bohurupi-subodh-ghosh
Madhyamik

বহুরূপী

বাংলা দশম শ্রেনি – বহুরূপী (গদ্য)


লেখক পরিচিতি

সুবোধ ঘোষ বাংলার একজন কথা সাহিত্যিক। বিহারের হাজারিবাগে ১৯০৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সারা জীবনে তিনি বহু পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলনে। বিহারের সামান্য বাস কন্ডাক্টর থেকে তাঁর কর্মজীবন শুরু  হয়, পরবর্তী সময়ে পৌরসভার কেরানী, স্টোরকিপার ইত্যাদি কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন, এমনকি তিনি ব্যবসাও করেছিলেন। তিরিশের দশকে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে যুক্ত হন এবং  পরবর্তীকালে অন্যতম সম্পাদকীয় লেখক হয়েছিলেন

তার বিচিত্র কর্ম জীবনের প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটকে। তাঁর লেখা দুটি বিখ্যাত গল্প হল ‘অযান্ত্রিক’ এবং ‘ফসিল’। এর মধ্যে ‘অযান্ত্রিক’ গল্পটি নিয়ে বরেণ্য চলচিত্রকার ঋত্বিক ঘটক চলচিত্র তৈরি করেছিলেন। তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল – ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘শুক্লাভিসার’, ‘জতুগৃহ’ ইত্যাদি। তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য আনন্দ পুরষ্কার এবং জগত্তারিনী পদক লাভ করেন

উৎস

বর্তমানে আলোচ্য ‘বহুরূপী’ গল্পটি সুবোধ ঘোষের গল্প সমগ্র তৃতীয় খণ্ড থেকে নেওয়া হয়েছে।

subscribe-jump-magazine-india

জেনে রাখার জন্য

এই বহুরূপী শব্দটির সাথে অনেক ছাত্র-ছাত্রীর পরিচয় নাও থাকতে পারে। বহুরূপী কথার অর্থ যার বহু রূপ ধারণ করার ক্ষমতা আছে। সাধারণত একজন শিল্পী নকল – পোশাক, রঙ (মেকাপ) এবং ভাব – ভঙ্গিমার সাহায্যে একটি চরিত্র ফুটিয়ে তোলে। এরা রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে, দর্শকরা খুশি হয়ে বহুরূপীদের বকশিস দিত; এতেই তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি হত। আজ কাল বহুরূপী প্রায় দেখা না গেলেও কিছু কাল আগেও শহরে, মফস্বলে এবং গ্রামে বহুরূপীর নিয়মিত দেখা মিলত।

বহুরূপী
মা কালীর বেশে এক বহুরূপী [সৌজন্যে – palokmedia.com]

বিষয় সংক্ষেপ

হরি বা হরিদা একজন প্রতিভাবান বহুরূপী। ‘শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরে, এক ছোট্ট ঘরে’ হরিদার বাস। হরি দরিদ্রও বটে, অধিকাংশ দিন তার ভালোভাবে আহার জোটে না। পাড়ার চারজন হরির সকাল সন্ধ্যার আড্ডার সঙ্গী। তাদের কাছে হরি হল হরিদা, তারাই চা, চিনি আর দুধ নিয়ে আসে। হরিদার ছোট্ট ঘরের উনানে চা তৈরি হয়, কথোপকথন চলতে থাকে।

এমনই একদিন হরিদার ঘরে আড্ডা দিতে এসে ছেলেরা জগদীশ বাবু এবং এক সন্ন্যাসীর কথা হরিদাকে জানায়। জগদীশ বাবু পাড়ার ধনী মানুষ, তিনি কৃপণ হলেও সাধু – সন্ন্যাসীতে তাঁর ভক্তি লক্ষ্যনীয়। তা এই জগদীশ বাবুর বাড়িতে একজন ‘খুব উচু দরের সন্ন্যাসী’ এসে উপস্থিত হয়েছেন; যিনি কিনা হিমালয়ে থাকেন এবং সারা বছরে মাত্র একটি হরীতকী ছাড়া কিছুই খান না। জগদীশ বাবু, সাধুর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করার জন্য সোনার বোল দেওয়া কাঠের খড়ম এবং সাধুর ঝুলিতে একশ টাকার নোট দান করেছেন শুনে হরি বা পাড়ার ছেলেদের হরিদা চুপ করে যায়।     

তারা জানে হরি গরীব হলেও তাঁর প্রতিভার কোন অভাব নেই। হরিদা চাইলেই অফিসের কোন কাজ বা কোন দোকানের বিক্রিওয়ালার কাজ সহজেই পেতে পারতো। কিন্তু ‘একেবারে ঘড়ির কাঁটার সামনে সময় বেঁধে দিয়ে আর নিয়ম করে নিয়ে রোজই এক চাকরি করে যাওয়া’ তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই

একঘেয়ে অভাবটাকে সহ্য করতে হরিদার আপত্তি নেই, কিন্তু একঘেয়ে কাজ করতে ভয়ানক আপত্তি।

হরিদার জীবনে একটা নাটকীয় বৈচিত্র আছে, যখন সে বহুরুপী সাজে তখন তাকে আলাদা করে চেনাই মুশকিল হয়ে যায়। তা সে বাসস্ট্যান্ডের পাগল বা রূপসী বাইজি অথবা নকল পুলিশ বা কাপালিক যাই হোক না কেন, প্রত্যেকবারেই তাঁর নিখুত সাজ এবং অভিনয় পথচলতি মানুষকে অবাক করে। হটাৎ হরিদা বলে –

‘আজ তোমাদের’ একটা জবর খেলা  দেখাবো।’

হরিদা ছেলেদের জানায় যে সে জগদীশ বাবুর বাড়িতে আজ একটি জবর খেলা দেখাবে এবং সে আরো জানায় এর ফলে সে যে পরিমাণ অর্থ আয় করবে তাতে তার সারা বছর চলে যাবে।

MMT_Jump

ছেলেরা তার কথা শুনে অবাক হয়, কারণ প্রথমত জগদীশ বাবু কৃপণ এবং দ্বিতীয়ত তিনি হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীকে অর্থদান করলেও ভেক ধরা নকল সন্ন্যাসীকে মানে হরিদাকে কি আদৌ অর্থ সাহায্য করবেন? হরিদা ছেলেদের কৌতূহল নিরসন করেন না, বরং সন্ধ্যাবেলা তাদের জগদীশ বাবুর বাড়িতে উপস্থিত হতে বলেন।

সন্ধ্যা বেলা ‘স্পোর্টের চাঁদা’ নেবার  আছিলায় ছেলেরা জগদীশ বাবুর বড়ি উপস্থিত হয়।

ছেলেরা যখন তাদের চাঁদার খাতা জগদীশ বাবুর হাতে দিয়ে অপেক্ষা করছে, এমন সময় সবাইকে অবাক করে এক ব্যাক্তির আবির্ভাব হয়।

আগন্তুকের খালি গায়ের উপর সাদা উত্তরীয় এবং পরনে একটা সাদা থান। মাথায় শুকনো সাদা চুল, ধুলো মাখা পা, হাতে একটা ঝোলা। তাতে কেবল মাত্র একটা বই – গীতা। ছেলেরা ভীষণ অবাক হয়, তারা আশা করেছিল যে জটাজূটধারী কোন সন্ন্যাসীরূপী হরিদাকে তারা দেখবে। কিন্তু ঐ অপরিচিত শীর্ণ চেহারার আগন্তুককে হরিদা বলে মনেই হয় না।


আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করার অনুরোধ রইল! 🙂


আগন্তুক এবং জগদীশ বাবুর কথোপকথন শুরু হয়। আগন্তুক নিজেকে বিরাগী নামে পরিচিত করে, তার আধ্যাত্মিক জ্ঞান সকলকে অবাক করে দেয়।

জগদীশ বাবু বিরাগীকে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করার বহু অনুরোধ করলেও, বিরাগী ঠাণ্ডা জল ছাড়া কিছুই স্বীকার করতে অসম্মত হন। এমন কি জগদীশ বাবু তাকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা দিলে, তাও নিতে বিরাগী অস্বীকার করেন। অবশেষে বিরাগী টাকার উপর কিছুমাত্র লোভ না দেখিয়ে জগদীশ বাবুর বাড়ি থেকে বিদায় নেন।


[আরো পড়ুন – আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি কবিতার সারাংশ]

পরে ছেলেরা হরিদার ছোট্ট ঘরে পৌঁছে দেখে উনানে চাল ফুটছে, বিরাগীর সেই সাদা উত্তরীয়, গীতা এবং ঝোলা মাদুরের উপর পড়ে আছে, আর একটা বিড়ি ধরিয়ে হরিদা চুপ করে বসে আছেন। ছেলেরা ভীষণ অবাক হয়, কারণ হরিদা বহুরূপী সেজে জগদীশ বাবুর বাড়ি যাবেন এই তথ্যটা জানা স্বত্বেও তারা বিরাগীকে দেখে চিনতে পারেনি। তারা জানতে চায় যে জগদীশ বাবু যখন বিরাগীরূপী হরিদাকে পাঁচশো টাকা সাধলেন তখন তিনি কেন টাকা নিতে অস্বীকার করলেন? [যেসময়ে এই গল্প রচনা করা হয়েছে সে সময় পাঁচশো টাকা বিপুল পরিমাণ টাকা ছিল]

তাতে হরিদা বলেন যে তিনি একজন বিরাগী সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করেছিলেন, একজন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর পক্ষে টাকা স্পর্শ করা শোভা পায় না, তাই তিনি টাকা নিতে পারেন নি। কারণ এর ফলে তার ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যেত। [এখানে ‘ঢং’ শব্দটি চরিত্রের বিশেষ দিক বোঝাতে ব্যবহার হয়েছে]।

ছেলেরা হরিদার মনের কথা বুঝতে পারে, কিন্তু তার সাথে এও বোঝে যে হরিদার দারিদ্র কখনও কাটবে না। অদৃষ্ট কখনই হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না। তবে হরিদা জানায় যে পরে সে জগদিশ বাবুর কাছে যাবে এবং তার প্রাপ্য বকশিস আট আনা বা দশ আনা দাবী করে আসবে।

হরিদার বক্তব্যঃ কি আর করা যাবে, খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর থেকে আর বেশি কি আশা করতে পারে?


অন্যান্য বিভাগগুলি পড়ুন

দশম শ্রেণি – ভৌতবিজ্ঞান

দশম শ্রেণি – বাংলা

দশম শ্রেণি – গণিত

দশম শ্রেণি – জীবনবিজ্ঞান


সারসংক্ষেপ

বহুরূপী গল্পের প্রধান চরিত্র হরি। হরি একজন বহুরূপী, ভিন্ন সাজ ধারণ করে দর্শকদের থেকে সামান্য কিছু আয় করেই তার গ্রাসাচ্ছাদন হয়। দারিদ্রের সাথে তার লড়াই নিত্যদিনের; কোনদিন তার উনানে চাল ফোটে আবার কোন দিন শুধু জল।

এই বহুরূপী সাজা তার কাছে কেবল মাত্র একটা জীবিকা নয়। সে একজন শিল্পী, বহুরূপীর অভিনয় তার কাছে শিল্প। সে যখন কোন চরিত্রের রূপায়ন করে, তখন সেই চরিত্রের সাজের পাশাপাশি, সেই চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও সমান গুরুত্ব পায়। এই জন্যেই প্রবল দারিদ্র থাকা স্বত্ত্বেও হরিদা জগদীশ বাবুর কাছ থেকে টাকা নিতে অস্বীকার করে, কারণ সেই সময় সে ‘বিরাগী – সন্ন্যাসীর’ বেশ ধারণ করেছিল, আর একজন সন্ন্যাসীর কাছে অর্থের কোন মুল্য নেই। হরিদার কাছে অর্থের থেকে এই শিল্পীর মুল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু সমাজ কি এই মূল্যবোধের কোন মুল্য দেয়?

মনে হয় না। কারণ ‘প্রকৃত’ সন্ন্যাসী যখন দুই হাত পেতে টাকা গ্রহণ করেন, সোনার বোল দেওয়া খড়ম পড়েন তখন দরিদ্র, নকল সন্ন্যাসীর অর্থ নিতে অস্বীকার করাটা সমাজের চোখে অপরাধ। তাই অদৃষ্ট হরির অর্থ না নেওয়ার মতো ভুল ক্ষমা করে না, হরি চিরকাল দরিদ্রই থেকে যায়।

কিন্তু অভাব – দারিদ্রের সাথে প্রবল লড়াই করেও অটুট থাকে হরিদার শিল্পীস্বত্ত্বা।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply