অভিষেক
Madhyamik

অভিষেক

বাংলা দশম শ্রেনি – অভিষেক (পদ্য) –  প্রথম পর্ব


কবি পরিচিতি

পাঠ্যাংশের ‘অভিষেক’ কবিতাটির রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮২৪ সালে অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন রক্ষণশীল হিন্দু জমিদার আর মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণা। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে মধুসূদন কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। তিনি হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র ছিলেন, স্বনামধন্য ইংরেজ অধ্যাপক ডিরোজিও’র ‘ইয়ং বেঙ্গল’ দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন মধুসূদন, আরেক অধ্যাপক রিচার্ডসনের অনুপ্রেরণায় ইংরেজিতে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়ে হিন্দু কলেজ ছেড়ে বিশপ্‌স কলেজে ভর্তি হয়ে গ্রিক, লাতিন, হিব্রু ও সংস্কৃত ভাষা শেখেন তিনি। আর এসময়েই মধুসূদন ভার্জিলের ‘ঈনিড’, হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’, মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর মতো বিখ্যাত রচনাগুলি পড়ে ফেলেন এবং কাব্য-প্রতিভার স্ফূরণ তাঁর মধ্যে আরো প্রকট হয়।

১৮৪৮ সালে মাদ্রাজে গিয়ে ‘spectator’ পত্রিকায় ইংরেজি কবিতা ও নিবন্ধ লিখতে থাকেন মধুসূদন। তিনি সেসময় একটি ইংরেজি কাব্যও লিখেছিলেন ‘The Captive Lady’ নামে। পরে ১৮৬৭ সালের শেষদিকে দেশে ফিরে এসে বাংলা ভাষায় আত্মোৎসর্গ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯), ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬০), ‘একেই কি বলে সভ্যতা ?’ (১৮৬০), ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০), ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১), ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ (১৮৬০), ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ (১৮৬২) ইত্যাদি। এছাড়াও হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর একটি কাহিনি অবলম্বনে ‘হেকটর-বধ’ নামে একটি গদ্যও লিখেছিলেন তিনি। তাঁর ‘মায়া কানন’ নাটকটি তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন এই মহান কবির মৃত্যু হয়।

jump-magazine-plus

অভিষেক কবিতার প্রেক্ষাপট

পাঠ্যাংশের ‘অভিষেক’ কবিতাংশটি আসলে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত।

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মধুসূদনের এক অসামান্য সৃষ্টি। নয়টি সর্গে বিন্যস্ত এই রচনাকে সমালোচকেরা আলংকারিক মহাকাব্য বলেন। সাধারণত মহাকাব্য দুই প্রকারের – আদি মহাকাব্য বা জাত মহাকাব্য এবং আলংকারিক মহাকাব্য। মহাকাব্য কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির রচনা হলে এবং তাতে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিকতার প্রভাব পড়লে তাকে আলংকারিক মহাকাব্য বলা হয়। অন্যদিকে আদি মহাকাব্য একজনের রচনা নয় কখনো, তাতে যুগে যুগে বহু মানুষের কিছু কিছু সৃষ্টি মিশে থাকে। মধুসূদনের এই মহাকাব্যের মূল কাহিনি রামায়ণ থেকে নেওয়া, তবে এই রামায়ণ বাল্মীকি-রামায়ণ বা কৃত্তিবাসী রামায়ণ নয়। মাদ্রাজে থাকাকালীন তিনি যে ‘জৈমিনি রামায়ণ’ পড়েছিলেন, এই মহাকাব্যের সেই কাহিনিক্রমের প্রভাব রয়েছে। অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা এই কাব্যে দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি, মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, হোমারের ‘ইলিয়াড’ এমনকি কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের প্রভাব রয়েছে। মধুসূদনের আগে পর্যন্ত বাংলায় কাব্য লেখা হত পয়ারের বাঁধা ছন্দে, তিনিই প্রথম ছন্দের এই বন্ধন ভেঙে এই নতুন ছন্দ তৈরি করেন যাকে ইংরেজিতে বলে Blank Verse। কাব্যের নয়টি সর্গ হল যথাক্রমে অভিষেক, অস্ত্রলাভ, সমাগম, অশোকবন, উদ্যোগ, বধ, শক্তি-নির্ভেদ, প্রেতপুরী, সংস্ক্রিয়া।

digital-mock-test

লঙ্কাধিপতি রাবণ মধুসূদনের কাব্যের নায়ক। দেবতাদের গোপন ষড়যন্ত্রে এবং দৈবী সহায়তায় বলীয়ান রামচন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে মেঘনাদ ইন্দ্রজিতের মৃত্যু এই কাব্যের মূল উপজীব্য। শত্রু-নিধনে ইন্দ্রজিতের বীরত্ব, রাবণের পিতৃহৃদয়ের আর্তি এবং পুত্রের মৃত্যুতে রাবণের গগনভেদী বিলাপের মধ্য দিয়ে কাব্যটি সমাপ্ত হয়েছে। মোট আড়াই দিনের ঘটনা নিয়ে কাব্যের কাহিনিক্রম বিন্যস্ত। রাবণের পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে কাব্যের সূচনা, দ্বিতীয় সর্গে ইন্দ্রজিৎ বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের অস্ত্রসংগ্রহ এবং রামচন্দ্রকে দৈবী সহায়তা দান, তৃতীয় সর্গটি আমরা পাই মধুসূদনের অনবদ্য সৃষ্টি প্রমীলা চরিত্রটিকে, চতুর্থ সর্গে অশোকবনে বন্দিনী সীতা আর বিভীষণ-পত্নী সরমার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে স্বল্প পরিসরে উঠে আসে রামায়ণের সম্পূর্ণ কাহিনিক্রম। এভাবে কাহিনি এগোতে থাকে, ষষ্ঠ সর্গে গভীর ট্র্যাজিক পরিণতিতে মেঘনাদের মৃত্যু ঘটে, নবম সর্গে প্রেতপুরীতে গিয়ে রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর পিতা দশরথের এবং সবশেষে মেঘনাদের শবদাহের মধ্য দিয়ে কাব্যের সমাপ্তি। সমগ্র কাব্যের  বেশিরভাগ চরিত্র, ছোটো ছোটো ঘটনা মধুসূদনের নিজের সৃষ্টি যা কিনা গ্রিক কাব্যসাহিত্যের অনুসৃত অনেকাংশে। কাব্যের প্রথমেই মধুসূদন প্রতিজ্ঞা করেছেন, ‘গাইব, মা বীররসে ভাসি, / মহাগীত…’ কিন্তু সমগ্র কাব্যটি পড়লে দেখা যাবে বীররসের পরিবর্তে কাব্যের আমর্ম জুড়ে রয়েছে করুণ রসের ধারা। মেঘনাদের পরাজয়ের যে গভীর ট্র্যাজিক পরিণতি তা সত্যই করুণার উদ্রেক ঘটায়।

jump-magazine-subscription

কাব্যের প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’-এ দেখা যাবে রাক্ষসকুলপতি রাবণ বীরবাহুর মৃত্যুতে বিচলিত। অপর পুত্র ইন্দ্রজিৎ কীভাবে রাঘবকে পরাস্ত করবেন যুদ্ধে তা নিয়ে কবি উদ্বিগ্ন। দেবী সরস্বতীর বন্দনার মাধ্যমে কাব্যের মূল অংশে প্রবেশ করেছেন কবি। লঙ্কার স্বর্ণ-সিংহাসনে আসীন রাবণ পুত্রশোকে বিচলিত। দূতের মুখে বীরবাহুর মৃত্যুর সংবাদ শুনে, তাঁর পুত্রের অসম সাহসিকতার বর্ণনা শুনে শোকসন্তপ্ত পিতা রাবণ। অজেয় কুম্ভকর্ণ নিহত হয়েছেন সম্মুখসমরে, স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে রামচন্দ্রের বানর সৈন্য। এই ঘোর সংকটকালে ইন্দ্রজিৎ পিতার আশঙ্কা উপেক্ষা করে রামের সঙ্গে সম্মুখ সমরে যেতে চেয়েছেন। এই প্রসঙ্গেই উপকাহিনির মতো কবি মুরলা-বারুণীর ঘটনাটি সন্নিবিষ্ট করেছেন। পাতালবাসিনী বারুণীর আদেশে মুরলা রক্ষকুল-রাজলক্ষ্মী রমার কাছে গিয়ে লঙ্কার অবস্থা জানতে চান আর তারপর রমা মেঘনাদের মা প্রভাষা-রাক্ষসীর বেশে আবির্ভূত হন মেঘনাদের কাছে। এর পরেই আলোচ্য পাঠ্যাংশের সূচনা ঘটছে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

অভিষেক কবিতার সারাংশ

প্রভাষা রাক্ষসীরূপী রমাকে দেখে সোনার সিংহাসন ছেড়ে বীর ইন্দ্রজিৎ তাঁর মা প্রভাষাকে প্রণাম করে এই প্রাসাদে তাঁর আসার কারণ জানতে চান। সেইসঙ্গে লঙ্কার কুশলও জানতে চান ইন্দ্রজিৎ তাঁর কাছে, কারণ ইন্দ্রজিৎ তখন প্রমোদ-উদ্যানে বিলাসে মত্ত ছিলেন। ইন্দ্রজিৎ-জননী শোকার্দ্র চিত্তে তখন বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ জানালে ইন্দ্রজিৎ তাঁর ভাইয়ের এরূপ অভাবিত মৃত্যুতে বিস্মিত হন। সীতাপতি রামের মায়াবী ছলনা থেকে লঙ্কার রক্ষোকুলকে বাঁচাতে নির্দেশ করেন ইন্দ্রজিৎ-জননী। আত্মগ্লানিতে জর্জরিত মেঘনাদ রথে চড়ে তখনই সত্বর রাক্ষসাধিপতি রাবণের কাছে এসে উপনীত হন, পথে তাঁর স্ত্রী প্রমীলার সঙ্গে দেখা হলে তাঁকে আশ্বাস দেন  যে শীঘ্রই ফিরে আসবেন তিনি। পিতা রাবণের সভায় এসে ইন্দ্রজিৎ প্রতিজ্ঞা করেন ভস্মীভূত করবেন শত্রু রাম এবং তাঁর সৈন্যদলকে। বীর পুত্রকে আলিঙ্গন করেন রাবণ, পিতৃহৃদয়ের উদ্বেগে তাঁকে বারবার যুদ্ধে পাঠাতে মন চায় না তাঁর। কিন্তু নিয়তি তাঁর প্রতিকূলে।  তবু পুত্র জীবিত থাকতে পিতা যাবেন সম্মুখসমরে, তা মানতে চান না ইন্দ্রজিৎ। তাই তিনি বলেন –

“..থাকিতে দাস, যদি যাও রণে

তুমি, এ কলঙ্ক, পিতঃ, ঘুষিবে জগতে।”

লঙ্কেশ্বর রাবণ জানান যে সম্মুখসমরের জন্য তিনি তাঁর ভাই কুম্ভকর্ণকেও জাগ্রত করেছেন, ‘শূলীশম্ভুনিভ’ কুম্ভকর্ণও যুদ্ধে নিহত। হতভাগ্য লঙ্কাধিপতি পুত্রহারা, ভ্রাতৃহারা, একা হয়ে পড়ছেন ক্রমশ। আর তাই রণোন্মাদনায় অবিচল ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধজয়ের আশায় পিতার আদেশে নিকুম্ভিলা যজ্ঞে উপবিষ্ট হন। এভাবেই রণসাজে সেনাপতি পদে অভিষেক ঘটে কুমার ইন্দ্রজিতের। সমস্ত রাত্রি যজ্ঞকর্ম সাঙ্গ হলে পরদিন সকালে রামচন্দ্রের সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হবেন তিনি। মেঘনাদের অভিষেকে চারিদিকে রাক্ষস বাদ্য বেজে উঠলো, উপস্থিত রক্ষোকুল জয়ধ্বনি দিয়ে সাদরে বরণ করে নিলো বীরবলী ইন্দ্রজিৎকে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – গণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান |

মূল বক্তব্য

পাঠ্যাংশের কাহিনিক্রম মেঘনাদের অভিষেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, তাই অংশটির নামকরণ সুপ্রযুক্ত। এই অংশে আমরা নিয়তিপীড়িত এক হতভাগ্য পিতা হিসেবে রাবণকে দেখি। বলা ভালো শুধু এই অংশে নয়, কাব্যের সর্বত্রই রাবণের চারিত্রিক গঠন এইরকম। রাক্ষসরাজ নয়, বরং এক পিতা হিসেবে মধুসূদন রাবণের চরিত্রটি এঁকেছেন। পিতা-পুত্রের এক বাৎসল্যপূর্ণ সম্পর্কের বুনন আমরা দেখি ‘মেঘনাধবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গের এই অংশটিতে। সর্বোপরি রাবণ-নন্দন ইন্দ্রজিতের বীরত্বই পাঠ্যাংশের উপজীব্য। স্বদেশ-রক্ষায় একজন সুযোগ্য বীরের মতোই ইন্দ্রজিৎ নিজের প্রাণ উপেক্ষা করে শত্রু-নিধনে বদ্ধপরিকর।

আসলে বাঙালির তথা আপামর দেশবাসীর লুপ্ত স্বাজাত্যবোধ জাগ্রত করে তুলতে চেয়েছেন মধুসূদন তাঁর এই কাব্যের চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে। ইন্দ্রজিৎ এই স্বাজাত্যবোধেই দৃপ্ত এক সৈনিক।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → কবিতার সরলার্থ


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

Leave a Reply