dakater-ma-bishoysongkhep
Class-11

ডাকাতের মা গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

বাংলাএকাদশ শ্রেণি – ডাকাতের মা (প্রথম পর্ব)


সতীনাথ ভাদুড়ীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর বিহারের পূর্ণিয়া জেলার ভট্টবাজারে আলোচ্য ‘ডাকাতের মা’ গল্পের লেখক অবিস্মরণীয় কথাসাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ীর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ইন্দুভূষণ ভাদুড়ী এবং মাতার নাম রাজবালা দেবী।

তাঁর পিতা ইন্দুভূষণ ছিলেন জেলা আদালতের আইনজীবী। নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে তাদের আদি নিবাস ছিল। সতীনাথ ভাদুড়ীরা মোট আট ভাই বোন ছিলেন ।

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে উচ্চ প্রাথমিক বৃত্তি গ্রহণ করে পূর্ণিয়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এখান থেকেই ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি।

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে সতীনাথ ভাদুড়ী পড়তে যান পাটনায় এবং সেখানে ১৯২৫ সালে পাটনা সায়েন্স কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন বি.এ পাঠক্রমে ভর্তি হন তিনি। এরপরে অর্থনীতিতে প্রথমে স্নাতক এবং পরে ১৯৩০ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করেন।

১৯৩১ সালে সতীনাথ ভাদুড়ী পাটনার ল কলেজ থেকে বি.এল ডিগ্রি অর্জন করে ওকালতিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত মোট ৭ বছর পূর্ণিয়ায় ওকালতি করেছেন তিনি। তবে এই ওকালতি করাকালীনই সাহিত্যচর্চায় তাঁর হাতেখড়ি হয়ে গেছে।

১৯৩২ সালে বিচিত্রা পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘জামাইবাবু’ প্রকাশ পায়। কর্মজীবনে সাহিত্যচর্চা, টেনিস খেলা এবং ব্রিজ খেলা এই নিয়েই মেতে থাকতেন তিনি।

তারপরে একদিন ওকালতি ছেড়ে ১৯৩৯ সাল নাগাদ সক্রিয়ভাবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যোগ দেন। অগ্রজ সাহিত্যিক কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর আদর্শ।

১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর তিনি নানাবিধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যেই ১৯৪০ সালে হাজারিবাগ জেলে দু বছর এবং ভাগলপুর জেলে দু বছর রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আটক ছিলেন তিনি।

১৯৪১ সালে সতীনাথ ভাদুড়ী পূর্ণিয়ার জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলে থাকার সময় তিনি লিখে ফেলেন বাংলা সাহিত্যে সাড়া জাগানো একটি অসামান্য রাজনৈতিক উপন্যাস ‘জাগরী’।

দেশের স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের আদর্শচ্যুতির কারণে দল ত্যাগ করে সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন সতীনাথ ভাদুড়ী। ফ্রান্স, ইতালি, সুইজারল্যাণ্ড এবং জার্মানি ভ্রমণ করেন তিনি এই সময়। আর এই সময় থেকেই নিয়মিতভাবে পূর্ণ সময়ের জন্য সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন সতীনাথ ভাদুড়ী।

তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘গণনায়ক’ প্রকাশ পায়।

তারপরে ১৯৪৮ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘ঢোঁড়াইচরিত মানস’ উপন্যাসের প্রথম চরণটি প্রকাশ পায়। ঐ বছরই প্রকাশ পায় ‘চিত্রগুপ্তের ফাইল’

তাঁর প্যারিসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন ‘সত্যিভ্রমণ কাহিনী’ বইয়ের পাতায় পাতায়।

১৯৫০ সালে ফ্রান্সে থাকাকালীনই ‘জাগরী’ উপন্যাসের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন সতীনাথ ভাদুড়ী।

১৯৫০ সালের জুন মাসে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৫১ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই দেখা যায় তাঁর সব উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে।

‘জাগরী’ ছাড়া তাঁর লেখা অন্যান্য শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’, ‘অচিন রাগিণী’, ‘সংকট’, ‘দিগভ্রান্ত’ ইত্যাদি উপন্যাস এবং ‘চকাচকী’, ‘অপরিচিতা’, ‘অলোকদৃষ্টি’, ‘পত্রলেখার বাবা’ ইত্যাদি ছোটোগল্প সংকলন।

এছাড়া নানা সময় তাঁর বহু উপন্যাসের ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জাগরী উপন্যাসের হিন্দি অনুবাদ করেন নারায়ণ প্রসাদ ভার্মা, ঐ বছরই লীলা রায় এই উপন্যাসের একটি ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘দি ভিজিল’ নামে।

strongএত বিপুল পাণ্ডিত্য সমৃদ্ধ সাহিত্যিক বাংলা ভাষায় খুব কম জন্মেছেন। বলা হয়, শুধুমাত্র ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ উপন্যাসটি লেখার জন্যেই তাঁর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়া উচিত ছিল।

১৯৬৫ সালের ৩০ মার্চ সতীনাথ ভাদুড়ীর মৃত্যু হয়।

ডাকাতের মা গল্পের উৎস

১৩৬১ বঙ্গাব্দের শারদীয় ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রথম এই ‘ডাকাতের মা’ গল্পটি প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত সতীনাথ ভাদুড়ীর বিখ্যাত গল্প সংকলন ‘চকাচকী’তে এই গল্পটি স্থান পায় এবং আমাদের আলোচ্য পাঠ্যাংশটিও সেই গল্প সংকলন থেকেই সংগৃহীত হয়েছে।


একাদশ শ্রেণি থেকে→ Physics | Chemistry Biology | Computer

ডাকাতের মা গল্পের বিষয় সংক্ষেপ

‘ডাকাতের মা’ ছোটোগল্পে দেখা যায় দুটি প্রধান চরিত্র – সৌখী নামের এক ডাকাত আর তার মা। সৌখী আসলে বংশপরম্পরায় ডাকাতি করে। তার বাপ-ঠাকুরদাও ছিল ডাকাত আর তাই সৌখীর মাকে আগে লোকে ‘ডাকাতের বউ’ বলে ডাকতো।

বাবা মারা যাবার পরে সৌখী বাবার মতোই ডাকাতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়।

ডাকাতের মা গল্পটি শুরু হচ্ছে ডাকাতের মায়ের অবস্থা বর্ণনার মধ্য দিয়ে।

ডাকাতের মায়ের ঘুম হয় সবসময় হালকা।কারণ রাতে কখন যে তার ছেলে এসে দরজায় টোকা দেবে তার ঠিক নেই।
এই টোকা দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ সংকেত চিহ্নের ব্যবহার সৌখীর মা শিখে নিয়েছে। ডাকাতির কাজে ভয় বেশি, তাই অবিশ্বাসও বেশি। তাই চট করে দরজা খোলা যায় না।

সৌখীর মা জানে যে দুটো টোকা দেওয়ার শব্দ যদি থেমে থেমে তিনবার হয় তবে বুঝতে হবে সৌখীর ডাকাত দলের লোকেরা এসেছে টাকা দিতে।

আবার ঐ একই শব্দ যদি থেমে থেমে চারবার হয় তাহলে বুঝতে হবে যে সৌখী নিজেই বাড়ি ফিরে এসেছে।

তবে সৌখী তার মাকে সতর্ক করে দিয়েছে যে দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ পেলেই যাতে না খোলে। এ ব্যাপারে তাঁর মাকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলেছে। দশবার নিশ্বাস ফেলতে যতক্ষণ সময় লাগে ঠিক ততক্ষণ অপেক্ষার পরেই দরজা খোলার নির্দেশ দিয়েছে সৌখী।

মাঝেমাঝে যদিও এই সংকেতগুলিও পাল্টাতে হয়। ডাকাত দলে কে যে কখন বিশ্বাসঘাতকতা করবে কেউ বলতে পারে না, তাই এত সতর্কতা।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

আগের মতো ভালো সময় নেই আর!

সৌখীর বাবার আমলে এক ডাকাত আহত হয়ে পড়লে পুলিশের কাছে যাতে ধরা না পড়ে বা তার থেকে কোনো খবর যাতে না বেরিয়ে আসে তাই সে নিজেই নিজের জিভ কেটে ফেলতো।

কিন্তু এখন সৌখীর অনুচরেরা খুব একটা বিশ্বস্ত নয়। পাঁচ বছর আগে সৌখী জেলে গেছে। প্রথম দুই বছর সৌখীর দলের লোকেরা প্রতি মাসে সৌখীর মাকে টাকা দিয়ে গেছে, কিন্তু তারপর থেকে আর টাকা দিতে আসে না।

অভাবে পড়ে সৌখীর মায়ের কি অবস্থা হল, কেমন আছেন তিনি সেসব সংবাদও কেউ আর নিতে আসে না। ডাকাত সর্দারের পরিবার ভেসে গেল কিনা, আদৌ বেঁচে আছে কিনা তা দেখতে আসে না দলের লোকেরা কেউই।

সৌখীর প্রথম বউ ছিল নিঃসন্তান, শরীর-স্বাস্থ্য ভালো ছিল। কিন্তু তার দ্বিতীয় বউটার শরীর-স্বাস্থ্য মোটেও ভালো নয়। সৌখীর দ্বিতীয় স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার পরেই শেষবার সৌখী ধরা পড়েছিল।

আর সৌখী ধরা পড়ার দুই বছর পর থেকেই সংসারে প্রবল অভাব দেখা দেয়, চার-পাঁচ বছর বয়সী সৌখীর ছেলে কখনোই তাঁর বাবার সান্নিধ্য পায়নি।

সৌখীর মা মনে করেন যে সৌখীর বাবার নামে এককালে চৌকিদার এমনকি থানার দারোগাসাহেবও কাঁপতেন, সেই সৌখীর সংসারেই আজ নাকি অভাব, দুবেলা দুটো অন্নসংস্থানও হয় না।

সৌখীর দ্বিতীয় স্ত্রীর শারীরিকভাবে ততটা সবল না হওয়ায় সেও পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করতে পারে না। বৃদ্ধা সৌখীর মাকেই বাধ্য হয়ে খই-মুড়ি ভেজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করে আসেন। এইসব বিক্রি করেও একজনের পেট চালানোর মতো অর্থ উপার্জন করা সম্ভব নয়।

ঝি-এর কাজও করতে পারে না সৌখীর মা কারণ ডাকাতের মা হওয়ার কারণে কেউই তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। তাই ছেলের অনুপস্থিতিতে বউমা আর নাতিকে বাধ্য হয়েই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন সৌখীর মা।

তাঁর বেয়াই অর্থাৎ সৌখীর শ্বশুরমশাই গোয়ালা বলে তাঁর বাড়িতে আর কিছু না হোক, সামান্য দুধটুকু মা এবং ছেলে দুজনেই খেতে পাবে এই বিশ্বাসে এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন সৌখীর মা।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

এ কথা সৌখীও জানে না।

সৌখীর মা মনে করতো যে তার ছেলে জেল থেকে ফিরলে পরে বউমা আর নাতিকে রূপোর গয়নায় একেবারে ভরিয়ে দেবে আর সৌখী আসার পরেই দলের যে লোকেরা তাঁর দুর্দিনে তার পরিবারকে দেখেনি তাদের উচিত শিক্ষা দেবে।

ঐ লোকগুলো বড্ড স্বার্থপর এবং সে কারণে তাদের দলে না রাখাই ভালো এমনই মনে করেন সৌখীর মা।

এমন করেই চলছিল। কয়েকদিন ধরেই রাতে সৌখীর মায়ের ঘুম আসছিল না। শীতকালে এমনিতে লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে না শুলে তার ঘুম আসে না। কিন্তু একদিন এমনই মুড়ি দিয়ে ঘুমোনোর কারণে রাত্রে সৌখী এসে দরজায় টোকা দিলে তার মা শুনতে না পাওয়ায় সৌখী তার মাকে এমনভাবে না ঘুমোতে শাসিয়ে যায়।

তার বাবার মতোই সৌখীও ধাতে বেশ কড়া, রগচটা প্রকৃতির মানুষ।

সৌখীর এই কথা শুনতে গিয়ে লেপ-কম্বলে মুড়ি দিতে পারেনি সৌখীর মা আর তাই রাত্রে তার ঘুম ভালো হয়নি। বয়স বাড়ার কারণে শীতও বেশি লাগে তার আর কম্বলটাও অনেক পুরনো হয়ে যাওয়ায় আর তাতে শীত মানে না।

সৌখীই এই কম্বলটা আগেরবার জেল থেকে নিয়ে এসেছিল। ঠিক এই সময়েই আধো তন্দ্রায় সৌখীর মা টিকটিক আওয়াজ শুনে সচকিত হয়। প্রথমে টিকটিকির ডাক বা শেয়াল-গন্ধগোকুলের চলাফেরার শব্দ ভাবলেও পরে আরো মন দিয়ে শুনলে সে বুঝতে পারে দরজাতেই কেউ দুবার টোকা মারলো।

উঠে বসে সৌখীর মা দেখতে পায় ঘর গরম করার আগুনের ধোঁয়ায় তার ঘর ভরে গেছে। আবার দুটো টোকা দরজায় পড়ায় সৌখীর মা নিশ্চিত হয় যে ডাকাতদেরই কেউ হয়তো এসেছে।

এগুলি সবই সাংকেতিক শব্দ। তাও আগেই দরজা না খুলে দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের মানুষটিকে বোঝার চেষ্টা করলো সৌখীর মা। কাউকে দেখতে না পেলেও বিড়ির গন্ধ পেল সে আর তখনই একেবারে তার কানের কাছে আবার দুবার টোকা পড়লো। তার ফলে সে বুঝতে পারলো দলের কেউ নয়।

পুলিশের লোক হওয়ার সম্ভাবনাও নেই কারণ সৌখীই বহুদিন জেলে রয়েছে।

তাই ছেলের পূর্বনির্দেশ অনুসারে দশ বার নিশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করে দরজা খুলতেই ছেলের গলার স্বর শুনে অভাবিতভাবে নিশ্চিন্ত হল সৌখীর মা।

সৌখীর মুখ থেকেই তার মা জানতে পারে যে লাটসাহেব জেল পরিদর্শনে এসে সৌখীর ব্যবহারে, কাজে-কর্মে খুশি হয়ে তাকে ছেড়ে দেবার জন্য হুকুম দিয়েছেন। আসলে সে প্রধান জমাদারকে ঘুষ দিয়েছিল আর সেই কারণেই তিনি জেলার সাহেবের কাছে সৌখীর জন্য সুপারিশ করেছিলেন।

কেরোসিনের কুপি খোঁজার সময় সৌখী দেশলাই জ্বালে আর সেই আলোয় সৌখীর মা তার ছেলের মুখ দেখতে পায়। ইতিমধ্যে উভয়ের মধ্যে কুশল বিনিময় চলে। সৌখী জানতে চায় তার বউ-ছেলে কোথায় গেছে? সৌখীর মা তাকে খুব নম্রভাবে জানায় যে বউ তার ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে।

সব কথা তখনই বলে সৌখীর মেজাজ চড়িয়ে দিতে চায়নি তার মা।

কিন্তু এতদিন পরে জেল থেকে বাড়ি ফিরে ছেলে-বউকে না দেখতে পেয়ে অর্ধেক আনন্দই তার মাটি হয়ে যায়। শুধুমাত্র ছেলের কথা শুনবে বলেই অনেকক্ষণ টোকা না মেরেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল সৌখী।

ছেলেকে সে এতদিন দেখতেই পায়নি, কেমন সে দেখতে হল তা দেখার বড়ো সাধ ছিল সৌখীর মনে। সেই সাধ যখন পূরণ হলই না, তখন সৌখীর মায়ের ব্যবসার ঐ খই-মুড়িগুলো খেয়ে মায়ের ছেঁড়া কম্বলটা গায়ে দিয়ে নিজের নতুন কম্বলটা মাকে গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সৌখী।

আর কিছুক্ষণ পরেই সে নাক ডাকতে থাকে। দুশ্চিন্তায় আর সৌখীর নাক ডাকার কারণে তার মায়ের কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। পরের দিন সকালে ছেলেকে কি খেতে দেবে সেই নিয়ে সৌখীর মায়ের কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না।

সৌখীর প্রিয় আলু-চচ্চড়ি খেতে দেওয়ার জন্য পরদিন সকালে চাল, আলু, সর্ষের তেল ইত্যাদি কেনার কথা ভাবে সৌখীর মা।

কিন্তু তাঁর কাছে কোনো পয়সাকড়ি ছিল না। সেই মুহূর্তেই সৌখীর মায়ের মনে পড়ে যায় পাড়ার পেশকার সাহেবের কথা। উপায়ান্তর না দেখে পেশকার সাহেবের বাড়িতে চুরি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

মধ্যরাত্রে পেশকার সাহেবের সদ্য গড়ে তোলা পাঁচিলটা টপকে সৌখীর মা মাতাদীন পেশকারের বাড়িতে ঢোকে। পেশকার সাহেব তাঁর পিতলের লোটার প্রতি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। পেশকার সাহেব প্রতিদিন তার লোটাটা কয়েকবার মেজে পরিষ্কার করে তবেই শান্ত হতেন।

সেই লোটার উপরেই নজর পড়ে সৌখীর মায়ের।

পরদিন ভোরবেলা উঠে সেই লোটা বাড়ির কোথাও না পেয়ে মাতাদীন পেশকার হট্টগোল বাধালেন। তাঁর স্ত্রী জানান যে, লোটা হল বাড়ির লক্ষ্মী।

তাই বাড়ির লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে আনার জন্য সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি লোটা কিনে আনা অবশ্যই দরকার। একদিকে চোরের উপর রাগ আর অন্যদিকে স্ত্রীয়ের কান্না শুনে মেজাজ চড়ে যায় মাতাদীন পেশকারের।

স্ত্রীকে ধমক দিয়ে মাতাদীন পেশকার বলেন যে চুরির খবর জেনেও পুলিশকে তা না জানালে সেই দোষে জেল পর্যন্ত হতে পারে। স্ত্রীকে কটু কথা শোনাতে শোনাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন পেশকার সাহেব এবং চুরির খবর জানাতে প্রথমেই তিনি গেলেন থানায়।

ফেরার পথে বাসনের দোকানে গেলেন তিনি এবং সেই দোকানে পেশকার সাহেবকে দোকানদার নানা রকমের ঘটি দেখালো। কোনো ঘটিই তাঁর পছন্দ হয় না।

পেশকার চান এমন লোটা চান যা এতটাই বড় হবে যাতে কোনো স্বাস্থ্যবতী মহিলা একটা মোটা বালা পরেও তার হাত অনায়াসেই লোটার ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। এই কথা শুনে দোকানদার পেশকারকে জানান যে নতুন কোনো ঘটি এখন পাওয়া না গেলেও পুরনো যদি তিনি নিতে চান তাহলে খুব কম দামে মাত্র আড়াই টাকায় পেশকার সাহেব একটি লোটা পেতে পারেন।

এই বাসনের দোকানে পুরনো বাসন বিক্রি হয় শুনে প্রথমে বিস্মিত হন পেশকার সাহেব এবং যখন দোকানদার তাঁকে সেই পুরনো লোটাটি বের করে দেখান প্রথমেই তার মনে সন্দেহ জাগে।

পকেট থেকে চশমা বের করে ভালো করে তিনি লক্ষ্য করেন যে তার চুরি যাওয়া লোটার মতোই এই লোটাটিও চার পায়াওয়ালা এবং এরও পায়ের নিচে তারা আঁকা রয়েছে।

পেশকার নিশ্চিত হলেন যে এটিই তার লোটা। মুহূর্তের মধ্যে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে পেশকার সাহেব দোকানদারের গলা টিপে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন যে এই ঘটিটি সে কোথা থেকে পেয়েছে।

চিৎকার-চেঁচামেচিতে দোকানের সামনে, আশেপাশে লোক জড়ো হয়ে যায়। ভয় পেয়ে সেই দোকানদার পেশকার সাহেবকে জানায় যে, কিছুক্ষণ আগেই সে এই লোটাটি সৌখীর মায়ের কাছ থেকে নগদ চোদ্দ আনা পয়সায় কিনেছে।

তখন পেশকার সাহেব দারোগা সাহেবকে থানা থেকে ডেকে আনার জন্য একটি ছেলেকে পাঠান এবং চুরির মীমাংসা হয়েছে এবং চোর ধরা পড়েছে জেনে দারোগা সাহেব সেই মুহূর্তেই থানা থেকে রওনা দেন অকুস্থলে।

পেশকার সাহেবের থেকে এসব কথা শুনতে পেরে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দলবল নিয়ে উপস্থিত হন সৌখীর বাড়িতে। সৌখী তখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পুলিশ দেখেই সৌখীর মায়ের বুক কেঁপে ওঠে। সৌখীর মা ভেবেছিল যে বাসনের দোকানদারেরা পুরনো বাসন রঙ করে নতুনের মত রূপ দিয়ে তার পরেই বিক্রি করে।

বুড়ি সৌখীর মা মনে করে ডাকাতি তার স্বামী-পুত্রের ন্যায্য অধিকারের জীবিকা, কারণ ডাকাতি হল সমর্থ পুরুষের কাজ, অহংকারের কাজ।

কিন্তু শেষকালে ডাকাত পরিবারের বউ হওয়া সত্ত্বেও ছিঁচকে চুরির দায়ে তাকে জেলে যেতে হবে?

লজ্জায় সৌখীর মা তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করতে ভুলে গেল। ইতিমধ্যে হই-হট্টগোলে সৌখীর ঘুম ভেঙে গেছে এবং ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই সৌখী বুঝতে পেরে যায় আসল ব্যাপারটা ঠিক কি।

সৌখী বুঝতে পারলো সামান্য চোদ্দ আনা পয়সার জন্য তার মা শেষে একটা ঘটি চুরি করেছে। অনটন-অভাবের কথা নিজের ছেলে সৌখীকে অন্তত তাঁর মা বলতেই পারতেন।

জেলখানার ঠিকাদারের অধীনে কাজ করে মোট ৯০ টাকা আয় করেছে সৌখী। ঠিক তখনই সৌখী ভাবলো যে বাড়ি-ঘর ইত্যাদি অবস্থা দেখে তার মায়ের অবস্থাটা তখনই বুঝে নেওয়া উচিত ছিল।

অবশেষে মায়ের সম্মান রক্ষার তাগিদে সৌখী নিজেই লজ্জায় মাথা পেতে চুরির দায় স্বীকার করে নেয়। দারোগাবাবু চোর ধরার আনন্দে তার অনুচর পরিষদবর্গের দিকে বিজয়ীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। দারোগাবাবু এমন ভাব করেন যাতে সৌখীকে বেলা পর্যন্ত ঘুমোতে দেখে তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন আসল ঘটনাটা কি।
শুধুমাত্র সৌখীর মায়ের থেকে সেই ঘটনাটা স্বীকার করার চেষ্টায় ছিলেন তিনি।

সৌখীর মা এবার ভেঙে পড়েন কান্নায়। তিনি যে ছেলের নামে কালিমা লেপন করেছেন। দারোগাবাবুর পায়ে ধরে মাথা ঠুকে সৌখীর মা জানায় যে তার ছেলে কোনো চুরি করেনি, সৌখীর মা নিজেই চুরি করেছেন।

দারোগাবাবুকে তার ছেলে সৌখীকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন সৌখীর মা। জেল থেকে ফিরে ছেলে, বউ কারোরই মুখ দেখতে পায়নি সৌখী। দারোগাবাবু সৌখীর মায়ের কথায় কর্ণপাত করেন না।

থানায় যাওয়ার আগে সৌখী তার কোমরের বটুয়াটা বার করে রেখে যায় খাটিয়ার ওপর। তখনো মাটিতে লুটিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সৌখীর বুড়ি মা।এদিকে উনুনে বসানো তরকারির পোড়া গন্ধ সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → ডাকাতের মা গল্পের বিশদে আলোচনা এবং বিষয়বস্তু


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –