chemical properties of matter
WB-Class-8

রাসায়নিক পরিবর্তনের সাহায্যে পদার্থের শনাক্তকরণ

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বিজ্ঞান । অধ্যায় – পদার্থের প্রকৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)


আগের পর্বে আমরা পদার্থের ভৌত ধর্ম নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

কোন পদার্থকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক ধর্মের সাহায্যে প্রয়োজন হয়। আমরা জানি যে পদার্থ কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলে শুধুমাত্র তখনই পদার্থটির রাসায়নিক ধর্ম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ভৌত ধর্মের মতন কোন পদার্থের রাসায়নিক ধর্মের প্রভাবে সৃষ্ট পরিবর্তন সাময়িক বা অস্থায়ী হয়না। এর প্রভাবে পদার্থের অণুর গঠনগত পরিবর্তন ঘটে এবং সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ উৎপন্ন হয়।

পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্যসমূহ

পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেগুলি হলঃ-
1) সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক বা একাধিক পদার্থের সৃষ্টি হয়।
2) রাসায়নিক পরিবর্তন স্থায়ী।
3) এই পরিবর্তনে বস্তুর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম পরিবর্তিত হয়।
4) বস্তুর অণুর গঠনগত পরিবর্তন হয়ে সম্পূর্ণ নতুন অণু সৃষ্টি হয়।
5) রাসায়নিক পরিবর্তন একমুখী। পদার্থকে সহজে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়না।
6) রাসায়নিক পরিবর্তনে তাপশক্তির উদ্ভব বা শোষণ ঘটে।

বিভিন্ন পদার্থের বিভিন্ন রকম রাসায়নিক ধর্ম দেখা যায়। যেমন জল, বায়ু, অ্যাসিড বা ক্ষারের সাথে কোন পদার্থের বিক্রিয়া হল একটি রাসায়নিক পরিবর্তন। একইভাবে কোন বস্তুর দাহ্যতা, দহন তাপ, ক্ষারত্ব বা অম্লত্ব, তেজস্কিয়তা, অর্ধায়ু প্রভৃতি পদার্থের রাসায়নিক ধর্মের উদাহরণ। এই রাসায়নিক ধর্মগুলির সাহায্য আমরা বিভিন্ন পদার্থকে শনাক্ত করতে পারি।

এই ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন যে শুধুমাত্র রসায়নগারে পরীক্ষার দ্বারা সম্পন্ন করা যায় তা নয়, প্রাকৃতিকভাবেও এই পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন- কাঠের দহন। কাঠের টুকরোয় আগুন দিলে কার্বন ডাই অক্সাইড, ছাই এবং অঙ্গার উৎপন্ন হয়। এটি কাঠের রাসায়নিক পরিবর্তন, কারণ এখানে ভিন্ন ধর্ম বিশিষ্ট একাধিক পদার্থ উৎপন্ন হচ্ছে। এই ঘটনা কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেও ঘটে থাকে দাবানলের ক্ষেত্রে। এই দাবানল হল প্রাকৃতিক ভাবে রাসায়নিক পরিবর্তনের উদাহরণ।

দাবানল

রাসায়নিক পরিবর্তনের সাহায্যে পদার্থের শনাক্তকরণ

একইভাবে দহনের মাধ্যমে ঘটা রাসায়নিক পরিবর্তনের সাহায্যে আমরা বিভিন্ন পদার্থ শনাক্ত করতে পারি।

ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইডের শনাক্তকরণ

ম্যাগনেশিয়াম (Mg) ধাতুকে বাতাসের উপস্থিতিতে দহন করলে এক প্রকার সাদা পাউডার উৎপন্ন হয়। এই সাদা পাউডার হল ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড, যা বাতাসের অক্সিজেনের সাথে ম্যাগনেসিয়ামের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়া, অর্থাৎ এর ফলে তাপের উদ্ভব হয়

চিনিতে কার্বনের উপস্থিতির পর্যবেক্ষণ

কিছুটা চিনি কোন পাত্রে নিয়ে গরম করলে দেখা যায় চিনির বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে বাদামী ও আরও পরে কালো হয়ে যায়। এর কারণ হল চিনিতে উপস্থিত কার্বন। চিনি হল হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন দিয়ে তৈরী একটি যৌগ (C12H22O11)। তাপের প্রভাবে চিনির অণুতে বর্তমান জল বাষ্পীভূত হয়ে যায়, আর অবশেষ হিসাবে পাওয়া যায় চিনিতে বর্তমান কার্বন।

কিউপ্রিক অক্সাইডের শনাক্তকরন

কিউপ্রিক নাইট্রেট [Cu(NO3)2] হল নিল বর্ণের কেলাসাকার পদার্থ। এই কেলাসে তিন অণু জল বর্তমান থাকে। একে উত্তপ্ত করলে প্রথমে এর কেলাসের মধ্যে বর্তমান জল বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আরও গরম করলে এর অণুর রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে কিউপ্রিক অক্সাইড, লালচে বাদামী বর্ণের নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড গ্যাস ও অক্সিজেন উৎপন্ন হয়।

নাইট্রিক অক্সাইডের শনাক্তকরণ

নাইট্রিক অক্সাইড (NO) একটি বর্ণহীন গ্যাস। এই গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এলে বাদামী বর্ণের গ্যাস উৎপন্ন হয়। এর কারণ, নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাস বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে বাদামী বর্ণের নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO2) গ্যাস উৎপন্ন করে।

ক্যালশিয়াম হাইড্রক্সাইডের শনাক্তকরণ

একটি পাত্রে কিছু ক্যালশিয়াম অক্সাইড (CaO) অর্থাৎ পাথুরে চুন নিয়ে তাতে কিছু জল দেওয়া হলে দেখা যায় যে জল শব্দ করে ফুটতে শুরু করে এবং তাপ উৎপন্ন হয়। ক্যালশিয়াম অক্সাইড ও জলের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড উৎপন্ন হয়। এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়া।

সোডিয়াম (Na) ধাতুর শনাক্তকরণ

সোডিয়াম (Na) ধাতু জলের সংস্পর্শে এলে তীব্র বিক্রিয়া ঘটে বর্ণহীন সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH) দ্রবণ ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়ার প্রভাবে সোডিয়াম ধাতু অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সোডিয়ামে আগুন ধরে যাবার সম্ভবনা থাকে।

বাতাসে উপস্থিত জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া ঘটেও আগুন ধরে যাবার সম্ভবনা আছে বলে সোডিয়াম (Na) কখনও খোলা বাতাসে রাখা হয় না। সাধারণভাবে কেরোসিনে ডুবিয়ে রাখা হয়।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদার্থ শনাক্ত করার জন্য অ্যাসিড বা ক্ষারকীয় পদার্থের সাথে বিক্রিয়া ঘটানো হয়। লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড (H2SO4) এর সাথে জিঙ্ক (Zn) যোগ করলে বিক্রিয়া ঘটে জিঙ্ক সালফেট (ZnSO4) এবং একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই নির্গত বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাসটি হল হাইড্রোজেন (H2)। এই নির্গত গ্যাসের মধ্যে একটি জ্বলন্ত পাটকাঠি প্রবেশ করালে দেখা যায় যে গ্যাস শব্দ সৃষ্টি করে, নীলাভ শিখা সহ জ্বলে উঠে তারপর নিভে যায়।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগবাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

ফেরাস সালফেটের শনাক্তকরণ

লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের সাথে লোহার গুঁড়ো যোগ করা হলে তাদের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়ে ফেরাস সালফেট (FeSO4) ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই ফেরাস সালফেট হালকা সবুজ বর্ণের হয়, সেই কারণে বিক্রিয়ার পরে তরলটি ফিকে সবুজ বর্ণের দেখায়।

আবার লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের মধ্যে যদি লোহার গুঁড়োর পরিবর্তে ফেরাস সালফাইড (FeS) যোগ করা যায় তাহলে বিক্রিয়া ঘটে ফেরাস সালফেট (FeSO4) এবং হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের গন্ধ পচা ডিমের মত।

লোহায় মরিচা ধরা

আমাদের চারপাশে ঘটা বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন বা বিক্রিয়ার মধ্যে একটি হল লোহায় মরচে ধরা। লোহার জিনিস খোলা অবস্থায় বাতাসে রেখে দিলে বাতাসের অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্প লোহার সাথে বিক্রিয়া ঘটায় এবং লোহার উপর বাদামী বর্ণের মরচের আস্তরণ সৃষ্টি হয়।

একই ভাবে দুধ থেকে দই উৎপন্ন হওয়া একটি রাসায়নিক পরিবর্তনের উদাহরণ। দই এর ধর্ম আর দুধের ধর্ম এক নয়। উৎপন্ন দইকে পুনরায় দুধে পরিণত করা যায় না। অর্থাৎ এখানে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে।

ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন একই সাথে ঘটার উদাহরণ

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যায় যে ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন একই সাথে ঘটে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় মোমবাতির দহনের ঘটনা। মোম হল একটি হাইড্রোকার্বনের যৌগ। যখন মোমবাতির দহন হয়, তখন দহনের ফলে তাপ ও আলোক উৎপন্ন হয়। এই উৎপন্ন তাপের প্রভাবে মোমের কিছু অংশ গলে তরল হয়ে যায়। কঠিন মোম গলে তরলে পরিণত হওয়া— এটি মোমের একটি ভৌত অবস্থার পরিবর্তন।

আবার মোমবাতি দহনের সময় মোম অর্থাৎ হাইড্রোকার্বন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে। বিক্রিয়ার ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প উৎপন্ন হয়, যাদের ধর্ম মোমের ধর্ম থেকে পৃথক। মোমের দহনে জলীয় বাষ্প ও কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হওয়া— এটি মোমের রাসায়নিক পরিবর্তন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন একই সাথে ঘটছে।

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতিঃ

বিজ্ঞান স্নাতক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষিতা নন্দিতা বসুর পেশা শিক্ষকতা।তিনি বই পড়তে বড় ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, অবসরে, বাসে ট্রামে তো বটেই, শোনা যায় তিনি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বই পড়তে পারেন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।