borjyo-bybosthapona
Madhyamik

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভাগীরথী হুগলী নদীর উপর বর্জ্যের প্রভাব

ভূগোলদশম শ্রেণি – বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (দ্বিতীয় পর্ব)


আগের পর্বে আমরা বর্জ্যের ধারণা এবং পরিবেশের উপর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের পর্বে আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভাগীরথী হুগলী নদীর উপর বর্জ্যের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বর্তমান উন্নত সময়ে প্রতিনিয়ত সম্পদের উৎপাদনে, সরবরাহ ও ভোগের জন্য বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে চলেছে এবং বর্জ্য ফেলার স্থানাভাবে সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানুষের ওপর কুপ্রভাব বেড়ে চলেছে। তাই বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা অবশ্যই দরকার, যাতে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট না হয়। বর্জ্য পদার্থের সৃষ্টি থেকে সংগ্রহ, পরিবহন ও সবশেষে নিক্ষেপ পর্যন্ত এর হ্রাস ঘটানো, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃনবীকরণ এর মাধ্যমে পরিচালনা করাকে বলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

এই ধাপগুলি সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক –

ক) বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস

বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করা, গৃহস্থালির বিভিন্ন জিনিস অপচয় কমিয়ে সেগুলিকে সরাসরি রাস্তায় না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা যাতে আবর্জনা কম সৃষ্টি করা যায়।

খ) বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার

নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে পরিত্যক্ত জিনিসপত্র থেকে বিভিন্ন নতুন উপকরণ, খেলনা, ঘর সাজাবার জিনিসপত্র তৈরি করা, আবার অনেকসময় নতুন ব্যবহারের জিনিস তৈরি করাকে পুনর্ব্যবহার বলে।

গ) বর্জ্যের পুনঃ নবীকরণ

একই বর্জ্য থেকে একই নতুন পদার্থ তৈরি করাকে পুনঃ নবীকরণ বলে। কাগজ, কাঁচ, ধাতু, কাপড় ইত্যাদি বর্জ্যকে পুনরাবর্তনশীল বর্জ্য বলে। পুরসভা থেকে এইসব বর্জ্যগুলিকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশে বর্জ্য প্লাস্টিকের প্রায় ৪০% পুনরুদ্ধার করে নতুন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র তৈরি করা হয়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যে যে পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে সেগুলি হল –

ক) বর্জ্য পৃথকীকরণ

কঠিন বর্জ্যগুলিকে সহজেই পৃথক করা যায়। যেসব বর্জ্যগুলি প্রকৃতিতে আপনাআপনি পচনের মাধ্যমে মাটিতে মিশে যায়, সেগুলিকে জৈব ভঙ্গুর বর্জ্য বলে। যেকোনো শাকসবজি, ফসলের খোসা, ফলের খোসা, বীজ, কাপড় এর উদাহরণ। আর একধরনের বর্জ্য আছে যেগুলি একদমই পচনশীল নয়, এদের জৈব অভঙ্গুর বর্জ্য বলে। পলিমার, পলিথিন, টায়ার, কাচ ইত্যাদি এর উদাহরণ। বর্জ্যকে এই প্রকৃতি অনুসারে আলাদা করে, পুনরাবরতন করে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়।

খ) ভরাটকরণ

বর্জ্য দিয়ে জম ভরাট করার কাজতিকে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বলা হয়, এটি একটি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবরজনার জৈব অংশ দিয়ে আলাদা করে ২ মিটার উঁচু স্তর বিছিয়ে দেওয়া হয়, তার উপর ২০-২৫ সেমি মাটির স্তর দেওয়া হয়।

গ) কম্পোস্টিং বা জৈব সার উৎপাদন

এই পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্য পদার্থ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে পচন ঘটিয়ে হিউমাস উৎপন্ন করা হয়। ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে বর্জ্য পদার্থ থেকে যে সার উৎপাদন করা হয় তাকে জৈব সার বলে। কম্পোস্ট সার প্রস্তুতিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব বর্জ্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য বর্তমানে জৈবসার বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে মাটিতে চাপা দেওয়া দেওয়া আবর্জনা থেকে পচনক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব সার উৎপন্ন হয়।

ঘ) নিকাশি ব্যবস্থা

তরল বর্জ্য পদার্থগুলি নর্দমার কাদাজলে মিশে থাকে, এতে ক্যাডমিয়াম, সিসা তামা, আর্সেনিক প্রভৃতি ধাতব পদার্থ থাকে। এই দূষিত জলে ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে মিথেন ও কারবন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। এছাড়া ঐ জলকে পরিষ্কার করে মাছের চাষ ও শিল্পের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ঙ) স্ক্রাবার

স্ক্রাবার হল বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণকারী একধরণের যন্ত্র যা কলকারখানা, পারমানবিক চুল্লি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা

ক। বায়ু, জল ও মাটি দূষণ রোধ করা যায়, ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়। প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস হওয়া থেকে সমাজকে রক্ষা করা একটি বিশেষ প্রয়োজন।
খ। বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস তৈরি করা গেলে সহজেই গচ্ছিত সম্পদের ভাণ্ডার রক্ষা করা যাবে।
গ। বর্জ্য পচনের ফলে যে মিথেন বা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়, তা সহজেই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এছাড়া বর্জ্য পুড়িয়ে যে তাপ উৎপন্ন হয় তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে আলোর সরবরাহ করা সম্ভব। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে কয়লা সম্পদকে রক্ষা করা সম্ভব।
ঘ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হলে দূষণের মাত্রা হ্রাস পাবে, ফলে বায়ু বাহিত বা জলবাহিত রোগ যেগুলি বর্জ্যের জন্যে সংক্রামিত হয় সেগুলি অনেকটাই কমবে।

বর্জ্যের প্রভাবে দৃশ্যদূষণ

ঙ। বর্জ্যের স্তূপ অনেকসময়ই দৃশ্যদূষণ ঘটায়, বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত জমতে থাকা কম্লেই সহজিএ নিরমল ও স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলা যাবে।
চ। অনেক্ষত্রেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক দিকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, পুনঃব্যবহার ও পুনঃনবীকরণের মাধ্যমে।

ভাগিরথী হুগলী নদীর উপর বর্জ্যের প্রভাব

গঙ্গা নদীর নিম্ন অববাহিকা ভাগিরথী হুগলী নদী নামে পরিচিত। এই নদীতে বর্জ্য আসে নিকটস্থ বন্দর, শহর, পাটকল, চামড়া কারখানা, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল শোধনাগার, কাগজকল, কৃষিক্ষেত্র থেকে। প্রায় সবধরনের বর্জ্য পদার্থই এই নদীতে এসে প্রতিদিন মিশেছে যার ফলে নদীর দূষণের মাত্রা বেড়ে হয়েছে অত্যধিক। এই প্রভাবগুলি হল –

ক। কলকারখানা, তেল শোধনাগার, পাটকল প্রভৃতি থেকে ক্রমশ দূষিত জল নদীতে এসে পড়ছে, যাতে মিশে থাকছে ধাতব বিষাক্ত পদার্থ। এর ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, নদীতে থাকা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রানির জবন সংশয় হচ্ছে।
খ। পুরসভার কঠিন বর্জ্য, কারখানার কাদা জল, জলে মিশে থাকা ভারী ধাতু নদী গর্ভে মিশে পলি ও চরের সৃষ্টি করছে যার ফলে নদী ক্রমশ অগভীর হয়ে যাচ্ছে।

গ। নদীতে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত বর্জ্য মেশার ফলে নদীর অভ্যন্তরের অক্সিজেন উৎপাদন কমে আসছে ফলে জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে,যা মাছের উৎপাদনে হ্রাস ঘটাচ্ছে, এরফলে বর্তমানে বহু প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমে এসেছে।
ঘ। কলকারখানা ও শোধনাগারের গরম জল নদীতে পড়ে জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়, এক্ষেত্রে জলে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু হয় ও জলচক্রের স্বাভাবিক গতি ব্যহত হয়।

ভাগিরথী হুগলী নদীর দূষণ

ভাগিরথী হুগলী নদীকে এরুপ দূষণমুক্ত করার জন্য ১৯৮৫ সালে ‘গঙ্গা একশান প্ল্যান’ নামে একটি পরিকল্পনা গৃহীত হয়, যেটি সম্পন্ন করার দায়িতবে ছিল কলকাতা পুরসভা এবং এই প্ল্যানের ফলে কলকাতার প্রায় ১৭৫ কিমি দীর্ঘ গঙ্গামুখি নালা বন্ধ করে তা পরিশোধন করা হয়। বর্তমানে ‘নমামি গঙ্গে’ নামক পরিকল্পনায় সমগ্র গঙ্গা নদী দূষণ মুক্ত করার কাজ চলছে।
সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

X-geo-4-b