varoter-swavabik-udvid
Madhyamik

ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ

ভূগোলদশম শ্রেণি – আঞ্চলিক ভূগোল (চতুর্দশ পর্ব)


আগের পর্বে আমরা ভারতের মৃত্তিকা ক্ষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছি।আজকের পর্বে আমরা ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

যে সমস্ত উদ্ভিদ প্রকৃতিতে আপনাআপনি জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে তাকে ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ বলা হয়।

স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেণীবিভাগ

কোন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মৃত্তিকা ও ঋতু বৈচিত্রের উপর ভিত্তি করে স্বাভাবিক উদ্ভিদের বন্টন পরিলক্ষিত হয়। ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের মোট ক্ষেত্রফল এর 21.34% (2015) এলাকাজুড়ে অরণ্য অবস্থান করছে।

ভারতের মানচিত্রে স্বাভাবিক উদ্ভিদের প্রকারভেদ

[উপরের মানচিত্রে স্বাভাবিক উদ্ভিদের প্রধান ও উপবিভাগ গুলিকেও দেখানো হয়েছে, তবে আমরা ভারতে অবস্থিত স্বাভাবিক উদ্ভিদের প্রধান পাঁচটি ভাগ নিয়েই নীচে আলোচনা করেছি।]

1. ক্রান্তীয় চিরহরিৎ উদ্ভিদ

অনুকূল পরিবেশ: বার্ষিক বৃষ্টিপাত 200 সেন্টিমিটারের বেশি, উষ্ণতা 25 থেকে 27 ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর্দ্রতা 75% এর বেশি, সারাবছর উষ্ণ আর্দ্র আবহাওয়া যুক্ত অঞ্চলে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

আঞ্চলিক বন্টন: আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢাল, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ, মনিপুর ,ত্রিপুরা ,মিজোরাম এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির ভূমি প্রধান প্রধান উদ্ভিদ হল আবলুস, গর্জন, পুণ, তুন, শিশু, এবনি, রবার, মেহগনি, বাঁশ, বেত প্রভৃতি।

বাঁশের বন

ক্রান্তীয় চিরহরিৎ উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য:
● চিরসবুজ অরণ্যে গাছের উচ্চতা 30 থেকে 40 মিটার হয়ে থাকে।
● বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এর একসাথের ঘন সন্নিবিষ্ট অবস্থান।
● এই উদ্ভিদের কাঠ খুব শক্ত ও ভারী হয়।

ব্যবহার: আসবাবপত্র তৈরিতে, নির্মাণকার্য, জ্বালানির কাজে, উপজাত দ্রব্য রূপে মধু মোম আঠা প্রভৃতি সংগ্রহ করা হয়।

2. ক্রান্তীয় পর্ণমোচী উদ্ভিদ

ক্রান্তীয় পর্ণমোচী শ্রেণীর উদ্ভিদকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়

ক) আর্দ্র পর্ণমোচী উদ্ভিদ:

অনুকূল পরিবেশ: গড় বৃষ্টিপাত 100 থেকে 200 সেন্টিমিটার, গড় উষ্ণতা 27 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, আর্দ্রতা 60 থেকে 70% এবং শুষ্ক গ্রীষ্মকালে শুষ্ক শীতকাল যুক্ত অঞ্চলে এই বনভূমি দেখা যায়।

আঞ্চলিক বন্টন: পশ্চিমবঙ্গ সমভূমি, অসম সমভূমি মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা ,ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল ও পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব ঢালে এই বনভূমি দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদ হল শাল,সেগুন ,মহুয়া, কুসুম, আম ,জাম ,তেঁতুল, বাঁশ ইত্যাদি।

আম গাছের চিত্র

বৈশিষ্ট্য:
● বছরের নির্দিষ্ট সময় গাছের পাতা ঝরিয়ে দেয় বলে এই বনভূমি পর্ণমোচী নামে পরিচিত।
● একই প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদের সমাবেশ একসাথে দেখা যায়।
● গাছের উচ্চতা 25 থেকে 60 মিটার পর্যন্ত হতে পারে।

ব্যবহার: আসবাবপত্র, রেলের কামরা, স্লিপার, নৌকা, বাসগৃহ নির্মাণ, জ্বালানি, আঠা ,মধু ,মোম লাক্ষা প্রভৃতি সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়।

খ) শুষ্ক পর্ণমোচী উদ্ভিদ

অনুকূল পরিবেশ: গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত 50 থেকে 100 সেন্টিমিটার, গড় উষ্ণতা 25 ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা 60% ওপর আবহাওয়া যুক্ত অঞ্চলে এই উদ্ভিদের বন্টন দেখা যায়।

আঞ্চলিক বন্টন: বিহারের পশ্চিমাংশ, ছত্রিশগড়, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর পশ্চিমাংশে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদগুলি হল কেন্দু, খয়ের, পলাশ, কুল, বেল, কোকো, রিঠা প্রভৃতি।

বৈশিষ্ট্য:
● এই বনভূমিতে গাছগুলি বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে।
● শীতকালে এই উদ্ভিদগুলির পাতা ঝরে যায়।
● এই উদ্ভিদের উচ্চতা 10 থেকে 15 মিটার হয়ে থাকে।

ব্যবহার: এই বনভূমির উদ্ভিদ আসবাবপত্র নির্মাণ, জ্বালানি ,সুগন্ধি তেল, ধুপ, ধুনো, শালপাতার, থালা তৈরির কাজে লাগে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

3. ক্রান্তীয় মরু উদ্ভিদ

অনুকূল পরিবেশ: গড় বৃষ্টিপাত 25 সেন্টিমিটার এর কম, উষ্ণতা 30 থেকে 35 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এবং কম আর্দ্রতা যুক্ত অঞ্চলে এই বনভূমি দেখা যায়।

আঞ্চলিক বন্টন: রাজস্থানের থর মরুভূমি এবং সংলগ্ন গুজরাট ও পাঞ্জাবের মরুভূমি অঞ্চলে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদগুলি হল বাবলা, খেজুর, ক্যাকটাস ,ঘাস, কাঁটা জাতীয় উদ্ভিদ।

মরু অঞ্চলে ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ

বৈশিষ্ট্য:
● এই সমস্ত উদ্ভিদে বাষ্পীভবন রোধ করার জন্য পাতা কাটায় রূপান্তরিত হয়।
● এই গাছের শিকর মাটির গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

ব্যবহার: এই গাছের কাঠ জ্বালানি হিসেবে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় এবং মরুভূমির প্রসার রোধ করতে এই গাছ রোপন করা হয়।

4. পার্বত্য অঞ্চলের উদ্ভিদ

অনুকূল পরিবেশ: বার্ষিক বৃষ্টিপাত 75 থেকে 125 সেন্টিমিটার, উষ্ণতা 10 থেকে 20 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড ও শীতকালীন তুষারপাত যুক্ত অঞ্চলের এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

আঞ্চলিক বন্টন: হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের 300 থেকে 3000 মিটার উচ্চতায়, দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট, নীলগিরি ও মধ্য ভারতের বিন্ধ্য, সাতপুরা ,মহাদেব ও মহাকাল পর্বতে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদ গুলির নাম হল শাল, শিশু, গর্জন, পাইন, দেবদারু, ওক, ফার, ম্যাপল, উইলো, জুনিপার, রডোডেনড্রন ও বিভিন্ন তৃণলতা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ।

রডোডেনড্রন ফুলের শোভা

বৈশিষ্ট্য:
● এই বনভূমিতে চিরহরিৎ ও সরলবর্গীয় উদ্ভিদ এর সমাবেশ দেখা যায়
● এই উদ্ভিদ খর্বাকৃতি থেকে লম্বা বৃক্ষ রূপে দেখা যায়।

ব্যবহার: এই উদ্ভিদের কাঠ আসবাবপত্র তৈরিতে, প্যাকিং বাক্স, দেশলাই বাক্স ,কাগজ শিল্পে, ওষুধ ও জ্বালানি শিল্প, ঘর গরম রাখতে ব্যবহৃত হয়।

5. ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ

অনুকূল পরিবেশ: উপকূলীয় পরিবেশে লবণাক্ত পলিমাটি এবং জোয়ার ভাটার প্রভাব যুক্ত অঞ্চলে এই উদ্ভিদ জন্মায়।

আঞ্চলিক বন্টন: গঙ্গা ব-দ্বীপের সুন্দরবন, মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর বদ্বীপ অঞ্চল, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপকূল অঞ্চলে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

প্রধান উদ্ভিদ: এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদ গুলি হল সুন্দরী, গরান, গেওয়া, গোলপাতা, হোগলা, কেওড়া প্রভৃতি।

উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ অরণ্য

বৈশিষ্ট্য:
● এই উদ্ভিদগুলির সারাবছর চিরসবুজ থাকে এবং এই উদ্ভিদের শ্বাসমূল, ঠেসমূল ও অধিমূল দেখা যায়।
● এই উদ্ভিদ জরায়ুজ অঙ্কুরোদগম ঘটাতে সক্ষম।

ব্যবহার: এই উদ্ভিদের কাঠ আসবাবপত্র তৈরিতে, চামড়া ট্যান ও রং করতে, ওষুধ তৈরি ও জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → ভারতের অরণ্য সংরক্ষণ


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তনী শ্রেয়সী বিশ্বাস। পড়াশোনা এবং লেখালিখির পাশাপাশি, ছবি আঁকা এবং বাগান পরিচর্যাতেও শ্রেয়সী সমান উৎসাহী।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

X-geo-5-a-14