dam
WB-Class-9

দাম

বাংলানবম শ্রেনি – দাম (গদ্য)


লেখক পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক হলেন নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়।

অভিভক্ত বাংলার দিনাজপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পরে তিনি জলপাইগুড়ি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সিটি কলেজ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় অধ্যাপক ছিলেন।

সাহিত্য জগতে তিনি বহু মণি-মাণিক্যের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকাজের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলি হল ‘রামমোহন’, ‘ভাড়াটে চাই’, ‘লালমাটি’, ‘সাগরিকা’ ইত্যাদি। সম্ভবত তাঁর অন্যতম সেরা কীর্তি ‘টেনিদা’; কিশোরদের জন্য লেখা টেনিদার গল্পগুলি নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়কে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে[উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা এই লিঙ্ক থেকে টেনিদার কালজয়ী টেনিদার উপন্যাস ‘চারমুর্তি’ অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবি দেখে নিতে পারো।]

উৎস

দাম ছোটগল্পটি ‘এগজিবিশন’ ছোটগল্পের সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে।

JUMP whats-app subscrition

বিষয় সংক্ষেপ

গল্পের প্রধান চরিত্র সুকুমার একজন অধ্যাপক এবং লেখক। ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় অঙ্ক তাঁর একেবারেই প্রিয় বিষয় ছিল না এবং স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন সুকুমারের কাছে এক জীবন্ত ‘বিভীষিকা’।

স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক কড়া প্রকৃতির হলেও, অঙ্কে তাঁর ব্যাপক পারদর্শিতা ছিল। যেকোন গাণিতিক সমস্যা তিনি এক ঝলক দেখেই তার সমাধান করে দিতেন। অঙ্কের মতো একটি জটিল ও কঠিন বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতা ছাত্রদের হতবাক করে দিত, তাদের মনে হত অঙ্কের সমাধান যেন বোর্ডে আগে থেকেই অদৃশ্য কালিতে কষা রয়েছে, যা ছাত্ররা দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু মাস্টারমশাই দেখতে পাচ্ছেন এবং তার উপরে চক বুলিয়ে চলেছেন।

অঙ্কের শিক্ষকের প্রধান লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের মধ্যে অঙ্কের ব্যপারে উৎসাহী করে তোলা। কিন্তু তাঁর কঠিন শাসন এবং শক্ত হাতে ক্লাস পরিচালনা দেখে ছাত্রদের মধ্যে উৎসাহের থেকে অধিক ভীতির উদ্রেক হত।

লেখক ম্যাট্রিকুলেশন (পুরানো দিনের মাধ্যমিক পরীক্ষা) দিয়ে অঙ্কের হাত থেকে নিস্তার পেলেও, অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের ভীতির হাত থেকে তাঁর নিষ্কৃতি মেলেনি। এমনকি যখন তিনি কলেজে শিক্ষকতা করছেন তখনও অঙ্কের ভীতি তাঁকে ছেড়ে যায়নি।


[আরো পড়ুন – নোঙর কবিতার সারাংশ]

একটি পত্রিকা থেকে লেখকের ছোটবেলার গল্প লেখার অনুরোধ এলে, তিনি তাতে তাঁর অঙ্কের মাস্টারমশাইকে নিয়ে লিখলেন। এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁর মাস্টারমশাইকে নিয়ে তাঁর লেখা মোটেও ভক্তিমূলক ছিল না। বরং বক্রোক্তি এবং মাস্টারমশাইয়ের অঙ্ক শেখাবার পদ্ধতির ব্যার্থতার কথাই তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেছিলেন।

“মূল কথাটা এই ছিল, অহেতুক তাড়না করে কাউকে শিক্ষা দেওয়া যায় না, গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করতে গেলে গাধাটিই পঞ্চত্ব পায়। তার প্রমাণ আমি নিজেই। মাস্টার মশাই আমাকে এত প্রহার করেও অঙ্ক শেখাতে পারেননি, বরং যা শিখেছিলুম তা-ও ভুলেছি। এখন দুই আর দুইয়ে চার না পাঁচ হয়, তাই নিজের মধ্যে সন্দেহ জাগে।”

এই লেখাটির জন্য পত্রিকার থেকে লেখক দশ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন।

এর পর অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে, সুকুমারের বয়স বেড়েছে, খ্যাতি বেড়েছে। তিনি বাংলাদেশের এক প্রান্তের একটি কলেজে বার্ষিক উৎসবে আতিথ্য করার ডাক পেয়েছেন। সাধারণত শহর থেকে কোন অথিতি মফস্বল বা গ্রামের কোন অনুষ্ঠানে আতিথ্য গ্রহণ করলে তার খাতির যত্ন বেড়ে যায়। সুকুমারের ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি।

অনুষ্ঠানে তিনি একটি জ্বালাময়ী ভাষণ দেন, যা সবার কাছে খুবই প্রশংসিত হয়। বক্তৃতা শেষ হলে, সুকুমারের সাথে একজন দেখা করার অনুরোধ করেন।

লেখক অপরিচিত ব্যাক্তির সাথে দেখা করতে এসে, তার মুখে নিজের নাম শুনে অবাক হয়ে যান এবং বুঝতে পারেন ঐ অপরিচিত ব্যাক্তি হলেন তাঁর স্কুলের সেই অঙ্কের মাস্টারমশাই।

মাস্টারমশাই সুকুমারকে জানান যে রিটায়ার হয়ে যাবার পর থেকে তিনি ঐ প্রতন্ত্য গ্রামে এসে রয়েছেন এবং আজ অনেকদূর থেকে শুধুমাত্র তার বক্তৃতা শুনবেন বলে এসেছেন। সুকুমার অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে মাস্টারমশাই এর প্রতি যে ভয় তাঁর মনে লুকিয়ে ছিল তা আবেগে রূপান্তরিত হচ্ছে।

মাস্টারমশাই সুকুমারকে আরো অবাক করে দেন যখন তিনি তাঁর পকেট থেকে একটি জীর্ণ পত্রিকার পাতা (সুকুমারের অঙ্কের মাস্টারমশাইকে নিয়ে লেখা সেই প্রতিবেদন) বের করেন। মাস্টারমশাই আরো বলেন যে ঐ লেখাটা তিনি সর্বদা সাথে নিয়ে ঘোরেন এবং সবাইকে দেখান। তাঁর মনে হয় ঐ লেখাটার মাধ্যমে তার ছাত্র তাকে অমর করে রেখেছেন।

শুধু তাই নয়, সুকুমার বুঝতে পারেন যে ঐ লেখাটির মধ্যে, মাস্টারমশায়কে নিয়ে যে তিনি যে বক্রোক্তি ও সমালোচনা করেছেন তাও মাস্টারমশাই সাদরে গ্রহণ করেছেন। মাস্টারমশাই উল্লেখ করেন –

“কত শ্রদ্ধা নিয়ে লিখেছে। আর সত্যিই তো – অন্যায় যদি করেই থাকি, ওরা ছাত্র – ওরা সন্তান – বড়ো হলে সে অন্যায় আমার শুধরে দেবে বই কি।”

মাস্টারমশাইয়ের এই বিপুলতা লেখকের অন্তরে গ্লানির সৃষ্টি করে। তাঁর মনে হয়, তিনি যেন –

“স্নেহ – মমতা –ক্ষমার এক মহাসমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়িয়েছেন। সেই স্নেহ – কোটি মণি – মানিক্য দিয়ে যার পরিমাপ হয় না; সেই মমতা – যার দাম সংসারের সব ঐশ্বর্যের চাইতে বেশি; সেই ক্ষমা – কুবেরের ভান্ডারকে ধরে দিয়েও যা পাওয়া যায় না”।

সুকুমার তাঁর ভুল বুঝতে পারেন, তাঁর মনে এই ভেবে অপরাধবোধ হয় যে এই রকম স্নেহমহী মানুষটার সম্পর্কে তিনি সমালোচনা করেছেন এবং সেই সমালোচনার থেকে তিনি দশ টাকা উপার্জন করেছেন।


নবম শ্রেণির অন্যান্য বিভাগগুলি দেখুন –


মূল বক্তব্য

উপনিষদের কথায় “আচার্য দেব ভব” অর্থাৎ শিক্ষক দেবতার সমতুল।

একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনে শিক্ষকের ভুমিকা অভিভাবকের থেকে কোন অংশে কম নয়। শিক্ষক জীবনের অন্যতম ব্রত হল ছাত্রছাত্রীর জীবনে উন্নতি ঘটানো।  শিক্ষকেরা তাঁদের শিক্ষাদানের পরিবর্তে পারিশ্রমিক পান এটা যেমন ঠিক কথা, কিন্তু একজন ছাত্র বা ছাত্রীর চরিত্র তথা ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের ভুমিকা একপ্রকার অমূল্য।

‘দাম’ গল্পের প্রধান চরিত্র ছাত্র সুকুমারের চোখে যে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের পরিচয় পাই, তিনি ভীষণ কড়া প্রকৃতির মানুষ, ছাত্রদের চোখে তিনি আতঙ্কের এক প্রতিরূপ। বড় মানুষ (যিনি তখন একজন কলেজ শিক্ষকও বটে) হয়ে ওঠা সুকুমার যখন ঘটনাচক্রে আবার তার অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের সাক্ষাৎ পান, তখন তিনি তার স্নেহের প্রতিরূপ উপলব্ধি করেন; যিনি তার ছাত্রের লেখা সমালোচনা ও বক্রোক্তি ভরা প্রবন্ধও সবাইকে গর্বের সাথে দেখান।

সুকুমারের ভুল ভাঙ্গে, সুকুমার বুঝতে পারেন যে শিক্ষক স্বত্ত্বাকে তিনি অনুভব করতে পারেননি। মাস্টারমশাইয়ের বিভীষিকাময় আচরণের মধ্যে যে স্নেহ – ভালোবাসার পরশ লুকিয়ে থাকতো তা সে বুঝতে পারেনি বরং সেই স্বত্ত্বাকে তিনি মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। তিনি তাঁর ভুল বুঝতে  পারেন এবং লজ্জায় তাঁর মাথা হেঁট হয়ে যায়।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply