poscimbonger-krishi-kaj
WB-Class-9

পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকাজ

ভূগোলনবম শ্রেণি – পশ্চিমবঙ্গ (অষ্টম পর্ব)।


গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা সম্পর্কে এই পর্বে আমাদের আলোচনার বিষয় পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকাজ।

পশ্চিমবঙ্গ হল কৃষিপ্রধান রাজ্য।

পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত মনোরম। কৃষিকাজ পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২/৩ শতাংশ লোক কৃষির উপর নির্ভর করে এবং এখনও অবধি পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ গ্রামই কৃষিনির্ভর।

পশ্চিমবঙ্গের কৃষির বিভিন্ন দিক

1) পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের (ধান, গম, পাট) প্রাধান্য বেশি।
2) বাণিজ্যিক ফসলের প্রাধান্য কম
3) কিছু কিছু অঞ্চলে কৃষি জলসেচ নির্ভর হলেও পশ্চিমবঙ্গের বেশিরই ভাগ অঞ্চলই এখনও অবধি মৌসুমী বায়ুর ওপর নির্ভরশীল।
4) উত্তরের কিছুটা অংশ বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশীরভাগ অঞ্চলেই নিবিড় কৃষিকাজ হয়।
5) পশ্চিমবঙ্গে বিকল্প কোনো কাজ বা শিল্প সেইভাবে গড়ে না ওঠায় কৃষিকাজের উপর সর্বদাই মানুষের নির্ভরশীলতা বেশী থাকে।
6) হর্টিকালচারের চাষ খুব বেশি লক্ষ্য করা যায় না।
7) শহরের নিকটবর্তী অঞ্চল জুড়ে সবজি ও ফুলের চাষ হতে দেখা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ফসলের শ্রেণীবিভাগ

খাদ্যশস্য- ধান ,গম ,ডাল, তৈলবীজ।

তন্তুশস্য- পাট।

বাগিচা ফসল- চা, কমলালেবু , সিঙ্কোনা ,তামাক।

হর্টিকালচার- পটল, ঢ্যাড়শ, বেগুন, ফুলকপি ,বাঁধাকপি, ফুলকপি প্রভৃতি।

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান কয়েকটি ফসলের পরিচিতি

পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যশস্য

ধান
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল হল ধান।

ভারতের মধ্যে ধান উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থানাধিকার করে আছে।

ধান চাষের সময়কাল

বছরের বিভিন্ন ধরনের ঋতুতে তিন ধরনের চাষ হতে দেখা যায়।

আমন ধান
পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত অঞ্চল জুড়ে বর্ষাকালে যে ধান চাষ হয় তা হল আমন ধান।

এই মানচিত্রে ধান উৎপাদক অঞ্চলটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বোরো ধান

জলসেচের সাহায্যে শীতকালের শুস্ক আবহাওয়ায় যে ধান চাষ হয় তা হল বোরো ধান এই ধানের ফলন খুব বেশী।

আউশ ধান

গ্রীষ্ম ঋতুতে আউশ ধানের চাষ হয়, তবে এই ধানের ফলন এখন খুবই কমে গেছে।

ধানের ব্যবহার

ধান থেকে আমরা চাল পাই সেই থেকে ভাত, মুড়ি, চিঁড়ে, খই প্রভৃতি পাওয়া যায়।এবং ধানের বাকি অংশ পশু খাদ্য ও জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার হয়।

ধান চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ

জলবায়ু

ধান চাষের জন্য উষ্ণতা লাগে ২৫˚ – ৩০˚ সেঃ উষ্ণতা লাগে এবং বৃষ্টিপাত লাগে প্রায় ১০০-২০০ সেমি। ধান চাষের জন্য প্রচুর পরিমানে জল লাগে বলে ধানকে উষ্ন আর্দ্র জলবায়োর ফসল বলা হয়। তবে ধান কাটার সময় শুষ্ক আবহাওয়া প্রয়োজন হয়।

মাটি

ধান চাষের জন্য পলিগঠিত উর্বর মাটি-ই প্রয়োজন।তবে দোঁআশ, এঁটেল মাটিতেও ধান চাষ ভাল হয়।

ভূপ্রকৃতি

ধান চাষের আর্দশ হল সমভূমি যেখানে জল জমা হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল ধান

ধান চাষের অর্থনৈতিক পরিবেশ

শ্রমিক
ধান চাষের জন্য প্রচুর পরিমাণে লাগে বলা যেতে পারে ধান একটি শ্রমনিবিড় ফসল।

জলসেচ
ধান চাষের জন্য প্রচুর পরিমানে জল লাগে তাই শীত কালীন যে ধান চাষ হয় তার জন্য জলসেচ অতি প্রয়োজনীয়।

উন্নত বীজ ও সার
এগুলি ফলনের মাত্রা বাড়ায় যার ফলে ধান চাষ লাভ জনক হয়।

ধান উৎপাদক অঞ্চল

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ধান চাষ সবচেয়ে বেশী হয় তাই এই অঞ্চলকে ধানের গোলা বলা হয়। এছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলী, পশ্চিম মেদিনীপুর এই সব জায়গাতেই ধান চাষের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়।

ধান চাষের সমস্যা

1)সব জায়গায় জলসেচের ব্যবস্থা না থাকায় বোরো ধান উৎপাদন খুবই কম উৎপাদিত হয় এবং সেই সঙ্গে দোফসলী চাষ ও খুব কম পরিমাণে হয়।
2)এখন অনেক জায়গায় প্রাচীন পদ্ধতিতে ধান চাষ হওয়ায় ধান উৎপাদন কম হয়।
3) রপ্তানী যোগ্য সুগন্ধি ধানের ফলন কম।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

পশ্চিমবঙ্গের তন্তুশস্য

পাট

পাট হল অর্থকারী ফসল।পাট চাষের ফলে পশ্চিমবঙ্গের আয় অনেকটা বেড়েছে ।

পাটকে সোনালী তন্তু বলা হয়।

পাট চাষের সময়কাল

পাট সাধারণত আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ুর ফসল তাই গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু মিলিয়ে পাট চাষ হয়।

পাটের ব্যবহার

পাটশাক খাদ্য হিসাবে এবং পাট কাঠি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয়।এছাড়াও পাট থেকে চট থলে দড়ি ত্রিপল প্রভৃতি তৈরি করা হয় তৎকালীন সময়ে পাট থেকে শৌখিন দ্রব্য বোর্ড প্রভৃতি তৈরি করা হয়।

পাট চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ

জলবায়ু
পাট চাষের জন্য ২০˚-৩৫˚ সেঃ উষ্নতার প্রয়োজন হয়।এবং বৃষ্টিপাত লাগে প্রায় ২০০-৩০০ সেমি বৃষ্টিপাত।ভারী বৃষ্টি ও গরমে ভালো পাট চাষের জন্য উপযুক্ত।কালবৈশাখী ঝড় পাট চাষের ক্ষেত্রে বেশ সুবিধাজনক হয়।

এই মানচিত্রে চা ও পাট উৎপাদক অঞ্চলগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাটি
দোঁয়াশ ও পলি মৃত্তিকাতে পাট চাষ ভালো হয়।এবং পটাশ ও নাইট্রোজেন মিশ্রিত মাটিও পাট চাষের পক্ষে আর্দশ।

ভূমির ঢাল
নিম্ম সমতলভূমি পলি মিশ্রিত বদ্বীপ অঞ্চলে পাট চাষ ভালো হয়।

জলাশয়
পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর জন্য প্রায় ১৫-২০ দিন জলে পাটকে ডুবিয়ে রাখতে হয় তাই পাট চাষ অঞ্চলের কাছাকাছি পুকুর ডোবা বা যে কোনো জলাশয় থাকা জরুরী।

পাট চাষের অনুকূল অর্থনৈতিক পরিবেশ

শ্রমিক
পাট চাষের ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমানে শ্রমিক লাগে তাই পাট চাষ বেশীর ভাগই জনবহুল এলাকাতে হয়।

পরিবহন ব্যবস্থা
পাট চাষ রপ্তানী নির্ভর তাই পাট জমি থেকে শহর বা কারখানায় পাট আসা পুরোটাই সুলভ পরিবহন ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে।

উন্নত বীজ ও সার
পটাশিয়াম মিশ্রিত সার পাটের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে।

পাট উৎপাদক অঞ্চল

পাট উৎপাদক জেলাগুলি হল উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিন ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হুগলী, উত্তর দক্ষিন দিনাজপুর, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার। এই সমস্ত জেলা গুলিতে খুব ভালো মানের পাট চাষ হয়।

পাট চাষের সমস্যা

1) পাটের বিকল্প কৃত্রিম জিনিসের চাহিদা বাড়ায় পাটের চাহিদা কমছে।
2) পশ্চিমবঙ্গের পাট উন্নত মানের হলেও বাংলাদেশের মতো ভালোমানের পাটের চাষ বিরল।

পশ্চিমবঙ্গের বাগিচা ফসল

চা

চা অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। দার্জিলিং এর চা এর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ১৮৫৫ সালে এখানে চা চাষ শুরু হয়।

চায়ের প্রকারভেদ

১) কালো সেঁকা চা- আমাদের দেশে এই চা বেশী খাওয়া হয়।
২) সবুজ চা- এই চা চিনে বেশী জনপ্রিয়।
৩) ইষ্টক চা- এই চা রাশিয়ায় বেশী পালন করা হয়।
৪) ওলং চা- তাইওয়ানে পাওয়া যায়।

চা চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ

জলবায়ু-
চা চাষে উষ্ণতা লাগে ২০ ˚- ৩০˚ সেঃ এবং বৃষ্টিপাত লাগে প্রায় ১৫০ -২০০ সেমি। এবং কুয়াশা চা চাষের পক্ষে ভালো তবে চা চাষের জন্য তুষারপাত খুবই ক্ষতিকারক।

মাটি
লোহা ও ম্যাঙ্গানিজ মেশানো উর্বর মাটি চা চাষের পক্ষে ।পার্বত্য অঞ্চলের ফসফরাস ও পটাশ মিশ্রিত মাটিতেও চা চাষের পক্ষে ভালো।

ভূমির ঢাল ঢালু পার্বত্য অঞ্চল যেখানে সহজে জল জমতে পারে না এবং উচ্চতা থাকে প্রায় 1000-1500 সেমি সেখানে চা চাষের পক্ষে ভালো।

ছায়াদানকারী গাছ
চা গাছ সরাসরি সূর্যালোকের আলো সহ্য করতে পারেনা বলে বাগিচাতেই ছায়াদানকারী গাছ হিসাবে অন্যান্য বড় গাছ লাগানো হয়ে থাকে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

চা চাষের অনুকূল অর্থনৈতিক পরিবেশ

শ্রমিক
বাগান পরিচর্যা ও চা এর গুণমানের জন্য সুদক্ষ শ্রমিক লাগে।

পরিবহন ব্যবস্থা
উপযুক্ত পরিবহণ ব্যবস্থা চা চাষকে লাভজনক চাষে পরিণত করে্রেছে।

কারখানা
চা প্রস্তুত ও পাচকেজিং এর জন্য বাগানের কাছেই কারখানা থাকে।

মূলধন
চা বাগিচা তৈরির বেশ কয়েকবছর পর উতপাদন শুরু হয় তাই সর্বদা মূলধনের প্রয়োজন হয়।

চা উৎপাদক অঞ্চল

আমাদের রাজ্যের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে চা চাষ হয়।

চা চাষের সমস্যা

১) অধিকাংশ চা বাগিচা পুরানো বলে ফলন কম হয়।
২)হেক্টর প্রতি উৎপাদন কম হওয়ায় অনেক চা বাগান বন্ধ হয়ে গেছে।

পার্বত্য অঞ্চলে চা বাগানে চা গাছের দৃশ্য

পশ্চিমবঙ্গের কৃষির সমস্যা

১) পশ্চিমবঙ্গের এখনও অনেক জায়গায় আছে যেখানে প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয় এবং পুরানো যন্ত্রপাতি দিয়ে চাষ করায় চাষের মান এখনও সেভাবে উন্নত নয়।
২) বছরের একবার চাষ হওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই ভাগী চাষীদের বেকার অবস্থায় থাকতে হয়।
৩) অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের হয়।
৪) রপ্তানি নির্ভর ফসলের চাষ তেমনভাবে হয় না।
৫) জনসংখ্যার চাপ বেশি বলে মাথাপিছু আয় কম।
৬) বাণিজ্যিক ফসলের চাষ কম হওয়ায় আয় কম।

অষ্টম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → পশ্চিমবঙ্গের শিল্প


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী মোনালিসা মাইতি। পড়াশোনার পাশাপাশি বই পড়তে এবং গান গাইতে ভালোবাসেন মোনালিসা।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

IX-geo-8-h