biseson
Study (পড়াশোনা)

বিশেষণ – সহজে ব্যাকরণ

সহজে ব্যাকরণ সিরিজ (ষষ্ঠ পর্ব) – বিশেষণ


কেমন আছো বন্ধুরা? আশা করি সহজে ব্যাকরণের ক্লাস তোমরা খুব ভালোমতো উপভোগ করছো। তোমাদের জন্যই এই প্রয়াস। তাই আবার নতুন একটি পর্বে চলে এসেছি নতুন কিছু শিখবো বলে।

বাংলা ব্যাকরণ পড়তে গিয়ে আমরা জেনেছি বাক্যে যখন কোনো শব্দ বসে, তখন তাকে পদ বলা হয়। এই পদ ব্যাকরণে নানা প্রকার। ইংরেজি grammar যারা পড়েছো তারা নিশ্চয় জানো সেখানে প্রাথমিকভাবে শব্দ চেনানোর জন্য Parts of Speech বলে একটি বিষয় রয়েছে- বাংলায় এটিই হল পদ।

Parts of Speech যেমন আটপ্রকার, বাংলায় অতগুলি পদ নেই।

বাংলায় পদের শ্রেণিবিভাগে আমরা পাই – বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়। অর্থাৎ মোট পাঁচটি। আজকে আমরা পদের আলোচনা শুরু করবো। সবার আগে পড়বো আমরা বিশেষণ

ইংরেজিতে একে আমরা চিনি adjective হিসেবে। এখন কী এই বিশেষণ? আমরা অনেকসময় বলি- ‘সুন্দর শিশু’ কিংবা ‘লাল টুকটুকে গোলাপ’ কিংবা ‘নির্জন পাহাড়’ – এই যে বাক্যগুলিতে একটা বস্তুকে আরেকটি বস্তু দিয়ে তুলনা করা হচ্ছে এখানেই তৈরি হল বিশেষণ। যেমন লাল টুকটুকে, নির্জন, সুন্দর এই শব্দগুলি বলে দিচ্ছে শিশু, পাহাড়, গোলাপ এগুলি ঠিক কীরকম? আমরা ব্যাকরণের ভাষায় শিশু, গোলাপ, পাহাড় এগুলিকে বিশেষ্য বলে থাকি। এখন এই বিশেষ্যের যে দোষ-গুণ যে পদ নির্দেশ করে তাকেই বিশেষণ বলা হয়। শুধু উপরে উল্লিখিত শব্দগুলিই নয়, নিত্যদিন আমরা বহু বিশেষণ ব্যবহার করি।

বাড়িতে ভাত খাচ্ছো – ভাতটা কেমন?
তুমি বলবে গরম বা ঠাণ্ডা।

তরকারিটা কেমন?
হয়তো বলবে ঝাল বা মিষ্টি বা দারুণ, খুব ভালো ইত্যাদি কিছু একটা।

তুমি যে জামা পড়েছ সেটি কী রঙের?
তুমি বললে – কালো বা নীল বা অন্য কিছু।

এরকম অজস্র বিশেষণ আমরা ব্যবহার করি। এই গরম, ঠাণ্ডা, ঝাল, মিষ্টি, দারুণ, ভালো, লাল, নীল ইত্যাদি পদগুলি সবক্ষেত্রেই অন্য পদের দোষ-গুণ, অবস্থা, মাত্রা ইত্যাদি বোঝায়। ফলে এত অজস্র বিশেষণের ব্যবহারের সুবিধার্থে সেগুলিকে কিছু শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। আমরা সেই শ্রেণিগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেবো। যদিও আগেই বলেছিলাম ব্যাকরণ বুঝতে গেলে, শিখতে গেলে সংজ্ঞার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল উদাহরণ। সবসময় এটা তোমরা মনে রাখবে।

বিশেষণের সংজ্ঞা:

যে সকল পদ বাক্যে বসে অন্য পদের দোষ-গুণ, প্রকৃতি, অবস্থা, মাত্রা ইত্যাদি নির্দেশ করে, তাকে বলা হয় বিশেষণ পদ।

এখন এই বিশেষণকে মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয় –

ক) নাম বিশেষণ
খ) বিশেষণের বিশেষণ
গ) ক্রিয়া বিশেষণ।

এই সম্পূর্ণ শ্রেণিবিভাগটি তালিকার মাধ্যমে প্রকাশ করলে তোমাদের সুবিধে হবে আশা করি।

এবারে এই তালিকাটি মাথায় রেখে আমরা জেনে নেবো শ্রেণিগুলি সম্পর্কে বিশদে।

যখন কোনো বিশেষ্য পদের দোষ-গুণ, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ ইত্যাদি নির্দেশ করে বিশেষণ তাকে বলা হয় বিশেষ্যের বিশেষণ। যেমন – সুন্দর ফুল, ছেঁড়া জামা, নির্জন পাহাড়, শান্ত নদী ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফুল, জামা, পাহাড়, নদী এইসব বিশেষ্যকে বিশেষিত করছে বলে এগুলিকে বিশেষ্যের বিশেষণ বলা হয়।

আবার একইভাবে বাক্যে সর্বনামকে যে পদ বিশেষিত করে তাকে ব্যাকরণের ভাষায় বলা হয় সর্বনামের বিশেষণ। যেমন – আমি দুঃখী বলে তুমি সুখী। সে অলস বলে ব্যর্থ। কিংবা তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন? – এইসব বাক্যগুলিতে আমি, তুমি, সে ইত্যাদি সর্বনামকে বিশেষিত করছে অধম, উত্তম, অলস, দুঃখী, সুখী এইসব বিশেষণ পদগুলি। তাই এদের বলা হয় সর্বনামের বিশেষণ।

আমরা জানি বাক্যে ক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকে না যে পদের তার মধ্যে সম্বন্ধ পদ অন্যতম। এখন এই সম্বন্ধ পদ যখন বিশেষণের মতো অন্য পদের দোষ-গুণ-অবস্থা নির্দেশ করে তখন তাকে সম্বন্ধ বিশেষণ বলা হয়। যেমন –

রামের কলমটি খুব দামী।

মায়ের রান্না অতুলনীয়।

জয় গোস্বামীর কবিতা আমার প্রিয়।

খেয়াল করো বন্ধুরা এখানে মায়ের, রামের, জয় গোস্বামীর এগুলি সবই সম্বন্ধ পদ। এগুলিই এখানে নির্দেশ করছে বিশেষণের মতো।  আবার যে বিশেষণগুলির দ্বারা অন্য পদের দোষ-গুণ-ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য বোঝা যায় তাকে আমরা বলে থাকি গুণবাচক বিশেষণ। যেমন- ভালো ছেলে, উপকারী পশু, দারুণ বই ইত্যাদি। আর যে বিশেষণ অন্য পদের অবস্থা নির্দেশ করে তাকে অবস্থাবাচক বিশেষণ বলে। এর উদাহরণ দেওয়া যায় এরকমভাবে – জ্বলন্ত সূর্য, ধনী অফিসার, চলন্ত ট্রেন, ফুটন্ত জল ইত্যাদি। এরকমভাবে আরো কিছু শ্রেণিবিভাগ খুব সহজে এভাবে তোমরা মনে রাখতে পারবে।

এগুলির মধ্যে কিছু কিছু তোমাদের বুঝতে অসুবিধে হতে পারে বলে বিশদে ব্যাখ্যা করছি। সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্যটি কী আশা করি বুঝতে অসুবিধে হয়েছে। তাই আরেকটু বুঝিয়ে বলি।

বন্ধুরা এখানে সংজ্ঞাবাচক বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো বিশেষ্যপদের প্রকৃতিকে। যেমন ধরা যাক ভারতীয় সংস্কৃতি কথাটাতে সংস্কৃতি হল বিশেষ্য। এখন সংস্কৃতি কেমন বোঝাচ্ছে ভারতীয় পদটি। মূলত এই বিশেষণগুলি তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে তৈরি হয়। যেমন – ভারত + ষ্ণিয় = ভারতীয়।

আবার অব্যয়ের বিশেষণের ক্ষেত্রে উদাহরণগুলির দিকে তাকালে দেখবে পরেই, উপরে, পিছনে এরকম অব্যয়গুলিকে বিশেষিত করছে একটু, ঠিক ইত্যাদি পদগুলি।


আরো পড়ুন → ধ্বনির ধারণাবর্ণ | বাক্য | সন্ধি

সব শেষে বলা হল বিধেয় বিশেষণের কথা।

আমরা বাক্যের গঠনে দেখেছি বাক্যকে উদ্দেশ্য আর বিধেয় এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। উদ্দেশ্যে মূলত থাকে কর্তা আর বিধেয় গড়ে ওঠে ক্রিয়া ও কর্ম নিয়ে। এখন যদি কোনো বাক্যে বিধেয় অংশটি নিজেই বিশেষণের কাজ করে এবং উদ্দেশ্য অংশে যে কর্তা আছে তাকে বিশেষিত করে তখন তাকে বিধেয় বিশেষণ বলা হয়। যেমন – রাতটি অন্ধকার – এই বাক্যে অন্ধকার হল বিধেয় আর রাতটি হল উদ্দেশ্য। অন্ধকার পদটি নির্দেশ করছে রাতটি কেমন তাই এটি বিধেয় হয়েও বিশেষণের কাজ করছে বলে একে বলা হয়েছে বিধেয় বিশেষণ। আশা করি বন্ধুরা বিষয়টি পরিস্কার হয়েছে। এবারে চলে আসবো বিশেষণের শেষ দুটি শ্রেণির আলোচনায়।

বিশেষণের বিশেষণ

আমরা এতক্ষণ জেনেছি বিশেষণ কেবলমাত্র বিশেষ্যের দোষ-গুণ-অবস্থা-প্রকৃতি ইত্যাদি নির্দেশ করে। কিন্তু কখনো কখনো একটি বিশেষণ অপর আরেকটি বিশেষণের দোষ-গুণ-অবস্থা-পরিমাণ ইত্যাদি বোঝাতে পারে, আর তখন সেই বিশেষণকে বলা হয় বিশেষণের বিশেষণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বেশ কনকনে শীত, অতি বড়ো চালাক, লাল টুকটুকে ফুল ইত্যাদি। এখানে বুঝতেই পারছো তোমরা যে চালাক, শীত ইত্যাদি বিশেষণ হওয়া সত্ত্বেও একে বিশেষিত করছে অতিরিক্ত বেশ কনকনে, অতি বড়ো ইত্যাদিগুলি। এগুলিকে তাই বিশেষণের বিশেষণ বলা হয়।

jump-magazine-subscription

ক্রিয়া বিশেষণ

বিশেষ্য বিশেষণের মতো ক্রিয়াপদকে যখন বিশেষিত করে এই বিশেষণ পদ, তখন তাকে ক্রিয়া বিশেষণ বলা হবে। ক্রিয়া অর্থাৎ কাজটি কীভাবে ঘটছে, কখন ঘটছে বা কোথায় ঘটছে ইত্যাদি যখন কোনো বিশেষণ বুঝিয়ে দেবে তখন তাকে ক্রিয়া বিশেষণ বলা হয়।

যেমন – ভাতটা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। সহজে বিষয়টি আয়ত্ত করা যাবে না। লোকটি দৌড়ে দৌড়ে আসছে।

এইসব বাক্যে খাওয়া, আয়ত্ত করা, দৌড়ানো ইত্যাদি ক্রিয়াগুলি কীভাবে ঘটছে তা বিশেষিত করছে এই ক্রিয়া বিশেষণগুলি। আসলে ইংরাজিতে যাকে adverb বলা হয়, বাংলায় তাকেই ক্রিয়া বিশেষণ বলা হয়ে থাকে।

এভাবে আশা করি তোমরা বিশেষণ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেলে। এখন তোমাদের নিজেদের পাঠ ও অভ্যাসের পালা। সহজে ব্যাকরণের নতুন কোনো পর্বে নিশ্চিত আবার কথা হবে তোমাদের সঙ্গে। এবারের মতো বিদায়। 

ষষ্ঠ পর্ব সমাপ্ত। 


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখাটি, অডিও, ভিডিও বা অন্য  কোন ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।