binodoner volbodol
Article (প্রবন্ধ)

বিনোদনের ভোলবদল

চায়ের দোকানী রঘু, খুব ভোরে এসে তার দোকান খুলেছে। তার পশরা সে সাজিয়ে নিচ্ছে খুব দ্রুত। কাঁধের গামছা দিয়ে সামান্য জমে থাকা ধুলো আলগোছে সরিয়ে দিচ্ছে। আর তো সময় হয়েই এল – এবার এক এক করে ভিড় জমাবে ইস্টিসানের বাবুরা, জমে উঠবে চায়ের দোকানের আড্ডা। উনুন জ্বালিয়ে চায়ের প্রথম জলটা ফোটাতে বসালো রঘু। এবার পালা তার নতুন কেনা ব্যাটারি চালিত রেডিওটাকে চালু করার। নব ঘরতেই বেজে উঠল প্রসার ভারতীর সেই বিখ্যাত প্রাভাতি ধ্বনি আর সাথে দেশ মাতৃকার আরাধনা – বন্দে মাতরম্! এর পর সেই সকাল থেকে রাত অবধি রঘু আর তার দোকানের সকল অথিতিকে সঙ্গ দেবে All India Radio।

ওপরের ঘটনাটি আজকের সময়ের পাঠকের কাছে বেমানান লাগতে পারে, কারণ এ ঘটনা আজকের নয়।

ষাট – সত্তরের বিনোদনের একছত্র সম্রাট ‘All India Radio’ আজ জৌলুষহীন এক প্রজা মাত্র। আজকের সময়ে রঘুর চায়ের দোকান থাকলেও, সেখানে All India Radio পরিবর্তিত হয়েছে ফোনে লাগান ‘চিপে’ অথবা Youtubeএ। আজকের Smartphone, YouTube, Internet, social media র দৌলতে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে আমাদের বিনোদনের জগত। এই প্রবন্ধে আমরা সেই বিনোদনের বিবর্তনের কিছু চিত্র ফিরে দেখবো।

[এই বিভাগ থেকে – অন্যতম সেরা বাঙালি বৈজ্ঞানিক – সত্যেন্দ্র নাথ বসু]

All India Radio

সালটা ছিল ১৯২৩, ভারতবর্ষ তখন শাসন করছে ব্রিটিশরা। সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে বম্বে প্রেসিডেন্সী ক্লাব, বম্বে (আজকের মুম্বাই) ও কোলকাতা দুটি রেডিও স্টেশন স্থাপন করল। এর কিছুদিন পরে এটি তৎকালীন সরকার অধিগ্রহণ করলেন এবং ১৯৩৬ সাল থেকে পাকাপাকি ভাবে জন্ম নিল All India Radio। সেই সময় মূলত খবর ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ সঞ্চারিত হত এই মাধ্যমে। এই রেডিওর সাহায্যে আপামর ভারতবাসীকে সম্ভাষিত করেছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, আবার এই রেডিওতেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনোত্তর  প্রথম ভাষণ দিয়েছেন।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে (১৯৫৭) স্থাপিত হল ‘বিবিধ ভারতী’। তখন ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছে রেডিও সেট, এই বিবিধ ভারতী চ্যানেলের মাধ্যমে সারাদিনে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা ধরে প্রচারিত হত মূলত বিনোদন ও নানান তথ্যমূলক অনুষ্ঠান। কৃষি তথ্যমূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে কৃষি প্রধান ভারতবর্ষের কৃষক ভাইদের কাছে এবং হাওয়া মহল, জয় মালা ইত্যাদি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি বন্ধু হয়ে উঠল রেডিও।

Akashvani_Bhavan,_Kolkata
আকাশবাণী ভবন কোলকাতা

টেলিভিশন

১৯৫৯ থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু হলেও। ভারতবর্ষে সঠিক ভাবে টেলিভিশনের প্রবেশ ১৯৭৫ সালে। তখন মাত্র ভারতের সাতটি শহরে প্রচারিত হত দূরদর্শন। তাও আবার কিছু সময়ের জন্য। আশির দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হতে শুরু হল নানা বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান। কিন্তু টেলিভিশন তখন একটি মহার্ঘ বস্তু। সেটা আবার চলে বিদ্যুতে এবং ছবি আনার জন্য বিস্তর পরিশ্রম করতে হয়। তাই টেলিভিশন একটি চমকপ্রদ বস্তু হলেও, রেডিও তখনও সাধারণ মানুষের ঘরের দুলাল ছিল। আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু হল রামায়ণ ও মহাভারত। সে এক দেখার মত ব্যাপার, এত দিন ঘরে-ঘরে লোকেরা যা শুনে এসেছে তা এবার টেলিভিশনের পর্দায়! শোনা যায় যখন রামায়ণ ও মহাভারত সম্প্রচারিত হত, সেই সময় রাস্তাঘাট – দোকানপাট সব ফাঁকা হয়ে যেত। এখান থেকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে রেডিও। ততদিনে গ্রামাফোন রেকর্ড চলে গিয়ে বাজারে এসে গেছে ক্যাসেট, তাই পছন্দের গান শোনার জন্য হা-পিত্যেশ করে রেডিওর সামনে বসে থাকার প্রয়োজনীয়তাও কমেছে।

এরপরে ১৯৯১ সালে ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে এক সাংঘাতিক পরিবর্তন হল। খুলে দেওয়া হল বিনিয়োগের দরজা। শুরু হল cable টিভির জামানা। সাধারণ মানুষ রেডিও ভুলে টেলিভিশনকে তার বিনোদনের বন্ধু হিসাবে আঁকড়ে ধরল। ঘরে ঘরে প্রবেশ করল টেলিভিশন।

indian-television
আধুনিক টেলিভিশনে চ্যানেলের ছড়াছড়ি

[বিজ্ঞানের ইতিহাস বিভাগ থেকে – তিনটি দুর্ঘটনা; ফলাফল তিনটি দুর্দান্ত আবিস্কার]

ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও স্মার্টফোন

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ভারতের কর্মক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ব্যাবহার শুরু হয়, তবে তা ছিল শুধুমাত্র কাজের একটি মাধ্যম, তার সাথে বিনোদনের দূর দূরান্ত অবধি যোগাযোগ ছিল না। ২০০০ সাল শুরুর সময় থেকেই personal computer জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং নিজস্ব কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্যবহারও শুরু হয়। কম্পিউটার কেজো কাজ ছাড়াও নানান বিনোদন মূলক কাজে (যেমন গান শোনা, গেম খেলা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি) ব্যবহার হলেও, ইন্টারনেটকে বিনোদনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ ছিল কম। কারণ তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং মন্থর।

২০০৪ সাল নাগাদ ভারত সরকার ব্রডব্যান্ড পলিসি তৈরি করে, যার ফলে ভারতবাসীর কাছে ইন্টারনেট অনেকটাই সহজলভ্য হয়ে যায়। এর আগে অনলাইন চ্যাট জনপ্রিয় থাকলেও, Orkut নামক একটি ওয়েবসাইট ইন্টারনেটে বিনোদনের একটি এক দিগন্তের সূচনা করে, শুরু হয় social networking এর যুগ। ২০০৫ থেকে প্রায় ২০০৮ অবধি ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল Orkut। সারা বিশ্বের নিরিখে ততটা জনপ্রিয় না হলেও ভারতে Orkut এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। পাঠক মনে রাখবেন, মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যয়বহুল হবার কারণে, Orkut ছিল কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ।

ভারতীয়দের সোশ্যাল মিডিয়ায় হাতেখড়ি - Orkut
ভারতীয়দের সোশ্যাল মিডিয়ায় হাতেখড়ি – Orkut

২০০৭ এর শুরুতে Apple নামক একটি সংস্থা বাজারে আনে তাদের স্মার্টফোন Apple I Phone। এই ফোনে সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ টাচ স্ক্রিন ব্যবহার করা হয় আর বদলে যায় স্মার্ট ফোনের সংজ্ঞা। ঐ দশকের শেষের দিকে ভারতে স্মার্টফোন সহজলভ্য হতে শুরু করে। এরপরে 3G নেটওয়ার্কের হাত ধরে ইন্টারনেট ঢুকে পড়ে আমাদের ফোনে। এর আগেও ইন্টারনেট ছিল বটে, তা ছিল 2G (অথবা EDGE) আর ভীষণ মন্থর।

apple i phone
স্মার্ট ফোনের সংজ্ঞা পাল্টে দিল Apple I-Phone

এবার ধীরে ধীরে বিনোদনের জগত বোকাবাক্সের থেকে মুখ ঘুরিয়ে মুঠোফোনের দিকে তার মুখ ঘোরায়। ইতিমধ্যে রেডিও তার সংজ্ঞা পরিবর্তন করেছে, MW আর SW ছেড়ে সে তার নতুন জামা FM’ পরেছে, আবার ফোনেই FM শোনা যায় তাই বিচ্ছিরি দেখতে ‘রেডিও সেট’ বাড়ি থেকে টা-টা জানিয়েছে।

শুরুর দিকে স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ছিল কমবয়সীদের একছত্র অধিকার। এরপরে হইহই করে হঠাৎ বাজারে আসে 4G (পড়ুন জিওর জয়জয়কার)। ব্যস প্রায় বিনামূল্য হয়ে যায় ফোনে ইন্টারনেট পরিষেবা আর স্মার্টফোন ব্যবহারের হিড়িক লেগে যায়। শুরু হয় Facebook, Instagramএ সময় কাটানো, WhatsApp এ খবরা-খবর নেওয়া, YouTube এ রান্না শেখা (বা আগডুম – বাগডুম ভিডিও দেখা) ।

world-of-social-media
আজ আমাদের দিনের অনেকটা সময় ব্যয় হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়

[প্রস্তুতি বিভাগ থেকে – মাধ্যমিকে কিভাবে নম্বর বাড়ানো যায়]

অতঃপর

এখন আর কোন খবর পাবার জন্য রাত ১০টার সংবাদের জন্য বসে থাকতে হয় না, ফেভারিট কোন show YouTubeএ নিজের সময় মতো দেখে নেওয়া যায়, চলতি পথে WhatsAppএ পাঠানো জোকস পড়ে মুচকি হাসা যায়, কারুর সাথে যোগাযোগ না রেখেও social media দেখে তার হাঁড়ির খবর রাখা যায়।

যুগ পরিবর্তন হয়েছে, ক্রমশ হচ্ছে এবং আগামী দিনে আরো হবে। একটা কথা না বললেই নয়, পরাধীন ভারতের চাষি ভাইটি সারাদিন হাড়ভাঙ্গা শ্রম করে সন্ধেবেলায় তার প্রতিবেশির বাড়ির রেডিওতে যে বিনোদন খুজতো, আজ IT companyতে হাই প্রোফাইল কর্মচারী রক্তিম অফিস ফেরত গাড়িতে বসে, দামি স্মার্টফোনে হেডফোন লাগিয়ে সেই একই বিনোদন খোঁজে। বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি, পালটেছে শুধু তার মাধ্যমটাই।

mobile entertainment
বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি, পালটেছে শুধু তার মাধ্যমটাই।

JUMP ম্যাগাজিনের WhatsApp SUBSCRIPTION একটি বিনামূল্যে পরিষেবা। এই পরিষেবার মাধ্যমে JUMP ম্যাগাজিনের সব নতুন লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্র সেগুলি নিজস্ব WhatsAPP আক্যাউন্টে পেতে পারেন।

 

One Reply to “বিনোদনের ভোলবদল

Leave a Reply