odvut-athitheoyta
WB-Class-8

অদ্ভুত আতিথেয়তা

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বাংলা। অদ্ভুত আতিথেয়তা (গদ্য)


লেখক পরিচিতি

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই নামটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং সাহিত্যকার। তাঁর আসল নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, কিন্তু সংস্কৃত ভাষা এবং সাহিত্যে তাঁর অগাধ জ্ঞানের জন্য তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। আধুনিক বাংলা লিপির প্রধান সংস্কারক এবং বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। আজকের দিনেও তাঁর অমর সৃষ্টি ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়েই শিশুদের বাংলা ভাষা শিক্ষার শুরু হয়।

তাঁকে তথাকথিত সাহিত্যিকের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না, তাঁর সকল কাজের মূল চালিকা শক্তি ছিল সমাজ, শিক্ষা ও ভাষার সংস্কার ও উন্নতি সাধন। তাঁর এই চিন্তার প্রতিফলন তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে বিশেষ ভাবে লক্ষ্যনীয়। তাঁর সাহিত্যকাজের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল কথামালা (১৮৫৬), আখ্যানমঞ্জরী, বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) শকুন্তলা (১৮৫৪), সীতার বনবাস (১৮৬০), মহাভারত, ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯) প্রভৃতি।

নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অবদানের কথা বাঙালি জাতি আজীবন কাল মনে রাখবে। উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আরো জানার জন্য JUMP ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে নিতে পারো।

উৎস

অদ্ভুত আতিথেয়তা গল্পটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘আখ্যানমঞ্জরী’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

subscribe-jump-magazine-india

‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পের বিষয় সংক্ষেপ

এই গল্পের প্রধান দুই চরিত্র হলেন মুরসেনাপতি এবং আরবসেনাপতি।

প্রসঙ্গত, আমরা অনেকেই আরব জাতির নামের সাথে পরিচিত হলেও, মুর জাতির সাথে আমাদের তেমন কোন পরিচয় নেই। তাই মূল বিষয়ের আলোচনায় প্রবেশের আগে এই মুর জাতির সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক।

পূর্ব আফ্রিকার এক দুর্ধর্ষ যাযাবর যুদ্ধপ্রিয় জাতি হল মুর। এদের গায়ের রং ছিল কৃষ্ণবর্ণ, গ্রিক শব্দ ‘মোরস’ কথার অর্থ কালো। সম্ভবত এখান থেকেই ‘মুর’ নামের উৎপত্তি। এই জাতির কার্যকলাপ মিশর থেকে মরক্কো অবধি বিস্তৃত ছিল।

আরব এবং মুর দুটি জাতিই যাযাবর প্রকৃতির এবং তাদের কাজের মূল স্থান ছিল আফ্রিকা এবং আফ্রিকা লাগোয়া এশিয়ার অঞ্চলগুলিতে। এই দুই যুদ্ধপ্রিয় জাতির মধ্যে লড়াই লেগেই থাকতো।

দুই জাতির মধ্যে যুদ্ধ চলছে এমন এক দিনে, আরবসেনা এক মুরসেনাপতিকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ধাওয়া করেছে।

এই স্থান থেকেই আলোচ্য গল্পের সূত্রপাত হয়।

প্রাণ ভয়ে ভিত, ক্লান্ত এবং দিক্‌ভ্রান্ত মুরসেনাপতি নিজের শিবিরের পরিবর্তে ভুল করে বিপক্ষ শিবির অর্থাৎ আরব শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হন। আরব জাতির অথিতি বাৎসল্য জগৎখ্যাত। তাই আরব শিবিরে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তারা মুরসেনাপতিকে প্রানে মারবে না, এই ভাবনায় তিনি তাদের কাছে আশ্রয় চান।

তার ভাবনাই সত্য হল।

আরব শিবিরের কর্মীরা তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁর জন্য বিশ্রাম এবং আহারের ব্যবস্থা করলেন। আরব শিবিরের সেনাপতির সাক্ষাৎ হলে তারা পরস্পরের সাথে কথোপকথন শুরু করেন; দুই বীর্যবান জাতির বীরত্বের গাথা একে অপরকে বলেন। এমন সময় হঠাৎ আরবসেনাপতি সেই স্থান থেকে উঠে যান।

তার আকস্মিক প্রস্থানের ফলে মুরসেনাপতি অবাক হয়ে যান। কিছুক্ষন পরে, আরবসেনাপতি জানান যে তার শরীর ভালো নয় তাই তিনি সামনে থেকে অথিতি আপ্যায়ন করতে পারছেন না। যেহেতু মুরসেনাপতি এবং তার ঘোড়া উভয়েই ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত, তাই তাদের পক্ষে নিজের শিবিরে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। সেই কারণে আরবসেনাপতি, মুরসেনাপতিকে ঐদিন রাতে আরব শিবিরেই থাকার অনুরোধ জানান এবং সাথে এটাও বলেন যে আগামী কাল ভোরে তার জন্য ঘোড়া শিবিরের বাইরে তৈরি থাকবে এবং তিনি যাতে নিজ শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন তার ব্যবস্থা থাকবে।

এই ঘটনার স্পষ্ট কারণ মুরসেনাপতি বুঝতে পারেন না। তবে তিনি আরবসেনাপতির পরামর্শ মেনে নেন। ঐ শিবিরেই আহার করে, শুয়ে পড়েন।


আরো পড়ুন – The wind cap | মুলদ সংখ্যার ধারণা | বল ও চাপ

শেষ রাতে তাকে আরব শিবিরের লোকেরা জাগিয়ে তোলে।

তিনি প্রাত্যহিক কার্য শেষ করে শিবিরের প্রধান দরজায় আসেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে একটি ঘোড়ার দড়ি হাতে আরবসেনাপতি অপেক্ষা করছেন। আরবসেনাপতি, মুরসেনাপতিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে বলেন যে তিনি যেন খুব দ্রুত আরব শিবির থেকে প্রস্থান করেন কারণ এখন আরবসেনাপতি ঐ মুর সেনাপতির ঘোর শত্রু। কারণ হিসবে আরবসেনাপতি বলেন, গতকাল রাতে তাদের আলাপের সময়ে মুরসেনাপতির কাছ থেকে আরবসেনাপতি জানতে পেরেছেন যে তার পিতার হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুরসেনাপতি।

এই কথা জানার পরে আরবসেনাপতির মনে প্রবল প্রতিশোধবোধ জন্মায়। কিন্তু আরব জাতির ধর্ম অথিতিকে আপ্যায়ণ করা। তাই মুরসেনাপতি যতক্ষণ তার আতিথ্যে আছেন, তিনি তার কোন অনিষ্ট করতে পারবেন না। তাই আরবসেনাপতি ঠিক করেন যে আগামীকাল ভোর অবধি অপেক্ষা করবেন এবং মুরসেনপতিকে যথার্থ সম্মান দিয়ে বিদায় দেবেন; তিনি যখন আরব শিবির ত্যাগ করবেন আর তখন তিনি আরবদের অতিথি থাকবেন না। ফলে সেই সময় আরবসেনাপতি তার কাঙ্খিত প্রতিশোধ নিতে পারবেন।
সেই জন্য আজ ভোরবেলা তিনি মুরসেনাপতিকে বিদায় জানাতে এসেছেন।

তিনি আরো বলেন যে ঘোড়াটি মুরসেনাপতিকে দেওয়া হয়েছে সেটি কোন অংশে কম নয়, সুতরাং আরবসেনাপতির তরফে কোন অন্যায় করা হয়নি। সূর্যোদয়ের পরে আরবসেনাপতি, মুরসেনাপতিকে গ্রেপ্তারের এবং প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন।

মুরসেনাপতি এই ঘটনা জেনে এবং আসন্ন বিপদ অনুমান করে দ্রুত শিবির ছেড়ে প্রস্থান করেন। এর পর সূর্য উঠলে, আরবসেনাপতি তাকে অনুসরণ করেন। অপর দিকে, যেহেতু মুরসেনাপতি কিছু সময় আগে রওনা দিয়েছেন এবং তার ঘোড়াটিও ছিল যথেষ্ট দ্রুতগামী, তার ফলে তিনি খুব সহজেই নিজের শিবিরে পৌঁছে যান। এদিকে আরবসেনাপতি, অনুরসরণ করে মুর শিবির অবধি আসেন, কিন্তু তিনি দেখতে পান যে মুরসেনাপতি তার নিজের শিবিরে পৌঁছে গেছেন। এরপর তার প্রতিশোধ নেবার আর কোন উপায় নেই বুঝতে পেরে আরবসেনাপতি নিজের শিবিরে ফিরে আসেন।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

মূল বক্তব্য

মানুষের মন এবং স্বভাব বড় অদ্ভুত।

গল্পের দুই চরিত্র তাদের জাতিগত শত্রুতার কারণে একে অপরের প্রতিপক্ষ। কিন্তু তার মধ্যেও তারা তাদের সামাজিক ধর্ম পালন করতে ভোলে না। আরবসেনাপতির পিতাকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন মুরসেনাপতি; সেই অর্থে মুরসেনাপতি হলেন আরবসেনাপতির ঘোরতর শত্রু। কিন্তু যেহেতু তিনি মুরসেনাপতিকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং মুরসেনাপতি তার অতিথি তাই তিনি সুযোগ পেয়েও তার প্রতিশোধ চরিতার্থ করতে পারলেন না।

কারণ আরব সেনাপতির জাতির ধর্ম অথিতিকে সাধ্যানুসারে পরিচর্যা করা, এমনকি তিনি শত্রু হলেও তার অনাদর বা ক্ষতিসাধন নিয়ম বিরুদ্ধ।

নিজের জাতির সম্মানকে, নিজের ব্যাক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে তিনি যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের কাছে বিস্ময়কর ও অদ্ভুত লাগলেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষণীয় ।

শব্দার্থ

পটমণ্ডপদ্বারঃ অস্থায়ী শিবিরের (তাঁবু) প্রবেশ পথ

ক্ষুন্নিবৃত্তিঃ ক্ষুধা নিবারন করা (খাওয়া)

গাত্রোত্থানঃ উঠে পড়া

প্রত্যুষঃ ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগের মুহূর্ত

মুখপ্রক্ষালনাদিঃ প্রক্ষালনাদি কথার অর্থ জল দিয়ে ধোয়া সুতরাং মুখপ্রক্ষালনাদি কথার অর্থ মুখ ধোয়া।

বৈরিতাঃ শত্রুতা

সমাপ্ত।


এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।