ovisehk-kobitar-sorolartho
Madhyamik

অভিষেক – কবিতার সরলার্থ

বাংলা দশম শ্রেনি – অভিষেক (পদ্য) – দ্বিতীয় পর্ব


আগের পর্বে অভিষেক পদ্যাংশের প্রেক্ষাপট ও সারাংশ প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্বে আলোচ্য পাঠ্যাংশটি আরো বিশদে বোঝার জন্য পাঠ্যাংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি প্রসঙ্গ-তাৎপর্য সহ আলোচনা করা হল।

অভিষেক কবিতার সরলার্থ

‘কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী

 ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া, ধাত্রীর চরণে…’

আলোচ্য পাঠ্যাংশ ‘অভিষেক’ মূলত মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গের অংশবিশেষ। মূল কাব্যের প্রথম সর্গে দেখা যায় রাক্ষসকুলপতি রাবণ পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে অত্যন্ত বিচলিত। অপর পুত্র ইন্দ্রজিৎ কীভাবে রাঘবকে পরাস্ত করবেন যুদ্ধে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দূতের মুখে বীরবাহুর মৃত্যুর সংবাদ শুনে, তাঁর পুত্রের অসম সাহসিকতার বর্ণনা শুনে শোকসন্তপ্ত পিতা রাবণ। ইতিমধ্যে অজেয় কুম্ভকর্ণ নিহত হয়েছেন সম্মুখসমরে, স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে রামচন্দ্রের বানর সৈন্য। এই ঘোর সংকটকালে ইন্দ্রজিৎ পিতার আশঙ্কা উপেক্ষা করে রামের সঙ্গে সম্মুখ সমরে যেতে চেয়েছেন। এই প্রসঙ্গেই উপকাহিনির মতো কবি মুরলা-বারুণীর ঘটনাটি সন্নিবিষ্ট করেছেন। পাতালবাসিনী বারুণীর আদেশে মুরলা রক্ষকুল-রাজলক্ষ্মী রমার কাছে গিয়ে লঙ্কার অবস্থা জানতে চান আর তারপর রমা মেঘনাদের মা প্রভাষা-রাক্ষসীর বেশে আবির্ভূত হন মেঘনাদের কাছে। রমা হলেন ইন্দিরা অর্থাৎ নারায়ণের স্ত্রী।

এর পরেই আলোচ্য পাঠ্যাংশের সূচনা ঘটছে। কবি নিজেই এই অংশের বক্তা যেখানে ‘কনক-আসন’ কথার অর্থ সোনার সিংহাসন এবং ‘বীরেন্দ্রকেশরী’ বলতে ইন্দ্রজিৎকে বোঝানো হয়েছে। প্রভাষা রাক্ষসীর বেশে রমাকে দেখে সোনার সিংহাসন ছেড়ে বীর ইন্দ্রজিৎ তাঁর মা প্রভাষাকে প্রণাম করে এই প্রাসাদে তাঁর আসার কারণ জানতে চান। সেইসঙ্গে লঙ্কার কুশলও জানতে চান ইন্দ্রজিৎ তাঁর কাছে, কারণ ইন্দ্রজিৎ তখন প্রমোদ-উদ্যানে বিলাসে মত্ত ছিলেন। ইন্দ্রজিৎ-জননী শোকার্দ্র চিত্তে তখন বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ জানালে ইন্দ্রজিৎ তাঁর ভাইয়ের এরূপ অভাবিত মৃত্যুতে বিস্মিত হন।

‘হায়! পুত্র, মায়াবী মানব

সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।’

আলোচ্য অংশের বক্তা প্রভাষা রাক্ষসীর বেশে রমা। বীরবাহুর মৃত্যুতে বিস্মিত ইন্দ্রজিৎ। রাতের অন্ধকারে মেঘের আড়াল থেকে শর নিক্ষেপ করে রাক্ষসসৈন্যকে পরাস্ত করেছিলেন ইন্দ্রজিৎ, আহত করেছিলেন রামচন্দ্রকেও। তাহলে বীরবাহুর মৃত্যু হল কার হাতে?


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

এই আপাত অসম্ভব ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেন ইন্দিরা। এই অংশে ইন্দ্রজিৎকে ‘মহাবাহু’ বলা হয়েছে কারণ তিনি উদার, দানপ্রিয়। ইন্দিরাকে কবি বলেছেন ‘রত্নাকর-রত্নোত্তমা’। কারণ রত্নাকর হল সমুদ্রগর্ভ যা কিনা রত্নের খনি আর সেই রত্নের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন ইন্দিরা। তাঁর অপর নাম লক্ষ্মী। আসলে পুরাণে আছে ঋষি দুর্বাসার অভিশাপে ইন্দ্র ত্রিভুবন জয় করতে পারেন না এবং শ্রীহীন হয়ে পড়লে সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেন। পরে সমুদ্রমন্থনের সময় ঘৃত থেকে লক্ষ্মী উঠে আসেন। তাই তাঁকে সমুদ্রগর্ভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্নের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইন্দিরা জানান সীতাপতি রামচন্দ্র মায়ার বলে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। সমগ্র কাব্য জুড়েই দেখা যাবে রামচন্দ্রের বিজয়ের লক্ষ্যে দেবতাদের মধ্যে চলেছে এক গোপন ষড়যন্ত্র। দৈবী শক্তিতে বলীয়ান রামচন্দ্র সেই দৈবী প্রভাবেই পুনরায় বেঁচে উঠেছেন। এ সংবাদ মেঘনাদের কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত। এই সংবাদ শুনে মেঘনাদ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ফুলের মালা, সোনার হার ছিঁড়ে ফেলে প্রমোদ উদ্যান থেকে বেরিয়ে আসেন।
jump-magazine-plus

নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকেন তিনি –

এ কি সাজে, আমারে, দশাননাত্মজ

আমি ইন্দ্রজিৎ?…”

দশানন রাবণের অপর নাম, তাই দশাননাত্মজ বলতে ইন্দ্রজিৎকেই বোঝানো হয়েছে। লঙ্কার এহেন সঙ্কটকালে ইন্দ্রজিৎ কিনা রমণীদের সঙ্গে উদ্যানে বিলাসে মত্ত। তাই সেখানেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন শত্রু নিধন করে তিনি এই অপবাদ ঘোচাবেন। আর এই প্রসঙ্গেই লঙ্কার রাজপ্রাসাদে রাক্ষসকুলপতি রাবণ পুত্র ইন্দ্রজিতের কাছে আক্ষেপ করেছেন –

“কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে,

কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?”

শিলা জলের থেকে ভারী হওয়ার কারণে তা জলে ভেসে থাকতে পারে না, অতলে ডুবে যায়। কবি এই প্রসঙ্গে এমন অসাধারণ উপমা ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝাতে চাইলেন যে রামচন্দ্রের পুনরায় বেঁচে ওঠার ঘটনাটি  শিলা জলে ভেসে থাকার মতোই অলীক-অসম্ভব। জগতে কেউ শোনেনি যে মানুষ মৃত্যুর পরেও বেঁচে উঠতে পারে। লঙ্কাধিপতি রাবণের এই উক্তির মাধ্যমে ইন্দিরার সংবাদের সমর্থন পাওয়া যায়। এই অংশে এক অমোঘ নিয়তি বা অদৃষ্টের ফেরে বিপর্যস্ত লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণের চরিত্রের একটি দিক ফুটে উঠেছে।
digital-mock-test

 ‘সাজিল রথীন্দ্রর্ষভ বীর আভরণে…’

 মধুসূদন নিজেই এই উক্তির কথক। আসলে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ যেহেতু আলঙ্কারিক মহাকাব্য অর্থাৎ একক ব্যক্তির রচনা তাই বারবার কাব্যের মধ্যে কবির নিজের উপলব্ধিও চরিত্রগুলির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। রাবণের শোকে, মেঘনাদের পরাজয়ের বেদনায় কবি নিজেও যেন শোকার্ত। তাছাড়া আত্মনির্ভর গীতিকবিতা লেখার যে অভ্যাস মধুসূদনের ছিল তার প্রভাবেও কাব্যের মধ্যে কবির নিজের অনুভূতি ফুটে উঠেছে। ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ কথার অর্থ শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, ‘আভরণ’ শব্দের অর্থ অলঙ্কার, পোশাক ইত্যাদি। প্রমোদ কাননে প্রতিজ্ঞা করার পর ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হন। যুদ্ধের উন্মাদনায় তিনি রথে চড়ে এগিয়ে চলেন লঙ্কার রাজপ্রাসাদের দিকে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – গণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

মধুসূদন এখানে একটি অতি সুন্দর উপমা প্রয়োগ করেছেন। ‘হৈমবতীসুত’ যেমন তারকাসুরকে বধ করার উদ্দেশে প্রস্তুত হয়েছিলেন তেমনই মেঘনাদের এই যুদ্ধের প্রস্তুতি। হৈমবতী পার্বতীর অপর নাম অর্থাৎ হৈমবতীসুত বলতে পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়কে বোঝানো হয়েছে। আবার কবি এখানে মহাভারতের বিরাটপর্বের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন উপমার মতো। বিরাটরাজার গোশালা থেকে গরু চুরি করে দূর্যোধন এবং তা রক্ষা করতে উদ্যত হয় ছদ্মবেশী পাণ্ডবেরা। বিরাটরাজের পুত্র উত্তর-এর সারথি ছিলেন অর্জুন। কৌরববাহিনী দেখে ভীত উত্তর পালাতে চাইলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন তখন শমীগাছের আড়ালে লুকোনো অস্ত্র নামিয়ে এনে তাঁকে আশ্বস্ত করে যুদ্ধ করেন দূর্যোধনের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে এবং গোধন উদ্ধার করেন। ধীরে ধীরে রথ এগোতে থাকে ইন্দ্রজিতের। মেঘবর্ণের রথের চাকাগুলি থেকে বিদ্যুতের ছটা বেরোচ্ছে, রথের ঘোড়ার গতি বায়ুর মতো দ্রুত। ঠিক এইসময়েই ইন্দ্রজিৎ-পত্নী প্রমীলা এসে তাঁর হাত দুটি ধরে অনুনয় করেন। কবি লিখছেন –

“হায় রে যেমতি

হেমলতা আলিঙ্গয়ে তরু-কুলেশ্বরে”।

অর্থাৎ লতানো গাছ যেমন বৃক্ষকে আলিঙ্গন করে উপরে ওঠে বা বেঁচে থাকে ঠিক সেইভাবে প্রমীলা তাঁর স্বামী ইন্দ্রজিতের হাত দুটি ধরলেন। স্ত্রীকে ছেড়ে তিনি যাচ্ছেন রণাঙ্গনে। ভীষণ যুদ্ধের আশঙ্কায় প্রমীলা ভীত। তাঁর স্বামী বেঁচে ফিরবেন কিনা তা নিয়ে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত। আর তাই সনাতন পত্নীর আশঙ্কিত হৃদয়ের আর্তি ফুটে উঠেছে প্রমীলার এই উক্তিতে –

“তবে কেন তুমি, গুণনিধি 

ত্যজ কিঙ্করীরে আজি?…”

স্বামীর বিরহে প্রমীলা কিভাবেই বা থাকবেন ? ‘কিঙ্করী’ শব্দের অর্থ দাসী বা সেবিকা। এই উক্তিতে প্রমীলা নিজেকে কিঙ্করী বলে সম্বোধন করে অনুনয় করেছেন যে ইন্দ্রজিৎ যেন তাঁকে ছেড়ে না যান। ইন্দ্রজিৎ তখন তাঁকে আশ্বাস দেন, যে ভালোবাসার বন্ধনে তিনি ইন্দ্রজিৎকে বেঁধে রেখেছেন তা কেউ ছিন্ন করতে পারবে না। রামচন্দ্রকে হত্যা করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি শীঘ্রই ফিরে আসবেন বলে প্রমীলাকে কথা দেন তিনি। প্রমীলার থেকে বিদায় প্রার্থনা করে ইন্দ্রজিৎ গরুড়ের রথে রওনা দেন। মেঘের মধ্যে ধনুকের ছিলায় টান দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করেন তিনি।
jump-magazine-subscription

 “হেন কালে তথা, 

দ্রুতগতি উতরিলা মেঘনাদ রথী…”

 লঙ্কার শিবিরে রাবণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যুদ্ধের উন্মাদনায় তিনি মত্ত। চারিদিকে বাজছে ‘রণ-বাজনা’, হাতির আর ঘোড়ার ডাকে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছে। আবার পদাতিক সৈন্যদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। রেশমী পতাকা উড়ছে চারিদিকে। ঠিক এইসময়েই রথে চড়ে নেমে এলেন মেঘনাদ।

পিতা রাবণকে রামচন্দ্রের পুনরুজ্জীবনের সংবাদ জানিয়ে তিনি অনুরোধ করেন রাবণ যেন তাঁকে অনুমতি দেন শত্রু নিধন করার। ইন্দ্রজিৎ রামচন্দ্রকে বন্দী করে রাবণের পদতলে এনে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু রাবণ শুধুই লঙ্কার রাজা নন, এ কাব্যে তিনি পিতা। পুত্রের মৃত্যুর সম্ভাবনা জেনেও তিনি কীভাবে তাঁকে অনুমতি দিতে পারেন ! এর আগে তাঁর অপর বীর পুত্র বীরবাহু মারা গেছে, নিহত হয়েছে অজেয় কুম্ভকর্ণও। এ যেন গ্রহের ফের। তাই রাবণের হতাশ কণ্ঠে শোনা যায় – “হায়! বিধি বাম মম প্রতি।” অদৃষ্ট বা নিয়তি তাঁর সহায় নয়। কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ ইন্দ্রজিৎ বলেন তিনি থাকতে পিতা যদি সমরে যায় তা হবে বীরত্বের কলঙ্ক। বারবার ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে পাঠাতে মন না চাইলেও লঙ্কার এহেন দুর্যোগে তিনি নিরুপায় রাজা। তাই রাতে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সমাপ্ত করে উষাকালে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন রাবণ –

 “নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ কর, বীরমণি!…”

‘বীরমণি’ এখানে স্বয়ং ইন্দ্রজিৎ। সূর্য অস্তমিত হচ্ছে আর এই অবসরেই মেঘনাদকে তিনি লঙ্কার সেনাপতি পদে বরণ করে নেন। ইষ্টদেবের পুজো শেষ করতে পারলেই ইন্দ্রজিৎ হবেন অজেয়। সেনাপতি পদে মেঘনাদের অভিষেকের এই ঘটনাই সমগ্র অংশটির উপজীব্য।

পর্ব সমাপ্ত।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

Leave a Reply