gorai-nodir-tire
WB-Class-8

গড়াই নদীর তীরে – জসীমউদ্দীন

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বাংলা। গড়াই নদীর তীরে (কবিতা)


কবি পরিচিতি – জসিমউদ্দিন

বাংলা কবিতার অন্যতম উল্লেখ্য কবি জসিমউদ্দিন। ‘পল্লীকবি’ উপাধিতে ভূষিত, জসীমউদ্‌দীন আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আধুনিক কবি। তাঁর জীবনকালে তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কবিতা, পল্লীগীতি, নাটক। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা ভাষার গীতিময় কবিতার উৎকৃষ্টতম নিদর্শনগুলোর অন্যতম।

গড়াই নদী সম্পর্কে কিছু কথা…

গড়াই নদী বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মার একটি শাখানদী। এই নদী বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী গুলির মধ্যে অন্যতম। বাংলা সাহিত্যে এই গড়াই নদীর উল্লেখ বহুবার এসছে। শুধু তাই নয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনকালের অনেকটা সময় গঙ্গা – পদ্মার তীর সংলগ্ন স্থানে কাটিয়েছেন, ফলে তাঁর কবিতায় বহুবার ফুটে উঠেছে গড়াই নদীর চিত্র।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

গড়াই নদীর তীরে কবিতার উৎস

‘গড়াই নদীর তীরে’ পাঠ্যাংশটি ‘পল্লীকবি’ জসীমউদ্দীন রচিত ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগ্রন্থের অংশবিশেষ। ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগ্রন্থটি মোট ছয়টি পর্বে বিভক্ত, আলোচ্য অংশটি ‘নীড়’ পর্ব থেকে নেওয়া হয়েছে।

‘গড়াই নদীর তীরে’ কবিতার সরলার্থ

গড়াই নদীর তীরে,
কুটিরখানিরে লতা-পাতা-ফুল মায়ায় রয়েছে ঘিরে।

গড়াই নদীর তীরে একটি কুটির বা খুব ছোট বাড়ির কথা কবি বলেছেন। কুটিরটির চারিপাশ লতা – পাতা – ফুল দিয়ে ঘেরা। কবির মনে হচ্ছে ঐ লতা – পাতা – ফুল যেন মায়ার বন্ধনে কুটিরটিকে আগলে রেখেছে।

বাতাসে হেলিয়া, আলোতে খেলিয়া সন্ধ্যা সকালে ফুটি,
উঠানের কোণে বুনো ফুলগুলি হেসে হয় কুটি কুটি।

সকাল বেলা উঠোনের কোনে বুনো ফুল ফুটেছে। তারা হাওয়ায় দুলছে, ঠিক জেনে মনে হচ্ছে তারা দুলে দুলে হাসছে।

মাচানের পরে সীম-লতা আর লাউ কুমড়ার ঝাড়,
আড়া-আড়ি করি দোলায় দোলায় ফুল ফল যত যার।

মাচা অর্থাৎ বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা কাঠামো; গ্রামবাংলায় এই ধরণের কাঠামো লতানে গাছ বেড়ে ওটার জন্য ব্যবহার করা হয়। কুটিরের পাশে রয়েছে মাচা, সেখানে রয়েছে সিম, লাউ, কুমড়োর মত লতানে গাছ। ঐ লতানে গাছগুলিতে ফুল এসেছে, হাওয়ায় তারা দুলছে।

তল দিয়ে তার লাল নটেশাক মেলিছে রঙের ঢেউ,
লাল শাড়ীখানি রোদ দিয়ে গেছে এ বাড়ির বধূ কেউ।

মাচার তলায়  মাটিতে লাল নটে শাক জন্মেছে। লাল নটে শাকের রঙ দেখে কবির মনে হচ্ছে রঙের ঢেউ খেলছে। সেখানে লাল রঙের একটি শাড়ি রোদে শুখাবার জন্য মেলে দিয়েছেন ঐ কুটিরের কোন বধু।

মাঝে মাঝে সেথা এঁদো ডোবা হতে ছোট ছোট ছানা লয়ে,
ডাহুক মেয়েরা বেড়াইতে আসে গানে গানে কথা কয়ে!

পাশের অব্যবহৃত ছোট পুকুর (এঁদো ডোবা) থেকে ডাহুক পাখি, তার ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে ঐ কুটিরের রাস্তায় খাবার খুঁজতে আসে। তাদের ডাক শুনে মনে হয়, তারা যেন গানে গানে কথা বলছে।

গাছের শাখায় বনের পাখিরা নির্ভয়ে গান ধরে,
এখনো তাহারা বোঝেনি হেথায় মানুষ বসত করে।

কুটিরের আসে পাশের গাছের শাখায় পাখিরা নির্ভয়ে ডাকে। তারা এখনো বুঝতে পারেনি যে ঐ কুটিরে মানুষ বাস করে, অর্থাৎ কবি বলতে চেয়েছেন যে কুটিরটি যেন ঐ প্রকৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

মটরের ডাল, মসুরের ডাল, কালিজিড়া আর ধনে,
লঙ্কা-মরিচ রোদে শুখাইছে উঠানেতে সযতনে।

কুটিরের উঠোনে যত্ন করে মটরের ডাল, মসুরের ডাল, কালোজিরা, ধনে, লঙ্কা – মরিচ রোদে শুখাতে দেওয়া হয়েছে।

লঙ্কার রঙ মসুরের রঙ, মটরের রঙ আর,
জিড়া ও ধনের রঙের পাশেতে আলপনা আঁকা কার!

লঙ্কার লাল রঙ, মসুরের কমলা রঙ, মটরের সবুজ রঙ, জিরার কালো রঙ এবং ধনের ধূসর রঙ পাশাপাশি রয়েছে, তা দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন আলপনা দিয়েছে।

যেন একখানি সুখের কাহিনী নানান আখরে ভরি,
এ বাড়ির যত আনন্দ হাসি আঁকা জীবন্ত করি।

এই সব দৃশ্যে একখানি সুখের চিত্র ধরা পড়ছে।

সাঁঝ সকালের রঙিন মেঘেরা এখানে বেড়াতে এসে,
কিছুখন যেন থামিয়া রয়েছে এ বাড়িরে ভালবেসে।

সাঁঝবেলার (সন্ধ্যা) এবং সকালের মেঘে সূর্যের লাল আভা দেখা যায়। কবি তাদের ‘রঙিন মেঘ’ বলেছেন। ঐ মেঘেরা যেন বেড়াতে এসে ঐ কুটিরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

subscribe-jump-magazine-india

গড়াই নদীর তীরে কবিতার সারাংশ

পল্লীকবি জসীমউদ্দিন এই কবিতার মাধ্যমে পল্লীগ্রামের একটি অসাধারণ চিত্র অঙ্কন করেছেন। তাঁর বর্ণনায় সামান্য একটি কুটির হয়ে উঠেছে অসামান্য। গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত ছোট কুটিরটিকে কেন্দ্র করে কিছু সাধারণ ঘটনা যেমন মাচার লতানে গাছের ফুল দোলা, উঠোনের বুনো ফুল, পাখির ডাক, উঠোনে শুকনো হওয়া ডাল – মশলা কুটিরের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। সামান্য লতা – পাতা – ফুল দিয়ে ঘেরা একটি কুটিরের সাথে প্রকৃতির এক সৌহার্দ্যপূর্ণ – ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

আমাদের চারিপাশে অজস্র প্রাকৃতিক ঘটনা আমাদের অলক্ষ্যে ক্রমাগত ঘটে চলেছে। জীবনের ব্যাস্ততায় আমরা তা উপেক্ষা করি। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবো কত সাধারণ ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের রঙ, যা আমাদের জীবনের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিতে পারে। হয়তো আমরাই হয়ে উঠতে পারি ঐ রঙিন মেঘ, যা জীবনের সৌন্দর্যে দেখে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।