automation-replace-jobs
Editorial (সম্পাদকীয়)

গতকালের কল্প, আজকের গল্প, আগামীকালের বিপদ নয় তো?



মনে করুন আপনি মোবাইল অ্যাপে একটা ট্যাক্সি বুক করলেন।

আপনার ট্যাক্সি যথাসময়ে রুটম্যাপ ধরে আপনার বাড়ির সামনে এসে আপনাকে কল করলো। আপনিও বেরিয়ে যেই ট্যাক্সিতে উঠতে যাবেন, দেখলেন ড্রাইভারের সিটে কেউ বসে নেই।

আপনি ভাবলেন “কে রে বাবা! এভাবে ট্যাক্সি ফেলে রেখে কোথায় গেলো।”

আপনি দরজা ধরে টানলেন। দরজাও খুলে গেল। আপনি যেই দরজা খুলে বসেছেন, অমনি ট্যাক্সিটা ভূতে চালানো গাড়ির মতো চলতে শুরু করলো। আপনি “বাবাগো মাগো” বলে যেই চিৎকার করছেন, অমনি গাড়ি থেকে একটা ভয়েস মেসেজ ভেসে এলো “ওয়েলকাম টু গুগল ট্যাক্সি। আমাদের অটোমেটেড ট্যাক্সি সার্ভিসে আপনাকে স্বাগত। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি। কম্পিউটার ও Artificial Intelligence এর সাহায্যে এটিকে চালানো হচ্ছে।”

কিম্বা আপনি খাবার অর্ডার করেছেন একটি জনপ্রিয় অ্যাপে। আপনার ম্যাপ দেখালো “অন্নপূর্ণা” আপনার খাবার নিয়ে আসছে। কিন্তু আপনি ম্যাপে দেখলেন সে কোনো রুট ধরে আসছেনা। কেমন যেন সোজা হোটেল থেকে আপনার বাড়ির অভিমুখে, সব বাড়ি ঘর পুকুর টপকে টপকে উড়ে উড়ে আসছে। একিরে বাবা! দেওয়াল টপকে টপকে আসছে নাকি! বাড়ির কাছে আসতেই ফোন। আপনি খাবার রিসিভ করতে বেরিয়ে দেখেন উড়ন্ত চাকি!!! আপনার খাবারের থলে ঝুলিয়ে আপনার সামনে হাওয়ায় ভাসছে। ড্রোন ডেলিভারি।

Commercial-drone-delivery-mobile-order-food

আপনি রাস্তায় যত ট্রাক দেখছেন, একদিন উঠে খবরের কাগজে জানতে পারলেন, ওই ড্রোন বা ট্যাক্সির মতো সব ট্রাককে স্বয়ংক্রিয় করে দেওয়া হবে। কারণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ির accident এর সম্ভাবনা বর্তমানে হওয়া accident এর তুলনায় 0.1%।

কারণ আমাদের হাতে আজ artificial intelligence বা A.I প্রযুক্তি। এসেছে যা আমাদের জীবনকে রাস্তায় অনেক সুরক্ষিত করে রাখবে। এভাবে একদিন ট্রেন, বোট, জাহাজ, ambulance, ময়লা তোলার গাড়ি, দমকলের গাড়ি প্রভৃতি চালাবে এই স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভার।

এভাবে শুধু পরিবহণ নয়, দমকল, সাফাই, সুরক্ষা, রেস্তোরাঁয় বেয়ারা, হোটেলের Maintainence কর্মচারী, receptionist, typist সব কাজেরই জায়গা দখল করবে মেশিন। ফ্যাক্টরি বা Manufacturing সেক্টর-এ আগেই দখল করেছিল অটোমেশন। এখন সেখানে আরও বেশি করে ঢুকবে AI।

Voice Command এর মাধ্যমে চলবে বাড়ির দরজা খোলা বন্ধ, আজ যেমন খোলে মোবাইল। টাইপ হবে কথা থেকে, যেমন গুগুল করে থাকে assistance manager দিয়ে। কারণ তাদের কর্মদক্ষতাও মানুষের থেকে বেশি, ভুলের পরিমাণও কম। আস্তে আস্তে “মেশিন লার্নিং” দখল করে নেবে সমস্ত Menial Job Sector।



ভাবছেন, কল্পবিজ্ঞান?

না, এগুলো কোনোটাই ভবিষ্যতের গল্প নয়। আর এমনও নয় যে সেই সুদূর আমেরিকাতে এসব হচ্ছে। এসব চলছে আজকের ভারতে। আর দুমাসের মধ্যে কলকাতায় নামতে চলেছে ড্রাইভারবিহীন মেট্রো। দিল্লির ম্যাজেন্টা লাইনে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এর পরিষেবা। মুম্বাইয়ের বহু ধনী বাড়িতে বসেছে স্মার্ট হোম সিস্টেম। 

হ্যাঁ, হয়তো সেরকম massive scale-এ নয়। কিন্তু 1997-98 সালের কথা একবার ভাবুন।

যখন প্রথম মোবাইল মোটোরোলা ফোনে ইনকামিং ছিল মিনিটে দেড় টাকা আর আউগোয়িং কল ছিল সাড়ে তিন টাকা! আর তখন ঘন্টায় 120 টাকা দিয়ে ডায়াল আপ ইন্টারনেট করতে হতো।

আর এখন? একুশ বছর পর, চার টাকায় এক GB Data প্রতিদিন! অর্থাৎ কাল যেগুলো কল্প, আজ সেগুলো গল্প হয়ে কাল সেগুলো আসল হতে সময় লাগছে না।

JUMP whats-app subscrition

 

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী 15-20 বছরে কাজ হারাবে 40% লোক, বিশেষতঃ এই রকম নিম্ন বেতনের কাজগুলি।

কিন্তু আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রগতি আরো দ্রুততর, আরো নিখুঁত হবে। শুধু তাই নয়, Artificial  intelligence এরপর শিখতে থাকবে high skill কাজও। ইতিমধ্যেই AI শিখে নিয়েছে উঁচুনিচু পথে দৌড়ানো, রিস্ক minimization, এমনকি গানে সুরারোপণ। কাজ চলছে dedicated medical operation থেকে শুরু করে অন্যান্য উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন কাজের দক্ষতা অর্জনেরও।

যারা অতি জনপ্রিয় সিনেমা অ্যাভেঞ্জারস দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই আয়রনম্যানের সহযোগী কম্পিউটার ‘জারভিস’ –কে খুব সহজেই মনে করতে পারবেন। এক কথায় বলতে গেলে সেই ‘জারভিস’ এর মত যন্ত্র কাল ঘরে ঘরে আসবে।

এই millennial generation এর প্রথম শিকার না হলেও যারা 2015-এর পরে জন্মাচ্ছে, তাদের পক্ষে কাজ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। এমনকি millennial generation-ও হতে পারে কর্মহারা, যেমন হয়েছে চীনের Foxconn কোম্পানিতে। এরা Apple কম্পিউটারের hardware সরবরাহ করে। গত এক বছরে এই সংস্থার কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে 110000 থেকে 50000।


[আরো পড়ুন – সাফল্যের সিঁড়ি]

তাহলে উপায়? কোনো কাজই কি ভবিষ্যতে থাকবে না?

তা নয় কিন্তু। নতুন ধরণের উদ্ভাবনের সাথে নতুন ধরণের কাজ আসে। ঘোড়ার দেখভাল করার কাজ একসময় অত্যন্ত বেশিমাত্রায় লোকজন করতো, কারণ ঘোড়া ছিল যাতায়াত, যুদ্ধ, চাষবাস প্রভৃতির সামগ্রী। আজ ঘোড়ার দেখভাল করার কাজ পাওয়া যায় রেসের মাঠে বা Mounted Police বা এক্কাগাড়ির আস্তাবলে এবং সেই কাজ করে অন্নসংস্থান করছেন এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোণা।

কিন্তু গাড়ির মেকানিক হওয়ার কাজ শিখে নানা জায়গায় কাজ পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোটরগাড়ির আবিষ্কার ঘোড়ার দেখভাল করার কাজের প্রয়োজন কমিয়ে দিলেও তার থেকে আধুনিক একটা কাজের জন্ম দিয়েছে। ঠিক তেমনই ভাবে এই নতুন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নতুন কাজের জন্ম দিচ্ছে।

আমাদের দেশে কেরালায় এই নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে “বান্দিকুট”  তৈরী হয়েছে। বান্দিকুট কোনো ছুঁচো জাতীয় প্রাণী নয়, একটি রোবট। এর কাজ আমাদের নর্দমা পরিষ্কার করা। যে কাজটি করতো আমাদের দেশের অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকজন। গত সপ্তাহে গুজরাটে সাত জন সেপটিক ট্যাঙ্কে ঢুকে কাজ করতে গিয়ে মারা যান। এইরকম বিপজ্জনক পেশা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে AI কে বন্ধু করা আমাদের খুবই দরকার।

মুশকিল হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজও সেই স্বাধীনতা পরবর্তী যুগের শিল্পভিত্তিক কাজের প্রশিক্ষণের উপযুক্ত হয়ে রয়ে গেছে।

মৌলিক ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা করার মতো শিক্ষা আমাদের বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীতে দুর্লভ। উদ্ভাবন আর শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রতিযোগিতায় আমরা আজও অন্যান্য দেশের থেকে পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিক লাভের প্রতি বেশি, সুদূরপ্রসারী লাভের দিকে কম রয়েছে। পড়ার বিষয়গুলি বুঝে আত্তীকরণ করার থেকে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়াটাকে আমরা পরম প্রাপ্তি ও ক্লাসে প্রথম থেকে দশের মধ্যে থাকাকে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার পুরষ্কার হিসেবে বেছে নিচ্ছি।  যতক্ষণে বুঝতে পারছি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে, কেঁচে গণ্ডুষ করারও সময় থাকছে না।


[আরো পড়ুন – মনোযোগ বাড়াতে হলে…]

এর পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন

প্রয়োগমূলক ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মিশেলে তৈরী শিক্ষা আজ ভীষণভাবে জরুরী। পুঁথিগত শিক্ষার বোকাবাক্স থেকে বেরিয়ে মৌলিক ভাবে ভাবতে শেখা, problem solving skill তৈরী, স্মৃতি ও জ্ঞানের উপরে নির্ভরতা হ্রাস, যুক্তি আর বোধের ওপর জোর, মুখস্থ বিদ্যার থেকে অধীত বিদ্যায় ঝোঁক বাড়ানো, পরীক্ষার চাপের থেকে বার করে এনে constant evaluation পদ্ধতির প্রয়োগ ইত্যাদি যাতে নিজের উৎসাহে শেখা ব্যাপারটাকে পুরষ্কৃত করা যায়।

আপনি খেয়াল করে দেখবেন যেটা আপনি নিজে শিখেছেন সেটা আপনি খুব ভালো শিখেছেন, কারণ ওতে আপনার তাগিদ ছিল, শেখার খিদে ছিল, উৎসাহ ছিল। মন যে খাবারটা খেতে পছন্দ করে না, শরীর সেই খাবারটা হজমও সেভাবে করে না, হয় তা নষ্ট হয়ে যায়, নয় সেটা শরীরে ভুল ভাবে জমা হয়। শিক্ষা মনের পুষ্টি, সঠিক ভাবে না পড়াশোনা করলে মন দুর্বল ও অভুক্ত থেকে যাবে।

জাপানে একটা concept আছে Ikigai। মানে এমন একটা কাজ যেটা আপনি ভালো পারেন, আপনার ভালোও লাগে করতে, লোকের প্রয়োজনও আছে এবং লোকে আপনাকে তার জন্য মূল্য দিতেও রাজি। এই আইডিয়াটিকে ikigai বলে।

কি করবেন ভাবছেন?

নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে কোনো ব্যাপারে Passionate করে তুলুন, তার ikigai খুঁজতে সাহায্য করুন।সে যেন কোনভাবেই না বুঝে স্রেফ মুখস্থ বিদ্যার উপর ভর করে পরীক্ষার বৈতরণী পার না হয়। সে যেন পড়ার বিষয়গুলি মনের আনন্দে পড়ে। তাহলে এমন একটা সময় আসবে যখন তার কাজকে কেউ প্রতিস্থাপিত করতে পারবে না তাহলেই এই নতুনের সাথে, নববিবর্তনের সাথে তাল মেলানো যাবে, হবে যোগ্যতমের উদ্বর্তন



এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের যে কোনো প্রশ্ন সরাসরি আমাদের করতে পারো ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্ৰুপে গিয়ে প্রশ্ন পাঠালে, আমাদের বিশেষজ্ঞরা  তার উত্তর দেবেন। গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply