nari-itihas-cover_final
Madhyamik

নারী ইতিহাস এবং পরিবেশের ইতিহাস

শ্রেণি – দশম বিষয়: ইতিহাস । অধ্যায়: ইতিহাসের ধারণা (পর্ব -২) |


এই অধ্যায়ের প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে সামাজিক ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস এবং পোশাক পরিচ্ছদের ইতিহাস নিয়ে। এই পর্বে আমরা নারী ইতিহাস এবং পরিবেশের ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

ঘ। নারী ইতিহাস

বর্তমান যুগের ইতিহাস চর্চা করতে গেলে নারী ইতিহাস চর্চা করতেই হবে।

পৃথিবীর সব দেশেই এখন এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চর্চা চলছে ও তা গ্রন্থের আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। আগেকার যুগে সমাজে নারীর কোনো মর্যাদা ছিল না তাদের কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিলনা। নারী জাতি পুরুষদের দ্বারা পরিচালিত ও প্রভাবিত হতো বলে তাদের সাধারণ চাওয়া-পাওয়া ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভালো-মন্দ সবকিছু অবহেলিত ও বঞ্চিত হত। মানব সভ্যতায় তাদের অবদান ও ভূমিকাকে কোনদিন গুরুত্ব দেয়া হতো না। প্রাচীন যুগের এক ধর্ম শাস্ত্রকর মনু তার মনুসংহিতায় বলেছেন নারী বাল্যে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্রের অধীন থাকবে। এথেকেই বোঝা যায় সে সময় নারীর স্থান কোথায় ছিল। প্রাচীন যুগে নারীরা কোন রাজ্যের রানী বা সিংহাসনের অধিকারী ছিল না। তবে বৈদিক যুগের বহু নারী শিক্ষা ধর্ম প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রেখেছেন। যেমন- লোপামুদ্রা, অপালা, গার্গী। তারা বৈদিক মন্ত্র রচনা করেছেন এবং পুরুষের সাথে তাঁর সহধর্মিণী হয়ে ধর্মচর্চাও করেছেন।

মধ্যযুগীয় নারীদের পর্দানশীন করে রাখা হতো। তবে ইতিহাসে কিছু নারীদের কথা পাই যারা পুরুষের সমকক্ষ হয়ে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। যেমন- রাজিয়া সুলতানা, দুর্গাবতী, চাঁদ বিবি, নুরজাহান প্রমুখ।

rajia_sultana_and_nur_jahan

আধুনিক যুগে নারীর অবস্থান অনেকটাই উন্নত হয়েছে।

নারী এখন পর্দার আড়াল ছেড়ে শিক্ষা-সংস্কৃতি, খেলাধুলা, রাজনীতি, ধর্ম চর্চা, সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের কীর্তিকাহিনী ও অবদান নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে। তাদের জীবনী নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বহু নারী প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের অবদান রেখেছেন। যেমন- ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, মাতঙ্গিনী হাজরা, অরুনা আসফ আলী, সরলা দেবী চৌধুরানী, সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীনা দাস, ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমতী বন্দেরনায়েক, শ্রীমতী গোল্ডা মেয়ার প্রমূখ।

খেলাধুলার জগতে যেমন ক্রিকেটে মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামী, বক্সিং এ মেরি কম, আর্চারিতে দোলা ব্যানারজী, টেনিসে সানিয়া মির্জা, ব্যাডমিন্টন এ সাইনা নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধু অনেকেই দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের মর্যাদা ও অবস্থানের এই যে ধারাবাহিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করার জন্য হাজার 1970 সাল থেকে এই ধরনের ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে। নারী ইতিহাস চর্চা মূলত ব্রিটেন ও আমেরিকাতে প্রথম শুরু হয়। 1977 সালে জোয়ান কেলির লেখা ‘ডিড উইমেন হ্যাভ আ রেনেসাঁ?’ গ্রন্থটি নারীদের সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা কে বদলে ফেলেছিল। আবার জোয়ান স্কটের মতে নারী পুরুষের যে লিঙ্গগত বৈষম্য রয়েছে তা সমাজের তৈরি করা সামাজিক বৈষম্য।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

ভারতের নারী ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে নীরা দেশাই এর লেখা ‘উওমেন ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’ জেরালিন্ড ফোর্বসের ‘উওমেন ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’, বি. আর. নন্দএর লেখা ‘দি ইন্ডিয়ান উইমেন: ফ্রম পর্দা টু মডার্নিটি’ গ্রন্থ গুলি পড়তেই হবে।

এক্ষেত্রে কমলা ভাসিনের লেখা ‘হোয়াট ইজ প্যাট্রিয়ার্কি’ এম. এন. শ্রীনিবাস এর লেখা ‘দ্য চেন্জিং পজিশন অফ ইন্ডিয়ান উইমেন’ ‘আ ফেমিনিস্ট পারস্পেক্টিভ’ গ্রন্থ গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

subscribe-jump-magazine-india

ঙ। পরিবেশের ইতিহাস

তোমরা হয়তো ভাবছো ইতিহাস চর্চায় পরিবেশে কি ভূমিকা আছে!

কিন্তু ভেবে দেখ, পরিবেশ ভালো না থাকলে আমরা ভালো থাকব কি করে?

তাই মানব সভ্যতার ইতিহাস চর্চায় পরিবেশের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, খাল-বিল, সাগর, সমুদ্র, জল, আলো, বাতাস, মরুভূমি, আবহাওয়া, জলবায়ু এই সবকিছুই হল পরিবেশের অংশ।

নগরায়ন, শিল্পায়ন, যুদ্ধ, আধুনিকতার কারণে বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। মানুষকে যদি পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতেই হবে।

বিজ্ঞানের দৌলতে আজ আমরা জেনেছি যে, এক সময় এই পৃথিবী প্রবল ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, পরে আবার প্রবল গরম হয়ে গেল। পৃথিবীর এক এক অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল এক এক রকমের। অঞ্চলভেদে জীব-বৈচিত্র্য ছিল আলাদা আলাদা। যেমন পাহাড়ের অধিবাসীরা খুব কর্মঠ ও কষ্টসহিষ্ণু হয়। নদী বা সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা অঞ্চলের মানুষরা নৌবিদ্যায় পারদর্শী হয় ও ভালো মৎস্যজীবী হয়। আবার সমতল ও উর্বর অঞ্চলের মানুষরা আরামপ্রিয় ও শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য অনুরাগী হয়। এইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদও দেশকে অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা করে তোলে। এইভাবে পরিবেশ মানব সভ্যতা, জীবন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে।

normoda_and_chipko

বর্তমানে বাস্তুতন্ত্র, আবহবিজ্ঞান, বনাঞ্চলের ইতিহাসও ইতিহাস চর্চার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।

1970 সাল থেকে এই ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে। এই ইতিহাস চর্চায় অরণ্য ও অরণ্যপ্রাণীদের সংরক্ষণ এর সুবিধা ও অসুবিধা, অর্নিবাসীদের এই নীতির বিরোধিতা করার কারণ উঠে এসেছে। অরণ্য বাসিরা প্রকৃতিকে পুজো করে তারা এই উপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে প্রভাবিত সংরক্ষণ নীতি মানতে পারেনা। তাই পরিবেশ নিয়ে রাজনীতিও শুরু হয়েছে।

পরিবেশ সম্পর্কে আরো জানতে হলে তোমাদের পড়তে হবে রাচেল কারসন এর লেখা ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’, আলফ্রেড ক্রসবির লেখা ‘ইকোলজিকাল ইম্পেরিয়ালিজম’, রিচার্ড গ্রোভ এর ‘গ্রীন ইম্পেরিয়ালিজম’। বহু ভারতীয় ইতিহাসবিদ যেমন- ইরফান হাবিব, রামচন্দ্র গুহ, বসন্ত সবেরওয়াল, মহেশ রঙ্গরাজন আরো অনেকে পরিবেশের ইতিহাস চর্চা করেছেন।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – গণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান |

ইরফান হাবিব ও মাধব গ্যাডগিল বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন এই বিষয়ের ওপর। যেমন ‘আন ইকোলজিকাল হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’, ‘দিস ফিসারডল্যান্ড’। কিথ টমাস এর লেখা ‘ ম্যান এন্ড দ্য ন্যাচারাল ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে প্রকৃতির উপর প্রাক-আধুনিক প্রভাব এর আলোচনা রয়েছে। সাইমন স্কামার লেখা ‘ল্যান্ডস্কেপ এন্ড মেমারি’ গ্রন্থে প্রকৃতি ও মানুষের একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা ছবি ফুটে উঠেছে। এছাড়া প্রকৃতির সববস্তুই সজীব এই ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে। ‘দিল্লি’স বেলি’ গ্রন্থে মাইকেলম্যান দিল্লি শহরের জলসংকট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস


লেখিকা পরিচিতিঃ

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের (স্নাতকোত্তর) প্রাক্তন ছাত্রী কাজল মণ্ডলের পেশা এবং নেশা ইতিহাস চর্চা। অন্য কাজের অবসরে গান শুনতে এবং দাবা খেলতে ভালোবাসেন কাজল।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group