prithibir-bivinno-vumirup
WB-Class-9

পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমিরূপ সমূহ

শ্রেণি- নবম | বিষয় – ভূগোল | অধ্যায়: ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)

এই পৃথিবী তার ব্যাপক বৈচিত্র্য দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়তই অবাক করে চলেছে।

কোথাও সে কঠিন পর্বত রূপে আবার কোথাও সুজলা সুফলা সমভূমিরূপে আবার কখন ঢেউখেলানো মালভূমিরূপে আমাদেরকে বিস্মিত করছে।

এই সকল ভূমিরূপ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। আগের অধ্যায়ে আমরা সেই বিষয়ে আলোচনা করেছি। যারা আগের পর্ব এখনো পড়োনি তারা এই লিঙ্ক থেকে পড়ে নিতে পারোভূ গাঠনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত ধারণা। এবার আজকের পর্ব শুরু করা যাক।

পৃথিবীর ভূমিরূপ সমূহকে আমরা প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করি যথা –

1. ব্যাপ্তি ক্রম অনুসারে
2. উৎপত্তি অনুসারে

ব্যাপ্তি ক্রম অনুসারে ভূমিরূপের শ্রেণীবিভাগ শ্রেণিবিভাগ

উপরে উল্লিখিত ভাগগুলির মধ্যে আবার কিছু ভাগ রয়েছে।

যেমন ব্যাপ্তি বা ক্রম অনুসারে পৃথিবীর ভূমিভাগকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

ক) প্রথম ক্রমের ভূমিরূপ

প্রথম ক্রমের ভূমিরূপের মধ্যে দুই প্রকার ভূমিরূপ বর্তমান।

● মহাদেশ
● মহাসাগর

খ) দ্বিতীয় ক্রমের ভূমিরূপ

দ্বিতীয় ক্রমের ভূমিরূপের মধ্যে তিন ধরনের ভূমিরূপ রয়েছে।

● পর্বত
● মালভূমি
● সমভূমি

গ) তৃতীয় ক্রমের ভূমিরূপ

এই ভূমিরূপ কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

● ক্ষয়জাত ভূমিরূপ
● সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ

এতক্ষণ তোমরা জানলে ব্যাপ্তি ক্রমানুসারেই কতরকম ভাবে আমাদের আশেপাশের ভূমিরূপগুলিকে ভাগ করা যায়। এখন আমরা দ্বিতীয় ভাগটি সম্পর্কে জেনে নেব।

2. উৎপত্তি অনুসারে শ্রেণীবিভাগ

উৎপত্তি অনুসারে ভূমিরূপকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়।যথা- পর্বত, মালভূমি, সমভূমি।

পর্বতের শ্রেণিবিভাগ

পর্বতকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

● ভঙ্গিল পর্বত
● স্তুপ পর্বত
● আগ্নেয় পর্বত
● ক্ষয়জাত পর্বত

মালভূমির শ্রেণিবিভাগ

মালভূমিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
● পর্বতবেষ্টিত মালভূমি
● লাভা মালভূমি
● ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি
● মহাদেশীয় মালভূমি

তিব্বত মালভূমি

সমভূমি

সমভূমি কে তিন রকম শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল –

ভূআন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সমভূমি : এই সমভূমিকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
○ স্বাভাবিক বা গঠনগত সমভূমি
○ উন্নত সমভূমি
○ অবনত সমভূমি

ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট সমভূমি: এই সমভূমিকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
○ পেডিমেন্ট সমভূমি
○ সমপ্রায় ভূমি
○ তরঙ্গ কর্তিত সমভূমি
○ হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট সমভূমি
○ কার্স্ট সমভূমি

সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট সমভূমি: সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট সমভূমিকে নয় ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –

○ লাভা সমভূমি
○ উপকূলীয় সমভূমি
○ হ্রদ সমভূমি
○ প্লাবনভূমি
○ পাদদেশীয় সমভূমি
○ বদ্বীপ সমভূমি
○ হিমবাহ সঞ্চিত সমভূমি
○ বাগদা সমভূমি
○ লোয়েস সমভূমি


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

আশা করি ভূমিরূপের বিভিন্ন ভাগগুলি সম্পর্কে তোমাদের এতক্ষণে একটা ধারণা হয়েছে। চলো এবারে আমরা

উৎপত্তি অনুসারে ভূমিরূপের বিভাগগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

পর্বতের সংজ্ঞা

বহুদূর বিস্তৃত সমতল ভূমি থেকে প্রায় প্রায় 1000 মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট, খাড়া ঢাল যুক্ত, উচ্চতা ও আপেক্ষিক উচ্চতা যুক্ত শিলাময় ভূমিরূপকে পর্বত নামে অভিহিত করা হয়।

ভূমিরূপের ক্রমানুসারে পর্বত হলো দ্বিতীয় ক্রমের ভূমিরূপ। হিমালয়, আল্পস, আন্দিজ, আরাবল্লী, সাতপুরা, বিন্ধ্য ইত্যাদি হল পর্বতের উদাহরণ।

পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত হল হিমালয়।
পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা হল আন্দিজ পর্বত।

অন্নপূর্ণা পর্বত।

আচ্ছা এবারে বলতো পর্বতমালা কাকে বলে?

কতগুলি পর্বত যখন সমান্তরালে বিস্তৃত হয় তখন তাকে পর্বতমালা বলা হয়।

একগুচ্ছ পর্বত যখন শৃঙ্খলের ন্যায় বিস্তৃত হয়, তখন তাকে কর্ডিলেরা বলা হয়। কর্ডিলেরা শব্দটির অর্থ হল শৃঙ্খল বা দড়ি।

পর্বতের বৈশিষ্ট্য

● পর্বত বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
● পর্বতের উচ্চতা এবং আপেক্ষিক উচ্চতা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের থেকে অনেক বেশি হয়।
● পর্বত শিলাস্তরের ভাঁজ, চ্যুতি, লাভা সঞ্চয় বা ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্টি হতে পারে।
● পর্বত সাধারণত তীক্ষ্ণ শিখর বিশিষ্ট হয়।
● অধিক উচ্চতায় পর্বতচূড়াগুলি সারা বছর তুষারাবৃত থাকে।
● পর্বতের ঢাল খাড়া হয় এবং ভীষণভাবে ধ্বস প্রবন হয়।

পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট। এটি কিন্তু একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বত। পর্বতের বিভিন্ন প্রকারগুলির মধ্যে ভঙ্গিল পর্বত অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।



ভঙ্গিল পর্বত

আমরা জানি গিরিজনি আলোড়নের প্রভাবে পাললিক শিলাস্তরের দুপাশ থেকে যখন চাপ পড়ে তখন শিলাস্তরের ভাঁজ সৃষ্টি হয় এবং শিলাস্তর উপরে উঠে যায় এই ভাবেই ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি হয়।

এই পর্বত শিলাস্তরে ভাঁজ সৃষ্টির ফলে উৎপন্ন হয় বলে একে ভঙ্গিল পর্বত বলা হয়।

ভঙ্গিল পর্বতের বৈশিষ্ট্য

ভঙ্গিল পর্বতের কতগুলি বৈশিষ্ট্য বর্তমান। সেগুলি হল-
● পৃথিবীর বেশিরভাগ ভঙ্গিল পর্বত হলো নবীন ভঙ্গিল পর্বত।
● পৃথিবীর বেশিরভাগ ভঙ্গিল পর্বত পাত সীমান্তের সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়েছে। পাত সীমান্তের সৃষ্টি হয়নি এমন কয়েকটি মাত্র প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত দেখা যায়।
● একাধিক পর্বত যখন বিভিন্ন দিক থেকে এসে একই বিন্দুতে মিলিত হয় বা একটি বিন্দু থেকে বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত হয় তখন তাকে পর্বতগ্রন্থি বলা হয়। পর্বত গ্রন্থি একমাত্র ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায়। যেমন -পামির গ্রন্থি থেকে হিমালয়, কুয়েনলুন, কারাকোরাম ,তিয়েনশান পর্বতগুলি বিস্তৃত হয়েছে।

পামির গ্রন্থি [চিত্র সৌজন্য – NASA]
● ভঙ্গিল পর্বত প্রধানত পাললিক শিলা দিয়ে গঠিত হয়। ভঙ্গিল পর্বতের শিলাস্তরে প্রচুর সামুদ্রিক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে ভঙ্গিল পর্বতগুলি অগভীর সমুদ্র থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
● ভঙ্গিল পর্বতের বিশালতা অর্থাৎ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিস্তার এবং উচ্চতা অনেক বেশি হয়। উচ্চতা অনেক বেশি হওয়ার কারণে এই পর্বতের শৃঙ্গগুলি সারাবছর তুষারাবৃত থাকে। বড় বড় হিমবাহ ও গিরিখাত এই পর্বতে পরিলক্ষিত হয়।
প্রায় সকল ভঙ্গিল পর্বত এই কমবেশি আগ্নেয় শিলার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
● ভঙ্গিল পর্বত প্রবল চাপের কারণে উৎপত্তি হাওয়ায় ভঙ্গিল পর্বতের শিলাস্তরে প্রচুর ভাঁজ এবং চ্যুতি দেখা যায়।
● ভঙ্গিল পর্বত ভূপৃষ্ঠের একটি দুর্বল অঞ্চল এই কারণে এখানে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
● ভঙ্গিল পর্বতে চাপের ফলে কোন শিলাস্তর যখন উপরে উঠে যায় তখন তাকে ঊর্ধ্বভঙ্গ এবং শিলাস্তর নিচে বসে গেলে তখন তাকে অধোভঙ্গ বলা হয়।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌতবিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবনবিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

উৎপত্তির সময় অনুসারে ভঙ্গিল পর্বতের শ্রেণিবিভাগ

ক) প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত

আজ থেকে প্রায় 28 থেকে 36 কোটি বছর আগে প্যালিওজোয়িক যুগে যেসব ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়েছিল তা আজ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বা প্রবল ক্ষয়ীভবনের প্রভাবে ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। এইসকল পর্বতের ভূমিরূপ গঠনের প্রক্রিয়া একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে এবং ক্রমাগত ক্ষয়ীভবন নগ্নীভবনের ফলে তাদের উচ্চতার ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে অবশেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যেই শুধু কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত ভঙ্গিল পর্বতগুলি টিকে রয়েছে।এদেরকেই প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত বলা হয়।

আরাবল্লি রেঞ্জ [Aravalli, by Nataraja licensed under CC BY-SA 2.5 ]
এরকম কিছু প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত হলো ভারতের আরাবল্লী , উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অ্যাপালাচিয়ান,ক্যালিডোনিয়ান ; ইউরোপের হার্সেনিয়ান; এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের সীমান্তে অবস্থিত ইউরাল পর্বত।

নবীন ভঙ্গিল পর্বত

এই পর্বতগুলি জুরাসিক, ক্রিটেসাস, টারশিয়ারী ও কোয়াটারনারি উপযুগে উৎপত্তি হয়েছে বলে এদের নবীন ভঙ্গিল পর্বত বলা হয়।
এই পর্বতগুলির গঠনকার্য এখনো সমাপ্ত হয়নি। এইজন্যেই এই পর্বতগুলি এখনো ভূমিকম্পপ্রবন এবং এদের উত্থান এখনো ঘটে চলেছে। এই কারণে ক্ষয়ীভবন প্রক্রিয়া চলা সত্বেও এই পর্বত গুলির উচ্চতা অনেক বেশি।

আল্পস পর্বতমালা

হিমালয় ,আল্পস ,আন্দিজ, রকি প্রভৃতি হল নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উদাহরণ।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → আগ্নেয় পর্বত


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্যভাবে কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



Join JUMP Magazine Telegram


JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাওয়ার জন্য –

IX_Geo_4b