akashe-satti-tara-sorolartho
WB-Class-9

আকাশে সাতটি তারা – কবিতার সরলার্থ

বাংলানবম শ্রেনি – আকাশে সাতটি তারা (পদ্য)


আগের পর্বে আমরা আকাশে সাতটি তারা কবিতার উৎস, সারাংশ এবং মূল বক্তব্য আলোচনা করেছি। এই পর্বে আকাশে সাতটি তারা কবিতার বিশদে সরলার্থ আলোচিত হল। আগের পর্বটি যদি পড়া না হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা অনুরোধ করবো এই পর্ব পড়ার আগে, আগের পর্বটি অবশ্যই একবার পড়ে নেবার জন্য।


[পড়ুন → আকাশে সাতটি তারা কবিতার প্রথম পর্ব]

বিষদে সরলার্থ

জীবনানন্দের কবিতার মূল স্তম্ভ হল তাঁর চিত্রকল্প নির্মাণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন কিছু অপ্রচলিত শব্দ প্রয়োগ করেন তিনি যা রহস্যের জন্ম দেয়। আলোচ্য ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটিও এইরকম একটি রচনা। পল্লী বাংলার যে মহৎ রূপ এবং প্রাকৃতিক সম্ভার তা কবি ফুটিয়ে তুলেছেন এই কবিতায়। আকাশে সাতটি তারা অর্থাৎ সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখা যায় আকাশে, কবি ঘাসের উপর বসে প্রকৃতির শোভা দেখেন।

এ প্রসঙ্গে সাতটি তারার নাম বলে দেওয়া যাক – ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, বশিষ্ঠ, অত্রি, অঙ্গিরা ও মরীচি। প্রাচীন ভারতীয় ঋষির নামেই এই নামকরণ। ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলার রূপ-সৌন্দর্য যেন জড়িয়ে ফেলেন কবি এভাবে। কবি লেখেন কামরাঙার মতো লাল মেঘ যেন গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে। কবির মনে হয় যেন মৃত মনিয়ার রক্তে সমুদ্রের জল লাল হয়ে গেছে।

‘…কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো

গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে’

এখানেই তৈরি হল এক রহস্য। কী এই ‘মনিয়া’?

অনেকে বলেন যে এটি আসলে মনিয়া বা মুনিয়া পাখি। কিন্তু একেবারেই সেরূপ অর্থে এই শব্দটি প্রযুক্ত হয়নি। আসলে ‘মনিয়া’র উৎস একটি গ্রিক-ল্যাটিন শব্দ। গ্রিক menos শব্দের অর্থ নিঃসঙ্গ বালক, ল্যাটিন monica-র অর্থ শিশুকন্যা। এমনকি পর্তুগিজ ভাষায় এই menos / monica পরিবর্তিত হয়ে menina-তে পরিণত হয়েছে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

অনুমান করা যায় আরবি ভাষায় এই menina থেকেই মুনিয়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে এবং আরবি ভাষার প্রভাবে বরিশাল, চট্টগ্রামের বাংলা ভাষায় এই শব্দটি এসে গেছে। তাই মনিয়া-র অর্থ পাখি নয়, কন্যাসন্তান। জীবনানন্দের দিনলিপি থেকে জানা যায় মনিয়া আসলে সৈদপুরের এক পাদ্রী এবং এক হিন্দু রমণীর কন্যা। কবির স্মৃতিতে ছিল বাংলার প্রাচীন গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জনের প্রথার কথা।

এই কন্যাসন্তান মনিয়াও যেন গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে। আর লাল রঙ যেন সেই কন্যার মৃত্যুকে ইঙ্গিত করেছে। মনিয়ার মতো কন্যারা যেভাবে গঙ্গাসাগরের অতলে ডুবে যায় নিঃশব্দে, তেমনই আকাশের হলুদাভ লাল মেঘ দিগন্তের ওপারে ঢেউয়ের গভীরে যেন ডুবে গেছে। বাংলায় নীল সন্ধ্যা নেমে আসলে কবির মনে হয় যেন কোনো এক কেশবতী নারীর চুলের বন্যায় সমস্ত চরাচর ঢেকে গেছে। সেই নারীর চুলের ঘন কালো রঙ রাতের আকাশের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। একটি কন্যার কথা আছে কবিতায়, সেই কিশোরীই হয়তো সেই মনিয়া। বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে সেই কন্যা যেন মিশে গেছে ওতপ্রোতভাবে। কবি লিখছেন –

‘অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত,

জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে’

এর পরের পংক্তিতে কবি পুকুরের জলের গন্ধ, চাঁদা-সরপুঁটি মাছের গন্ধ, কলমি শাক, হাঁসের ভেজা পালক – এইরকম সনাতন বাংলার কিছু প্রাকৃতিক উপাদান তুলে আনেন। বলা ভালো ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতাতেই বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি – দেশজ ঐতিহ্যের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলার মাঠ-নদী-অবহেলিত তরুলতা কিংবা ভগ্ন মঠ সবই পরম মমতায় কবি লালন করেন স্মৃতিতে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

জীবনানন্দ হয়তো অনুভব করেছিলেন আসন্ন পৃথিবীর আমূল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে খুব দ্রুত নগরায়ণে বদলে যাচ্ছিল তামাম বিশ্ব – নগরায়ণ, বিশ্বায়ন, পুঁজির আগ্রাসন ইত্যাদি সমস্ত বিষয় পালটে দিচ্ছিল বাংলার শান্ত-নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশকে। তাই জীবনানন্দ হয়তো তাঁর স্মৃতিতে থাকা বাংলার প্রাচীন মহিমান্বিত রূপ কবিতায় রূপ দিয়ে কালোত্তীর্ণ করে তুলতে চেয়েছেন। মুথা ঘাস, বট ফল এমন অতি তুচ্ছ অবহেলিত উপাদানকেও কবি সস্নেহে স্থান দিয়েছেন কবিতায়। এইরকমই জীবনানন্দের নানা কবিতায় বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস, এমনকি বহু আনকোরা গাছের নাম পাওয়া যায়। তাঁর মাতৃভূমি বাংলাকে তিনি এতটাই ভালোবাসেন, এতটাই সংলগ্ন তাঁর প্রাণ বাংলার ভূমির সঙ্গে।

subscribe-jump-magazine-india

মনে রাখতে হবে কবির দেখা বাংলা কিন্তু অবিভক্ত বৃহৎ বঙ্গদেশ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা’ । মাতৃভূমির এই প্রাণের রঙ্গ কবি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন, অনুভব করেছেন বাংলার প্রাণের উত্তাপ। তাই তিনি লেখেন –

‘…কিশোরীর চালধোয়া ভিজে হাত – শীত হাতখান,

কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাস – লাল লাল বটের ফলের;

ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা – এরই মাঝে বাংলার প্রাণ;’

আর এই বাংলার প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা ঝরে পড়েছে তাঁরই অপর এক কবিতায়, যেখানে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন – ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’

এই আলোচনার শেষে কবিতাটির বিশেষ গঠন নিয়ে দু-চার কথা না বলা অন্যায় হবে।

‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতাই একেকটি সনেট। এখন ‘সনেট’ হল কবিতার এমন এক বিশেষ রূপ যেখানে দুটি পৃথক স্তবকে মোট ১৪টি পংক্তি এবং প্রতি পংক্তিতে ১৪টি অক্ষরের বাঁধুনিতে নির্দিষ্ট ভাব ব্যক্ত করেন কবি। অর্থাৎ সনেটে ১৪টি লাইন থাকবে আর প্রতি লাইনে থাকবে ১৪টি অক্ষর (এই অক্ষর আসলে ‘দল’ বা syllable)।

সনেট মূলত দুই প্রকারের – পেত্রার্কীয় এবং শেক্সপীরিয়। পেত্রার্কীয় সনেটে দুটি স্তবকের প্রথমটিতে ৮টি আর পরেরটিতে ৬টি পংক্তি থাকে; এদের যথাক্রমে অষ্টক (octave) আর ষটক (sestet) বলে। আর শেক্সপীরিয় সনেট অনেকটাই আলাদা। এখানে ৮টি পংক্তির অষ্টক থাকে প্রথমে আর তারপর ষটকে দুটি করে পংক্তি তিনবার থাকে। শেষ দুই পংক্তিকে বলা হয় couplet।

পেত্রার্কীয় সনেটের ছন্দোরূপ এইরকম – ab ba ab ba, cde cde।

শেক্সপীরিয় সনেটের ছন্দোরূপ এইরকম – ab ba ab ba, cd ef gg।

জীবনানন্দের সনেটগুলি পেত্রার্কীয় রীতির সঙ্গে মিল থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তিনি নতুন ছন্দোরীতি এনেছেন কবিতায়।

‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার ছন্দোরীতি হল – ab ba ab ba, cd cd cd। এ থেকে ধারণা করা যায় সহজেই যে জীবনানন্দ ঐ দুই ধারার সনেট রীতির মিশেলে নিজস্ব এক প্রকার রীতিতে কবিতা লিখেছেন।

এখানেই কবি হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব।

আলোচনা সমাপ্ত।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।