varoter-malvumi-onchol
Madhyamik

ভারতের মালভূমি অঞ্চল

ভূগোলদশম শ্রেণি – আঞ্চলিক ভূগোল (চতুর্থ পর্ব)


আগের পর্বে আমরা ভারতের সমভূমি অঞ্চল সম্পর্কে জেনেছি। এই পর্বে আমরা ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল সম্পর্কে জেনে নেব।

ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চলের অবস্থান

ভারতের দক্ষিণ ভাগের মালভূমি তিনদিকে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। এরূপ অবস্থানের জন্য এই মালভূমি অঞ্চলটি উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল নামে পরিচিত। এই মালভূমির উত্তর সীমান্তে অবস্থান করছে আরাবল্লী, সাতপুরা, বিন্ধ্য, ভারমের ও রাজমহল পাহাড়।

পূর্ব সীমান্তে রয়েছে ভারতের পূর্ব উপকূল, পশ্চিম সীমান্তে ভারতের পশ্চিম উপকূল এবং দক্ষিণ সীমান্ত কন্যাকুমারিকা অন্তরীপে গিয়ে শেষ হয়েছে।

এই মালভূমির উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃতি প্রায় 1,600 কিলোমিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে 1,400 কিলোমিটার। এই মালভূমির গড় উচ্চতা 600 থেকে 900 মিটার। ভারতের এই উপদ্বীপীয় মালভূমিটি গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ।

উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চলের শ্রেণীবিভাগ

ভূপ্রকৃতির তারতম্য অনুসারে এই মালভূমি অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

ভারতের মানচিত্রে মালভূমি অঞ্চল

যেমন-
1. দাক্ষিণাত্যের মালভূমি
2. মধ্য ভারতের উচ্চভূমি
3. পূর্ব ভারতের উচ্চভূমি বা পূর্বাচল

1. দাক্ষিণাত্যের মালভূমি

দাক্ষিণাত্যের মালভূমি ত্রিভুজাকৃতির। এর উত্তর ও উত্তর পূর্বে অবস্থান করছে সাতপুরা, মহাদেব, মহাকাল পর্বত; পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পূর্বে পূর্বঘাট পর্বত।

দাক্ষিণাত্যের মালভূমির ভূ প্রকৃতি

ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী মালভূমিকে দু ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা- পার্বত্য অংশ এবং মালভূমি অংশ।

● পার্বত্য অংশ

ক. সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বত

পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমান্তরালে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রাচীরের ন্যায় অবস্থান করছে। এই পর্বতমালা একটি তির্যকচ্যূত স্তুপ পর্বত যা বর্তমানে ক্ষয়জাত পর্বতে পরিণত হয়েছে।

এই পর্বতের নিকট থলঘাট ও ভোরঘাট গিরিপথ অবস্থিত। পশ্চিমঘাট পর্বতের উত্তর অংশে অবস্থিত শৃঙ্গটি হল কলসুবাই (1646 মিটার) এবং সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত ভাভুলমালা (2,339 মিটার) হল পশ্চিমঘাটের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

খ. নীলগিরি পর্বত

পশ্চিমঘাট পর্বতের একদম দক্ষিণে অবস্থিত হল নীলগিরি পর্বত যা পূর্বঘাট পর্বতমালার এসে মিলিত হয়েছে। নীলগিরি পর্বত পালঘাট গিরিপথ দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

দোদাবেতা (2,637 মিটার) হল নীলগিরি পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

আনাইমালাই পর্বত তিন দিক থেকে এসে নীলগিরি পর্বতের সাথে মিলিত হয়েছে।

আনাইমালাই পর্বতের আনাইমুদি (2695 মিটার) হল দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

আনাইমুদি পর্বত [Image by-Mdmadhu, licenced under- CC BY-SA 4.0]

গ. পূর্বঘাট পর্বত বা মলয়াদ্রি:

ভারতের পূর্ব উপকূল বা করমন্ডল উপকূলের সমান্তরালে বিচ্ছিন্ন কতগুলি শৈলশিরার সমষ্টি হল পূর্বঘাট বা মলয়াদ্রি পর্বত। এই পর্বত একটি ক্ষয়জাত পর্বতের উদাহরণ।

পূর্বঘাট পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জিন্দাগাডা (1,690 মিটার)।
এই পর্বতের দক্ষিণে সর্বোচ্চ অংশ পালকোনডা নামে পরিচিত। মহেন্দ্রগিরি (1,501 মিটার) ও আর্মাকোন্ডা (1,680 মিটার) পূর্বঘাট পর্বতের উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গ।

ঘ. সাতপুরা পর্বত

চ্যুতির ফলে সৃষ্ট নর্মদা ও তাপ্তি নদীর উপত্যকায় মাঝখানে অবস্থিত সাতপুরা পর্বত হল একটি হোর্স্ট পর্বতের উদাহরণ।

ধূপগড় (1,350 মিটার) হলো সাতপুরা পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

● মালভূমি অংশ

মালভূমি অংশটিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

ক. মহারাষ্ট্র মালভূমি

এই মালভূমি বাসল্টজাতীয় লাভা দ্বারা গঠিত হয়েছে। এই মালভূমির পশ্চিম অংশে লাভা স্তরের ক্রমাগত সঞ্চয়ের ফলে সিঁড়ির ধাপের মত ভূমিরূপ সৃষ্টি করেছে। এই কারণে এই মালভূমিকে ডেকানট্রাপ বলা হয়। এই মালভূমিতে অযোধ্যা পাহাড় অবস্থিত।

খ. কর্ণাটক মালভূমি

এটি একটি ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি। একে মহীশূর মালভূমি নামেও অভিহিত করা যায়। এই মালভূমির পশ্চিমে রয়েছে মালনাদ ও পূর্বাংশে ময়দান।

পশ্চিমভাগে পশ্চিমঘাট পর্বতের পাদদেশে উত্তর থেকে দক্ষিনে বিস্তারিত 320 কিলোমিটার লম্বা, পূর্বদিকে 35 কিলোমিটার চওড়া উঁচু-নিচু ঢেউখেলানো পাহাড়ময় ভূমিভাগটি মালনাদ নামে পরিচিত।
এর পূর্বাংশে অনুচ্চ ঢেউ খেলানো ভূমি ময়দান নামে পরিচিত।

গ. তেলেঙ্গানা মালভূমি

আর্কিয়ান যুগের শিলায় গঠিত এই মালভূমির উত্তরাংশ ও পর্বতময় দক্ষিণাংশ তরঙ্গায়িত রূপ নিয়েছে।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিবাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

2. মধ্যভারতীয় উচ্চভূমি

উত্তরপশ্চিমে আরাবল্লী, দক্ষিণের নর্মদা উপত্যকা এবং পূর্বে রেওয়া মালভূমি দ্বারা মধ্য ভারতের উচ্চভূমি বেষ্টিত হয়েছে।

মধ্যভারতীয় উচ্চভূমির ভূপ্রকৃতি

এই অঞ্চলের প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক অংশগুলো হল-

● আরাবল্লী পর্বত

ভারতের উত্তর-পশ্চিমে বিস্তৃত 800 কিলোমিটার দীর্ঘ আরাবল্লী পর্বত হলো ভারতের প্রাচীনতম ভঙ্গিল পর্বত। এটি একটি ক্ষয়জাত পর্বত রূপে অবস্থান করছে। গুরুশিখর (1,772 মিটার) এই পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

আরাবল্লী পর্বত [Image by-Nataraja,licensed under- CC BY-SA 2.5]

● মারওয়ার উচ্চভূমি

আরাবল্লী পর্বতের পূর্ব দিকে অবস্থিত উচ্চভূমিকে রাজস্থান উচ্চভূমি নামে অভিহিত করা যায়।

● মধ্য ভারতের মালভূমি

চম্বল নদী বিধৌত বালি মাটি দিয়ে গঠিত তরঙ্গায়িত এই মালভূমি পাথার নামে পরিচিত।

● বুন্দেলখন্ড উচ্চভূমি

এই উচ্চভূমিটি গ্রানাইট ও নিস শিলায় গঠিত এবং এই অঞ্চলের গড় উচ্চতা 300 থেকে 600 মিটার।

● মালওয়া বা মালব্য মালভূমি

বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরে অবস্থিত এই লাভা গঠিত মালভূমির উচ্চতা 500 থেকে 600 মিটার।
jump-magazine-subscription

● রেওয়া মালভূমি

মালব্য মালভূমির পূর্ব দিকে অবস্থিত লাভা গঠিত মালভূমিটি রেওয়া মালভূমি নামে পরিচিত। এই অঞ্চলটি তরঙ্গায়িত।

● বিন্ধ্য পর্বত

নর্মদা নদীর উত্তর অংশে বেলে পাথর শিলায় গঠিত পর্বত টি হলো বিন্ধ্য পর্বত। এই পর্বতের দক্ষিণ খাড়া ঢালে নর্মদা নদী উপত্যকা নেমে গেছে। এই ঢালকে নর্মদার খাড়া ঢাল বলা হয়। এই পর্বতের পূর্ব অংশে কাইমুর পাহাড় অবস্থিত। এটি একটি ক্ষয়জাত স্তুপ পর্বত।

3. পূর্ব ভারতের উচ্চভূমি বা পূর্বাচল

মধ্য ভারতের উচ্চভূমির পূর্বে এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর-পূর্ব ভারতে এই উচ্চভূমি অবস্থিত। এই উচ্চভূমির ভূ-প্রাকৃতিক অংশগুলি হল-

● বাঘেলখন্ড মালভূমি

এই মালভূমি অঞ্চলে গন্ডোয়ানা শিলার অপর ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি এবং গ্রানাইট শিলার অপর তরঙ্গায়িত মালভূমি গড়ে উঠেছে।

● ছোটনাগপুর মালভূমি

এই মালভূমিকে গ্রানাইট ও নিস শিলায় গঠিত। এই মালভূমির পশ্চিমে ল্যাটেরাইট বা লাভা গঠিত সমতল মস্তক বিশিষ্ট অংশকে প্যাট বলা হয়। এই পাহাড়ের উচ্চতা গড় 1000 মিটার।

● মহানদী অববাহিকা বা ছত্রিশগড় অববাহিকা

মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশায় মহানদীর অববাহিকা বিস্তৃত হয়েছে। এই অববাহিকার গড় উচ্চতা 1000 মিটার। এই অঞ্চলে স্লেট এবং চুনা পাথরের তৈরি পাহাড় রয়েছে। এটি ছত্রিশগড় অববাহিকা নামেও পরিচিত।

● দণ্ডকারণ্য মালভূমি

ছত্রিশগড়ের দক্ষিণের দণ্ডকারণ্য মালভূমি অবস্থিত। এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত ইন্দ্রাবতী নদীতে চিত্রকূট জলপ্রপাত অবস্থিত।

পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তনী শ্রেয়সী বিশ্বাস। পড়াশোনা এবং লেখালিখির পাশাপাশি, ছবি আঁকা এবং বাগান পরিচর্যাতেও শ্রেয়সী সমান উৎসাহী।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।