toroler-chap
WB-Class-8

তরলের চাপ (Pressure of fluid)

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বিজ্ঞান । অধ্যায় – বল ও চাপ (চতুর্থ পর্ব)


আগের পর্বে তোমরা তরলের ঘনত্ব সম্পর্কে জেনেছ। এই পর্বে আমরা তরলের চাপ নিয়ে আলোচনা করবো।

তরলের-চাপ

তোমরা কোন বস্তুকে যদি কোন তলের উপর রাখো তবে জানবে, বস্তুটি ওই তলের উপর তার নিজের ওজনের সমান বল প্রয়োগ করে। এর ফলে ওই তলের উপর যে চাপ সৃষ্টি হয় তা শুধু ওই বস্তুর ওজন অর্থাৎ বস্তু দ্বারা প্রযুক্ত বলের উপর নির্ভর করে না, বস্তুটির সাথে ওই তলের স্পর্শ হওয়া ক্ষেত্রফলের উপরও নির্ভর করে।

তাহলে বলতো চাপ কাকে বলে?

চাপ (pressure) হল কোন বস্তুর প্রতি একক ক্ষেত্রফলে লম্বভাবে প্রযুক্ত বল।

চাপ যে ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে তা কিন্তু আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাই।

চলো একটা উদাহরণের সাহায্যে বুঝে নিই।

আচ্ছা তোমরা কেউ বাড়ির সবার সাথে দিঘা গেছো?

যদি গিয়ে থাক তাহলে দেখবে বাড়ির বড়রা সমুদ্রের ধারের বিশেষ কিছু জায়গায় যেতে বারণ করেন, আর কারণ হিসাবে বলেন চোরাবালির কথা।

তোমরা জানো চোরাবালি কি?

যারা দিঘা যাওনি বা গেছো তারা সকলেই নিজের সুরক্ষার জন্য জেনে রাখ, চোরাবালি হল এক ধরণের আলগা বালি যা স্থায়িত্বহীন, মানুষ বা অন্য কোন প্রাণী এই বালিতে পা দিলে ঐ আলগা বালির স্তর খুব দ্রুত ওজন নিতে না পেরে সরে যায়, এবং যে ঐ বালির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সে দ্রুত বালির নীচে ঢুকে যেতে শুরু করে, এবং যে যত বেশি ছটফট করে ঐ স্থান থেকে বেরিয়ে আসতে, ততই তার ভরবেগ বৃদ্ধির কারণে সে দ্রুত তলিয়ে যেতে শুরু করে, আর তার সাথে সমুদ্রের ঢেউ কাজ করায় সেই ব্যাক্তি একসময় তলিয়ে যায় ও তার মৃত্যু ঘটে।

শুধুমাত্র দিঘাই নয় ভারতের বেশিরভাগ উপকুলে এই চোরাবালি সমৃদ্ধ কিছু স্থান দেখা যায়।
তবে বর্তমানে প্রশাসনিক পদক্ষেপ, প্রচার, সমুদের ধারের পুনর্নির্মাণ প্রভৃতি এই বিপদ অনেকটাই হ্রাস করেছে।

চোরাবালি এলাকা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।

এখন ঐ চোরাবালিতে পড়লে কি করনীয়?

সেক্ষেত্রে প্রাণে বাঁচতে বালির উপর শুয়ে পড়তে হয় তাতে শরীর বালির মধ্যে তত বেশী ঢোকে না।


আরো পড়ুন → An April Day | ঘনফল নির্ণয় | তরলের ঘনত্ব


এখন এর কারণ হল, দাঁড়িয়ে থাকার সময় দেহের সম্পূর্ণ ওজন ওই ব্যক্তির পায়ের উপর পড়ছে। পায়ের পাতার ক্ষেত্রফল অপেক্ষাকৃত কম। ফলে প্রতি বর্গএকক বালিতে বেশী বল পড়ে এবং বালি বেশী পরিমাণ সরে যায়। সুতরাং দেহ বালিতে অপেক্ষাকৃত দ্রুত ঢুকে যেতে থাকে। অন্যদিকে বালির উপর শুয়ে পড়লে যদিও দেহের ওজন একই হবার কারণে বালিতে প্রযুক্ত চাপ সমান হয়, কিন্তু শুয়ে থাকা অবস্থায় শরীরের অনেক বেশী অংশ বালির সংস্পর্শে থাকে। ফলে শরীরের ওজনের দ্বারা প্রযুক্ত চাপ অনেকখানি ক্ষেত্রফল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং প্রতি বর্গএকক বালিতে বলের পরিমাণ অনেক কম হয়। কাজেই শরীর বালির ভিতর অনেক কম এবং ধীরে ধীরে ঢুকবে। সেক্ষেত্রে বিপদের ঝুঁকিও অনেকটা কমে যাবে।

এই একই কারণের জন্য কোন ধারালো ছুরি দিয়ে সহজে কোন জিনিস কাটা যায়, কিন্তু ভোঁতা ছুরি দিয়ে কাটা কঠিন।

এবার আসা যাক, তরলের কথায়, তরল পদার্থও কোন বস্তুর সংস্পর্শে এলে এই একইভাবে বস্তুটির উপর চাপ প্রয়োগ করে।

প্রতি একক ক্ষেত্রফলে তরল লম্বভাবে যে বল প্রয়োগ করে তাকে তরলের চাপ বলে। তরলের এই চাপকে উদস্থৈতিক চাপও বলা হয়। আর কোন ক্ষেত্রফল এলাকায় তরল লম্বভাবে মোট যে বল প্রয়োগ করে তাকে ঘাত বলা হয়।

তরলের-চাপের-সুত্র

চাপের একক

CGS পদ্ধতিতে চাপের একক ডাইন প্রতি বর্গ সেন্টিমিটার (dyne/cm2)
SI পদ্ধতিতে চাপের একক নিউটন প্রতি বর্গ মিটার (newton/m2)। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে SI পদ্ধতিতে তরলের চাপ পাস্কাল (Pa) একক দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

চলো দেখা যাক তরল ঠিক কীভাবে চাপ দেয়।

একটি পাত্রকে কোন তরল, ধরা যাক জল দিয়ে ভর্তি করা হল। আমরা জেনেছি, জল পাত্রের গায়ে চাপ প্রয়োগ করবে।

এবার পাত্রটির গায়ে তিনটি ভিন্ন উচ্চতায় একই মাপের তিনটি ছিদ্র করা হল। জল তিনটি ছিদ্র দিয়ে বাইরে পড়বে। খেয়াল করলে আমরা দেখবো যে, তিনটি ছিদ্রের মধ্যে যেটি জলের বেশী গভীরে আছে, সেটি দিয়ে জল বেশী দূরে গিয়ে পড়ছে। কম গভীরতায় থাকা ছিদ্র দিয়ে জল অপেক্ষাকৃত কম দূরে পড়ছে। অর্থাৎ গভীরতা যত বাড়বে, চাপ তত বৃদ্ধি পাবে।


আবার পাত্রটিতে যদি ছিদ্র দুটি একই উচ্চতায় করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে উভয় ছিদ্র দিয়ে জল একই বেগে সম দূরত্বে গিয়ে পড়ছে। এর কারণ হল একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় সব বিন্দুতে তরলের চাপ সমান হয়। অর্থাৎ অনুভূমিক তলে সর্বত্র তরলের চাপ একই হবে, এবং ওই তরলের চাপ সব দিকে সমান ভাবে কাজ করবে।

তরলের চাপ তরলের ঘনত্বের সাথে পরিবর্তিত হয়।

ধরা যাক দুটি পাত্র নিয়ে একটিতে সাধারণ জল ও অন্যটির চিনির ঘন দ্রবণ নেওয়া হল। উভয় পাত্রে তরলের উচ্চতা এক রাখা হল। এবার দুটি পাত্রের একই গভীরতায় একই মাপের ছিদ্র করা হল। দেখা যাবে যে চিনির দ্রবণ বেশী দূরে গিয়ে পড়ছে। এর কারণ হল চিনির দ্রবণের ঘনত্ব সাধারণ জলের ঘনত্ব অপেক্ষা বেশী। ফলে চিনির দ্রবণ পাত্রের গায়ে বেশী চাপ প্রয়োগ করছে এবং বেশী দূরে গিয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে তরলের চাপ তরলের ঘনত্ব, গভীরতা প্রভৃতির উপর নির্ভর করে।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগবাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

আমরা তরলের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলি পাই সেগুলি হল:

(a) তরলের মধ্যে কোন বিন্দুতে চাপ তরলের গভীরতার উপর নির্ভর করে। গভীরতা যত বাড়ে চাপ তত বাড়বে।
(b) স্থির তরলের ভিতর কোন বিন্দুতে তরল সবদিকে সমান চাপ প্রয়োগ করে।
(c) তরলের মধ্যে কোন বিন্দুতে তরলের চাপ ওই তরলের ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। ঘনত্ব বেশী হলে তরলের চাপও বেশী হয়।
(d) তরলের ভিতরে কোন অনুভূমিক তলে সর্বত্র চাপ একই হয়।
(e) তরলের ভিতর কোন বিন্দুতে চাপ তরলের পাত্রের আকৃতি বা আকারের উপর নির্ভর করে না।
(f) তরল সর্বদা উঁচু থেকে নিচু স্থানে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহ তরলের ভর, আয়তন প্রভৃতির উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তরলের চাপের উপর।

subscribe-jump-magazine-india

আরো একটি উদাহরণের সাহায্যে আমরা বুঝে নিই

একটি টেবিলে দুটি পাত্র রেখে তাদের একটি পাইপ দ্বারা তলা দিয়ে যুক্ত করা হল। এবার দুটি পাত্রের একটিতে কম ও অন্যটিতে বেশী জল ভর্তি করা হল।

দেখা যাবে যে যেটিতে জলের উচ্চতা বেশী সেই পাত্র থেকে অন্য পাত্রে জল প্রবাহিত হচ্ছে। উভয় পাত্রে জলতলের উচ্চতা সমান হলে প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর কারণ

জলের প্রবাহ চাপের উপর নির্ভর করে। উচ্চতা বেশী হলে জলের চাপও বেশী হয়। এই প্রবাহ জলের পরিমাণের উপর নির্ভর করে না। যে পাত্রে রাখা আছে তার আয়তন বা পাত্রটির আকৃতি এই প্রবাহকে কোন রকম প্রভাবিত করে না। এই বিশেষ ধর্মকে জলের সমচ্চোশীলতা ধর্ম বলে।

উদাহরণ 1: কোন তরল 5 m2 স্থানের উপর 200 নিউটন বল প্রয়োগ করছে। তরলের চাপ নির্ণয় কর।

আমরা জানি,

তরলের চাপের সূত্র

= 200/5 = 40 নিউটন/m2
∴ তরলটি দ্বারা প্রযুক্ত চাপ এর পরিমাণ হল 40 নিউটন/m2

উদাহরণ 2: 0.0025 m2 স্থানের উপর কত পরিমাণ বল প্রয়োগ করলে 200,000 Pa চাপ সৃষ্টি করে সম্ভব হবে?

আমরা জানি, পাস্কাল = নিউটন/মিটার2
∴ চাপের পরিমাণ = 200,000 Pa = 200,000 N/m2
⇒ বল = চাপ × ক্ষেত্রফল
= 2000000 × 0.0025
= 500 নিউটন
∴ 500 নিউটন বল প্রয়োগ করতে হবে।

অধ্যায় সমাপ্ত।


লেখিকা পরিচিতি

বিজ্ঞান স্নাতক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষিতা নন্দিতা বসুর পেশা শিক্ষকতা। তিনি বই পড়তে বড় ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, অবসরে, বাসে ট্রামে তো বটেই, শোনা যায় তিনি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বই পড়তে পারেন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।