bharater-protibeshi-deshsomuho
WB-Class-8

ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: ভূগোল । অধ্যায় – ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক


আগের পর্বে আমরা জেনেছি মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন সম্পর্কে। এই পর্বে আমরা ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে আলোচনা করবো।

কোন দেশের ভূভাগের সীমানা পেরিয়ে আশেপাশের যেসব দেশ থাকে সেই দেশগুলোকে প্রতিবেশী দেশ বলে। ভারতের মোট প্রতিবেশী দেশগুলির নাম হল – উত্তরে চীন, নেপাল, ভুটান; উত্তরপশ্চিমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান; পূর্বে বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং দক্ষিণে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মায়ানমার, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশগুলির সঙ্গে ভারতের স্থলভাগের সীমানা রয়েছে।

একমাত্র শ্রীলঙ্কা অবস্থিত ভারত মহাসাগরের উপর, যার চারদিকে রয়েছে জলভাগের সীমানা।

ভারত ও শ্রীলঙ্কা পক প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের সঙ্গে ভারত সম্পূর্ণ জলপথে বাণিজ্য করে থাকে। পাকিস্তানের একদিকে সীমান্তে রয়েছে আরবসাগর এবং অপর দুদিকে রয়েছে ভারতের সীমানা।

সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত ভারতের দুটি নিকটতম প্রতিবেশী দেশ হল – নেপাল ও ভুটান এবং ঐ দুটি দেশের কোন নিজস্ব সমুদ্র বন্দর নেই, কলকাতা বন্দরের ওপর এই দুটি দেশের বিশ্ব বাণিজ্য নির্ভরশীল।

ভারতকে ভারতীয় উপমহাদেশ বলা হয় কেন?

হিমালয় পর্বতের দক্ষিণে ভারত ও তার সীমান্তে অবস্থিত দেশগুলির মধ্যবর্তী অঞ্চলে সামাজিক মিল রয়েছে অনেকখানি। এদের মধ্যে ভারতের অবস্থান একেবারে মাঝখানে, আয়তন ও জনসংখ্যার বিচারে ভারত বৃহত্তম। তাই এই অঞ্চলকে ভারতীয় উপমহাদেশ বলে।

ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে শান্তি, স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক প্রগতির উদ্দেশ্যে SAARC (South Asian Association for Regional Co-Operation) তৈরি করেছে। 1985 সালে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান এই ৮টি দেশ SAARC সংস্থা গঠন করেছে। এর সদর দপ্তর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম প্রধান কারণ হল পণ্যদ্রব্য আদান-প্রদান বা বাণিজ্যিক লেনদেন।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান | ভূগোল

ভারতের প্রতিবেশী দেশের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

নেপাল

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। এখানকার প্রধান ভাষা নেপালি। পোখরা, বিরাটনগর, জনকপুর এই দেশের উল্লেখযোগ্য শহর। কালিগন্ডক এখানকার প্রধান নদী এবং প্রধান কৃষিজ ফসলগুলি হল- ধান, গম, পাট, ভুট্টা, জোয়ার, আখ, কার্পাস, কমলালেবু। কাগজ, পাট, সুতিবস্ত্র, চিনি প্রভৃতি নেপালের প্রধান শিল্প। নেপালে পর্যটন হল বৃহত্তম শিল্প ও বিদেশি মুদ্রা অর্জনের বৃহত্তম উৎস।

নেপালের মাউন্ট এভারেস্ট

পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট নেপালে রয়েছে, যা সারা পৃথিবীর পর্বতারোহীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। কাঠমান্ডু, নাগারকোট, পোখরা, লুম্বিনি, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি নেপালের দর্শনীয় স্থান।

ভুটান

হিমালয়ের কোলে আরও একটি দেশ ভুটান। এর রাজধানী থিম্পু এবং প্রধান ভাষা জাংথা। ফুন্টশোলিং, পারো, পুনাখা ভুটানের অন্যতম শহর।

ভুটানের পুনাখা

ভুটানের প্রধান কৃষিজ ফসল হল- গম, যব, ভুট্টা, বার্লি, আপেল, কমলালেবু। সিমেন্ট, কাঠ, জ্যাম-জেলি, পানীয় প্রভৃতি ভুটানের প্রধান শিল্প ও জীবিকা। ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে আপেল, আনারস, কমলালেবু ব্যবহৃত হয় আচার, জ্যাম-জেলি, স্কোয়াশ তৈরি করতে।

বাংলাদেশ

নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিখ্যাত। মেঘনা, পদ্মা এখানাকার প্রধান নদী। ঢাকা, বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত শহর এবং রাজধানী। এছাড়াও চট্টগ্রাম, শ্রীহট্ট ও খুলনা অন্যতম শহর। এই দেশের প্রধান ভাষা বাংলা। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানকার প্রধান ফসলগুলো হল- ধান, পাট, ভুট্টা, গম, জোয়ার, কার্পাস, চা, আখ।

বাংলাদেশের ধানক্ষেত

বাংলাদেশে বহু কৃষিজ ও বনজ শিল্প গড়ে উঠেছে। পাট বাংলাদেশের প্রধান শিল্প। প্রায় ৮০টির মত পাটকল রয়েছে চট্টগ্রাম, খুলনা শহরে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ কুটির শিল্পে উন্নত। ঢাকার মসলিন, টাঙ্গাইলের তাঁতের কাপড় বিশ্ববিখ্যাত। চা শিল্পেও বাংলাদেশ অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছে। এছাড়াও কাগজ, চিনি, সিমেন্ট রাসায়নিক সার প্রভৃতি শিল্প গড়ে উঠেছে।

মায়ানমার

কর্কটক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশ মায়ানমারের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ হল কাকাবোরজি (৫৫৮১ মিঃ)। নেপাইদাউ এদেশের রাজধানী। ইয়াঙ্গন, মান্দালয়, মৌলমেন এখানাকার প্রধান প্রধান শহর। ইরাবতী ও চিন্দুইন এখানাকার প্রধান নদী। প্রধান ভাষা বর্মি। সাধারণত ধান, ভুট্টা, জোয়ার, যব, তামাক, তৈলবীজ চাষ হয়ে থাকে।

মায়ানমারের অবস্থান

চিনি, পাট ও রেশম হল মায়ানমারের প্রধান শিল্প। খনিজ সম্পদে এই দেশ বেশ সমৃদ্ধ। প্রধান দুটি নদী অববাহিকায় খনিজ তেল পাওয়া যায়। এছাড়া টিন, সিসা, দস্তা, টাংস্টেন ও মুল্যবান পাথর উত্তোলনে মায়ানমার বিখ্যাত। পদ্মরাগমণি মুল্যবান পাথর হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। চিরসবুজ এবং পর্ণমোচী উভয় ধরণের অরণ্যে সমৃদ্ধ এই দেশ।

শ্রীলঙ্কা

দ্বীপরাষ্ট্র এবং নিরক্ষীয় আবহয়াওয়ার দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা বিখ্যাত। শ্রীজয়বর্ধনেপুরা কোট্টে হল শ্রীলঙ্কার রাজধানী। এখানকার উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের নাম পেড্রোতালাগালা (2527 মিঃ)। প্রধান নদী হল মহাবলিগঙ্গা। প্রধান ভাষা হল সিংহলী। তৈলবীজ, নারকেল, মশলা, চা এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল, এছাড়া ধান, ভুট্টা, আখ চাষ হয়ে থাকে। চা, কাগজ ও বস্ত্রশিল্পে শ্রীলঙ্কা উন্নত। কলম্বো, জাফনা, রত্নপুরা অন্যত প্রধান শহর।

শ্রীলঙ্কার গাল্লে

শ্রীলঙ্কার প্রধান অর্থকরী ফসল হল নারকেল। উপকূলের ধারে প্রচুর নারকেল গাছের চাষ হয়। এছাড়া তৈলবীজ, তুলো, সিঙ্কোনাও এদেশের অর্থকরী ফসল। বছরে দুবার বর্ষাকাল আসে বলে এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান চাষ করা হয়। রবার চাষেও শ্রীলঙ্কা বিখ্যাত। চা উৎপাদন ও রপ্তানিতে শ্রীলঙ্কা বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ প্রভৃতি মশলা উৎপাদনে শ্রীলঙ্কা বিখ্যাত। গ্রাফাইট উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছ এই দেশ। এছাড়াও মুল্যবান নীলকান্ত মণি, পদ্মরাগ মণি এখানে পাওয়া যায়।

পাকিস্তান

ভারতের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশ হল পাকিস্তান। এদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ হল তিরচিমির (৭৬৯০ মি:)। সিন্ধু নদ হল প্রধান নদ। পাকিস্তানের রাজধানী হল ইসলামাবাদ। প্রধান ও সরকারি ভাষা হল উর্দু। করাচী, লাহোর, পেশোয়ার এখানাকার উল্লেখযোগ্য শহর।

পাকিস্তানের খারদাং উপত্যাকা

পাকিস্তানের প্রধান কৃষিজ ফসল হল – ধান, গম, আখ, তুলা, তৈলবীজ, ডাল। মূলত জলসেচের উপর কৃষিকাজ নির্ভরশীল। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও, সিন্ধু ও তার উপনদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি করা হয়েছে। সেচখাল কেটে চাষের কাজে জলসেচ করা হয়ে থাকে। আপেল, বেদানা, খেজুর, পিচ প্রভৃতি ফল প্রচুর পরিমাণে চাষ করা হয়। সিমেন্ট, চিনি, বস্ত্র, চর্ম, পশম ও পশমজাত দ্রব্য হল পাকিস্তানের প্রধান শিল্প সমূহ।

প্রতিবেশী দেশ এবং ভারতের মধ্যে আমদানি ও রপ্তানিকৃত দ্রব্যসমুহ

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতিঃ

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের ছাত্রী শ্রীপর্ণা পাল। পড়াশোনার পাশাপাশি, গান গাইতে এবং ভ্রমণে শ্রীপর্ণা সমান উৎসাহী।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

VIII_Geo_8a