samoyikpotro-songbadpotro-sahityo
Madhyamik

সাময়িকপত্র, সংবাদপত্র ও সাহিত্য

ইতিহাসদশম শ্রেণি – সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা (পর্ব – ১)


উনবিংশ শতাব্দীর ছিল বাঙালির এক গৌরবময় অধ্যায়৷

এক্ষেত্রে বিভিন্ন মনীষীর অবদানকে অস্বীকার করতে পারবে না বাঙালি৷ এঁনাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির উন্নতি। এঁনারা এসেছিলেন নতুন দিনের বার্তা নিয়ে। তারা ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান সমস্ত ক্ষেত্রে নতুনের জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন৷

বাংলা ভাষায় যে সমস্ত সাময়িক পত্রগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত এই দেড়শো বছর ধরে তার ভূমিকা ও অবদান উনবিংশ সমাজের আন্দোলনের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷

ইংরেজ আমলে মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর সাধারণ জনগণের পড়ার জন্য সাময়িক পত্রগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করে৷ আঠারো শতকের শেষ থেকে ছাপাখানার ব্যবহার শুরু হয়।

1780 সালে জেমস অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বেঙ্গল গেজেট’ হল ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র৷

আর সংবাদপত্রের ভূমিকা শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশনের আটকে রইল না, বরং তারা সরকারি কাজে নিজেদের স্বাধীন মত প্রকাশ করার সুযোগ পেল৷ 1798 সালে প্রকাশিত হয় ‘বেঙ্গল হরকরা’, যদিও ভারতীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য ইংরেজরা হিকিকে নির্বাসিত করে৷


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

তবে বাংলা ভাষার জয়যাত্রা শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশনের হাত ধরে!

শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয় 1818 সালে দিগ়্দর্শন পত্রিকা ওই বছরেই একই সংস্থানের সাহায্যে প্রকাশিত হল ‘সমাচার দর্পণ’ আর এই দুই পত্রিকার সম্পাদক এক ব্রিটিশ ব্যক্তি মার্শম্যান৷

এরপর 1821 সালে রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়ের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ কৌমুদি’৷ এটি ছিল একটি সাপ্তাহিক বাংলা সংবাদপত্র৷ তবে এর মাঝে উল্লেখযোগ্য সংবাদটি হল ১৮১৮ সালের মে মাসে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বাঙ্গাল গেজেটি’, এটি ছিল বাঙালি সম্পাদিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র৷

এর আগে আমরা বাংলা সংবাদপত্র পেয়েছিলাম কিন্তু ‘বাঙ্গাল গেজেটি’ একটি নতুন পালক যোগ করল সম্পাদনায় অংশগ্রহন করে৷ রামমোহন রায় রীতিমতো ধর্মীয় কারণে প্রকাশনা শুরু করেছিলেন সংবাদ কৌমুদির৷ কিন্তু পরবর্তীকালে তার সাথে ভবানীচরণেরে মতানৈক্য হলে তিনি প্রকাশ করলেন ‘সমাচার চন্দ্রিকা’৷

পরবর্তীকালে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর৷ এ ছাড়াও আরও অনেক ধরনের সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে৷

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের সংবাদপত্রে ‘সেকালের কথা’ গ্রন্থে সেসময়ের বিবিধ প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির কথা বিস্তারে আমরা জানতে পারি৷

‘বঙ্গদর্শন’ ও তার পরবর্তী সময়

সাময়িকপত্রের জগতে বঙ্গদর্শনের আবির্ভাব এক অন্য মাত্রা এনে দিল৷ নতুন ধরনের ধারার আবির্ভাব ঘটল৷ এমনকি নারী সমাজকেও পাঠক হিসেবে পেল এবার বঙ্গ সমাজ৷ এছাড়া প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের ‘ইন্ডিয়ান রিফর্মার’ (১৮৩১), হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’(১৮৫৩), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকাও উল্লেখযোগ্য৷

নারী সমাজ ও সাময়িক পত্রিকা

ঊনবিংশ শতাব্দীতে নারী প্রগতির উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয় ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’, মূলত এই পত্রিকার উদ্যোক্তা ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। তিনি বাংলায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে নারীর অগ্রগতিতে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিলেন। তার উদ্যোগে 1863 খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় বামাবোধিনী সভা। প্রকৃতপক্ষে ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ ছিল এই সভার মুখপাত্র৷ এই সময়কালীন অন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হল তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ‘অবলাবান্ধব’৷

তৎকালীন সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন

সাময়িক পত্রিকা ও সংবাদপত্রের পর ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জন-মানসকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সাহিত্যের অবদান কোনমতেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়৷

প্রথমদিকে বাংলা সাহিত্যের উপর ইউরোপীয় সাহিত্যের একটা প্রভাব আছে বলে মনে হয়েছিল৷

তবে পাশ্চাত্য সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে অনুকরণ করেনি এদেশের সাহিত্য৷ পাশ্চাত্যের দর্শন শিল্পরূপকে গ্রহণ করলেও এদেশের সাহিত্যে উপনিষদীয় সাহিত্য থেকেও ভাবধারা গ্রহণ করতে ঊনবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্য পিছপা হয়নি৷ মধ্যযুগীয় সাহিত্যে একটা ছন্দের ভাব লক্ষ্য করা গেলেও ঊনবিংশ শতকের সাহিত্য ছিল মূলত গদ্য নির্ভর৷jump-magazine-subscription
এই সময় প্রচুর পরিমাণে নাটক নভেল রচিত হয়েছিল সেই সঙ্গে অবশ্য গীতিকাব্যের উদাহরণও পাওয়া যায়৷ মধ্যযুগ যেখানে সাহিত্যে দৈব আদর্শ ,দৈব নির্দেশ ,ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদিকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল সেখানে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু ছিল মানবতাবাদ ,জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা৷

লক্ষণীয় সাম্প্রতিককালের পরিস্থিতি অনুযায়ী ঊনবিংশ শতকের বাঙালির মন হয়ে উঠেছিল অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন৷

ঊনবিংশ শতকের কিছু বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও তাদের সৃষ্টি

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখার কথা৷ লেখক তার জন্মভূমি ভারতবর্ষকে ইন্দ্রের অমরাবতী থেকেও শ্রেষ্ঠ মনে করতেন তবে ভারতীয়দের পাশ্চাত্য সাহিত্য ও আদর্শের প্রতি যে ভালোবাসা তা তাঁর কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিল না বরং তিনি এই মোহগ্রস্ততাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য বলেন “দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া৷”

আবার কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় ফুটে উঠেছে “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে/ কে বাঁচিতে চায়?” স্বদেশপ্রেমের এই জয়গান আমরা শুনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচনাতেও৷ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এর বৃত্তসংহার ও নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ কাব্যেও জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশপ্রেমের আবেগ ধরা পড়ে খুব স্পষ্টভাবে৷
প্রাচীন ভারতবর্ষে নাট্যাভিনয়ের প্রচলন ছিল।

পাশ্চাত্যের আদর্শকে গ্রহণ করে কলকাতায় প্রথম বাংলা নাটক অভিনীত হয় 1795 সাল নাগাদ  হেরাসিম লেবেডফ এর উদ্যোগে৷

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ভারতে ধীরে ধীরে দেশাত্মবোধক নাটক লেখা ও তার অভিনয় জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে৷ অবশ্যই এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য

1858 খ্রিস্টাব্দে লেখা দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ৷

হুতুম প্যাঁচার নকশা

সাহিত্যে স্বদেশী ভাবধারার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে লেখার উল্লেখ না করলেই নয় তা হল কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা হুতুম প্যাঁচার নকশা গদ্যটি৷ কালীপ্রসন্ন সিংহের ছদ্মনাম ছিল হুতুম পেঁচা৷

এই গদ্যে তৎকালীন সামাজিক অনাচার ,মানুষের চরিত্রের নৈতিক স্খলন ইত্যাদির প্রতি বিদ্রূপের মাধ্যমে কালীপ্রসন্ন সিংহ মানুষকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেছেন৷ কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখনীতে তৎকালীন সমাজের চিত্র, চরিত্র যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি আরেকটি বিষয় উল্লেখ যোগ্য এই গ্রন্থে মূলত লেখক কোন কাল্পনিক চরিত্রকে আশ্রয় করেননি বরং তার সমালোচনার নিশানায় ছিল বাস্তব চরিত্ররাই৷

এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ্য মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’, দক্ষিণারঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের ‘চা-কর দর্পণ’,অমৃতলাল বসুর ‘হীরকচূর্ণ’৷

নীলদর্পণ নাটক

জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে রচিত সাহিত্য সম্বন্ধে যখন আলোচনা হয় তখন 1858 খ্রিস্টাব্দে রচিত দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ সম্বন্ধে যদি দু-চার কথা না বলা যায় তবে ইতিহাসের অবমাননা হয়৷ এই নাটকে যে স্থানের কথা জায়গা পেয়েছে তা হল নদীয়ার অন্তর্গত গুয়াতালির মিত্র পরিবারের বিপর্যয়ের কাহিনী৷ এই নাটকে তোরাপ ,আদুরী, উডসাহেব, রোগ সাহেব , পদি ময়রানী চরিত্রগুলি ছিল অত্যন্ত বাস্তব ধর্মী৷


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

নাটকটি প্রচার ধর্মী হলেও নাটকের সংলাপ ও চরিত্র গঠনের মাধ্যমে হয়ে ওঠে অত্যন্ত শক্তিশালী ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি৷ দীনবন্ধু মিত্র সরকারি কর্মচারী হওয়ার দরুন তিনি কেনচিৎ পেথিকেন ছদ্মনামে নাটকটি প্রকাশ করেন৷ তবে পরবর্তীকালে পাদ্রী জেমস লং সাহেব যখন এই নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন তখন তিনি সরকারি রোষের শিকার হন৷ বিচারে লংয়ের কারাবাস ও জরিমানার আদেশ হয়৷

1872 খ্রিস্টাব্দে যখন কলকাতায় জাতীয় নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেখানে প্রথম অভিনীত নাটক হলো নীলদর্পণ৷

দেশাত্মবোধক নাটকের কথা যখন ওঠে তখন গিরিশচন্দ্র ঘোষের সৃষ্টিগুলোকে বাদ দিলে চলে না৷ গিরিশ ঘোষের নাটক সিরাজদৌলা, মীর কাসিম, ছত্রপতি শিবাজী অবশ্যই উল্লেখের অপেক্ষা রাখে৷

বাঙালি তথা ভারতবর্ষের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে যে মন্ত্রটি সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়েছিল তা হল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দেমাতারাম’।

এই মন্ত্র ভারতবাসীকে জাদু বলে দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এছাড়া ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা আনন্দমঠ উপন্যাস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়৷

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত কৃষ্ণচরিত্র, রাজ সিংহ, দেবী চৌধুরানী, দুর্গেশ নন্দিনী, সীতারাম প্রভৃতি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে৷

প্রাসঙ্গিকভাবে স্বামী বিবেকানন্দের রচনা গুলোকেও অস্বীকার করা যায় না তার লেখা বর্তমান ভারত, প্রাচ্য পাশ্চাত্য ,রাজযোগ, পরিব্রাজক প্রভৃতি লেখা ভারতবাসীর মনে একাত্মতা বোধ জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছিল৷ রমেশচন্দ্র দত্তের লেখা মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত ও রাজপুত জীবন সন্ধ্যা অবশ্যই স্বদেশপ্রেমের অন্যতম নিদর্শন৷

প্রথম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → উনিশ শতকের বাংলাঃ শিক্ষা ও সংস্কার


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।