন্য সকলে উৎসুক হয়ে উঠলো।


দ্বাদশ শ্রেনি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

দেখা গেল বুড়ি একটা বুড়ো বটগাছের নীচে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রাথমিকভাবে সকলেই দেখে ভাবলো যে বুড়ি হয়তো মরেই গিয়েছে। তাঁর শরীরে কোনও নড়া-চড়া ছিল না। আধুনিকতার একটুও ছোঁয়া লাগেনি সেই গ্রামে, এখনও বিদ্যুৎ পরিষেবা আসেনি সেখানে। সেখানেই একইসঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা একত্রে বসবাস করতেন।

গ্রামের হিন্দুরা বুড়িকে মৃত ভেবে বাঁশের মাচায় করে তাঁর শবদেহ নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসে নদীর ধারে।

গ্রামের চৌকিদারই এই পরামর্শ দিয়েছিল। মৃতদেহটি খুঁড়ে খাবার জন্য ঠিক কখন আকাশ থেকে শকুনের দল নেমে আসে সেটা দেখার জন্য গ্রামের হিন্দুরা অপেক্ষায় ছিল। ঠিক বিকেল নাগাদ দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য।

বুড়ির মৃতদেহ পাঁজাকোলা করে নিয়ে বাজারের দিকে আসতে দেখা গেল মুসলমান পাড়ার লোকজনকে। তারা জানায় যে বুড়ি মুসলমান, তাই তাঁকে যথাযোগ্যভাবে কবর দিতে হবে। বুড়ির ধর্ম নিয়ে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হল। নীল উর্দি পরা চৌকিদার কোনওরকমে দুপক্ষকে সামলে রাখে। যতদিন বুড়ি বেঁচে ছিল ততদিন, তাঁর কোনও খোঁজখবর নেয়নি কেউ, এখন মারা যাবার পর তাঁর ধর্ম নিয়ে সকলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

এমন সময় হঠাৎ সকলকে চমকে দিয়ে বুড়ির মৃতদেহ নড়ে উঠতে দেখা যায়।

বোঝা যায় যে বুড়ি মরেনি। বুড়ি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সেই সময় সকলে সমস্বরে তাঁকে জিজ্ঞেস করে যে সে হিন্দু না মুসলমান? বুড়ি ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দেয় যে সে যে আসলে কী তা মানুষেরা ঠিকভাবে দেখতেই পারছে না, চোখ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কেউ চিনতে পারেনি। অবশেষে সব লোককে গালিগালাজ করতে করতে বুড়ি আবার হাঁটতে হাঁটতে অদূরে মিলিয়ে যায়।
পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

XII_Beng_Bharatborsho_1