latitude in bengali
WB-Class-9

অক্ষাংশ ও অক্ষরেখা

বিষয়: ভূগোল । অধ্যায় – ভূপৃষ্টে কোন স্থানের অবস্থান নির্ণয় (পর্ব – এক)


যে কোন কিছুর অবস্থান নির্ণয় হল একটি অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস। আমরা যদি অবস্থান নির্ণয় করতে না পারি তাহলে কোন কিছুকে চিহ্নিত করতেও অসুবিধা হবে।

যে কোন একজন শিক্ষক/ শিক্ষিকা যদি একটি ক্লাসের কোন ছাত্র ছাত্রীর নাম না জানেন তাহলে শ্রেণী কক্ষে সেই নির্দিষ্ট ছাত্র বা ছাত্রীকে চিহ্নিত করতে হলে, তার অবস্থান অনুযায়ী তাকে ডাকেন। যেমন last বা first bench এর ধারে যে বসে আছো সে উঠে দাঁড়াও।

ঠিক তেমনি এত বড় পৃথিবীতে কোন দেশ বা নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার উপায় হল এই অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা।

পৃথিবীকে প্রথমেই আমরা চারটি ভাগে বিভক্ত করেছি, তারা হল – উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব  এবং পশ্চিম এই চারটি গোলার্ধ।

Latitude-and-Longitude

পৃথিবীর একবারে মধ্যবর্তী বা পেটের মাঝখান দিয়ে গেছে  নিরক্ষরেখা (০°) যেটি পৃথিবীকে দুটি গোলার্ধে অর্থাৎ সমানভাগে উত্তর ও দক্ষিনে বিভিক্ত করেছে।

এই ভাবে পূর্ণ বৃত্তাকার লাইনগুলি উত্তর ও দক্ষিণ দিকে এগিয়ে কল্পনা করা হয়েছে।

এই পূর্ণ বৃত্তাকার লাইন গুলি হল অক্ষাংশ। যা নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ধিরে ধিরে বৃদ্ধি লাভ করেছে।

আবার একে বারে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত কতগুলি লম্বা কাল্পনিক রেখা আমরা কল্পনা করেছি। এগুলি হল দ্রাঘিমা রেখা।

এর মধ্যে লন্ডনের গ্রিনীচ শহরের উপর দিয়ে যে রেখাটি গেছে সেটিকে আমরা বলি মূল দ্রাঘিমারেখা, যার মান হল ০°। এর ঠিক বিপরীত দিকের রেখা হল 180°। এই দুটি রেখা পৃথিবী কে পূর্ব ও পশ্চিম দুটি গোলার্ধে বিভক্ত করেছে।

এইভাবে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ গুলির অক্ষের দ্বারা আমরা grid system তৈরি করেছি, এবং এই সকল লাইন গুলি সঠিকভাবে ব্যবহার করে আমরা একটি map বা মানচিত্রটি সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবহার করি।

maggrid
Grid Mapএর একটি নমুনা

অক্ষাংশঃ-

এখন কথা হল এই ভাবে চারটি ভাগে ভাগ করার পর প্রথমেই আসে উত্তর গোলার্ধের কথা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতিটি অক্ষরেখাকে আমরা একটি মানে চিহ্নিত করেছি। এই মানগুলি আমরা দিলাম কীভাবে?

এই মান গুলি আমরা দিয়েছি ক্ষেত্র থেকে কৌণিক দূরত্বের উপর নির্ভর করে অর্থাৎ যে সব অক্ষরেখা পৃথিবীর ঠিক মাঝখান দিয়ে গেছে বলে এটি কেন্দ্রের সাথে ০° তল তৈরী করে, তাই এই রেখাটির মান ০° (নিরক্ষরেখা)।


আরো পড়ুন – কলিঙ্গ দেশে ঝড় বৃষ্টি কবিতাটির সারাংশ

আবার অপর দিকে একেবারে উত্তর বা দক্ষিণ মেরু কেন্দ্রের উপর দিয়ে যে অক্ষরেখাগুলি গেছে তারা পৃথিবীর সাথে 90° তল তৈরি করে বলে এর মান হল 90°। এইভাবে আমরা বিভিন্ন অক্ষাংশের মানগুলি পেয়ে থাকি। পৃথিবী ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে প্রতিটি কাল্পনিক  অক্ষাংশ (111 km) একটি নির্দিষ্ট ভাবে পৃথিবীর উপর দিয়ে টানা হয়েছে।

এই সকল অক্ষাংশগুলির মধ্যে প্রধান অক্ষাংশ হল সাতটি। এগুলি হল

latitude

  1. নিরক্ষরেখা (0°) – এই রেখাটিকে আমরা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বৃত্তও বলতে পারি। এই রেখাটি পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে টানা হয়েছে। আমরা জানি যে পৃথিবীর আকৃতি হল কিছুটা উপবৃত্তাকার। ফলে এর মধ্যবর্তী স্থানটি অনেক বেশি মাত্রায় চওড়া এবং আমরা যত মেরুর দিকে যাব, ততই এর পরিধি ক্রমাগত ছোট হতে থাকবে এবং মেরুর কাছে এসে এটি একটি বিন্দুতে পরিণত হবে।
  2. Tropic of Cancer / কর্কটক্রান্তি (23½° N) – পূর্বের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি যে পৃথিবী তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সাথে 23½° কোনে হেলে অবস্থান করছে। এর ফলে সূর্যের সরাসরি আলো এসে পৌছতে পারে  23½° N এবং 23½° S  অক্ষাংশ রেখা পর্যন্ত। সেই জন্য এই কর্কটক্রান্তি রেখার একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে আছে। 21st June সূর্য সরাসরি ভাবে এই রেখার উপর আলো প্রদান করে।
  3. Tropic of Capricorn / মকরক্রান্তি (23½° S) – অপরদিকে দক্ষিণ গোলার্ধেও 23½° S-এ সূর্য রশ্মি সরাসরি এসে পৌছায় 23rd December-এ। এর ফলে এই অক্ষাংশটিও কর্কটক্রান্তি রেখার ন্যায় তাৎপর্যপূর্ণ।
  4. Arctic Circle / সুমেরু বৃত্ত (66½° N) আমরা পূর্বের অধ্যায়ে আলোচনা করেছি যে সূর্যরশ্মি কৌণিকভাবে এসে 66½° N এবং 66½° S পৃথিবীর উপর পৌছাতে পারে, এর কারণ পৃথিবী তার অক্ষের সাথে 66½° কোণে হেলে আবর্তন করছে। এই রেখার উপর সরাসরি সূর্যের আলো পৌছাতে পারে না।
  5. Antarctic Circle / কুমেরু বৃত্ত (66½° S) – সুমেরু বৃত্তের মতো কুমেরু বৃত্তেও সরাসরি সূর্যের আলো না পৌছিয়ে, কৌণিক ভাবে পৌছায়।
  6. North pole / উত্তর মেরু (90° N) – এটি উত্তর গোলার্ধের শেষ অক্ষাংশ। এখানে বৃত্তটি ছোট হতে হতে, বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
  7. South Pole / দক্ষিণ মেরু (90° S)-  দক্ষিণ গোলার্ধের শেষ বিন্দু হল দক্ষিণ মেরু।

JUMP whats-app subscrition

তাপবলয় বা Heat Zones

সূর্যরশ্মির পতনকোনের উপর নির্ভর করে আমরা পৃথিবীতে মোট তিনটি তাপ বলয় পেয়েছি। এগুলি হল –

  1. উষ্ণমণ্ডল- এই অঞ্চলটির তাপমাত্রা হল সর্বাধিক। সূর্য রশ্মি সরাসরিভাবে এই স্থানে সারাবছর এসে পৌছায়। ফলে এর উষ্ণতা সর্বাধিক। এর পরিসর হল 23½° N থেকে 23½° S পর্যন্ত।
  2. নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল- এই অঞ্চলটিতে সূর্যরশ্মি সরাসরি এসে পৌছতে পারে না। সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে এসে পৌছায় এই অঞ্চলটিতে। এর ফলে এই স্থানটি অতিরিক্ত শীতল বা উষ্ণ কোনোটাই নয়। এই স্থানের তাপমাত্রা অত্যন্ত আরামদায়ক। তাই এই স্থানটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল নামে পরিচিত। এর পরিসর 23½° N থেকে 66½° N এবং 23½° S থেকে 66½° S পর্যন্ত।
  3. শীতল অঞ্চলঃ- এই স্থানটি হল একেবারে উত্তর বা দক্ষিণে অবস্থিত। এই স্থানটির তাপমাত্রা খুবই কম। শীতকালে এমনকি সারা বছরের প্রায় সব সময়ই, এই স্থানটি বরফে ঢাকা থাকে। এর ফলে অতিরিক্ত ঠান্ডা হয় এই স্থানটিতে। এই অঞ্চলটি শীতল অঞ্চল নামে পরিচিত। এই স্থানে মৃত্তিকা নেই বললেই চলে। এর পরিসর হল 66½° N থেকে 90° N এবং 66½° S থেকে 90° S পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন


অক্ষাংশ এর মান নির্ণয়ের অন্যান্য কিছু পদ্ধতি

আমরা পূর্বেই অক্ষাংশের মান নির্ণয়ের কিছু পদ্ধতি আলোচনা করেছি। এটি ছাড়া ও আরও কিছু পদ্ধতি রয়েছে অক্ষাংশের মান নির্ণয়ের জন্য। এগুলি হল-

  1. Polar star observation বা ধ্রুবতারার অবস্থান অনুযায়ীঃ- পৃথিবীর তল হল বক্রতল অর্থাৎ এটি অসমান। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে উত্তর আকাশে একটি নির্দিষ্ট স্থানেই ধ্রুবতারার অবস্থান। সেই অবস্থানটিকে নিরীক্ষণ করলেও আমরা সেই স্থানের কোনিক দূরত্ব জানতে পারি সেই কোনিক দূরত্বের মান হল সেই স্থানের অক্ষাংশের মান। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, নিরক্ষরেখা থেকে সুমেরুর দিকে 1° করে এগিয়ে গেলে আকাশে ধ্রুবতারার কোনিক মানও (উন্নতি কোন) 1° করে বেড়ে যাবে। সুমেরু বিন্দুতে পৌঁছালে ধ্রুবতারাকে ঠিক মাথার উপর অবস্থিত হতে দেখা যাবে।
  2. মধ্যদিনের সূর্যের কৌনিক মান/Midday Sun observation-

(a) যেকোন স্থানের সর্বোচ্চ কৌনিক অবস্থান সূর্য থেকে ও আমাদের অবস্থান বা অক্ষাংশের মান জানতে সাহায্য করে।

b) সূর্যের দুপুর 12টায় হয় সর্বোচ্চ অবস্থান সেই অবস্থান থেকে পৃথিবী তলের মান নির্ণয় করতে পারলে আমরা পৃথিবীর সেই স্থানের মান বা অক্ষাংশগত মানও জানতে পারবো।

জেনে রাখা ভালোঃ  সেক্সট্যান্ট যন্ত্রের সাহায্যে কৌণিক পরিমাপ ও অক্ষাংশ নির্ণয় করা হয়। যদিও বর্তমানে কৃত্তিম উপগ্রহের সাহায্যে (GPS) খুব সহজেই কোন স্থানের অক্ষাংশ বা দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করা যায়।

সেক্সট্যান্ট যন্ত্রের ব্যবহার (সৌজন্যে Wikipedia)


অক্ষাংশের বৈশিষ্ট্য

  1. নিরক্ষরেখা হল বৃহত্তম অক্ষরেখা।
  2. নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর বা দক্ষিণে গেলে অক্ষরেখাগুলির মান বৃদ্ধি হয়।
  3. দুটি অক্ষরেখার মধ্যে দূরত্ব সর্বদা সমান হয়। কারণ পৃথিবীর পরিধি হল প্রায় 40,000 কিলোমিটার এবং এটি একটি পূর্ণবৃত্ত। অর্থাৎ বলা যায় দুটি অক্ষরেখার মধ্যবর্তী দূরত্ব (40,000 / 360°) 111 কিলোমিটার।
  4. একটি নির্দিষ্ট অক্ষরেখা ধরে হাটতে থাকলে আমরা একই রকম জলবায়ু দেখতে পাবো।
  5. প্রতিটি অক্ষরেখাই পূর্ণবৃত্ত; কেবল মাত্র দুটি অর্থাৎ 90° N এবং 90° S ছাড়া।
  6. একটি নির্দিষ্ট অক্ষরেখার উপর অবস্থিত প্রতিটি স্থানে একই সঙ্গে দিন ও রাত্রি সংগঠিত হয় না।
  7. অক্ষরেখা গুলি প্রতিটি প্রতিটির সাথে সমান্তরাল।
  8. পৃথিবীতে মোট 180টি অক্ষরেখা আছে। আর নিরক্ষরেখা নিয়ে মোট 181টি অক্ষরেখা আছে।
  9. উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের সর্বোচ্চ অক্ষরেখা দুটি ক্রমাগত ছোট হতে হতে বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

পরবর্তী পর্বে আমরা দ্রাঘিমা ও দ্রাঘিমারেখা নিয়ে আলোচনা করবো।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Sayantani Bhaduri
কলকাতার জুলিয়ান ডে বিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষিকা সায়ন্তনীর ছোটবেলা থেকেই ভূগোলের সাথে আত্মিক যোগাযোগ। পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো ও পাহাড় চড়ার আনন্দ উপভোগ করতে খুব ভালোবাসেন সায়ন্তনী।

Leave a Reply