Calorimetry-in-bengali
WB-Class-9

আপেক্ষিক তাপ ও ক্যালোরিমিতি

ভৌতবিজ্ঞাননবম শ্রেনি – অধ্যায়: তাপ (প্রথম পর্ব)


তাপ সম্পর্কে আলোচনার শুরুতেই যেটা জানা দরকার তা হল তাপ কি?

তাপ হল একপ্রকার শক্তি, এই শক্তি কোন যান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়াই এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে সঞ্চালিত হতে পারে। এই শক্তি গ্রহণ করলে বস্তু গরম বা বর্জন করলে ঠাণ্ডা হয়ে যায় যা আমরা অনুভব করতে পারি।

এখন এই যে ঠাণ্ডা বা গরমের অনুভূতি সেটা কিন্তু তাপ নয়। সেই অনুভূতি আসলে তাপমাত্রা।

বর্তমানে আমরা তাপমাত্রা সম্পর্কে আলোচনা স্থগিত রেখে কেবল তাপ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকব।

যাই হোক, তাপ একপ্রকার ভৌত পরিমাপযোগ্য রাশি, তবে বস্তুর তাপ আমরা সরাসরি মাপতে পারি না।

বস্তু যখন তাপ গ্রহন বা বর্জন করে তখন তার উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। উষ্ণতার এই হ্রাস বৃদ্ধি থেকেই আমরা তাপের পরিমাপ করে থাকি।

তাপ পরিমাপন

ধরা যাক m ভরের কোন একটি বস্তু t1°C উষ্ণতায় রয়েছে। এখন বস্তুটির উষ্ণতা যদি বৃদ্ধি পেয়ে t2°C হয় তবে বস্তু দ্বারা গৃহীত তাপের পরিমান H = m . S. (t2 – t1) °C

উপরোক্ত সম্পর্কে S হল পদার্থের আপেক্ষিক তাপ

একইভাবে যদি বস্তুর উষ্ণতা হ্রাস পেয়ে t3°C হয়। তবে বস্তু দ্বারা বর্জিত তাপের পরিমান হবে H = m . S. (t1 – t3) °C

এখন জানা দরকার আপেক্ষিক তাপ কি?

আমরা বস্তু দ্বারা গৃহীত বা বর্জিত তাপের যে সূত্রটা পেয়েছি সেটা হল –

H = m × S × t [এক্ষেত্রে (t2 – t1) বা (t1 – t3) কে t ধরে নেওয়া হয়েছে]

বা, S = \frac{H}{mt}

এক্ষেত্রে H = বস্তু দ্বারা গৃহীত তাপের পরিমান

m = বস্তুর ভর

এবং,  t = তাপ গ্রহণ বা বর্জনের ফলে বস্তুতে সৃষ্ট উষ্ণতার পার্থক্য

এখন m এবং t যদি একক হয় তবে S = H

অর্থাৎ একক ভরের কোন বস্তুতে একক উষ্ণতার পার্থক্য সৃষ্টির জন্য যে পরিমান তাপ দিতে হবে বা বর্জন করতে হবে সেই পরিমান তাপকেই ঐ বস্তু বা পদার্থটির আপেক্ষিক তাপ বলে।

subscribe-jump-magazine-india

আপেক্ষিক তাপের মাত্রা ও একক

আপেক্ষিক তাপের মাত্রা বা একক সম্পর্কে জানার আগে আমাদের প্রথমে তাপের মাত্রা ও একক সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

তাপ আর কৃতকার্য পরস্পর তুল্য, যদিও এব্যাপারে বিশদ আলোচনা পরে করা যাবে।

যাই হোক, তাহলে জানা গেল যে তাপের মাত্রা আর কৃতকার্যের মাত্রা একই।

সুতরাং তাপের মাত্রা = কৃতকার্যের মাত্রা = বলের মাত্রা × সরণের মাত্রা

taper-matra-

= \frac{[M. L^{2}.T^{-2}]}{[M\times K]} [এক্ষেত্রে উষ্ণতার মাত্রা K ধরা হল]

= [L^{2}.T^{-2}.K^{-1}]


[আরো পড়ুন – দ্রবণ, দ্রাব, দ্রাবক এবং দ্রব্যতা ]

আপেক্ষিক তাপের একক

সুতরাং একই সূত্র থেকে আপেক্ষিক তাপের এককটিও জানতে পারি।

apekkhik-taper-ekok

সুতরাং, আপেক্ষিক তাপের C.G.S একক = ক্যালোরি গ্রাম-1 °C-1 এবং S.I একক = জুল Kg-1 °C-1  বা জুল Kg-1 K-1

[উল্লেখ্য যে, S.I পদ্ধতিতে উষ্ণতার একক হিসাবে °C বা কেলভিন (K) উভয়েই ব্যবহার হতে পারে]

ক্যালোরিমিতি (Calorimetry)

এখন ধরা যাক একাধিক বস্তুকে পরস্পরের সংস্পর্শে রাখা হয়েছে। যেমনটা চিত্রে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ‘A’ বস্তু ‘B’ বস্তু পরস্পর স্পর্শ করে আছে।

two-objects

এখন A এর উষ্ণতা যদি B অপেক্ষা বেশি হয় তবে A এর মধ্যে থাকা তাপ B এর দিকে প্রবাহিত হতে থাকবে। এই তাপ প্রবাহ ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ না A ও B বস্তুর তাপমাত্রা সমান হচ্ছে।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে A বস্তু থেকে তাপ বর্জিত হচ্ছে এবং B বস্তুতে তাপ গৃহীত হচ্ছে; এই গৃহীত বা বর্জিত তাপের পরিমাণকেই ক্যালোরিমিতি নামে অভিহিত করা হয়।

ক্যালোরিমিতির মূল নীতি

ক্যালোরিমিতির মূলনীতিটি হল, গৃহীত তাপ = বর্জিত তাপ

অর্থাৎ, সংস্পর্শ যুক্ত একাধিক বস্তু যদি ভিন্ন তাপমাত্রায় থাকে তবে অধিক তাপমাত্রা বিশিষ্ট বস্তুর দ্বারা তাপ বর্জিত হবে এবং এই বর্জিত তাপই নিম্ন তাপমাত্রা বিশিষ্ট বস্তু দ্বারা গৃহীত হবে।

শেষে আরও একটি কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন যে, এই তাপ গ্রহণ বা বর্জনের মাধ্যমে সবকটি বস্তুই একই তাপমাত্রায় উপনীত হবে এবং এই অবস্থায় আসার পর আর কোন তাপ প্রবাহ ঘটবে না।

ক্যালোরিমিতির মূল নীতির গাণিতিক রূপ

ধরি A বস্তুর ভর mA এবং B বস্তুর ভর mB

A বস্তুর আপেক্ষিক তাপ SA এবং B বস্তুর আপেক্ষিক তাপ SB

এখন প্রাথমিক অবস্থায় A বস্তুর তাপমাত্র tA°C এবং B বস্তুর তাপমাত্রা তাপপ্রবাহ tB°C  [tA°C > tB°C]।

তাপ প্রবাহ শেষে উভয়েরই তাপমাত্রা সমান হয়ে হয়, t°C ।

সুতরাং A বস্তু কর্তৃক বর্জিত তাপ = HA=mASA (tA-t) °C এবং B বস্তু কর্তৃক বর্জিত তাপ = HB=mBSB (t-tB) ° C

এখন ক্যালরিমিতির মূল নীতি অনুযায়ী, A বস্তু দ্বারা বর্জিত তাপ = B বস্তু দ্বারা গৃহীত তাপ বা

\mathbf{m_{A}\; S_{A}\; (t_{A}-t) = m_{B}\; S_{B} \; (t-t_{B})}

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য

আমরা তাপ পরিমাপক যে যন্ত্র অর্থাৎ ক্যালোরিমিটার সম্পর্কে যা জানি। সেটিও এই ক্যলোরিমিতির মূল নীতির ভিত্তিতেই কাজ করে থাকে।

ক্যালোরিমিটার হল একটি চোঙাকৃতি তামার পাত্র, যাকে অপরিবাহী কাঠের ব্লকে বসানো থাকে। যাতে কোন তাপ ক্যালোরিমিটার পাত্রের বাইরে না যেতে পারে। এরপর যে বস্তুর তাপ মাপা হবে তাকে ক্যালোরিমিটারে প্রবেশ করিয়ে ক্যালোরিমিটারের উষ্ণতার হ্রাস – বৃদ্ধি ঐ তামার পাত্রের সঙ্গে যুক্ত থার্মোমিটারের সাহায্যে পরিলক্ষিত হয়।

calorimeter
একটি ক্যলোরিমিটার

এই প্রসঙ্গে আমাদের আরও একটি বিষয়ে জেনে নেওয়া উচিত যেটা হল জল – সম। জল- সম সংঙ্ক্রান্ত আলোচনা পড়ার জন্য এই পোস্টটি দেখ → জল-সম

গাণিতিক সমস্যার সমাধান

কোন ধাতুর আপেক্ষিক তাপ = 200 জুল kg-1 °C-1  ধাতুটিরর উষ্ণতা 20°C থেকে 100°C তে নিয়ে যেতে কত তাপ লাগবে? [প্রদত্ত – ধাতব বস্তুর ভর 500 গ্রাম]

উত্তর – ধাতব বস্তু দ্বারা গৃহীত তাপ = ধাতব বস্তুর ভর × ধাতুর আপেক্ষিক তাপ × উষ্ণতার বৃদ্ধি

= 500 gm × 200 J. kg-1°C-1  × (100 -20) °C

=\left ( \frac{500}{1000} \right )kg \times 200 J. {kg^{1}}^{\circ} C^{-1}\times 80^{\circ} C

= \left ( \frac{500\times 200\times 80}{1000} \right ) J = 8000 J



কার্য ও তাপের তুল্যতা

আমরা আমাদের দুটি হাত যদি পরস্পর ঘষি তবে লক্ষ্য করে থাকব যে হাত দুটি গরম হয়ে যাবে। এরকম বহু উদাহরণই আমরা আমাদের চারপাশে দেখতে পাই। দৈনন্দিন জীবনে কোন মেশিন ঘুরলে বা পাখা বেশ কিছুক্ষন ঘোরার পর তা গরম হয়ে যায়। সুতরাং এই সব ঘটনা থেকে আমরা ধারণা করতে পারি যে যেখানে কোন কার্য সম্পাদিত হচ্ছে সেখানে তাপও উৎপন্ন হচ্ছে।

তাই বলা যায়, “কৃতকার্যের ফলে উৎপন্ন তাপ কৃতকার্যের সঙ্গে সমানুপাতিক।”

যদি কৃতকার্য = W ধরা হয় এবং উৎপন্ন তাপের মান = H ধরা হয়।

তবে W ∝ H

বা, W = J × H

বা, H = W/J

এক্ষেত্রে J হল একটি ধ্রুবক।


বিশেষ দ্রষ্টব্য

অদ্ভুত ভাবে S I পদ্ধতিতে কৃতকার্য ও তাপ উভয়েরই একক জুল; তাই সেক্ষেত্রে J = 1 কিন্তু C.G.S পদ্ধতিতে তাপের একক ক্যালোরি। তাই তাপের মান জুল থেকে ক্যালোরিতে প্রকাশ করতে হলেই আমরা ঐ মানকে J = 4.2 দ্বারা ভাগ করবো। কিংবা আর্গ থেকে ক্যালোরিতে নিয়ে যেতে হলে 4.2 × 107 দ্বারা ভাগ করবো।


এখন W = J.H সুত্রে যদি উৎপন্ন তাপের মান অর্থাৎ H = I  হয় বা একক হয় তবে w = J

অর্থাৎ একক পরিমাণ তাপ উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ কার্য সম্পাদন করতে হয় তাই হল তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্ক।

সুতরাং, J = W যখন H = 1

সুতরাং, C G S পদ্ধতিতে তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্কের মান 4.2 × 107 আর্গ / calorie।


নবম শ্রেণির অন্যান্য বিভাগগুলি দেখুন –


প্রথম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব →  লীনতাপ

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Dr. Mrinal Seal
ডঃ মৃণাল শীল সাঁতরাগাছি উচ্চ বিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। পড়াশোনার পাশাপাশি ঘুরে বেড়াতে ও নানান ধরণের নতুন নতুন খাবার খেতেও পছন্দ করেন ডঃ শীল।

Leave a Reply