nilodhojer-proti-jona
Class-11

নীলধ্বজের প্রতি জনা – বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও পৌরাণিক অনুষঙ্গ

বাংলাএকাদশ শ্রেনি – নীলধ্বজের প্রতি জনা (তৃতীয় পর্ব)


আগের দুটি পর্বে আমরা নীলধ্বজের প্রতি জনা কবিতার কাব্য পরিচিতি এবং বিশদে সরলার্থ আলোচনা করেছি। এই অন্তিম পর্বে আমরা নীলধ্বজের প্রতি জনা কবিতার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও পৌরাণিক অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনা করবো।

নীলধ্বজ এবং জনার এই কাহিনি কোথা থেকে পেলেন মধুসূদন?

আলোচনার শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক কাহিনির মূল উৎসটি। মূল মহাভারত থেকে অনুপ্রাণিত হননি মধুসূদন। এই পত্রকবিতা রচনার আড়ালে প্রভাব ছিল বেদব্যাসের শিষ্য ঋষি জৈমিনির ভারত-সংহিতা তথা জৈমিনি ভারত এবং কাশীরাম দাসের বাংলায় অনূদিত মহাভারতের।

জৈমিনি ভারতের কাহিনিতে দেখা যায়, অর্জুন অশ্বমেধের ঘোড়া নিয়ে পৌঁছায় মাহিষ্মতীপুরীতে আর ঠিক তখনই রাজপুত্র প্রবীর সেই ঘোড়াকে বেঁধে রেখে পাণ্ডবদের আহ্বান করেন যুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধে শরবিদ্ধ হন প্রবীর, রাজা নীলধ্বজ তাঁকে উদ্ধার করেন। তারপর নীলধ্বজের সৈন্যদের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধে প্রবীর মারা যায়। নীলধ্বজ সেই সময় তাঁর জামাতা অগ্নির শরণাপন্ন হন। কিন্তু সেই অগ্নি অর্জুনের স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে নীলধ্বজকেই বলেন অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া পাণ্ডবদের ফিরিয়ে দিতে। কারণ অর্জুন স্বয়ং নারায়ণের অবতার, নারায়ণ তাঁকে সবসময় রক্ষা করেন। ফলে যুদ্ধের বাসনা ত্যাগ করে হতাশচিত্তে নীলধ্বজ অন্তপুরে গিয়ে পত্নী রাজমহিষী জ্বালাকে ঘোড়াটি ফিরিয়ে দিতে বলেন।

কিন্তু স্বামীর এহেন হীন আচরণে তাঁকে ধিক্কার দেন জ্বালা।

ফলে নীলধ্বজ আবার যুদ্ধে গেলেও অর্জুনের বাণে বিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় ফের অন্তঃপুরে ফিরে আসেন। তারপর জ্বালাকে বুদ্ধিহীন বলে তিরস্কার করে অর্জুনকে যুদ্ধের ঘোড়া ফিরিয়ে দেন নীলধ্বজ এবং অর্জুনের নির্দেশে তিনি নিজেও সেই ঘোড়ার সঙ্গে যেতে সম্মত হন। জ্বালা সেই সময় রাজপুরী পরিত্যাগ করে চলে যান তাঁর ভাই উল্মুকের কাছে এবং অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভাইয়ের সাহায্য প্রার্থনা করেন জ্বালা। সেই শুনে জ্বালাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিতে চাইলেও পরে ঘর-ভাঙানি অপবাদ দিয়ে উল্মুক জ্বালাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন। খেয়া করে গঙ্গা পেরোবার সময় জ্বালা ক্রুদ্ধ চিত্তে গঙ্গার পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গঙ্গাদেবী স্বয়ং আবির্ভূতা হন জ্বালার সামনে এবং তখন জ্বালা তাঁকে বলেন যে পরপর সাত পুত্রকে বিসর্জন দিয়ে গঙ্গা নিজের জলকেই অপবিত্র করেছেন। শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গঙ্গার শেষ পুত্র ভীষ্মকেও বধ করেছেন। ভীষ্মের মৃত্যুর কথা শুনে গঙ্গা ক্রুদ্ধ হয়ে অর্জুনকে অভিশাপ দেন যে ছয় মাসের মধ্যে তাঁর মাথা দেহ থেকে ছিন্ন হবে। এই অভিশাপে পুলকিত হয়েও জ্বালা অবশেষে আগুনে আত্মাহুতি দিলেন এবং প্রাণনাশি বাণ হিসেবে চিত্রাঙ্গদা আর অর্জুনের পুত্র বভ্রূবাহনের তূণের মধ্যে লুকিয়ে থাকলেন।


একাদশ শ্রেণি থেকে→ Physics | Chemistry Biology | Computer

এখন এই কাহিনিটি কাশীরাম দাসের মহাভারতে অশ্বমেধ পর্বে থাকলেও জৈমিনি ভারতে নীলধ্বজের স্ত্রী জ্বালা কাশীদাসী মহাভারতে হয়েছে ‘জনা’। জৈমিনি ভারতে নীলধ্বজ দুইবার অর্জুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু কাশীদাসী মহাভারতে নীলধ্বজ নিজে একবারও অস্ত্রধারণ করেননি বা যুদ্ধে যাননি। তবে জনার জীবনের শেষ অধ্যায়টি কাশীরাম দাস তাঁর মহাভারতে নিজের মতো খানিকটা পরিমার্জন করেছেন। আর তাই বলাই যায় মধুসূদনের এই কাব্যে কাশীদাসী মহাভারতের প্রভাবই সবথেকে বেশি।

‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যের শেষ পত্র এই ‘নীলধ্বজের প্রতি জনা’।

এই কাব্যে অন্যান্য নারী চরিত্রের থেকে জনা একটু পৃথক। এখন প্রশ্ন হল জনা কেন বীরাঙ্গনা? অঙ্গনা কথার অর্থ হল নারী। বীর যে নারী সেই বীরাঙ্গনা। কিন্তু এখানে মধুসূদন কোন অর্থে নারীর বীরত্বকে সূচিত করেছেন তা আমাদের বুঝে নিতে হবে। কোনো নারী চরিত্রই এই কাব্যে পুরুষের মতো প্রত্যক্ষ সমরে অংশ নেয়নি। কিন্তু তাঁদের তেজোদীপ্তি, আত্ম-অহংকার, স্পষ্টভাষণ আর সর্বোপরি আত্মমর্যাদা আর স্বাধীনতার বোধই তাঁদের বীরাঙ্গনা করে তুলেছে। জনার মধ্যেও ফুটে উঠেছে এই বৈশিষ্ট্যগুলি। মধুসূদন শুধুমাত্র ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ করবেন বলে এই পত্রকবিতায় হয়তো জনাকেই সর্বতোভাবে সরব এবং নীলধ্বজকে নীরব রেখেছেন। এমনকি নীলধ্বজের পৌরুষ, ক্ষত্রতেজ সবই লুপ্ত। পত্রকবিতার শুরুতে জনার বয়ানে মধুসূদন লেখেন –

‘সাজিছ কি নররাজ, যুঝিতে সদলে –
প্রবীর পুত্রের মৃত্যু প্রতিবিধিৎসিতে, –
নিবাইতে এ শোকাগ্নি ফাল্গুনীর লোহে?’

জনা জানেন এই রণবাদ্যের উদ্দেশ্য কী, পুত্রহন্তা শত্রুর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেছেন তাঁর স্বামী নীলধ্বজ। তিনি বেশ বুঝতে পেরেছেন অর্জুনের সমাদরের জন্যেই এই আড়ম্বর, প্রবীরের মৃত্যুর প্রতিশোধে যুদ্ধযাত্রা করছেন না নীলধ্বজ। কিন্তু তবু উত্তর জেনেও তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করছেন জনা, তাঁর স্বামীকে। সে তাঁর একমাত্র পুত্রের হত্যাকারী পাণ্ডব অর্জুনের সঙ্গে সখ্যতা করেছে, মিত্রভাবে তাঁকে অতিথিসেবায় আপ্যায়ণ করেছে। আর এটাই ক্ষত্রনারী জনার কাছে তীব্র অপমানজনক। জনার মধ্যে দেখা গেছে প্রবল আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব। ক্ষত্রধর্ম কখনো শত্রুকে সেবা করে না, বরং তাঁকে হত্যার আয়োজন করে আর যেখানে পুত্রের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত এবং ন্যায়সঙ্গত ছিল, সেখানে নীলধ্বজ ফাল্গুনী অর্জুনের সঙ্গে করমর্দন করছেন। অর্জুনের সেই হাত এখনো প্রবীরের রক্তে রঞ্জিত।

জনা তাই বারবার নীরব নীলধ্বজকে সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করে গিয়েছেন।

সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ উপস্থিত ছিল না। জনা জানতেন নীলধ্বজ তাঁর উত্তর দেবেন না। নীলধ্বজের পৌরুষহীন এই কাজ জনার লজ্জার কারণ, নিজের মনের জ্বালা-মনের বেদনা কারো সঙ্গেই আর তিনি ভাগ করে নিতেন পারেন না। যে স্বামীকে এতদিন তিনি কাছের বলে ভেবেছেন তিনিও আজ তাঁর পাশে নেই। একাকী নারীর আত্মবিলাপ-বিদ্রুপ-ধিক্কার তাই ঝরে পড়েছে জনার কণ্ঠে –

‘না ভেদি রিপুর বক্ষ তীক্ষ্ণতম শরে
রণক্ষেত্রে, মিষ্টালাপে তুষিছ কি তুমি
কর্ণ তার সভাতলে?’

মধুসূদন নীলধ্বজকে নিরুদ্যম-হীন চরিত্র সৃষ্টি করে তাঁর বিপ্রতীপে জনাকে এক তেজোময়ী নারী হিসেবে গরে তুলেছেন এবং নীলধ্বজ নীরব বলেই হয়তো জনাকে এত প্রগল্‌ভ, এত দীপ্ত বলে মনে হয়।

পত্র কবিতার প্রথম স্তবক থেকে শুরু করে ষষ্ঠ স্তবক পর্যন্ত জনার খেদ যেমন ঝরে পড়েছে, তেমনই বারবার পুরনো ঘটনা, পাণ্ডবদের জন্ম-ইতিহাস, কুন্তী আর দ্রৌপদীর চরিত্র ইত্যাদি নানা ঘটনা নিয়ে বিদ্রুপ করেছেন, কটু মন্তব্য করে নীলধ্বজের অন্তরের বীরত্বকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।

জনা তো সত্যই তাঁর স্বামীকে ভালোবাসেন আর তাই পুত্রের মৃত্যুতে স্বামীর এমন হীন আচরণ তাঁকে বেদনাহত করে সবথেকে বেশি। জনার এই তিরস্কার-এই গঞ্জনা কখনোই পুরোপুরি অভিযোগ নয়, বরং তার মধ্যে মিশে আছে অনুযোগ আর অভিমান। আর তাই স্বাধীনচেতা নারী হিসেবে জনা যখন তাঁর একান্ত প্রিয় স্বামীর কাছেই যথাযোগ্য মর্যাদা পেলেন না, জাহ্নবীর জলে প্রাণ বিসর্জনে উদ্যত হলেন তিনি। জনার কঠিন-কঠোর যুক্তিগুলি আর নীলধ্বজকে বিদ্ধ করছিল না। নারী হিসেবে সীমিত সামর্থ্যের কথা তখন তাঁর মনে পড়ে যায় –

‘কুলনারী আমি, নাথ, বিধির বিধানে
পরাধীনা! নাহি শক্তি মিটাই স্ববলে
এ পোড়া মনের বাঞ্ছা!’

সামাজিক কাঠামোয় অধিকারের বৈষম্যের কারণে জনা আজ অসহায়, অক্ষম, তিনি স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছাপূরণ করতে পারেন না। জনার বেঁচে থাকার মূল অবলম্বন আমরা দেখি আত্মমর্যাদা। কুলনারী হয়ে স্বামীকে ভালোবেসেও সমস্ত পুরুষ-আধিপত্যকে ভেঙে আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল হয়ে থাকতে চেয়েছেন জনা। পুত্রের মৃত্যুতে নীলধ্বজের এই মূঢ় নীরবতা এবং অর্জুনের সঙ্গে মিতালি জনার আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। কোনোরকম অপমানজনক সমঝোতায় বিশ্বাসী নন জনা। তিনি চান না অন্যায়, অনৈতিকতায় আর অমর্যাদায় বেঁচে থাকতে। নীলধ্বজকে তিনি ভালোবাসেন কিন্তু তার মনে আজ যখন ন্যূনতম সম্মানবোধ নেই জনার প্রতি, তখন জনা তাঁর অস্তিত্বকে নিরর্থক মনে করেন। বীরত্ব তাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছে এক নির্লিপ্ত প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। তিনি অস্ত্র ধরেননি, যুদ্ধে যাননি, নানা উপায়ে নীলধ্বজের প্রতিশোধস্পৃহা জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হলে নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নারীর যোগ্য অধিকার, যোগ্য মর্যাদা ছাড়া যে বাঁচা যায় না সেটাই জনা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন।

আসলে মধুসূদন যুগের থেকে এগিয়ে ছিলেন।

উনিশ শতকের বুকে দাঁড়িয়ে নারী-স্বাধীনতার এমন সাহসী কাব্য রচনা করা যথেষ্ট দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। নবজাগরণের যুগে বাংলা সাহিত্যে এমন দূর্বার গতিতে নারী-প্রগতির হাওয়া বইয়ে দিতে কেবল মধুসূদনই পেরেছিলেন। যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা পুরুষ-প্রভুত্ব এবং পুরুষ আধিপত্যের সমাজে নারীর অবহেলা, যন্ত্রণা, গোপন হাহাকার তিনি বুঝেছিলেন বলেই পাশ্চাত্যের আলোয় হিন্দু রমণীদের উজ্জীবিত করতে চাইছিলেন। নারীশিক্ষার প্রচলন নিয়ে সেসময় বহু সংস্কারক কাজ করছিলেন।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

মধুসূদনের পথ সেবার পথ ছিল না, তিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে নারী-মনীষার জাগরণ ঘটাতে চাইলেন। আর বীরাঙ্গনা কাব্যের নীলধ্বজের প্রতি জনা পত্রকবিতায় তাই জনা বারবার অমার্জিত ভাষায় পাণ্ডবদের জন্ম-পরিচয় আর পাণ্ডব-রমণীদের সতীত্ব নিয়ে যে বিদ্রুপ করেছেন তা প্রমাণ করে অমর্যাদা এবং অন্যায় সহ্য করা প্রগতির ধর্ম নয়। মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের সঙ্গে তাঁর কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। একমাত্র পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে শোক-বিহ্বল হয়ে রাবণের রাজসভায় এসে তিনি স্বামী রাবণকে দোষারোপ করতে থাকেন, তাঁকে নানাভাবে বিদ্রুপ করতে থাকেন চিত্রাঙ্গদা। কিন্তু চিত্রাঙ্গদার এই রোষের মধ্যে অভিযোগই ছিল, অভিমান নয়। তাই জনার চরিত্রটি অনেক বেশি মানবীয় এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মধুসূদন মহাভারতের নানা পৌরাণিক অনুষঙ্গ তুলে এনেছেন জনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনা কিন্তু সত্যকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। যেভাবে মেঘনাদবধ কাব্যে রামের বদলে রাবণের নায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রামের চরিত্রের দূর্বলতাগুলি প্রকট হয়ে দেখা দেয়, ঠিক সেভাবেই যেন এই পত্রকবিতা পাণ্ডবের কদর্য দিকগুলিকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তুলে ধরেছেন জনা তাঁর তীক্ষ্ণ বিদ্রুপময় বক্তব্যে। কুন্তীর প্রসঙ্গে তাঁকে ‘স্বৈরিণী’ বলতেও বাধেনি তাঁর। মহাভারতের কাহিনিতে দেখি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হওয়ায় পাণ্ডুর ঔরসে কুন্তীর গর্ভে পাণ্ডবের জন্ম হয়নি। বরং কুন্তী পাণ্ডুর অনুমতি নিয়ে ঋষি দূর্বাসার বরে যথাক্রমে ধর্ম্রাজ, পবনদেব এবং ইন্দ্রের ঔরসে আপন গর্ভে যুধিষ্ঠির, ভীম এবং অর্জুনের জন্ম দেন। ইন্দ্রের ঔরসে জন্ম হওয়ায় জনা তাঁকে ‘জারজ অর্জ্জুনে’ বলে সম্বোধন করেছেন। কুন্তীকে কুলটা বলার আরেকটি কারণ জনা জানতেন যে কুমারী অবস্থাতেই সূর্যদেবের ঔরসে তাঁর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু শুধুমাত্র লোকলজ্জার খাতিরে সেই সন্তান গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন কুন্তী। জনা তাই বিশ্বাস করেন, এমন নারীর গর্ভে কখনোই কোনো পুণ্যাত্মার জন্ম হতে পারে না। স্বৈরিণী কথার অর্থ চরিত্রহীনা নারী, স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষে আসক্ত যে নারী। জনার চোখে একারণেই কুন্তী স্বৈরিণীতে পরিণত হয়েছেন। এতেই থেমে থাকেননি জনা। মহাভারত রচয়িতা বেদব্যাসের কলঙ্কও তুলে এনেছেন তিনি –

‘সত্যবতীসূত ব্যাস বিখ্যাত জগতে’

ধীবর-কন্যা সত্যবতী যমুনায় খেয়া পারাপারের কাজ করতেন, তাঁর গায়ে মাছের গন্ধ প্রবল থাকায় তাঁর নাম হয় মৎস্যগন্ধা। একদিন তীর্থযাত্রী পরাশর মুনি তাঁর নৌকায় উঠে সত্যবতীর প্রতি তীব্র আসক্তিবশত তাঁর সঙ্গে মিলিত হন, কৃত্রিমভাবে কুয়াশা তৈরি করেন তিনি নৌকার চারপাশে। এরই পরিণতিতে সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসের জন্ম হয়। আর এই বেদব্যাসের জন্মের পর সত্যবতীর সঙ্গে বিবাহ হয় রাজা শান্তনুর। তাঁদের দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্যের মধ্যে যক্ষ্মারোগে অকালেই মারা যান বিচিত্রবীর্য। বংশরক্ষা দায় হয়ে পড়ে। সত্যবতীর অনুরোধে বেদব্যাস আসেন এবং বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী অম্বিকা এবং অম্বালিকার সঙ্গে মিলিত হয়ে তাঁদের গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুর জন্ম দেন বেদব্যাস। আর এই ঘটনার লজ্জায় কলঙ্কিত বেদব্যাসের কথায় জনা বলেন –

‘করিলা কামকেলি লয়ে ভ্রাতৃবধূদ্বয়ে’।

তাই বেদব্যাস যতই পাণ্ডবের গুণকীর্তন করুন না কেন, তাঁর কথার কোনো মূল্যই নেই জনার কাছে। জনার চোখে তাই বেদব্যাস কু-কুলের কুলাচার্য্য। ঠিক এরপরেই জনা চলে আসেন দ্রৌপদীর প্রসঙ্গে। পঞ্চস্বামীর পত্নী দ্রৌপদীকে তিনি ‘অলির সখী, রবির অধীনী, / সমীরণ-প্রিয়া!’ বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ পুরুবংশের সরোবরে দ্রৌপদী হলেন পদ্মের মতো, একইসঙ্গে মৌমাছির সখী, সূর্যের অধীন আবার বাতাসের প্রেয়সী। কারণ দ্রৌপদীও একইভাবে পঞ্চপাণ্ডবের প্রিয়া এবং ভোগ্যা। দ্রৌপদী তাই কোনোভাবেই লোকমাতা রমার প্রতিরূপ হতে পারেন না। তাঁকে জনা ‘ভ্রষ্টা রমণী’ বলতেও দ্বিধা করেননি।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

দ্রৌপদীর প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে তাঁর স্বয়ম্বর সভার কথা। সেই সভায় ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে উপস্থিত হন পঞ্চপাণ্ডব। তাঁরা আমন্ত্রিত ছিলেন না, কারণ কৌরবদেওর ষড়যন্ত্রে হস্তিনাপুরের রাজত্বের অংশীদারিত্ব থেকে উৎখাত করে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। আর তাই ছলনার আশ্রয় নিয়ে এক তীরে মাছের চোখ বিদ্ধ করে ব্রাহ্মণবেশী অর্জুন দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন। সভায় প্রবেশের অধিকার না থাকলেও সমস্ত রাজা-মহারাজাদের চোখে ধুলো দিয়ে অর্জুন ছদ্মবেশে গর্হিত কাজ করেছিলেন, আর তাই জনা বলেন –

‘ছদ্মবেশে লক্ষ রাজে ছলিলা দূর্ম্মতি স্বয়ম্বরে’

জনার রোষ যেন কিছুতেই কমে না। শাস্ত্রজ্ঞানী জনা জানেন কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। আর এতদিন পান্ডবদের যে অন্যায়গুলিকে ধর্মের বাতাবরণে মুড়ে ন্যায়ের মর্যাদা দেওয়া হতো, সেই মিথ্যা আড়াল তিনি সকলের সামনে এক টানে খুলে ফেলেন। সত্যের তেজে তাঁর বিদ্রুপ-বাণী আরো তিক্ত, তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। অর্জুনের খাণ্ডবদাহনের প্রসঙ্গ তুলে আনেন জনা –

‘দহিল খাণ্ডব দুষ্ট কৃষ্ণের সহায়ে।
শিখণ্ডীর সহকারে কুরুক্ষেত্র রণে
পৌরব-গৌরব ভীষ্ম বৃদ্ধ পিতামহে
সংহারিল মহাপাপী!..’

মহাভারতে দেখা যায় শ্বেতকি রাজার যজ্ঞে বারো বছর ধরে শুধু ঘি খেয়ে খেয়ে অগ্নিমান্দ্য হলে অগ্নি ব্রহ্মাকে বলেন খাণ্ডববন দহন করে সেখানকার প্রাণীদের চর্বি খেলে তাঁর অসুখ সেরে যাবে। আর সেই কাজে এর আগেও বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন অগ্নি, হাতি আর নাগেরা ক্রমাগত জল ঢেলে সেই আগুন নিভিয়ে দিয়েছিল। অবশেষে অগ্নি কৃষ্ণ এবং অর্জুনের সাহায্য চাইলে অর্জুন পনেরোদিন ধরে খাণ্ডববন দহনে সাহায্য করেন। এভাবে বন্যপ্রাণীদের নির্বিচারে আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো অপরাধ অর্জুনকে কলঙ্কিত করেছে। আর আজ সেই অর্জুনের সঙ্গেই কিনা নীলধ্বজ সন্ধি করছেন!

শুধু এটুকুই নয়, নপুংসক শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অন্যায় সমরে পিতামহ ভীষ্মকে শরবিদ্ধ করেন অর্জুন। এই শিখণ্ডী আসলে পূর্ব জন্মে ছিলেন অম্বা যাকে বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার জন্য ভীষ্ম অপহরণ করে এনেছিলেন। কিন্তু অম্বা ভালোবাসতেন শাল্বরাজকে। এদিকে অপহৃত হওয়ায় শাল্বরাজ অম্বাকে গ্রহণ করতে চাননি। এতে রুষ্ট হয়ে মহাদেবের বরে পরজন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন জেনে যমুনার তীরে চিতা সাজিয়ে অম্বা প্রাণত্যাগ করেন। যৌবনে ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কোনো স্ত্রী বা নপুংসকের সামনে তিনি কখনোই অস্ত্রধারণ করবেন না। আর এই দূর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে ভীষ্মকে হত্যা করেন অর্জুন।

দ্রোণাচার্য্যকেও বধ করা হয়েছিল ছলনার আশ্রয়ে। অতি প্রিয় সন্তান অশ্বত্থামার মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ দিয়ে দূর্বলচিত্ত দ্রোণকে হত্যা করেন অর্জুন। ‘অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ’ এই প্রবাদ আমাদের সকলেরই জানা। আর কর্ণ! সেই বা বাদ পড়ে কেন। ব্রহ্মশাপে যখন তাঁর রথের চাকা বসে গেল মাটিতে, সমস্ত ক্ষত্রিয়ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলে নিরস্ত্র কর্ণের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন অর্জুন। আর এইসব কঠিন কঠোর সত্য- পাণ্ডবের চরম কলঙ্কগাথা তুলে এনে নীলধ্বজকে তিনি প্রশ্ন করেন,

‘মহারথী-প্রথা কি হে এই, মহারথি?’

মনে রাখতে হবে জনার কণ্ঠে এভাবে পাণ্ডবদের নীচতা-হীনতা, কলঙ্কের কথা ফুটে উঠেছে এই পত্রকবিতার শুধুমাত্র তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে। আর এভাবেই একাধারে যুক্তিবাদী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না, মাতৃত্বের মূর্ত প্রতীক জনা বারবার স্বামী নীলধ্বজকে স্বধর্মে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখাতে চেয়েছেন নীলধ্বজকে। আর তা না পেরে যুক্তিবাদী জনার মনেও নিয়তির বিধান বড়ো হয়ে উঠেছে। মধুসূদনের কাব্যে এই নিয়তি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।