effect of corona
Editorial (সম্পাদকীয়)

ভবিষ্যতে কর্ম ও শিক্ষাক্ষেত্রে করোনার প্রভাব



গোটা বিশ্বকে করোনা মহামারী এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে।

এর পাশাপাশি এতদিনে আমরা প্রায় সবাই বুঝে গেছি যে, এই সমস্যা আমাদের জীবনে দীর্ঘকালব্যাপী চলবে। এই অবস্থায় করোনা যে আমাদের কাজকর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিপুল প্রভাব ফেলতে চলেছে সেকথা বলার জন্য আজ আর বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না।

শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে করোনা মহামারির যে প্রভাব ভবিষ্যতে আসতে চলেছে তেমন তিনটি বিষয়ে আজ আমরা আপনাদের কাছে আলোকপাত করতে চাই।

Automation

অটোমেশনের প্রভাব বৃদ্ধি

অটোমেশন যে আমাদের জীবনে আসতে চলেছে এবং কর্ম – জীবিকার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে এই অনুমান আগেই করা গিয়েছিল। কিন্তু করোনা মহামারির ফলে, কাজের জগতে বেশ কিছু পরিবর্তন আসবে। যেমন সংক্রমণের ভয় থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন সংস্থাগুলি আরো বেশি মেশিন বা প্রযুক্তির সাহায্য নেবে। একটি বিখ্যাত মার্কেট রিসার্চ সংস্থার অনুমান 2030 সালের মধ্যে আমেরিকার মতো উন্নতশীল দেশগুলিতে এক তৃতীয়াংশ কর্মী হিসাবে মানুষের বদলে যন্ত্র (অটোমেশন) কাজ করবে। (2)

আপনি নিশ্চয় এতদিনে শুনেছেন যে ভারতে শ্রমের মুল্য কম অর্থাৎ ইউরোপ বা এগিয়ে থাকা দেশগুলিতে নিয়োগ করার জন্য একজন কর্মীকে যে মুল্য বা বেতন দিতে হয় তার অনেকটাই কম বেতনে একাধিক কর্মী ভারতে নিয়োগ করা যায়। এতদিন ভারতে অটোমেশনের প্রভাব তেমনভাবে বৃদ্ধি না পাবার অন্যতম কারণ এটাই।

কিন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে কর্মস্থল বা অফিসগুলো একই পরিমাণ কর্মী নিয়ে কাজ করতে পারবে না।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায় একটি ফ্লোরে যেখানে আগে দশজন একসাথে কাজ করতেন সেখানে এখন খুব বেশি হলে পাঁচজন নিয়ে কাজ করতে হবে; অর্থাৎ ‘সোশ্যাল ডিসটেন্সিং’ মেনে কাজ করাতে হবে। এবার ভাবুন, যে কাজ দশ জনে মিলে করা হত, সেই কাজ পাঁচ জন মিলে কিভাবে করবে?

এক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ ও গুণগতমান সঠিক রাখার জন্য যন্ত্রের ব্যাবহার বৃদ্ধি পাওয়া অবিশ্যম্ভাবী। এই অটোমেশনের ফলে কাজের বাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়বে অদক্ষ কর্মীরা কাজ হারাবেন।

আপনি ভাবছেন, করোনা কি আর সারাজীবন থাকবে? করোনা চলে গেলেই আবার পুরানো ব্যবস্থা চালু হবে।

হয়তো আপনি ভুল ভাবছেন।

একটি বাঘের কথা ভাবুন, যে গরু – ছাগল খেয়ে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতো। একদিন সে মানুষের মাংসের স্বাদ পেল। সে কি আর গরু বা ছাগল খেতে চাইবে? নিয়ম বলে না, সেই বাঘটি মানুষখেকো বাঘে রূপান্তরিত হবে। কর্মক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। একবার কোন পরিবর্তন হলে তা পুরানো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া খুব কঠিন একটি ব্যাপার।

এই অটোমেশনের উপরে আমরা আগেই বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি, চাইলে এই লিঙ্কগুলি থেকে সেগুলি পড়া যেতে পারে।আমাদের জীবনে অটোমেশন

Gig Economy

গিগ ইকোনমির প্রবেশ

উন্নত দেশ গুলিতে কাজের বাজারে গিগ (Gig) ইকোনমির চল আগে থেকেই আছে। এবার ভারত বা অন্যান্য উন্নতশীল দেশগুলিতে এর প্রভাব বাড়বে।

এবার আগে বুঝে নেওয়া যাক যে, এই গিগ ইকোনমি ব্যাপারটা কি?

ধরুন কোন সংস্থায় দশ জন কর্মী কাজ করে এবং তাঁদের বেতন বাবদ সেই সংস্থার এক লক্ষ টাকা ব্যায় হয়। এবার এই বেতন ছাড়াও, সংস্থাটির আরো কিছু খরচ আছে, যেমন অফিসের ভাড়া, ইলেক্ট্রিসিটি খরচ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং তাদের maintenance সংক্রান্ত খরচ ইত্যাদি।

অর্থশাস্ত্রের ভাষায় এই খরচগুলিকে ওভারহেড বলা হয়। ধরা যাক প্রতি মাসে ওই সংস্থা ওভারহেড দুই লাখ টাকা। তাহলে মাথা পিছু খরচ দাঁড়াচ্ছে কর্মী প্রতি এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা (10 + 2 = 12, 12 / 10)। অর্থাৎ, বেতনের খরচ ছাড়াও সংস্থা পরিচালনা করার  জন্য আরো অনেক ব্যয়ভার বহন করতে হয়।

এবার ধরা যাক ঐ সংস্থাটি এমন কিছু কাজ করে যেগুলি স্বল্প মেয়াদী মানে যে কাজটি তিন মাস বা ছয় মাস ধরে কাজ চলে, সেটি শেষ হলে আবার একটা কাজ শুরু হয়। এই অবস্থায় যদি ঐ সংস্থাটি স্থায়ী কর্মী নিয়োগ না করে ঐ তিন বা ছয় মাসের জন্য কোন দক্ষ অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে তাহলে কি হয়?

লাভ অনেকগুলি, প্রথমত অস্থায়ী কর্মীর ক্ষেত্রে ওভারহেড খরচ লাগবে না কারণ তার জন্য অফিসের প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, ঐ স্বল্প মেয়াদী কাজটি শেষ হলেই ঐ কর্মীর নিয়োগের সময় সীমা ফুরোবে, সুতরাং ঐ সংস্থাকে প্রতি মাসে বেতন দিতে হবে না। তৃতীয়ত, যেহেতু ঐ অস্থায়ী কর্মী ঐ নির্দিষ্ট কাজটির জন্য ভীষণভাবে দক্ষ, তাই কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। আবার ঐ অস্থায়ী কর্মীটিও কিন্তু একসাথে অনেকগুলি সংস্থার কাজ করতে পারবে, তাই তার রোজগারের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়বে। মনে করা হচ্ছে আগামী দিনে মোট কর্মী সংখ্যার 25 – 30% কর্মচারী ফ্রিলান্সার হিসাবে কাজ করবেন। (তথ্যসূত্র – 1)

অর্থাৎ, দুই পক্ষই সমানভাবে লাভবান হবে। এই স্বল্প সময়ের জন্য, অস্থায়ী কর্মী নিয়োগকে গিগ ইকোনমি বলা হয়।

একটা কথা মাথায় রাখতেই হবে। এই গিগ ইকোনমির ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীদের কাজের সম্ভাবনা অনেকটা বাড়লেও, অদক্ষ কর্মীদের কিন্তু এই ব্যাবস্থায় কোন স্থান নেই।         

e-learning-is-the-future

অনলাইন শিক্ষার প্রসার

আপনার বাড়িতে বা আপনার পরিচিত কোন ছাত্র বা ছাত্রী থাকলে এতদিনে সে নিশ্চয় অনলাইন মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেছে। বাচ্ছাদের অনলাইন শিক্ষার ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত; তবে আমরা এর দুটো ভালো দিক উল্লেখ করবো।

  • অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্র বা ছাত্রী তার কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে একা থাকে এবং শিক্ষক বা শিক্ষিকার কথা বা বোর্ড ওয়ার্ক সরাসরি দেখতে পায়। যে ব্যাপারটা একটা ক্লাসরুমের মধ্যে সম্ভব হয় না।
  • সাধারণত ছাত্রছাত্রীরা কোন প্রশ্ন, শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের জিজ্ঞেস করতে ভয় পায় বা বুঝতে না পারলেও বলতে লজ্জা পায়। অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সমস্যা থাকে না, কারণ কোন অংশ বুঝতে না পারলে, বার বার রেকর্ডিং দেখে তা বুঝে নেওয়া যায়।

অনেক অভিভাবক ভাবেন মোবাইলে ইন্টারনেট থাকার ফলে ক্লাস করার সময় মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে তাই পড়ার ক্ষতি হয়। কথাটি আংশিক ভাবে সত্য কারণ ক্লাস চলাকালীন WhatsApp-এ মেসেজ এলে বা কোন ফোন এলে মনোযোগ বিঘ্ন ঘটে এই ব্যাপারটি যেমন সত্য তেমনই স্কুলে বা কোচিং ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যে কোনভাবেই মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে না এটা ভাবারও কোন কারণ নেই।

শুধুমাত্র তাই নয়, অনলাইন শিক্ষার ব্যাপ্তিও বিশাল।

কোন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক বা শিক্ষিকার ক্লাস প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে বসে করতে পারার অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাই দিতে পারে।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, JUMP ম্যাগাজিন বাংলায় পড়াশোনা সংক্রান্ত একটি অগ্রণী  ডিজিটাল পত্রিকা। প্রতিদিন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন 4o ঘণ্টারও বেশি সময়  (daily reading time) এই ম্যাগাজিনে পড়াশোনা করে। এই একটা সামান্য তথ্যই বলে দিচ্ছে যে আগামীদিনে ভারত তথা বাংলায় অনলাইন শিক্ষার সম্ভাবনা কতটা উজ্জ্বল।

সব শেষে একটা কথা বলি, শিক্ষা ব্যাপারটা কিন্তু শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়।

শিক্ষার কোন বয়স নেই। আগে একজন ইঞ্জিনিয়ার তার কলেজ জীবনের শিক্ষা দিয়েই তার সমগ্র কর্ম জীবন কাটিয়ে দিতেন। এখন ব্যাপারটা তা নয়, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও সামগ্রিক কর্ম পদ্ধতি এত দ্রুত পরিবর্তন হয় যে ক্রমাগত শেখার অভ্যাস না করলে, আপনি পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। তাই এই ধরণের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনলাইন লার্নিং আগামি দিনে একটা বড় ভুমিকা নেবে ।

এই প্রতিবেদনে একটা ব্যাপার কিন্তু খুব স্পষ্ট ভাবে উঠে আসছে, আর তা হল আগামী দিনের কাজের বাজারে প্রধানত চাহিদা থাকবে দক্ষ কর্মীদের। অদক্ষ কর্মীদের বিপুল অংশ হয় কাজ পাবেন না নাহলে তাদের কাজ হারাবেন।

তাই তোমরা যারা এখন পড়াশোনা করছো, তারা এখন থেকেই সতর্ক হও। পড়ার প্রতিটা বিষয় বুঝে পড়ো এবং নিজেকে ভবিষ্যতের লক্ষ্যে তৈরি করো। শুধুমাত্র নম্বর পাবার লক্ষ্যে মুখস্ত করে পরীক্ষায় পাশ করার অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করো।

তথ্য সূত্র  – 1 | 2

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply