mendelifs-periodic-table
Madhyamik

মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণি

ভৌতবিজ্ঞান – দশম শ্রেনি – অধ্যায়: পর্যায় সারণি (দ্বিতীয় পর্ব)


আমরা আগের পর্বে দেখেছি, কিভাবে বিজ্ঞানী নিউল্যান্ড তার ‘অষ্টক’ সূত্র রচনা করেছিলেন। তার পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিফ আগেকার পর্যায় সারণি সংস্কার করেন ও তার জগৎখ্যাত পর্যায় সারণি রচনা করেন।

নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্রের অসম্পূর্ণতার পর্যালোচনা :

মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণীর সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে আগে নিউল্যান্ডের পর্যায় সারণির ভ্রান্তিগুলি আলোচনা করতে হয়। নিউল্যান্ডের মত অনুসারে প্রতিটি অষ্টম মৌলে, প্রথম মৌলটির ধর্ম পুনরাবৃত্ত হয়। কিন্তু প্রথম 16টি মৌলের পর (H থেকে Ca অবধি) ধর্মের সাদৃশ্য বিনষ্ট হয়ে যায়।

উল্লেখ করা যায় যে, Aluminium আর Chromium নিউল্যান্ডের পর্যায় সারণিতে উপরে নিচে বর্তমান। কিন্তু এদের মধ্যে যোজ্যতা ছাড়া আর কোনো ধর্মের মিল নেই। আবার Oxygen ও সালফারের সাথে ফেরাস বা Iron এর মিল না থাকলেও তিনি এদেরকে এক পংক্তিভুক্ত করেন।

JUMP whats-app subscrition

মেন্ডেলিফ লক্ষ্য করেন যে নিউল্যান্ডের পর্যায় সারণিতে মৌলগুলির ধর্মগুলি মিল রেখে বসেছিল, কিন্তু ক্যালসিয়ামের পরবর্তী  মৌলগুলিতে এই ধর্মের মিল থাকছে না। কিন্তু যখন তিনি মৌলগুলির পারমাণবিক ভরকে ভিত্তি করে মৌলগুলিকে পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রমে সাজালেন, তিনি সেখানেও ধর্মের পুনরাবৃত্তি দেখতে পেলেন। তিনি নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্রটিকে পুনঃসম্পাদিত করে নতুন পর্যায়সূত্র বানালেন।

Mendelejevs_periodiska_system_1871
বিজ্ঞানী মেন্ডেলিফ রচিত পর্যায় সারণি

মেন্ডেলিফের পর্যায় সূত্র:

পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রমে সাজালে মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম পর্যায়ক্রমে পুনরাবৃত্ত হয়।”

তিনি কেবলমাত্র অষ্টকের নিয়মটি বর্জনই করলেন না, বরং জোর দিলেন ধর্মের সাদৃশ্য থাকার ওপরেও। তিনি হাইড্রোজেনকে (H) ফ্লুরিনের (F) ওপর থেকে সরিয়ে লিথিয়ামের ওপরে স্থান দিলেন। হাইড্রোজেন হলো তার প্রথম পর্যায় (period) এর একমাত্র মৌল। দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি পারমাণবিক ভর 7 থেকে 19 অবধি 7টি মৌলকে 7টি গ্রূপ বা শ্রেণীতে স্থান দিলেন।

লিথিয়াম (Li) গ্রূপ 1এ, বেরিলিয়াম (Be) গ্রূপ 2 এ। বোরন(B), কার্বন (C), নাইট্রোজেন(N) আর অক্সিজেন(O) যথাক্রমে গ্রূপ 3, 4, 5 ও 6 নম্বরে এবং ফ্লুরিন (F)7 নম্বর গ্রূপে স্থান পেলো।

P1

এরপর আবার সোডিয়াম (Na) 1এ, ম্যাগনেসিয়াম (Mg) 2এ, অ্যালুমিনিয়াম (Al) গ্রূপ 3এ, সিলিকন (Si) 4এ, ফসফরাস (P) 5এ, সালফার (S) 6এ, ক্লোরিন (Cl) 7এ স্থান পেলো। উল্লেখ্য এখানে যে মৌলটি অক্সিজেনের সাথে বসলে যে যোজ্যতা প্রদর্শন করে, তার গ্রুপ সংখ্যা একই।  যেমন Na2O, MgO, Al2O3, SiO2, P2O5, SO3 ও Cl2O7-এ Na, Mg, Al, Si, P, S ও Cl-এর যোজ্যতা যথাক্রমে 1, 2, 3, 4, 5, 6 ও 7।

P2

এরকম ভাবে তিনি Ca অবধি এগোলেন। কিন্তু তারপর তিনি পেলেন (Sc)স্ক্যান্ডিয়াম। যার যোজ্যতা অক্সিজেনের সাথে 3 কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম বা বোরনের সাথে তার কোনো ধর্মের মিল নেই। তিনি সেটিকে গ্রূপ 3-এর B উপশ্রেণীতে স্থান দিলেন এবং আগের মৌলগুলিকে ওদের যথাক্রমিক শ্রেণীর A উপশ্রেণীতে স্থান দিলেন। এভাবে তিনি (Ti) টাইটেনিয়াম, (V) ভ্যানাডিয়াম, (Cr) ক্রোমিয়ম ও (Mn) ম্যাঙ্গানিজকে গ্রূপ 4B, 5B, 6B ও 7B তে স্থান দিলেন। এরপর তিনি পেলেন (Fe) আয়রন, (Co) কোবাল্ট ও (Ni) নিকেল।তিনটিতেই তিনি চৌম্বক ধর্মের সাদৃশ্য পেলেন। তিনটিকেই স্থান দিলেন গ্রূপ 4-এ।

P3

এরপর (Cu) কপারকে 1B তে রেখে ও (Zn) জিঙ্ককে 2B তে রেখে পরবর্তী 5টি মৌলকে রাখলেন 3A, 4A, 5A, 6A ও 7A তে। এখানে উল্লেখ্য যে তিনি যখন এই টেবিলটা বানাচ্ছেন তখন মাত্র 56টি মৌল আবিষ্কৃত হয়েছিল।

তাই তিনি এই চতুর্থ পর্যায়ে 3A ও 4A এর মৌলগুলির ধারণা করেছিলেন মাত্র, সেগুলি তখন আবিষ্কৃত হয় নি। 5A, 6A ও 7A তে তিনি রাখলেন (As) আর্সেনিক, (Se) সেলেনিয়াম ও (Br) ব্রোমিনকে, যাদের সাথে ফসফরাস, সালফার ও ক্লোরিনের ধর্মের মিল রয়েছে।

3A তে তিনি অনুমান করেছিলেন যে অ্যালুমিনিয়ামের মতো কোনো একটি ধাতু থাকবে, সেটিকে তিনি নাম দিলেন Eka-অ্যালুমিনিয়াম। ঠিক তেমনই 4A তে রাখলেন Eka-সিলিকনকে। সেই দুটি মৌলের সমস্ত ধর্ম তিনি গণনা করে লিখে রাখলেন।

Mendeleev'sPeriodic
মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণি আধুনিক ভাবে সজ্জিত করে [সৌজন্যে NCSSM]
পরবর্তীকালে যখন গ্যালিয়াম আর জার্মেনিয়াম আবিষ্কৃত হলো, দেখা গেল তাঁর অনুমান 98% সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। এটি তাঁর পর্যায় সারণি ও পর্যায়সূত্রের ব্যাপক সাফল্য।


বিজ্ঞাপন


তিনি তাঁর পর্যায় সারণির জন্য কিছু নিয়ম বানিয়েছিলেন, যার ভিত্তিতে তিনি মৌলগুলিকে বিভিন্ন ঘরে স্থান দেন। সেগুলি হলো:

  1. মৌলগুলি ভরের ঊর্ধ্বক্রমে সাজানো হবে
  2. একটি ঘরে (একই পর্যায় ও একই শ্রেণীতে) একটি মাত্র মৌলই থাকবে।
  3. একই শ্রেণীতে থাকা মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম একই রকম হবে।
  4. যদি দুটি মৌলের পারমাণবিক ভর ভিন্ন হয় তবে তারা আলাদা শ্রেণীতে স্থান পাবে।
  5. যদি কোনো ঘরে কোনো মৌল না পাওয়া যায় তবে সেই ঘরটিকে শূন্য রাখা হবে।
  6. এইভাবে সাজালে আমরা মোট 7 টি পর্যায় ও 8 টি শ্রেণী পাবো। তার মধ্যে 7 টি শ্রেণীকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হবে। একই ঘরে থাকা মৌলগুলি-র যোজ্যতার মূল ছাড়া আর কোনো মিল থাকবে না।


এই নিয়মগুলি মেনে পর্যায় সারণি বানানোর ফলে আমরা যে পর্যায় সারণি পেলাম তাতে প্রচুর সুবিধা হলো

  • একই ধর্মের মৌলগুলিকে একই শ্রেণীতে পাওয়া গেলো
  • অজ্ঞাত মৌলগুলির সম্বন্ধে আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভবপর হলো
  • কিছু কিছু মৌলের পারমাণবিক ভরের সংশোধনও হলো।

[আরো পড়ুন – বিভব, ভোল্টেজ ও ওহমের সূত্র]

কিন্তু মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণিতেও অনেক ভুল ছিল। সেগুলি হল-

  • মেন্ডেলিফ নিষ্ক্রিয় গ্যাসের জন্য কোনো স্থান রাখেননি। কারণ নিষ্ক্রিয় গ্যাস তখনও আবিষ্কৃত হয়নি।
  • মেন্ডেলিফ হালকা আয়োডিনকে (127) ভারী টেলুরিয়ামের (128) পরে রেখেছিলেন, আয়োডিনের সাথে ব্রোমিনের ধর্মের সাদৃশ্যের কারণে। এখানে তিনি নিজেই ধর্মের সাযুজ্যকে ভরের উর্ধক্রমে বিন্যাসের থেকে বেশি প্রাধান্য দেন।
  • আবার ধর্মের মিল থাকা সত্ত্বেও Li আর Mg, Be আর Al, বোরন আর Si ভিন্ন শ্রেণীতে স্থান পায়।
  • হাইড্রোজেনের স্থান আজও বিতর্কিত। ধর্মের মিল দেখলে হাইড্রোজেনকে মেন্ডেলিফের গ্রূপ 1A ও গ্রূপ 7A উভয়েতেই স্থান দেওয়া উচিৎ।
  • উনি রাসায়নিক ধর্মের সাদৃশ্য থাকার কারণে আইসোটোপকে একই ঘরে বসিয়েছিলেন।উনি Fe, Co আর Ni কে একই ঘরে রাখেন।
  • ধর্মের মিল না থাকা সত্ত্বেও K আর Cu একই ঘরে স্থান পায়।


মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণির সংশোধন হয় নিষ্ক্রিয় গ্যাস আবিষ্কারের পর। নিষ্ক্রিয় গ্যাসের জন্য নবম শ্রেণী ‘০’ রাখা হয় অষ্টম শ্রেণীর পর।

মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণির শক্তি ছিল তাঁর কল্পনাশক্তি। পরবর্তীকালে মোসলে কর্তৃক পারমাণবিক সংখ্যা বা পরমাণু ক্রমাঙ্ক আবিষ্কার হওয়ার পরে দেখা যায় যে তাঁর দ্বারা প্রকল্পিত মৌলগুলি যেটি যেখানে বসার সেটি সেখানেই বসেছে। খালি ঊর্ধ্বক্রমটি আর পারমাণবিক ভরের নয়, পারমাণবিক সংখ্যার, মেন্ডেলিফের পর্যার সারণীতেও যেটি ঊর্ধ্বক্রমে আছে। তাই

  1. আইসোটোপের এক ঘরে থাকা যুক্তিযুক্ত
  2. I (53) এর আগে Te (৫2) বসবে
  3. Li (3) এর সাথে Na (11), Be (4) এর সাথে Mg (12) আর B (5) এর সাথে Al (13) বসছে।

কিন্তু বাকি ভুলগুলি শোধরানোর জন্য নতুন পর্যায়সূত্র প্রয়োজন পড়লো। সেটির ভিত্তি হলো পরমাণু ক্রমাঙ্ক।

“পারমাণবিক সংখ্যার ঊর্ধ্বক্রমে সাজালে মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম পর্যায়ক্রমে পুনরাবৃত্ত হয়।”

পরবর্তী পর্বে পড়ুন আধুনিক পর্যায় সারণির কথা।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply