sorbonam-bangla-byakron
Study (পড়াশোনা)

সর্বনাম – সহজে ব্যাকরণ

সহজে ব্যাকারণ সিরিজ – (সপ্তম পর্ব)- সর্বনাম


আবার একটি নতুন ক্লাসে চলে এলাম বন্ধুরা। আশা করি সকলে ভালো আছো। সহজে ব্যাকরণের আগের ক্লাসে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বিশেষণ নিয়ে।

নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে এ সম্পর্কে আলোচনার আগে পদ কী সে বিষয়ে আমি আলোকপাত করেছিলাম। আজকে আমরা যে সর্বনাম পড়বো সেটিও একটি পদ।

নামপদের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় সর্বনাম। ইংরাজিতে একে আমরা Pronoun হিসেবে চিনি।

Noun-এর পরিবর্তে এই পদ বসে বলে একে Pronoun বলা হয়। আমরা এবার সর্বনাম সম্পর্কে জেনে নেব।

সর্বনাম কাকে বলে?

দেখবে বাক্যের মধ্যে তুমি, আমি, তোমরা, আমরা, সে, তারা এইরকম অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার করি, এগুলিই হল সর্বনাম।

বাক্যে সাধারণত একই বিশেষ্য পদ বারবার বসলে শুনতে খারাপ লাগে। তাই শ্রুতিমাধুর্যের জন্যেই এই সর্বনাম পদগুলি ব্যবহৃত হয়। খুব সহজ কয়েকটা উদাহরণের সাহায্যে আমরা ব্যপারটা বুঝে নিই।

সর্বনামের উদাহরণ

শ্যামল পড়াশোনায় খুব ভালো। শ্যামল খুব ভালো ছবি আঁকে। শ্যামল দয়ালু ছেলে। শ্যামল জীবনে অনেক উন্নতি করবে।

এই বাক্যগুলিতে দেখো বন্ধুরা বারবার ‘শ্যামল’ বিশেষ্যটি বারবার বসায় শুনতে একদমই ভালো লাগছে না। একঘেঁয়ে মনে হচ্ছে। তাই এই একঘেঁয়েমি কাটাতে প্রথম বাক্যের পরে শ্যামল শব্দের বদলে যদি সর্বনাম বসানো হয় কেমন হবে বিষয়টা? দেখা যাক।

শ্যামল পড়াশোনায় খুব ভালো। সে খুব ভালো ছবি আঁকে। সে দয়ালু ছেলে। জীবনে সে অনেক উন্নতি করবে।

খেয়াল করে দেখো বন্ধুরা আগের মতো আর একঘেঁয়ে মনে হচ্ছে না। এখানে শ্যামলের বদলে বসলো ‘সে’। এটাই হল সর্বনামের কাজ বা ব্যবহারের দৃষ্টান্ত।

সর্বনামের প্রকারভেদ

এই সর্বনাম আবার ব্যাকরণের ক্ষেত্রে আটটি ভাগে বিভক্ত। আমরা আগে জেনে নিই ভাগগুলির নাম, তারপর বিশদে আলোচনা করা যাবে।

1. ব্যক্তিবাচক সর্বনাম
2. নির্দেশক সর্বনাম
3. অনির্দেশক সর্বনাম
4. প্রশ্নবাচক সর্বনাম
5. সাপেক্ষ সর্বনাম / নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম
6. আত্মবাচক সর্বনাম
7. সাকল্যবাচক সর্বনাম
8. পারস্পরিক সর্বনাম

এখন একে একে আমরা এই ভাগগুলি নিয়ে বিশদে আলোচনা করবো। তবে

সবার আগে প্রাধান্য দেবো উদাহরণকে

ব্যক্তিবাচক সর্বনাম

ক. আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।
খ. শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি।
গ. তিনি খুব বড়ো মাপের পণ্ডিত ছিলেন।
ঘ. আপনাকে এই জানা আমার ফুরোবে না।
ঙ. আমি কান পেতে রই।

এই বাক্যগুলিতে গাঢ় রঙে চিহ্নিত যে পদগুলি অর্থাৎ আমার, তোমার, তিনি, আমি, আপনাকে এগুলি আসলে বিশেষ কোনো একটি ব্যক্তিনামের পরিবর্তে বসেছে বাক্যে।

এই পদগুলি একইসঙ্গে কোনো একটি ব্যক্তিনামকে নির্দেশ করছে। তাই এগুলিকে বলা হয় ব্যক্তিবাচক সর্বনাম।
এইরকম আরো কিছু ব্যক্তিবাচক সর্বনাম হল – আমি, আমরা, আমাকে, আমাদের, তুমি, তোমরা, তোমাকে, তাঁকে, তুই, তোকে, আপনি, আপনাকে, সে, তারা, তিনি, তার ইত্যাদি।

ব্যক্তিবাচক সর্বনামের পুরুষ অনুসারে বিভাজন

এখন এই ব্যক্তিবাচক সর্বনামগুলিকে পুরুষ অনুসারে বিভাজিত করা যায় এভাবে –
উত্তম পুরুষের ব্যক্তিবাচক সর্বনাম :
আমি, আমরা, আমাকে, আমাদের, আমাদেরকে

মধ্যম পুরুষের ব্যক্তিবাচক সর্বনাম :
তুমি, তোমরা, তোমার, তোমাকে, তোমাদেরকে, তুই, তোর, তোরা, তোকে, তোদের, তোদেরকে, আপনি, আপনার, আপনাদের, আপনাকে, আপনাদেরকে

প্রথম পুরুষের ব্যক্তিবাচক সর্বনাম : সে, তার, তাকে, তারা, তাদের, তাদেরকে, তিনি

এরপরে চলে আসবো পরের ভাগে। উদাহরণগুলি খেয়াল করো বন্ধুরা।

চ. এটা দিয়ে কী করবে তুমি?
ছ. এই হিয়া ভরা বেদনাতে
জ. উনি গ্রামের স্কুলে পড়ান।
ঝ. লিখিও উহা ফিরত চাহো কিনা

উপরের বাক্যগুলিতে দেখা যাচ্ছে গাঢ় রঙে চিহ্নিত পদগুলি নিকটবর্তী বা দূরবর্তী কোনো বিশেষ্যকে নির্দেশ করছে। তাই এগুলি হল নির্দেশক সর্বনাম।


আরো পড়ুন – ধ্বনির ধারণা | বর্ণ | বাক্য | সন্ধি | বিশেষণ

নির্দেশক সর্বনামের প্রকারভেদ

এই নির্দেশক সর্বনাম আবার দুই প্রকারের –

নৈকট্যসূচক বা সামীপ্যবাচক এবং দূরত্বসূচক।

কাছের কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে নির্দেশ করলে তাকে বলা হয় নৈকট্যসূচক বা সামীপ্যবাচক নির্দেশক সর্বনাম। যেমন – এ, এই, এরা, এটা, এগুলি, ইহা ইত্যাদি।

আর দূরবর্তী কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দেশ করলে তাকে বলা হয় দূরত্বসূচক নির্দেশক সর্বনাম। যেমন – ও, ঐ, ওটা, উহা, ওরা, ওইগুলি, উহারা ইত্যাদি।

এখন এই নির্দেশক সর্বনামের ক্ষেত্রে যেমন কোনো নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, ঠিক এর উল্টোটা ঘটে অনির্দেশক সর্বনামের ক্ষেত্রে। অনির্দেশক সর্বনামের ক্ষেত্রে কোনো অনির্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করা হয় মূলত কোনো, কেউ, কেউ কেউ বা কোনো কোনো এইরকম সর্বনামের সাহায্যে। যেমন-

ঞ. কেউ কোথা নেই, বাতাস ওড়ায় মিহিন সাদা ধুলো।
ট. কোনো কোনো ছাত্র খুবই অমনোযোগী হয়ে থাকে।
ঠ. কোনো কিছু বলার আগে বা করার আগে, ভালো করে চিন্তা করবে।

প্রশ্নসূচক সর্বনাম

এবারে আমরা চলে আসি প্রশ্নসূচক সর্বনামের ক্ষেত্রে। এই বিশেষ সর্বনামের ধারণাটি অনেকের ক্ষেত্রে ভুল হয়। প্রশ্নসূচক বিশেষণের সঙ্গে একে অনেকে গুলিয়ে ফেলে। ফলে এই দ্বন্দ্ব কাটানো সবার আগে জরুরি। দেখা যাক বিষয়টি কী? আগে উদাহরণগুলির দিকে তাকাও।

ড. যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?
ঢ. কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?
ণ. কোন রাস্তায় হাঁটবে ঠিক করেছ?
ত. গতকাল পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল কারা?

এখানে কেন, কে, কারা, কোন ইত্যাদি সর্বনামের সাহায্যে কিছু প্রশ্ন করা হচ্ছে বলে এদেরকে বলা হয় প্রশ্নসূচক সর্বনাম।

এখন এখানেই একটি ধারণাগত ভ্রান্তি ঘটে। প্রশ্ন করা হলেই সেই পদ প্রশ্নসূচক সর্বনাম হয়ে যায় না। কোনো প্রশ্নের উত্তরে যদি বিশেষ্য পদ আসে তবেই একমাত্র সেটি প্রশ্নসূচক সর্বনাম হবে।
যেমন – কে তুমি? – এই প্রশ্নের উত্তরে নিজের নাম বলতে হবে অর্থাৎ তা বিশেষ্য পদ। ফলে ‘কে’ এখানে প্রশ্নসূচক সর্বনাম।

কিন্তু যদি উত্তরে বিশেষ্যের বদলে বিশেষণ আসে তাহলে কিন্তু সেটি প্রশ্নসূচক বিশেষণ হয়ে যায়। যেমন – তোমার বয়স কত? – এর উত্তরে কোনো সংখ্যা বলা হবে। এখন সংখ্যা মানেই হল বিশেষণ। চব্বিশ বছর বললে বছর বিশেষ্য পদটিকে বিশেষিত করছে ‘চব্বিশ’ এই বিশেষণটি। তাই ‘কত’ এই পদটি প্রশ্নসূচক সর্বনাম না হয়ে প্রশ্নবাচক বিশেষণ হল।

subscribe-jump-magazine-india

আশা করি এবারে তোমাদের ধারণা পরিস্কার হল। ভবিষ্যতে আর কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না।

সাপেক্ষ সর্বনাম বা নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম

এখন আমরা জানবো সাপেক্ষ সর্বনাম বা নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম সম্পর্কে।

পারস্পরিক নির্ভরশীল সংযোগবাচক সর্বনামকে সাপেক্ষ সর্বনাম বলে। সর্বনামের যে জোড়াগুলির একটি ব্যেবহৃত হলে অপরটিও ব্যবহৃত হয়, তাদের সাপেক্ষ সর্বনাম বা নিত্যলসম্বন্ধী সর্বনাম বলে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় –
থ. যারা স্বর্গগত তারা এখনো জানে স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি
দ. যাহা পাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা চাই তাহা পাই না।
ধ. যে করে খনিতে শ্রম জেনো তারে ডরে যম।
ন. যা ছিল তা গেল চলে, রইল যা তা কেবল ফাঁকি!

এখানে যা-তা, যে-তারে, যারা-তারা, যাহা-তাহা এগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বা নির্ভরশীল। তাই এগুলি হল সাপেক্ষ সর্বনাম। এবারে খেয়াল করো বন্ধুরা। নতুন উদাহরণ।

আত্মবাচক সর্বনাম

প. নিজ কর্মদোষে হায় মজাইলা এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি।
ফ. সম্রাট আলেকজাণ্ডার স্বয়ং আপনার সমীপে উপস্থিত।
ব. বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা

উপরের বাক্যগুলিতে গাঢ় রঙে চিহ্নিত পদগুলি খেয়াল করো কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রাধান্য প্রকাশ করছে বা কোনো ব্যক্তির আত্মভাবকে বোঝাচ্ছে। তাই এগুলি হল আত্মবাচক সর্বনাম।

সমষ্টিবাচক বা সাকল্যবাচক সর্বনাম

যে সর্বনাম পদ ব্যক্তি বা বস্তুর দল বা সমষ্টিকে বোঝায় তাকে ব্যাকরণে বলা হয় সমষ্টিবাচক বা সাকল্যবাচক সর্বনাম। ইংরাজিতে একে বলা হয় Plural Noun। এই বহুবচন নির্দেশক শব্দগুলি এক্ষেত্রে সাকল্যবাচক সর্বনাম হিসেবে কাজ করে। যেমন –

ভ. সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে শোনো শোনো পিতা
ম. বল বল বল সবে শত বীণা বেণু রবে
য. আমরা সবাই রাজা আমদেরই রাজার রাজত্বে

এই সব, সকল, সবাই, উভয় ইত্যাদি বহুবচন নির্দেশক শব্দগুলি সাকল্যবাচক বা সমষ্টিবাচক সর্বনাম।
খেয়াল করে দেখো বিশেষ কোনো একটি নামপদের পরিবর্তেই কিন্তু এগুলি বসছে। সবশেষে পড়ে রইল পারস্পরিক সর্বনাম। অতি সহজ বিষয়। বুঝতে তোমাদের কোনো অসুবিধেই হবে না।

অপরের সাহায্য ছাড়া পরস্পর অর্থে স্বেচ্ছায় ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল পারস্পরিক সর্বনাম।

সাপেক্ষ সর্বনামের ক্ষেত্রে আমরা যেমন দেখেছিলাম দুটি সর্বনাম একে অপরের উপর নির্ভরশীল, এক্ষেত্রে কিন্তু পুরো উলটো। অর্থাৎ কোনো নির্ভরশীলতা নেই, স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সর্বনাম ক্রিয়াশীল। যেমন –

র. আপনা-আপনিই দরজাটা খুলে গেল।
ল. নিজে নিজেই সে লাফাতে শুরু করলো।
ব. পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবে।

এই বাক্যগুলিতে দেখা যাচ্ছে সর্বনামগুলি একটি জোড়ার মধ্যে রয়েছে এবং কারো উপর কেউ নির্ভরশীল না হয়েই যেন স্বেচ্ছায় কাজ সম্পন্ন করছে। এছাড়াও পারস্পরিক সাহচর্যে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে বোঝাচ্ছে এখানে। তাই এগুলি হল পারস্পরিক সর্বনাম।

সর্বনাম নিয়ে আর বিশেষ কিছু বলার নেই। তাই আজকের ক্লাস এখানেই শেষ। আপাতত ছুটিইইই…ই..ই..ই..।

সপ্তম পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।