malvumi
WB-Class-9

মালভূমি

ভূগোলনবম শ্রেণি – ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া (পঞ্চম পর্ব)।


আগের পর্বে তোমরা জেনেছ স্তুপ পর্বত সম্পর্কে, এই পর্বে মালভূমি সম্পর্কে আমরা জেনে নেব।

মালভূমি কাকে বলে?

পর্বত ও সমভূমির বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ভূপৃষ্ঠে দ্বিতীয় ক্রমের যে ভূমিরূপ দেখা যায় তাকেই মালভূমি বলা হয়। মালভূমিকে চেনার কতগুলি উপায় আছে সেগুলি হল-

  • সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মালভূমির উচ্চতা হয় কমপক্ষে 300 মিটার।
  • অনেক ক্ষেত্রে মালভূমিতে পর্বতের মত অনুচ্চ গিরি শিখর দেখা যায়।

মহীভাবক আলোড়নের ফলে মহাদেশের বিশাল অংশ যখন উত্থিত হওয়ার ফলে বা তরল লাভা বিদার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূপৃষ্ঠে স্তরায়ীত হয়ে জমে গিয়ে যে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে তাকে মালভূমি বলা হয়।

মালভূমি দেখতে অনেকটা টেবিলের মত।শীর্ষ দেশ চ্যাপ্টা, অসমান ও তরঙ্গায়িত হয়ে থাকে।
মালভূমি সাধারণত খাড়া ঢাল বিশিষ্ট হয়।
সংলগ্ন ভূমিভাগ থেকে হঠাৎ উত্থিত হওয়া এই উঁচুভূমিগুলি নদী দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং বিভক্ত হয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল দোয়াব অঞ্চল সৃষ্টি করে। সাধারণত পাহাড় ও পর্বতের মাঝে উচু অংশে ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি ও সমভূমির মাঝে নিচু ও সমতল মালভূমি অবস্থান করে।

মালভূমি

সুতরাং মালভূমি হল চারপাশে ভূমিভাগ থেকে 300 মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, খাড়া ঢাল বিশিষ্ট সুবিস্তৃত, তরঙ্গায়িত ও টেবিলের মত চ্যাপ্টা শীর্ষ বিশিষ্ট ভূমিরূপ। এইজন্যেই মালভূমির অপর নাম হল টেবিলল্যান্ড। কখনো কখনো দু-একটা বিক্ষিপ্ত চূড়া যুক্ত শৈলশিরা ও নদী উপত্যকা এই মালভূমির ভূমি ভাগের মধ্যে বৈচিত্র্য তৈরি করে।

ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলাতে সমতল ভূমিভাগের মধ্যে মালভূমি দেখা যায়। ব্যাসল্ট লাভায় তৈরি পাহাড়, বুরুন্ডি হ্রদের পাশে ধারে স্লেট পাথরের শীলাকে সুবর্ণরেখার প্রবাহপথ ও কোয়ার্টজ ও কোয়ার্টজাইটের লম্বা প্রাচীর পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

মালভূমির শ্রেণীবিভাগ

মালভূমিকে বিভিন্ন উপাদানের ভিত্তিতে বিভিন্ন ভাবে শ্রেণীবিভাগ করা যায়।

1. উচ্চতা অনুসারে মালভূমির শ্রেণীবিভাগ

উচ্চ মালভূমি
উদাহরন- পামির মালভূমি

নিম্ন মালভূমি
উদাহরণ- দাক্ষিণাত্য মালভূমি

পামির মালভূমি

2. উৎপত্তি ও শিলার গঠন অনুসারে মালভূমির শ্রেণীবিভাগ

ভূ আলোড়নের ফলে সৃষ্ট মালভূমি
i) পর্বতবেষ্টিত মালভূমি
ii) মহাদেশীয় মালভূমি
iii) তির্যক চ্যুতি মালভূমি
ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট মালভূমি
i) পিডমন্ট মালভূমি
ii) ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি
iii) ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি
iv) মরু মালভূমি
সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট মালভূমি
উদাহরণ- লাভা মালভূমি
subscribe-jump-magazine-india

পর্বতবেষ্টিত মালভূমি

ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সময় গিরিজনি আলোড়নের প্রভাবে বিশাল আকার অধঃভঙ্গের মধ্যে মধ্যে সঞ্চিত পলি রাশি উত্থিত হয়ে মালভূমির আকার ধারণ করে। এই মালভূমির চারপাশ বেষ্টন করে ভঙ্গিল পর্বত অবস্থান করে বলে একে পর্বত বেষ্টিত মালভূমি বলা হয়।

ভূতত্ত্ববিদ কভার-এর মতে মহীখাতের মধ্যবর্তী অংশে পরবর্তীকালে পর্বত বেষ্টিত মালভূমির সৃষ্টি করে।

পর্বত বেষ্টিত মালভূমির উদাহরণ

ভারতের উত্তরে হিমালয় ও কুয়েনলুন পর্বত শ্রেণীর মাঝখানে তিব্বত মালভূমি হল পৃথিবীর বৃহত্তম পর্বতবেষ্টিত মালভূমি উচ্চতা 1500 মিটার।
উত্তর আমেরিকার রকি পার্বত্য অঞ্চলে মেক্সিকো, ইয়ুকন ও কলম্বিয়া মালভূমি হল পর্বত বেষ্টিত মালভূমির উদাহরণ।
ভারতের লাদাখ মালভূমি।
দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলের বলিভিয়া ও ইকুয়েডর মালভূমি।
তুরস্কের টরাস পর্বতের ও পন্টিক পর্বতের মাঝখানে আনাতোলিয়া মালভূমি।

লাদাখ মালভূমি

পর্বত বেষ্টিত মালভূমির উৎপত্তি

পর্বত বেষ্টিত মালভূমি তিনটি পর্যায়ে উৎপত্তি হয়।

i) প্রথম পর্যায়ে দুটি মহাদেশীয় পাত বা ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী স্থানে পলি সঞ্চয় হয়। এই প্রক্রিয়াকে লিথোজেনেসিস বলা হয়।
ii) পরবর্তী পর্যায়ে এই দুটি ভূখণ্ড বা পাত পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসার ফলে সঞ্চিত পলিরাশির উপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। প্রবল চাপের ফলে এই পলিতে ভাঁজ পড়ে এবং প্রান্ত বরাবর ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয় ও মহীখাতের মধ্যবর্তী স্থানে মালভূমির সৃষ্টি হয়। এই পর্বত বেষ্টিত মালভূমিকে বলা হয়।
iii) পরবর্তীকালে মালভূমি ও ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষয়জাত প্রক্রিয়ার উপর ক্রিয়াশীল হতে থাকে এই প্রক্রিয়াকে গ্লীপটোজেনেসিস বলা হয়। সুতরাং পর্বতবেষ্টিত মালভূমি ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সাথে সাথে একইসঙ্গে উৎপত্তি লাভ করে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

পর্বতবেষ্টিত মালভূমির বৈশিষ্ট্য

  • পর্বত বেষ্টিত মালভূমি সমুদ্রতল থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থান করে। সাধারণত 3000 মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় এই মালভূমি অবস্থান করে।
  • এ ধরনের মালভূমি আকৃতিতে সুবিশাল হয়ে থাকে এবং প্রিক্যাম্বিয়ান যুগের শিলা দ্বারা গঠিত।
  • এই মালভূমিগুলি নবীন ভঙ্গিল পর্বত দ্বারা বেষ্টিত এবং ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সাথে সাথেই এদের সৃষ্টি হয়ে থাকে।
  • এই মালভূমিগুলি পর্বত ঘেরা দ্বীপের মতো যার উপরিভাগ পাললিক স্তর দিয়ে গঠিত।
  • এই মালভূমির চারিদিক ভঙ্গিল পর্বত দ্বারা বেষ্টিত এই কারণে এই মালভূমির জলবায়ু চরমভাবাপন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে।

[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত ]

মহাদেশীয় মালভূমি

যখন পৃথিবীর কোন বিস্তীর্ণ অঞ্চল মহীভাবক আলোড়নের ফলে উত্থিত হয় বা ভূত্বকের কোন স্থিতিশীল অংশ মহাদেশীয় সঞ্চারণ বা পাত সঞ্চালনের ফলে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ক্ষয় প্রতিরোধ করে মালভূমি হিসেবে অবস্থান করে তখন তাকে মহাদেশীয় মালভূমি বলা হয়।

মহাদেশীয় মালভূমি এর উদাহরণ

আফ্রিকা মালভূমি, উত্তর আমেরিকার কলোরাডো মালভূমি ,কানাডার শিল্ড মালভূমি, রাশিয়ার শিল্ড মালভূমি, এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, আরব, উপদ্বীপীয় ভারত, গ্রীনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার বিশাল অংশ জুড়ে এই মালভূমি অবস্থিত।

মহাদেশীয় মালভূমির উৎপত্তি

মহাদেশীয় মালভূমি বিভিন্নভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে।
মহীভাবক আলোড়নের ফলে ভূত্বকের বিস্তীর্ণ স্থান উত্থিত হয়ে মহাদেশীয় মালভূমি সৃষ্টি করতে পারে।অনেক ভূমিরূপবিদদের মতে বিশাল পরিমাণ ক্ষারকীয় লাভা ভূত্বকের ফাটল দিয়ে নির্গত হয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে যখন সঞ্চিত হয় তখন এই মালভূমির সৃষ্টি হতে পারে।

প্রাচীনকালের গন্ডোয়ানাল্যান্ড ও লরেশিয়ার অন্তর্গত স্থিতিশীল ভূখণ্ড বা ক্রেটন মহাদেশীয় সঞ্চারণ বা পাত চলাচলের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষয় প্রতিরোধ কঠিন শিলা অঞ্চল বা শিল্ড অঞ্চল হিসেবে অবস্থান করে। এদের মহাদেশীয় মালভূমি বলা হয়।

মহাদেশীয় মালভূমি বৈশিষ্ট্য

  • এই মালভূমি মহাদেশের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে।
  • এই মালভূমি উচ্চতা সমুদ্রের উচ্চতা থেকে বেশী উচু হয় না।
  • এ ধরনের মালভূমি আগ্নেয় শিলা ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত হয় বলে ক্ষয় প্রতিরোধ করতে পারে।
  • এই মালভূমির শীর্ষ দেশ প্রায় সমতল এবং ভূমির বন্ধুরতাও নূন্যতম।
  • এই মালভূমি অত্যন্ত প্রাচীন সুস্থিত এবং অপরিবর্তনশীল।

পঞ্চম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → লাভা ও ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তনী শ্রেয়সী বিশ্বাস। পড়াশোনা এবং লেখালিখির পাশাপাশি, ছবি আঁকা এবং বাগান পরিচর্যাতেও শ্রেয়সী সমান উৎসাহী।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।