Chimera-in-bengali
Article (প্রবন্ধ)

কাইমেরিজম : জৈবিক দ্বৈত সত্ত্বার গল্প !



গ্রিক ভাষায় “ডাই(Di)” মানে হচ্ছে দুই, আর “মেরোস(meros)” বলতে বোঝায় একক বা ইউনিট।এই দুইয়ের মিলনে হয় ডাইমার(Di-mer)।

রসায়নবিজ্ঞান পড়েছেন যারা,তাদের কাছে “মনোমার”,”ডাইমার”,”পলিমার” শব্দগুলো নিঃসন্দেহে খুব পরিচিত। মনোমার হলো ক্ষুদ্র একক, আর বহুসংখ্যক মনোমার একত্রিত হলে তার নাম হয় পলিমার। খুব সহজেই বোঝা যায়, দুইটি মনোমার একত্রিত হলে তার নাম হয় ডাইমার।

লিখছি যা নিয়ে সেটাও এক অর্থে ডাইমারিজম-যেখানে আমার মনোমার হলো পরস্পর আলাদা ডিএনএ সেট- আর একেকটা স্বতন্ত্র ডিএনএ সেটই যে একেকটা মানুষ(তার মানে আমি দুটো আলাদা মানুষকে মনোমার বানিয়ে ডাই-হিউম্যান জাতীয় কিছু বানাবো!), এটা বললে নিশ্চই অত্যুক্তি হবে না!

ঘটনার সূত্রপাত

সময়টা ১৯৫৩। Mrs. McK গিয়েছিলেন উত্তর ইংল্যান্ডের একটা ব্লাড ক্লিনিকে; রক্তদান করতে। তিনি ব্লাড ডোনেট করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।এদিকে, সেই ক্লিনিকের একজন স্থানীয় চিকিৎসক ভদ্রমহিলার ডোনেট করে যাওয়া ব্লাড পাঠালেন স্ক্রিনিং টেস্টের জন্যে। কিন্তু, স্ক্রিনিং টেস্টের রিপোর্ট দেখে তিনি রীতিমত আঁতকে উঠলেন। এক ব্যক্তির শরীরে একই সাথে দু’ধরণের রক্তের অস্তিত্ব! যা কিনা বায়োলজিক্যালি একজন মানুষের পক্ষে বহন করা অসম্ভব!(চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে Mrs. McK-ই হচ্ছেন প্রথম Chimeric (কাইমেরিক)!)


[আরো পড়ুন – পাই-এর ইতিহাস]

এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরের ঘটনা।

২০০২ সাল, সেসময় আমেরিকার অধিবাসী ‘লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ড’ যখন তৃতীয়বারের মতো গর্ভবতী,তখন স্বামীর সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। লিডিয়া আদালতে আবেদন করেন আগের দুই সন্তানের অভিভাবকত্ব পাবার জন্যে। আদালত নির্দেশ দেন লিডিয়ার ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট জমা দেবার জন্যে। ডিএনএ রিপোর্ট জমা দেয়া হয়। রিপোর্টে প্রমাণিত হয় ঐ দুই সন্তানের কারো সাথেই লিডিয়ার ডিএনএ ম্যাচ করেনি!

অর্থ্যাৎ এতদিন যাদেরকে লিডিয়া সন্তান বলে মানুষ করেছেন, ডিএনএ টেস্ট তাদেরকে “Unrelated Individual” বা অসম্পর্কিত বলে দাবি করছে! আদালতে প্রতারণা মামলায় ফেঁসে যান লিডিয়া। কিন্তু তার আইনজীবীর পরামর্শে আদালত লিডিয়াকে প্রতারক হিসেবে সাব্যস্ত করতে একটু সময় নেন । তবে এক শর্তে- তার তৃতীয় সন্তান জন্মদানের সময় একজন ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকবেন। পরে সেই সন্তানের সাথে আবার লিডিয়ার ডিএনএ ম্যাচ করে দেখা হবে।

দেখতে দেখতে তৃতীয় সন্তানের জন্মদানের সময় চলে এলো। এক হাসপাতালে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তৃতীয় সন্তান জন্মদান করেন লিডিয়া। পরে ডিএনএ টেস্ট করা হয় তাদের। ডিএনএ রিপোর্টে পাওয়া গেলো- এই সন্তানের সাথেও লিডিয়ার ডিএনএর কোনো মিল নেই! কিন্তু উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেট তো রিপোর্ট করলেন তার চোখের সামনেই লিডিয়া সন্তান জন্মদান করেছিলেন।  আদালত রায় দিলেন- লিডিয়া যে শুধু প্রতারক, তাই নয়, সে টাকার বিনিময়ে অন্য দম্পতিদের থেকে ভ্রূণ নিয়েও নিজের গর্ভে পেলে-পুষে বড় করে সন্তান জন্ম দেয় !

JUMP whats-app subscrition

কি বিস্ময়কর আর আশ্চর্যজনক না বিষয় দুটো !

এই দুটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার পিছনে রয়েছে একই ক্রীড়নক কাইমেরিজম(Chimerism)!

বিজ্ঞানের ভাষায় যখন একটি স্বতন্ত্র জীবের মাঝে দুটি আলাদা জিনের সেট বা আলাদা ডিএনএ সেট থাকে, সেই অবস্থাকেই কাইমেরিজম বলে ,আর ঐ বিশেষ জীবটিকে বলা হয় জেনেটিক কাইমেরা(Genetic Chimera)। কখনো একই শরীরে পাওয়া যায় দুইটি ভিন্ন ধরণের ডিএনএ, আলাদা রক্তপ্রবাহ এবং কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মদাগ (শরীরের দুই পাশের রঙ দু’রকম, আর মাঝখান দিয়ে বাংলাদে‌শ-ভারত বর্ডার লাইন!)। 


[আরো পড়ুন – প্রকৃতির বিস্ময় টেরারিয়াম]

প্রাচীন গ্রিক পুরাণে কাইমেরা (Chimera) নামের এক ধরনের প্রাণীর উল্লেখ আছে, যার একটি মাথা ও ঘাড় সিংহের মতো, পিঠ ছাগলের মতো, আরেকটি মাথা এবং লেজ সাপের মতো। অর্থাৎ এক প্রাণীর শরীরে কয়েক প্রাণীর অস্তিত্ব। এ থেকেই মূলত জটিল এই শারীরিক অবস্থাটির এই নামকরণ করা হয়েছে।উল্লেখ্য, ভারতীয় পুরাণেও একইরকমভাবে উল্লেখ আছে নৃসিংহ–এর কথা। “নৃ” মানে “নর”, তাহলে নৃসিংহ হলো একই দেহে মানুষ আর সিংহ!

Nrisingha-chaimera

কাইমেরিক জীবদের দেহে ডিএনএ সেট থাকে দুরকম।সাধারণত দেখা যায়, মানুষের সকল কোষের ডিএনএ নকশা (profile) একই রকম। অর্থাৎ একজন স্বাভাবিক মানুষের মুখের লাগায়, থাইরয়েড এর কোষে কিংবা জনন কোষে একই রকম ডিএনএ থাকে। কিন্তু যারা কাইমেরিক ব্যক্তি, তাদের জন্য এ কথা খাটে না! তাদের দেহে এর চেয়ে বেশি (দুই বা ততোধিক!) প্রোফাইল শনাক্ত করা যায়!

কিন্তু এমনটা কেন হয়?

প্রকৃতপক্ষে কাইমেরিজম এর একেকটা ধরণের পেছনে কাজ করে একেকটা কারণ। টুইন কাইমেরিজম,টেট্রাগ্যামেটিক কাইমেরিজম, মাইক্রো কাইমেরিজম প্রভৃতি। টুইন কাইমেরিজমের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভ্রূণ অবস্থায় মায়ের শরীরে যমজ ভ্রুনের একটি ভ্রূণ অনেক সময় মারা যায়।

এবার বেঁচে থাকা ভ্রূণটি, মৃত ভ্রূণটিকে নিজের মধ্যে শোষণ (absorb) করে নেয়। ফলে জন্ম নেওয়া মানুষটির শরীরে তার নিজের ও তার নিজের জন্ম না নেওয়া ভাই/বোনের, মোট দুই সেট ডিএনএ থাকে। দ্বিতীয় জাইগোট টিকে শোষণ (absorb) করা প্রথম জাইগোট থেকেই জন্মলাভ করে কাইমেরিক বেবি! আংশিক অ্যাবজোর্বশন এর ঘটনাও ঘটতে পারে। যখন দু’টো জাইগোট পাশাপাশি মাতৃ জরায়ুতে অবস্থান করে, তখন অনেক সময়ই একটি জাইগোট অপর জাইগোট টিকে আংশিকভাবে শোষণ (absorb) করে বসে। ফলে, আংশিক শোষিত (absorb) হওয়া জাইগোট থেকে ত্রুটিপূর্ণ (ক্ষণজন্মা) বাচ্চার জন্ম হয়। টেট্রা মানে হলো চার। টেট্রাগ্যামেটিক কাইমেরিজম এর ক্ষেত্রে দুটি শুক্রাণু এবং দুটি ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণ এর ঘটনা ঘটে। তারপর বাকি ইতিহাস আগের মতোই-উভয় ভ্রূণের একত্রীকরণ।

chaimera animal
প্রাণীদের মধ্যে কাইমেরিজমের ঘটনা

এখানে উল্লেখ্য যে, মায়ের গর্ভাশয়ে থাকা যমজ বাচ্চা দু’টোর জাইগোট একই লিঙ্গের হলে, জন্মলাভ করা কাইমেরিক বাচ্চাটিও একই লিঙ্গের হবে; শুধুমাত্র তার শরীরে দু’টো ভিন্ন ধরণের ডিএনএ সিকুয়েন্সের টিস্যু অবস্থান করবে। আর যদি, যমজ বাচ্চা দু’টোর জাইগোট ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গ প্রকাশ করে, এবং জাইগোট গুলোর মাঝে পরিপূর্ণ শোষণ (absorption) ঘটে, তবে জন্মলাভ করা বাচ্চাটি হবে Intersex (উভলিঙ্গ) কাইমেরিক!

কাইমেরিজমের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তবে সব বৈশিষ্ট্যই সবার মাঝে দেখা যায় না। ব্যক্তি ভেদে নানা রকমের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়,এদের দেহে দুই রকমের রঙ পরিলক্ষিত হতে পারে। এর ফলে জাঁদরেল দুটো নাম ও যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞান অভিধানে!

পুরো শরীরের ছোট অংশ জুড়ে কিংবা প্রায় অর্ধেকের মতো অংশে শরীরের বাকি অংশের চেয়ে গাঢ় রঙ হলে তার নাম হাইপারপিগমেন্টেশন আর হালকা রঙ হলে তা হাইপোপিগমেন্টেশন। এদের রক্তে দুই ধরনের ডিএনএ সেট থাকে (Mrs. Mck এর ঘটনাটা আঁচ করতে পারছেন বোধহয়!আগাম অভিনন্দন!) এমনকি শরীরে দুই ধরনের ইম্যুনিটি সিস্টেম একইসাথে কাজ করে!

অনেক তো কথা হলো এই দুর্লভ জটিলতা নিয়ে। এবার প্রথম দুটো ঘটনার ব্যাখ্যা দিই। Mrs. Mck এর ঘটনাটা “তদন্ত” করছিলেন Medical Research Council Blood Group Unit in England এর দু’জন স্পেশালিষ্ট- Mr Robert Race এবং Mr Ruth Sanger। তাদের রিপোর্টে জানা গেলো, Mrs. McK এর একজন যমজ ভাই ছিল। যে কিনা ১৯৫৩ সালেরও ত্রিশ বছর আগেই মাত্র তিন বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন। Mr. Race অনেক রিসার্চ করে বের করেন, Mrs Mck এর মায়ের গর্ভকালীন সময়ে Mrs McK ও তার যমজ ভাইয়ের ভ্রূণাবস্থায় পরস্পরের ভিন্নধর্মী Haemopoietic Stem Cell ইনফিউশন ঘটে।

যার দরুণ, মাত্র তিন বছর বয়সে ভাইটি মারা যায় Intrinsic Haemolytic Anaemia-য় ভুগে। আর গর্ভকালীন সময়ে, ভাইয়ের দেহ থেকে বোনের দেহে খুব অল্প পরিমাণেই ইনফিউশন ঘটায় বোনটি দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল ক্রনিক ইলনেস নিয়েই!


[আরো পড়ুন – ঐতিহাসিক কল্পগল্পঃ পটচিত্রের রহস্য]

লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ডকে যে রায় শুনতে হয়েছিলো(কতই না কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি!) মানুষের অজ্ঞতার কারণে। যাহোক একসময় লিডিয়ার আইনজীবী পেপারে পড়লেন লন্ডনের এক ঘটনা। সেখানে এক মা সন্তান জন্মদানের পর সন্তানের সাথে তার ডিএনএর কোনো মিল না পাওয়ায় গবেষকরা ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছিলেন। সম্প্রতি তারা আবিষ্কার করেছেন- ঐ মা আসলে শরীরে কাইমেরিজম (Chimerism)-এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। লিডিয়ার আইনজীবীও কোর্টে গিয়ে দাবী করলেন- লিডিয়া একজন কাইমেরা। তার শরীরে আলাদা দুই সেট ডিএনএ আছে। আইনজীবীর দাবী অনুযায়ী আবার টেস্ট করে দেখা গেলো ঘটনা সত্যিই তাই। লিডিয়ার শরীরে আরেক সেট ডিএনএ পাওয়া গেলো যেটার সাথে তার সন্তানদের ডিএনএ মিলে যায়!

Lydia-fairchild
সন্তানদের সাথে লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ড (সৌজন্য – hashtagchatter.com)

শুধু তাই নয়। ঐ একই সেট ডিএনএ পাওয়া গেলো লিডিয়ার মা এবং দিদিমার / নানীর শরীরেও। লিডিয়ার সন্তানদের ডিএনএ ম্যাচ করলো লিডিয়ার মা এবং দিদিমার / নানীর ডিএনএর সাথেও। মূলত, এর আগে প্রথম টেস্ট করার সময় লিডিয়ার যে জৈবিক নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিলো তা ছিলো লালার কোষ (এটাকে ডিএনএ সেট A ধারী কোষ বিবেচনা করতে পারেন।) অথচ,তার সকল বাচ্চা যে ডিএনএ লিডিয়ার কাছ থেকে পেয়েছে তা ছিল লিডিয়ার জনন কোষের (যেহেতু লিডিয়া কাইমেরিক, তাই তার এই দুই কোষের ডিএনএ সেট মেলেনি। এই কোষটির ডিএনএ প্রোফাইল আগের লালার কোষের অনুরূপ সেট A পায় নি, এর সেট টাকে ধরা যায় B সেট!) বেকসুর খালাস পেলেন (বৈজ্ঞানিকভাবে(!) প্রমাণিত ঐ তিন সন্তানের মা -) লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ড । সেই সাথে ফিরে পেলেন তার সন্তানদের !

“The only absolute thing is nothing is absolute. And truth can sometimes be stranger than fiction”

এই আলোচনার ‘মরাল’ এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে!


লেখক পরিচিতি

এই প্রবন্ধটির লেখক আবির মৈত্র। আবির বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্র। আবির পড়াশোনার বিষয়গুলির মধ্যে জীববিজ্ঞান এবং রসায়নবিজ্ঞান পড়তে ভীষণ ভালোবাসে। 


এই লেখাটি থেকে ভালো লাগলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল ।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

 

Leave a Reply