WB-Class-9

বলকান জাতীয়তাবাদ

ইতিহাসনবম শ্রেণি – উনবিংশ শতকের ইউরোপ – রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সংঘাত(পঞ্চম পর্ব)


আমরা আগের অধ্যায়গুলিতে ইউরোপের প্রধান শক্তিশালি দেশগুলির মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা বলকান অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করবো।

এই প্রসঙ্গে আসার আগে আমরা বলকান অঞ্চল সম্পর্কে একটু জেনে নিই।

ইউরোপের পূর্ব অঞ্চলকে বলকান অঞ্চল বলা হয়। গ্রিস, বুলগেরিয়া, মোলদাভিয়া, সার্বিয়া, রোমানিয়া ইত্যাদি অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল পঞ্চদশ শতকে তুর্কি শাসক অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তুর্কি শাসকরা ছিলেন এশিয় এবং ইসলামী সম্প্রদায়ের। অপরদিকে বলকানবাসীরা ছিলেন ইউরোপিয় এবং খৃস্টধ্রমানুলম্বি। সুতরাং শাসক এবং প্রজাদের মধ্যে সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের ব্যাপক বিভেদ ছিল।

Southeast_Europe_1812

অপর দিকে যখন ইউরোপের অন্যন্য দেশগুলি যখন ধীরে ধীরে প্রাচীনতন্ত্র বাতিল করে প্রজাতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউরোপ জুড়ে শিল্পবিপ্লবের প্রসার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেই সময় তুরস্ক শাসিত বলকান অঞ্চলের শাসকদের মধ্যে সংস্কারের কোন আগ্রহ ছিল না। শুধু তাই নয় তৎকালীন তুর্কি শাসকরা ছিলেন অকর্মণ্য, পরিশ্রম বিমুখ এবং প্রাচীনপন্থী। তুর্কিরা শুধুমাত্র সামরিক শক্তির জোরেই দীর্ঘকাল বলকান অঞ্চলের শাসন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।

ইউরোপিয় শাসকরা যেখানে ক্রমাগত সামরিক এবং সামাজিক সংস্কারে মননিবেশ করছিলেন সেখানে বলকান শাসকরা কোনরূপ সংস্কারের চেষ্টা করেননি। এর ফলে তুর্কি সেনা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ অন্যন্য শক্তিরা (প্রধানত রাশিয়া) বলকান অঞ্চল নিজেদের দখলে আনতে সচেষ্ট হন।

বলকান জাতীয়তাবাদ

তুর্কি অপশাসন থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যে জাতীয়াতাবাদী ভাবধারা সঞ্চারিত হয়।

Karte_Suedosteuropa_03_01
বলকান অঞ্চল (নীল বর্ডার দিয়ে ঘেরা)

গ্রিস

বলকান অঞ্চলের অন্যতম দেশছিল গ্রিস। ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে হেটারিয়া ফিলিকে বা বান্ধব সভা নামে একটি গুপ্ত সঙ্ঘ গড়ে ওঠে। এদের কার্যকলাপ সমগ্র গ্রিসে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ফ্রান্সের জুলাই বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সময়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহ শুরু হয় এবং অবশেষে গ্রিস স্বাধীনতা পায়।

Siège_de_l'Acropoles
তুরস্ক বাহিনীর সাথে গ্রীকদের যুদ্ধ।

বুলগেরিয়ায়, সার্বিয়া ও অন্যান্য দেশ

জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ধীরে ধীরে বলকান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তা ইউরোপের প্রধান দেশগুলির সমর্থন লাভ করে। যদিও এই সমর্থনের পেছনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলির নিজ নিজ স্বার্থ ছিল। ১৮৭৮ সালে বার্লিনের চুক্তির সাহায্যে বলকান অঞ্চলের ব্যবচ্ছেদ করা হয়। এর ফলে বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশগুলি বুঝতে পারে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ তাদের একাই লড়তে হবে। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে গড়ে ওঠে বলকান লীগ। পরবর্তী সময়ে বলকান লীগের সাথে তুরস্ক সুলতানের যুদ্ধ হয়; এবং সুলতান হেরে যান। সুলতানের সাথে লন্ডনের চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এর ফলে বলকান অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানই স্বাধীন হয়ে যায়।

এই নিয়ে আমরা পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

subscribe-jump-magazine-india

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৪ – ১৮৫৬)

কত সামান্য বিষয় কিভাবে একটা ব্যাপক রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হতে পারে তার উদাহরণ হল ক্রিমিয়ার যুদ্ধ।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, বলকান অঞ্চলের দখলদারিতে রাশিয়ার বিশেষ আগ্রহ ছিল। সপ্তদশ শতক থেকেই রাশিয়া এই ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিতে শুরু করে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল এই উদ্যোগেরএকটি বিশেষ পরিণতি।

Panorama_dentro
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ

তুরস্ক সাম্রাজ্যের অধীন জেরুজালেম হল খ্রিষ্টানদের একটি পবিত্র স্থান। এই স্থানের একটি গির্জার (গ্রোটো) দখলকে কেন্দ্র করে বিবাদ শুরু হয়। খৃস্ট সমাজ তখন মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল রোমান ধর্মযাজক এবং গ্রীক ধর্মযাজক। এদের মধ্যে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড রোমান ধর্মযাজক এবং রাশিয়া গ্রীক ধর্মযাজকদের মান্যতা দিত। সুতরাং এই গ্রোটো গির্জার চাবি কোন ধর্ম যাজকদের দখলে যাবে, তা নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং তা যুদ্ধে পরিণতি লাভ করে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

প্রকৃত কারণ

আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি ধর্মীয় যুদ্ধ মনে হলেও, আদপে এটি তা ছিল না।

রাশিয়ার জার (রাশিয়ার সম্রাটকে জার বলা হয়) প্রথম নিকোলাস প্রথম থেকেই তুরস্কের প্রবল সমালোচক ছিলেন এবং তুরস্ককে ‘ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি’ বলতেন। তিনি বলকান অঞ্চল ব্যবচ্ছেদে ইংল্যন্ডের সমর্থন চান। ইংল্যান্ড সরাসরি প্রস্তাব নাকচ না করলে; জার তা সম্মতি হিসাবে ধরে নেন। ফলস্বরূপ জার বলকান অঞ্চলের মোলদাভিয়া ও ওয়ালচিয়া দখল করেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশ এতে আপত্তি জানালেও, রাশিয়া তাদের অধিগ্রহণে অনড় থাকে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

অবশেষে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, পরে পিডমন্ড এবং সার্ডিনিয়া এই যুদ্ধে যোগ দেন। এই যুদ্ধ দুই বছর ধরে চলে; রাশিয়া পরাজিত হয় এবং ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি হয়।

Edouard_Dubufe_Congrès_de_Paris
প্যারিসের চুক্তি

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলাফল

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ইউরোপের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর ফলে –

  • রাশিয়া তুরস্ককে অধিগৃহীত অংশগুলি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
  • ইউরোপের মধ্যে রাশিয়ার আধিপত্য খর্ব হয়। এমনকি রাশিয়ার মধ্যেও জারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে থাকে।
  • বালকান অঞ্চলের জাতীয়াতাবাদী আন্দোলন বৃদ্ধি পায়।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply